সিনেমা বা কমিকসের দুনিয়ার সুপারহিরোদের দেয়ালের ভেতর দিয়ে হাঁটা অস্বাভাবিক কিছু না। সেটা অ্যাভেঞ্জার্সের ভিশন হোক বা হ্যারি পটারের জাদুকরদের প্ল্যাটফর্ম 9¾। সিনেমাতে এগুলোকে স্বাভাবিকই মনে হয়। কিন্তু কখনো ভেবেছেন, বাস্তবে এটা সম্ভব কি না? বা আমরা কেন দেয়ালের একপাশ দিয়ে ঢুকে আরেকপাশ দিয়ে বের হতে পারি না। দেয়াল তো অনেক দূরের কথা। একটা পাতলা কাগজের মধ্যে দিয়েও তো হেঁটে চলে যেতে পারি না।
প্রশ্নটা মোটেই অযৌক্তিক নয়। কারণ আমরা তো স্কুল থেকে শিখেছি যে সবকিছু তৈরি হয় পরমাণু দিয়ে, আর সেই পরমাণুর প্রায় সবটাই ফাঁকা জায়গা। কতটা ফাঁকা তা বোঝার জন্য একটি উপমা দেওয়া যেতে পারে: হিসাব বলছে, যদি মানবদেহের সমস্ত শূন্যস্থান সরিয়ে ফেলা যায় তবে পুরো মানবজাতি একটি চিনি খণ্ডের মধ্যে ফিট হয়ে যাবে। ইন্টারেস্টিং তাই না?
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, আমাদের শরীরও তো পরমাণু দিয়েই গড়া। দেয়ালও তো তাই। দুটোই ফাঁকা জায়গা দিয়ে তৈরি। তাহলে দুটো ফাঁকা জিনিসের মধ্যে এত বাধা কেন আসছে? উত্তরটা বেশ মজার এবং কিছুটা গভীর। এর পেছনে কাজ করে পদার্থবিজ্ঞানের দুটি মৌলিক নিয়ম। আজ আমরা সেই কারণগুলোই এক এক করে বোঝার চেষ্টা করব। তবে লেখার শেষে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের এক অদ্ভুত সম্ভাবনার কথা জানাবো আপনাদের।
প্রথমেই পরমাণুর গঠনটা আরেকবার ঝালিয়ে নেওয়া যাক। যদিও আমরা হয়তো কমবেশি জানি একটি পরমাণুর কেন্দ্রে থাকে ছোট্ট নিউক্লিয়াস। আর তার চারপাশে ঘুরছে ইলেকট্রন। নিউক্লিয়াসে থাকে প্রোটন পজিটিভ চার্জ আর নিউট্রন, যাদের কোনো চার্জ নেই। এরা সব একসাথে জমাট বেঁধে থাকে। ধরুন একটি পরমাণু একটা ফুটবল মাঠের মতো বিশাল তাহলে নিউক্লিয়াস টা হবে মাঠের ঠিক মাঝখানে রাখা একটা মটরের দানা। আর বাকি পুরো মাঠ টাই হল ইলেক্ট্রন দের এলাকা। অর্থাৎ নিউক্লিয়াস এতটাই ছোট যে পরমাণুর মোট ভলিউমের ৯৯.৯৯৯% ফাঁকা মনে হয়। এই তথ্য শুনে যেকারও মনে হতে পারে দেয়ালের ভেতর দিয়ে যাওয়া সম্ভব হওয়া উচিত!
কিন্তু বিষয়টা এত সহজ নয়। কারণ আমরা যাকে “শূন্য” ভাবছি, আদতে সেটা একেবারে ফাঁকা না। এখানে আমাদের পুরোনো ধারণাটা একটু পাল্টাতে হবে। ইলেকট্রনগুলো গ্রহের মতো সুনির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘোরে না। কোয়ান্টাম মেকানিক্সে ইলেকট্রনকে একটি সম্ভাব্যতার মেঘ বা ওয়েভফাংশন হিসেবে দেখা হয়। আর যেখানে এই মেঘের ঘনত্ব বেশি, সে স্থানে ইলেকট্রন থাকার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

এই মেঘকে আপনি চলমান সিলিং ফ্যানের সাথে তুলনা করতে পারেন। বন্ধ সিলিং ফ্যানের ফাঁকা জায়গা থাকলেও যখন সেটা ঘুরতে শুরু করে, তখন তার ভেতর হাত ঢোকানো অসম্ভব হয়ে যায়। ইলেকট্রনের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার ঘটে। তারা স্থির নয় বরং সম্ভাব্যতার মেঘের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। এই মেঘের প্রান্তে ঋণাত্মক চার্জ থাকে, যা পরমাণুর জন্য একটি প্রায় প্রবেশ নিষিদ্ধ সীমানা তৈরি করে। তাই পরমাণুর ভেতরের ঐ ফাঁকা জায়গাটা আসলে অন্য পরমাণুর জন্য অ্যাভেইলেবল না।
এবার এর উত্তরে আসা যাক
কারণ ১:
সবচেয়ে বড় কারণ হলো ইলেকট্রনের ঋণাত্মক চার্জ। যখন আমাদের হাত দেয়ালের দিকে এগোয়, তখন আমাদের হাতের ইলেকট্রন দেয়ালের ইলেকট্রনের খুব কাছে চলে আসে। দুইটি সমধর্মী চার্জ কী করে? একে অপরকে ঠেলে দেয়। ঠিক তাই। আমাদের হাতের ইলেকট্রন আর দেয়ালের ইলেকট্রন এমনভাবে ঠেলাঠেলি শুরু করে যে তারা কখনো ওভারল্যাপ হতে দেয় না।

এটাকে ভাবতে পারেন দুই চুম্বকের একই মেরু একে অপরের দিকে ঠেলতে গেলে যেমন হয়। যত কাছে নেবেন, তত বেশি প্রতিরোধ পাবেন। এই অদৃশ্য প্রতিরোধ আসলে আমাদের শরীরকে দেয়ালের ভেতর দিয়ে ঢুকতে বাধা দেয়।
আপনাদের একটা মজার ফ্যাক্ট বলি। আমরা আসলে কোনো কিছুকে আক্ষরিক অর্থে ‘স্পর্শ’ করি না। হাত যখন টেবিলে রাখেন, তখনও হাতের ইলেকট্রন আর টেবিলের ইলেকট্রন কখনো মিলিত হয় না। আমরা যা অনুভব করি তা মূলত এই ইলেকট্রোম্যাগনেটিক ফোর্সের প্রতিক্রিয়ার চাপ। অর্থাৎ, স্পর্শ আসলে এক ধরনের ইলিউশন বা বিভ্রম।
এই বল এতটাই প্রবল যে মাধ্যাকর্ষণের চেয়ে প্রায় এক ট্রিলিয়ন গুণ বেশি শক্তিশালী। তাই দেয়ালের সামনে দাঁড়িয়ে যতই চেষ্টা করেন না কেন, এই ইলেকট্রন বিকর্ষণের বাধা অতিক্রম করা আপনার পক্ষে অসম্ভব।
কারণ ২:
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বাধাটা আসে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের আরো একটা অদ্ভুত নিয়ম থেকে। এটা হচ্ছে পাউলি এক্সক্লুশন প্রিন্সিপল, বাংলায় পাউলির বর্জন নীতি। নোবেলবিজয়ী পদার্থবিদ উলফগ্যাং পাউলি বলেন, এই নীতিটা মূলত ফার্মিয়ন বলে এক বিশেষ ধরনের কণার আচরণ ব্যাখ্যা করে। ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন অর্থাৎ পদার্থের মূল গাঠনিক উপাদান যারা, তারা সবাই হল ফার্মিয়ন। এসব কণার স্পিন অর্থাৎ নিজস্ব ঘূর্ণন যেটা ভগ্নাংশের মানের হয়। খুব সহজ করে বললে দুটো একই রকম ফার্মিয়ন যেমন ধরুন দুটো ইলেকট্রন।
প্রত্যেকটা ইলেকট্রনের একটা অ্যাড্রেস আছে। তার অবস্থাটা বোঝানোর জন্য কয়েকটা কোয়ান্টাম নম্বর লাগে। যেমন তার শক্তি স্তর, কোনটা তার অরবিটাল বা থাকার জায়গাটার আকৃতি কেমন, স্পেসে সেটা কোন দিকে মুখ করে আছে, আর তার নিজের স্পিন বা ঘূর্ণন টা কোনদিকে, ক্লকওয়াইজ নাকি অ্যান্টি ক্লকওয়াইজ যাকে আমরা বলি আপ বা ডাউন স্পিন। এখন পাউলির নীতি বলছে একটা পরমাণুর মধ্যে দুটো ইলেকট্রনের এই সব কটা কোয়ান্টাম নম্বরের মান একই হতে পারবে না। অন্তত একটা না একটায় তাদের তফাৎ থাকতেই হবে।
বিষয়টা সহজ ভাবে বুঝতে ধরুন হোস্টেলের ছোট্ট একটা ঘর। সেখানে দুটো সিট আছে। নিয়ম হলো দুজন ছাত্র সেই ঘরে থাকতে পারে। কিন্তু তারা একদম একই ভাবে একই জায়গায় থাকতে পারবে না। হয়তো একজন বিছানায় শুলে অন্যজনকে চেয়ারে বসতে হবে বা দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। এরকম ইলেক্ট্রনের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা আরো স্ট্রিক্ট। একটা নির্দিষ্ট অরবিটালে মানে ঐ ঘরে বড়জোর দুটো ইলেকট্রন থাকতে পারে। শর্ত হলো তাদের স্পিন হতে হবে উল্টো দিকে। মানে একটা স্পিন যদি আপ হয় অন্যটা স্পিন অবশ্যই ডাউন হতে হবে। তারা কিছুতেই একই স্পিন নিয়ে একই অরবিটালে থাকতে পারবে না।

কিন্তু এই নীতিটা কীভাবে আমাদের দেয়াল ভেদ করতে বাধা দিচ্ছে? ইলেকট্রনগুলো তো এমনিতেই বিকর্ষণের জন্য দূরে সরে যাচ্ছে।
হ্যাঁ, বিকর্ষণ বলটা ইলেকট্রন মেঘগুলোকে একে অপরের খুব কাছে আসতে দেয় না। কিন্তু ধরুন, কোনোভাবে যদি প্রচণ্ড চাপ দিয়ে দুটো পরমাণুকে আরও আরো কাছে আনার চেষ্টা করা হয়, তখন এই পাউলির বর্জন নীতির বিরোধিতা ভীষণভাবে সক্রিয় হয়ে ওঠে। ইলেকট্রনগুলো তখন একে অপরের জন্য বরাদ্দ যে কোয়ান্টাম স্পেস বা কোয়ান্টাম অবস্থা সেখানে ঢোকার চেষ্টা করে। দুটো ইলেকট্রন তো একই অবস্থায় থাকতে পারে না। ফলে তারা একে অপরকে আরও আরও বেশি জোরে ঠেলে সরিয়ে দেয়। বিকর্ষণের সাথে এই অতিরিক্ত চাপটাও যোগ হয়। এই এক্সট্রা প্রেশার যা ইলেক্ট্রন গুলোকে একই জায়গায় গাদাগাদি করতে দেয় না, তাকে বলে ইলেকট্রন ডি জেনারেশন প্রেশার।
শুধু যে আমাদের দেয়াল ভেদ করতে বাধা দেয় তাই নয়, এই পাউলি বর্জন নীতিটি গোটা বস্তু জগতকে কলাপস করে যাওয়া থেকে বাঁচিয়ে রেখেছে। যদি এই নীতিটা না থাকত তাহলে একটা পরমাণুর সব ইলেকট্রন হুড়মুড় করে সর্বনিম্ন শক্তিস্তরে এসে জড়ো হত। পরমাণুগুলো চুপসে যেত, পদার্থও কোন স্থায়ী আকারই পেত না। চেয়ার টেবিল আমরা নিজেরা কিছুই থাকত না। এমনকি মহাকাশেও এর অসীম গুরুত্ব। মৃত নক্ষত্র যেমন ধরুন শ্বেত বামন, হোয়াইট ডোয়ার্ফ বা নিউট্রন স্টার। তারা যে প্রচন্ড গ্রাভিটির টানেও পুরোপুরি কলাপস করে না তার পেছনেও এই লেজেন্ডারি প্রেশারের অবদান আছে।
মনে আছে, আলোচনার শুরুতে একটা ক্ষুদ্র সম্ভাবনার কথাও বলেছিলাম? হ্যাঁ, এটাই হয়তো এই বাধাগুলো পেরোনোর কোন রাস্তা হতে পারে।
কোয়ান্টাম টানেলিং
কোয়ান্টাম মেকানিক্সে আসলে অসম্ভব বলে কিছু নেই। এবার এই আলোচনায় ফরাসি পদার্থবিদ লুইস ডি ব্রগলীকে টানতে হবে। কারণ তার ধারণা কোয়ান্টাম মেকানিক্সে যুগান্তকারী পরিবর্তন নিয়ে আসে। তিনিই প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন যে, শুধু আলো নয়, প্রতিটি কণারই তরঙ্গধর্ম আছে। সে হিসাবে একটি ইলেকট্রন থেকে শুরু করে মানুষ, সবার মধ্যে কনা ধর্ম বিদ্যমান।
কল্পনা করুন, একটা টেনিস বলকে দেওয়ালের দিকে ছুড়ে মারলেন। এখন যদি টেনিস বলের শক্তি দেয়াল ভাঙার মতো না হয়, তাহলে নিউটনের তৃতীয় সূত্র অনুযায়ী দেয়ালে লেগে বাউন্স করে ফিরে আসবে। কিন্তু ওইযে বললাম কোয়ান্টাম মেকানিক্সে অসম্ভব বলে কিছু নেই। কোয়ান্টাম মেকানিক্সে যখন আমরা বলকে তরঙ্গ হিসেবে ভাবছি তখন সিনারিও টা একটু পাল্টে যায়। যখন বলের তরঙ্গ দেয়ালের বাধার সামনে আসে, হঠাৎ থেমে যায় না। যদি বাধা টা খুব বেশি পুরু না হয়, তাহলে তরঙ্গের একটা ক্ষীণ অংশ বাধার অন্য পাড়ে গিয়েও পৌঁছতে পারে। তার মানে বলটির শক্তি বাধাটা পেরোনোর মতো যথেষ্ট না হলেও সে বাধার মধ্যে দিয়ে যেন সুড়ঙ্গ কেটে ওপারে চলে গেল। আর এই ঘটনাকেই বলা হয় কোয়ান্টাম টানেলিং। তবে বলটি যে দেয়ালের আরেকপাশে থাকবে এর সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। কেন সেটাও একটু পরে ব্যাখ্যা করছি। তবে এটা শুধু থিওরি নয় এটা বাস্তবেও ঘটে। তাছাড়া অনেক রিয়েল লাইফ অ্যাপ্লিকেশনও আছে।
খুবই ক্ষুদ্র কনা যেমন ইলেকট্রন বা প্রোটন খুব পাতলা বাধার মধ্য দিয়ে আসলেই ‘টানেল’ করতে পারে।
যেমন ধরুন আমাদের সূর্যের পেটের ভেতরে যে নিউক্লিয়ার ফিউশন হয়। যার জন্য এত শক্তি তৈরি হয়, সেটাও সম্ভব হয় এই কোয়ান্টাম টানেলিং এর জন্য। আবার কিছু তেজস্ক্রিয় মৌল থেকে যে আলফা কণা বেরিয়ে আসে, রেডিও অ্যাকটিভ দিকে সেটাও কোয়ান্টাম টানেলিং দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। তাছাড়া অত্যাধুনিক স্ক্যানিং টানেলিং মাইক্রোস্কোপ যা দিয়ে আমরা এটমের ছবি পর্যন্ত তুলতে পারি সেটাও এই টানেলিং প্রিন্সিপল এর উপরই কাজ করে।
তাহলে বড় বস্তু যেমন টেনিস বল বা মানুষ কি দোষ করেছে?
আসলে টানেলিংয়ের সম্ভাবনা নির্ভর করে কণার ভর, বাধার পুরুত্ব, আর শক্তির উপর। একটা ইলেকট্রন হয়তো কয়েক ন্যানোমিটার পুরু বাধা পেরিয়ে যেতে পারে। কিন্তু আপনার শরীর? মানুষের শরীরে প্রায় 10²⁸ পরমাণু রয়েছে। তাদের সবাইকে একসাথে টানেল করতে হবে। সম্ভাবনা এত ক্ষুদ্র যে কার্যত শূন্য।
ডি-ব্রগলি তরঙ্গদৈর্ঘ্য ইকুয়েশন বলছে,
λ=h/mv
অর্থাৎ বস্তুর তরঙ্গদৈর্ঘ্য = প্ল্যাঙ্কের ধ্রুবক/বস্তুর ভরবেগ।
সমীকরণ থেকে আমরা বুঝতে পারি কোনো বস্তুর কণা ধর্ম এবং তরঙ্গ ধর্ম পরস্পরের ব্যস্তানুপাতিক। বস্তুর ভর যত বেশি তরঙ্গ ধর্ম তত কম। অর্থাৎ বেশি ভারী বস্তুর ক্ষেত্রে কণা ধর্ম এবং ক্ষুদ্র বস্তুকণার ক্ষেত্রে তরঙ্গ ধর্ম প্রাধান্য পায়।

এখন ধরুন একজন মানুষের ভর ধরুন ৭০ কেজি। এখন সমীকরণে মানগুলো ইনপুট দিলে মানুষের তরঙ্গ ধর্ম আসবে ১০^-৩৫ এর কাছাকাছি। এটা পরমাণুর আকারের তুলনায় অকল্পনীয়ভাবে ছোট। এত ক্ষুদ্র তরঙ্গদৈর্ঘ্য বাস্তবে পরীক্ষামূলক যন্ত্রে মাপা সম্ভব নয়। তাই আপনার শরীরের জন্য ডি ব্রগলী তরঙ্গধর্ম পুরোপুরি অদৃশ্য। তার চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জিং হলো প্রত্যেকটা পরমাণুকে একই সঙ্গে একই মুহূর্তে একদম কোঅর্ডিনেট ভাবে টানেল করতে হবে। একটা সিঙ্গেল কণার টানেল করার সম্ভাবনাই যেখানে এত কম, সেখানে 10²⁸ টা পরমাণুর একসাথে টানেল করার সম্ভাবনা কত কম হতে পারে ভাবুন। মহাবিশ্বের বয়স যত, তার চেয়ে বহুগুণ বেশি সময় ধরে অপেক্ষা করলেও এমন একটা ঘটনা একবারও ঘটার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
তাছাড়া বড় বস্তু কখনো একা থাকে না। বাতাসের অণু, আলো, তাপ সবকিছু মিলিয়ে তার কোয়ান্টাম ফেজ এলোমেলো হয়ে যায়। একারণে বড় বস্তু চিরায়ত বা ক্লাসিকাল ফিজিক্সের নিয়মে আচরণ করে। যদিও শেষ পর্যন্ত সবকিছুই কোয়ান্টামের নিয়মের অধীনে চলছে কারণ আপনি নিজেই অণু,পরমাণু দিয়ে তৈরি।
তাহলে শেষ মেশ এটাই দাঁড়ালো যে দেওয়ালের ভেতর দিয়ে প্রবেশ সিনেমা বা কল্পনাতেই সুন্দর। যদিও কোয়ান্টাম মেকানিক্স একটা ক্ষুদ্র সম্ভাবনার কথা বলে তবুও বাস্তবে এর সম্ভাবনা এতটাই ক্ষুদ্র যে কার্যত শূন্য। মূলত একারণেই আমাদের ইউনিভার্স স্ট্যাবল।
সংক্ষেপে
আজকের এই লম্বা আর বেশ গভীর আলোচনা থেকে যা বুঝলাম, সেটা যদি একটু গুছিয়ে বলি, আমরা দেওয়ালের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যেতে পারি না। তার পেছনে প্রধানত দুটি কারণ আছে।
এক,
আমাদের শরীরের পরমাণুর ইলেকট্রন মেঘ আর দেওয়ালের পরমাণুর ইলেকট্রন মেঘের মধ্যেকার সাংঘাতিক তড়িৎ চুম্বকীয় বিকর্ষণ বল, যা তাদের কাছেই আসতে দেয় না।
দুই,
পাউলির বর্জন নীতি যা একই রকম কণা যেমন ইলেক্ট্রন গুলোকে একই কোয়ান্টাম অবস্থায় থাকতে দেয় না আর বস্তুকে নিরেট রাখে। এই দুটো নিয়ম মিলেই আমাদের এই সলিড ওয়ার্ল্ডের ভিত্তি তৈরি করেছে। যদিও কোয়ান্টাম টানেলিং থিওরিটিক্যাল যে কোন বস্তুর পক্ষেই সম্ভব। মানুষের মত বড়, ভারী আর জটিল বস্তুর ক্ষেত্রে এর সম্ভাবনা, পরিবেশের প্রভাব আর বিপুল সংখ্যক কণার একসাথে টানেল করার অসম্ভব কম সম্ভাবনার কারণে প্র্যাকটিক্যালি শূন্য একেবারে নিখুঁত।
লেখা: রেদোয়ানুল হক রানা
