আইজ্যাক নিউটন জন্মগ্রহণ করেন ১৬৪২ সালের ‘ক্রিসমাস ডে’ তে, এমন এক সময়ে যখন দেশটি গৃহযুদ্ধে বিভক্ত ছিল এবং তিনি নিজেও ছিলেন শারীরিকভাবে দুর্বল এক শিশু। তাঁর জন্মের কয়েক মাস আগেই বাবার মৃত্যু হয়। পরে মায়ের পুনর্বিবাহের কারণে তিনি বাড়ি ছেড়ে চলে যান, আর আইজ্যাক বড় হয়ে ওঠেন তাঁর দাদা-দাদির তত্ত্বাবধানে।
লিংকনশায়ারের এক প্রত্যন্ত খামারে কেটেছিল তাঁর শৈশব, বিদ্বৎসমাজের কোলাহল থেকে বহু দূরে। কিন্তু সেই নীরব ও সাধারণ শুরুর মধ্য থেকেই ধীরে ধীরে জন্ম নেয় এমন এক মেধা, যা পরে উন্মোচন করে দেখায় গতি, আলো আর মাধ্যাকর্ষণ কীভাবে পুরো মহাবিশ্বকে নিয়ন্ত্রণ করে।
আধুনিক বিজ্ঞানের ভিত্তি নির্মাণ
আইজ্যাক নিউটনের জন্মের সময় বিজ্ঞান এখনো স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে গড়ে ওঠেনি। তখন পণ্ডিতেরা তাঁদের গবেষণাকে বলতেন ‘প্রাকৃতিক দর্শন’। অর্থাৎ ভৌত জগতের এক বিস্তৃত অধ্যয়ন, যেখানে পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি উদ্দেশ্য ও নকশা নিয়ে চিন্তাভাবনাও জড়িত ছিল। এই ধারণার বড় একটি অংশই নির্ভর করত অ্যারিস্টটলের শিক্ষার ওপর, যেখানে যুক্তিকেই জ্ঞান অর্জনের প্রধান পথ হিসেবে দেখা হতো।
সে সময় পাথর মাটিতে পড়লে মানুষ ভাবত, এটি নিজের স্বাভাবিক জায়গায় ফিরে যাচ্ছে। আগুন ওপরে ওঠে, কারণ তার প্রকৃতি তাকে ওপরে টানে। আর ভারী বস্তু নিচে পড়ে, কারণ তাদের প্রকৃতি সেভাবেই কাজ করে। এসব ধারণাকে প্রশ্ন না করেই সত্য বলে মেনে নেওয়া হতো। ব্যাখ্যাগুলো একে অন্যের সঙ্গে এত ভালোভাবে মিলত যে খুব কম মানুষই ভাবত, প্রকৃতি সত্যিই কি এমনভাবে কাজ করে কি না।
তবে ১৬০০ দশকের শুরুর দিকে কিছু চিন্তাবিদ এই প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করতে শুরু করেন। অনুমানের বদলে পরীক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়ার এই ধারা নিউটনের যুগের জন্য, আর পরবর্তীতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির জন্যও, শক্ত বৌদ্ধিক ভিত্তি তৈরি করে।
নিউটন যে বৈজ্ঞানিক জগতের উত্তরাধিকারী হয়েছিলেন, সেটিকে গড়ে তুলতে যাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন:
নিকোলাস কোপার্নিকাস (১৪৭৩–১৫৪৩): সূর্যকেন্দ্রিক তত্ত্ব উপস্থাপন করেন, যেখানে পৃথিবী নয়, সূর্যই সৌরজগতের স্থির কেন্দ্র।
ইয়োহানেস কেপলার (১৫৭১–১৬৩০): জ্যোতির্বিদ টাইকো ব্রাহের পর্যবেক্ষণ বিশ্লেষণ করে আবিষ্কার করেন যে গ্রহগুলো উপবৃত্তাকার কক্ষপথে চলতে থাকে এবং পূর্বানুমেয় নিয়মে আকাশীয় গতি প্রদর্শন করে।
গ্যালিলিও গ্যালিলেই (১৫৬৪–১৬৪২): দূরবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে বৃহস্পতির চারপাশে ঘুরতে থাকা উপগ্রহ পর্যবেক্ষণ করেন, যা প্রমাণ দেয় সবকিছু পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে না। এই আবিষ্কার শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে প্রচলিত ভূকেন্দ্রিক বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ করে।
ফ্রান্সিস বেকন (১৫৬১–১৬২৬): যুক্তি দেন যে অনুসন্ধান শুরু হওয়া উচিত পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষার মাধ্যমে, যা আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ভিত্তি।
রেনে দেকার্ত (১৫৯৬–১৬৫০): একটি যান্ত্রিক মহাবিশ্বের ধারণা দেন, যা গতির নিয়ম দ্বারা পরিচালিত এবং গণিতের মাধ্যমে প্রকাশযোগ্য।
রবার্ট বয়েল (১৬২৭–১৬৯১): নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পুনরাবৃত্তিযোগ্য পরীক্ষা পরিচালনা করে রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানে প্রমাণের নতুন মানদণ্ড স্থাপন করেন।

একজন আধুনিক চিন্তাবিদের গড়ে ওঠা
নিউটন তাঁর শৈশবের বড় একটি অংশ কাটান একাকী, ভাঙাচোরা যন্ত্র মেরামত করতে করতে আর হাতের কাছে যা পেতেন তা দিয়ে নতুন নতুন যন্ত্র বানিয়ে। তিনি এমনকি একটি ছোট উইন্ডমিলও তৈরি করেছিলেন, যার ভেতরে একটি ইঁদুর দৌড়ালে সেটি ঘুরে উঠত। খুব অল্প বয়সেই পরীক্ষার প্রতি তাঁর টান স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কাগজের নৌকার পাল বাতাসে কীভাবে নড়ে, কিংবা হাতে খোদাই করা সূর্যঘড়িতে ছায়া কীভাবে সরে যায়, এসব তিনি মনোযোগ দিয়ে দেখতেন এবং পদ্ধতিগতভাবে নোট করতেন।
সৎবাবার মৃত্যুর পর নিউটনের মা তাঁর ছোট সন্তানদের নিয়ে বাড়ি ফিরে আসেন। এরপর আইজ্যাককে গ্র্যান্থামের বোর্ডিং স্কুল থেকে তুলে এনে দাদা-দাদির খামারে পূর্ণকালীন কাজে লাগানো হয়।
কিন্তু নিউটন ছিলেন এক অমনোযোগী বালক। কাজ ফেলে দিয়ে দিবাস্বপ্নে হারানো এবং দীর্ঘ সময় ধরে যন্ত্রপাতি নিয়ে নাড়াচাড়া করাই ছিল তাঁর স্বভাব। শেষ পর্যন্ত তাঁর মামা ও সাবেক প্রধান শিক্ষক মিলে তাঁর মাকে রাজি করান যেন তিনি আবার পড়াশোনায় ফিরে আসতে পারেন। কিন্তু কিংস স্কুলে ফিরে নিউটনের যান্ত্রিক কৌতূহল আর শেখার তৃষ্ণা দ্রুতই পুনরায় জেগে ওঠে।
নিঃসঙ্গতায় অধ্যয়ন
১৬৬১ সালে নিউটন কেমব্রিজের ট্রিনিটি কলেজে সাবসাইজার হিসেবে ভর্তি হন, যেখানে ধনী ছাত্রদের জন্য কাজ করে তিনি নিজের খরচ জোগাতেন। তিনি তখন যে পাঠ্যক্রমের মুখোমুখি হন, তা তখনও অ্যারিস্টটলের প্রাকৃতিক দর্শনের ওপর ভিত্তি করে গড়া। নিউটন এটি মনোযোগ দিয়ে পড়লেও তাতে সন্তুষ্ট হননি। তাঁর আগ্রহ ছিল এমন সমস্যায়, যেগুলো কেবল যুক্তি দিয়ে নয়, সমাধানও করা যায়।
তিনি সহপাঠীদের মধ্যে ঘুরে বেড়ানো নতুন চিন্তাবিদদের লেখা পড়তে শুরু করেন, যেমন কেপলার ও গ্যালিলিওর কাজ। তাঁর শিক্ষক Isaac Barrow নিউটনের প্রতিভা লক্ষ্য করেন এবং তাঁকে গণিত ও অপটিক্সের উন্নত গ্রন্থ পড়ার সুযোগ দেন (অপটিক্স হলো আলোর প্রকৃতি ও আচরণ নিয়ে গবেষণার শাখা)।
১৬৬৫ সালে লন্ডনের মহামারী কেমব্রিজে পৌঁছালে নিউটন বই ও যন্ত্রপাতি ভর্তি একটি সিন্দুক নিয়ে লিংকনশায়ারে ফিরে যান। পড়াশোনার এই বিরতিকে কাজে লাগিয়ে তিনি নিজের পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালান। কাঁচের প্রিজম দিয়ে সূর্যালোক ভেঙে আলাদা রঙে বিভক্ত করা এবং পরিবর্তনশীল পরিমাণের বর্ণনা দিতে সমীকরণ লেখা—এই কাজগুলো ক্যালকুলাসের প্রাথমিক রূপ হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রায় সম্পূর্ণ নিঃসঙ্গতায় পরিচালিত সেই ব্যক্তিগত গবেষণাগুলো পরবর্তীতে তাঁকে আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্বে পরিণত করা তত্ত্বগুলোর প্রথম রূপরেখা তৈরি করে।
মহামারি কমার পর ১৬৬৭ সালে নিউটন কেমব্রিজে ফিরে এসে পড়াশোনা পুনরায় শুরু করেন। সেই বছরই তিনি ট্রিনিটি কলেজের ফেলো নির্বাচিত হন, আর দুই বছর পর আইজ্যাক ব্যারোর স্থলাভিষিক্ত হয়ে লুকাসিয়ান অধ্যাপক পদে অধিষ্ঠিত হন, যা তখন ইংল্যান্ডের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ একাডেমিক পদ।
তীক্ষ্ণ মেধা আর ধারালো কথার আঁতুড়ঘর রয়্যাল সোসাইটি
১৬৬০ সালে রাজা চার্লস দ্বিতীয়ের অধীনে প্রতিষ্ঠিত রয়্যাল সোসাইটি ব্রিটেনের প্রথম জাতীয় বৈজ্ঞানিক একাডেমি। এর মূলমন্ত্র হলো: Nullius in verba, অর্থাৎ, কারও কথাই অন্ধভাবে বিশ্বাস করো না, যা স্পষ্টভাবে নির্দেশ করে যে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান কর্তৃত্বের ওপর নয়, প্রমাণের ওপর ভিত্তি করতে হবে। ১৬৭২ সালে ফেলো হিসেবে নিউটনের নির্বাচন তাঁকে ইংল্যান্ডের ক্রমবর্ধমান অগ্রগামী চিন্তাবিদদের নেটওয়ার্কের কেন্দ্রে নিয়ে আসে।
সহকর্মীদের কাছে নিউটন অত্যন্ত সম্মানিত বুদ্ধিজীবী ছিলেন, তবে কঠিন স্বভাবের কারণে তিনি ততটাই পরিচিতি লাভ করেছিলেন। কেউ তাঁর ধারণা নিয়ে প্রশ্ন তুললেই তিনি সহজে অপমানিত বোধ করতেন, আর এর ফলে একের পর এক বিখ্যাত এবং কখনো কখনো নিষ্ঠুর একাডেমিক বিরোধ জন্ম নিত।
নিউটনের এবং গটফ্রিড উইলহেল্ম লাইবনিজের সম্পর্কও তিক্ত ছিল। লাইবনিজ যখন ক্যালকুলাসের প্রথম আবিষ্কারক হিসেবে স্বীকৃতি চেয়েছিলেন, তখন নিউটন, যে সময়ে রয়্যাল সোসাইটির সভাপতি ছিলেন, গোপনে কমিটির প্রতিবেদন নিজেই লিখে নিজেকে বৈধ আবিষ্কারক ঘোষণা করেন। এই বিতর্ক নিয়ে নিউটন এতটাই ক্ষুব্ধ ছিলেন যে প্রতিদ্বন্দ্বীর মৃত্যুর পর তিনি এক বন্ধুকে লিখেছিলেন, লাইবনিজের হৃদয় ভাঙায় তিনি গভীর সন্তুষ্টি পেয়েছিলেন।
নিউটনের প্রথম বড় বিরোধ ঘটে রবার্ট হুকের সঙ্গে, যিনি দাবি করেছিলেন যে নিউটন আলো ও মাধ্যাকর্ষণ সংক্রান্ত ধারণা তাঁর কাছ থেকে ধার নিয়েছেন। নিউটন মুদ্রিত লেখায় পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে হুকের তত্ত্বকে নিছক অনুমান বলে উড়িয়ে দেন এবং সেই বিখ্যাত বাক্যটি যোগ করেন, “আমি যদি আরও দূরে দেখতে পেরেছি, তবে তা দৈত্যদের কাঁধে দাঁড়িয়ে।” মন্তব্যটি সম্ভবত সূক্ষ্ম বিদ্রূপ ছিল, কারণ হুক ছিলেন খাটো ও কুঁজো।
সব অস্থিরতার মধ্যেও রয়্যাল সোসাইটির ভেতরে নিউটনের প্রভাব ক্রমেই বৃদ্ধি পেতে থাকে। আলো ও রঙ নিয়ে তাঁর গবেষণা এবং প্রতিফলন দূরবীক্ষণ আবিষ্কার ইতোমধ্যেই তাঁকে স্বীকৃতি এনে দিয়েছিল। এই ভিত্তির ওপর ১৬৮৭ সালে প্রকাশিত Philosophiae Naturalis Principia Mathematica তাঁকে প্রশ্নাতীত কর্তৃত্বের আসনে বসায়। এই গ্রন্থে তিনি গতির তিনটি সূত্র সংজ্ঞায়িত করেন, যেখানে জড়তা, বল এবং ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে সব ধরনের গতি কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় তা দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি, সার্বজনীন মাধ্যাকর্ষণের একক তত্ত্বের মাধ্যমে আকাশীয় ও পার্থিব বলবিদ্যাকে একসূত্রে বাঁধেন।
নিউটনের বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার
নিউটন একবার নিজেকে তুলনা করেছিলেন “সমুদ্রতটে খেলা করা এক বালকের সঙ্গে, যে সাধারণের চেয়ে একটু মসৃণ নুড়ি বা একটু সুন্দর খোলস খুঁজে পায়, অথচ তার সামনে সত্যের বিশাল মহাসাগর এখনও পুরোপুরি অনাবিষ্কৃত রয়েছে।” এই বিস্ময়ের অনুভূতি গাণিতিক প্রমাণের প্রতি তাঁর নিরলস আগ্রহের সঙ্গে মিলিত হয়ে, প্রতিটি বৈজ্ঞানিক প্রশ্নে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলেছিল।
আলো, রং এবং অপটিক্স
গ্রামীণ লিংকনশায়ারে বসবাসকালে নিউটন অপটিক্স নিয়ে পরীক্ষা শুরু করেন। তিনি সূর্যালোকের একটি সরু রশ্মি কাঁচের প্রিজমের মধ্য দিয়ে পাঠান। আলোটি সাদা অবস্থায় না থেকে লাল থেকে বেগুনি পর্যন্ত রঙের একটি ধারায় ছড়িয়ে পড়ে। এই ফলাফল থেকে তিনি সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে সাদা আলো নিজেই সব রঙের সমষ্টি, আর প্রিজমের আকার প্রতিটি রঙকে ভিন্নভাবে বাঁকিয়ে আলাদা করে দেয়।
পরবর্তীতে তিনি আরেকটি প্রিজম ব্যবহার করে এই আলাদা হয়ে যাওয়া রঙগুলো আবার একত্রিত করেন এবং পুনরায় সাদা আলো তৈরি করে দেখান। এই পরীক্ষাগুলিই তাঁর রঙ-তত্ত্বের ভিত্তি গড়ে তোলে।
এই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে নিউটন দূরবীক্ষণ যন্ত্রের উন্নতিও করেন। তখনকার প্রতিসরণ দূরবীক্ষণে লেন্সের মাধ্যমে আলোকে বাঁকানো হতো, কিন্তু সাদা আলোর প্রতিটি রঙ সামান্য ভিন্নভাবে বাঁকে, ফলে ছবিটি কখনো সম্পূর্ণ স্পষ্ট হতো না। এর ফলে রঙিন প্রান্ত দেখা দিত, যাকে বলা হয় ক্রোম্যাটিক অ্যাবেরেশন।
নিউটন যুক্তি দেন যে এই সমস্যা এড়ানোর একমাত্র উপায় হলো কাঁচের লেন্স পুরোপুরি বাদ দিয়ে বাঁকানো আয়না ব্যবহার করা। আয়নার মাধ্যমে আলো প্রতিসৃত না হয়ে প্রতিফলিত হয় এবং একত্রিত হয়। আয়না সব তরঙ্গদৈর্ঘ্যকে সমানভাবে প্রতিফলিত করে, ফলে রঙগুলো সঠিকভাবে একসঙ্গে থাকে এবং ছবিটি পরিষ্কার দেখা যায়।
গতির নিয়ম নতুন করে লেখা
অ্যারিস্টটলীয় দার্শনিকরা বিশ্বাস করতেন যে কোনো বস্তুর গতি বজায় রাখতে তার ওপর স্থায়ীভাবে বল প্রয়োগ করতে হয়। তাই তাদের মতে, একটি তীর উড়ে যাওয়ার কারণ ছিল তার পেছনে বাতাসের ধাক্কা, যা তাকে সামনে ঠেলে দিত।
নিউটন সমস্যাটিকে ভিন্নভাবে দেখেন। তিনি কল্পনা করেন এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে ঘর্ষণ বা বায়ুপ্রতিরোধ নেই। এই চিন্তাভাবনা থেকেই জন্ম নেয় নিউটনের গতির সূত্রগুলো।
গতির প্রথম সূত্র
দোলক, সংঘর্ষরত বল এবং মসৃণ পৃষ্ঠে গড়ানো বস্তুর ওপর পরীক্ষা চালিয়ে নিউটন লক্ষ্য করেন যে কোনো কিছুর গতি তখনই থামে, যখন কোনো বাহ্যিক বাধা তাতে প্রয়োগ করা হয়। এই উপলব্ধিই তাঁর প্রথম সূত্রে রূপ নেয়: কোনো বস্তু স্থির থাকলে তা স্থিরই থাকে, আর কোনো বস্তু চলমান থাকলে তা সরলরেখায় ধ্রুব বেগে চলে, যতক্ষণ না কোনো বাহ্যিক বল তার অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। পরিবর্তনের এই প্রতিরোধকে নিউটন জড়তা (inertia) বলেছিলেন, অর্থাৎ একটি বস্তুর প্রবণতা তার বর্তমান গতি বা স্থিরতা বজায় রাখার।
জড়তাকে পদার্থের মৌলিক ধর্ম হিসেবে বোঝার পর নিউটন ব্যাখ্যা করতে পারেন কেন একটি পাক ঘাসের ওপর বরফের তুলনায় কম দূরত্ব অতিক্রম করে। ঘাসে ঘর্ষণ বেশি, যা পাকের জড়তার বিপরীতে কাজ করে এবং তার গতি দ্রুত কমিয়ে দেয়।
গতির দ্বিতীয় সূত্র
গতি কীভাবে পরিবর্তিত হয় তা বোঝার জন্য নিউটন ত্বরণ নিয়ে কাজ করেন। অর্থাৎ কোনো বস্তুর বেগ বা দিক কত দ্রুত বদলায়। তাঁর দ্বিতীয় সূত্র দেখায় যে এই পরিবর্তন প্রয়োগকৃত বলের সঙ্গে সরাসরি সমানুপাতিক এবং বস্তুর ভরের সঙ্গে ব্যস্তানুপাতিক। এই সম্পর্কটি প্রকাশ করা হয় F = ma সমীকরণে। হালকা বস্তুর ক্ষেত্রে অল্প বলেই উল্লেখযোগ্য ত্বরণ সৃষ্টি হয়। বিপরীতে, একই বল ভারী বস্তুর ওপর প্রায় কোনো প্রভাবই ফেলে না। এ কারণেই চলমান একটি গাড়িকে থামানো আর গড়াতে থাকা একটি ফুটবল থামানো এক বিষয় নয়। গাড়ির বেশি ভর মানে একই বল প্রয়োগে তার গতি অনেক ধীরে পরিবর্তিত হয়।
গতির তৃতীয় সূত্র
নিউটনের তৃতীয় সূত্র বলে, প্রতিটি বল যুগল আকারে আসে। যখন একটি বস্তু অন্যটির ওপর বল প্রয়োগ করে, তখন দ্বিতীয় বস্তুটি প্রথমটির ওপর সমান মানের কিন্তু বিপরীত দিকের বল প্রয়োগ করে। উদাহরণস্বরূপ, একই জায়গা থেকে দুইজন স্কেটার একে অপরকে ধাক্কা দিলে তারা বিপরীত দিকে সরে যায়, কারণ সংস্পর্শের মুহূর্তে তারা সমান ও বিপরীত বল অনুভব করে। একইভাবে, কামান থেকে গোলা ছোড়া হলে কামানটি পেছনে সরে যায়, আর রকেট ওপরে ওঠে কারণ তার নির্গত গ্যাস নিচের দিকে নিক্ষিপ্ত হয়।
মাধ্যাকর্ষণ এবং পরিবর্তনের গণিত
বল ও আলো নিয়ে নিজের গবেষণায় নিউটন লক্ষ্য করেছিলেন যে প্রকৃতির অনেক ঘটনা ঘটে ধারাবাহিক কিন্তু অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিবর্তনের মাধ্যমে। এসব পরিবর্তন বোঝার জন্য তাঁর দরকার ছিল এমন একটি গাণিতিক ভাষা, যা সময়ের খুব ছোট ব্যবধানে পরিবর্তিত রাশিগুলোর আচরণকে নির্ভুলভাবে প্রকাশ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, একটি পড়ে যাওয়া বলের বেগ স্থির নয়; সময়ের সাথে সাথে তা ক্রমাগত বাড়ে। প্রতিটি ক্ষুদ্র মুহূর্তে বলটির অবস্থান ও গতি আলাদা হয়, এবং এই ক্ষুদ্র তথ্যগুলো একত্র করলেই পুরো গতিপথ বোঝা যায়।
নিউটন এই মুহূর্তে-মুহূর্তে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ককে গণিতের মাধ্যমে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। এই লক্ষ্য থেকেই তিনি নিজের ব্যক্তিগত নোটবইয়ে একটি নতুন পদ্ধতি তৈরি করেন, যাকে তিনি বলতেন ফ্লাকশনস। এই পদ্ধতির মাধ্যমে সময়ের সাথে পরিবর্তনশীল রাশিগুলোর তাৎক্ষণিক পরিবর্তনের হার নির্ণয় করা সম্ভব হতো, পাশাপাশি সেই ক্ষুদ্র পরিবর্তনগুলো জমা করে বৃহত্তর প্রবণতাও বিশ্লেষণ করা যেত।
যদি কোনো পড়ে যাওয়া বলের খুব ছোট একটি সময়খণ্ডে অতিক্রান্ত দূরত্ব জানা যায়, তবে সেই মুহূর্তে বলটির বেগ নির্ধারণ করা যায়। পরের মুহূর্তে আবার দেখা যায় বেগ আরও বেড়েছে। বেগের এই ক্রমাগত পরিবর্তন থেকেই বোঝা যায়, মাধ্যাকর্ষণ বলটি কীভাবে বলটিকে টেনে নিচ্ছে। এভাবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র সময়খণ্ডের তথ্য একত্র করে নিউটন বলটির পুরো গতিপথ অনুসরণ করতে পারতেন, ছাড়ার মুহূর্ত থেকে শুরু করে ভূমিতে আঘাত করা পর্যন্ত। নিউটনের এই ফ্লাকশনস পদ্ধতিই পরবর্তীতে ক্যালকুলাস নামে পরিচিত হয়।
নিউটন বুঝতে পারেন, একই গণিত তিনি যেকোনো পরিবর্তনশীল গতির ক্ষেত্রেই প্রয়োগ করতে পারেন। তাই তিনি আকাশের দিকে তাকান এবং সময়ের সঙ্গে চাঁদের অবস্থান কীভাবে বদলায়, তা বিশ্লেষণ করে তার ওপর কার্যরত বল নির্ণয় করেন। চাঁদকেও তিনি এক অর্থে একটি বলের মতোই দেখেন, যার বেগ ও ত্বরণ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ থেকে নির্ণয় করা যায়।
চাঁদের ত্বরণকে তিনি পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের টানের সঙ্গে তুলনা করেন, যার মান প্রায় ৯.৮ মিটার প্রতি সেকেন্ড বর্গ। চাঁদের দিকে টান, অর্থাৎ যা তাকে কক্ষপথে ধরে রাখে, প্রায় ০.০০২৭ মিটার প্রতি সেকেন্ড বর্গ পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের প্রায় ১/৩৬০০ অংশ। অন্য কথায়, প্রতি সেকেন্ডে চাঁদ যতটা পৃথিবীর দিকে পড়ে, সেটি ঠিক এতটাই যাতে সে সোজা পথে ছিটকে না যায় এবং বাঁকানো কক্ষপথে থাকে।
যেহেতু চাঁদের দূরত্ব পৃথিবীর পৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬০ পৃথিবী-ব্যাসার্ধ, তাই এই মানগুলো সেই বিপরীত-বর্গ নিয়মের সঙ্গে মিলে যায়, যা নিউটন প্রত্যাশা করেছিলেন। দূরত্ব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাধ্যাকর্ষণ দুর্বল হয়, এবং ৬০ পৃথিবী-ব্যাসার্ধ দূরত্বে তা প্রায় ১/৩৬০০ হওয়াই স্বাভাবিক। এটি ছিল শক্ত প্রমাণ যে আপেলকে নিচে টেনে আনা বলটিই চাঁদের কক্ষপথ নিয়ন্ত্রণ করছে।
এই উপলব্ধি থেকে নিউটন সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে পৃথিবীর গতি এবং আকাশের গতি একই নিয়ম মেনে চলে। এ থেকেই জন্ম নেয় সার্বজনীন মাধ্যাকর্ষণের সূত্র। এই সংযোগ বিজ্ঞানীদের হাতে একটি একক কাঠামো প্রদান করে, যার মাধ্যমে পড়ে যাওয়া বস্তু থেকে শুরু করে গ্রহের কক্ষপথ পর্যন্ত সবকিছু বোঝা সম্ভব হয়।
প্রাকৃতিক জগতের বিভিন্ন অংশকে একসূত্রে বেঁধে দেওয়ার নিউটনের তাগিদ মানুষকে বৈজ্ঞানিক সমস্যার দিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়। অ্যারিস্টটলীয় চিন্তাবিদরা শুরু করতেন জিনিসগুলো কীভাবে আচরণ করা উচিত, সেই ধারণা দিয়ে।
নিউটন জোর দিত এমন ব্যাখ্যার ওপর যা পর্যবেক্ষণযোগ্য, পরিমাপযোগ্য এবং পুনরায় পরীক্ষা করে একই ফলাফল পাওয়া যায়। তিনি যা দেখতে এবং সংখ্যায় প্রকাশ করতে পারতেন, সেখান থেকেই কাজ শুরু করতেন, তারপর সেই সম্পর্কগুলো ব্যবহার করে এমন নিয়ম আবিষ্কার করতেন যা নির্দিষ্ট পরীক্ষার সীমা ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত প্রযোজ্য।
