মানুষের ভয় পাওয়ার ক্ষমতা তার সুরক্ষার জন্য স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় একটি প্রতিক্রিয়া। কিন্তু কখনো কখনো এই ভয় অস্বাভাবিক মাত্রায় পৌঁছায় এবং সাধারণ জীবনযাত্রায় বাধা সৃষ্টি করে। এই ধরনের ভয় যদি বিশেষ কোনো পরিস্থিতি বা জায়গার প্রতি হয়ে ওঠে, তখন তাকে বলা হয় ফোবিয়া। তেমনি একটি পরিচিত ফোবিয়া হলো ক্লস্ট্রোফোবিয়া। এটি এমন একটি মানসিক অবস্থা যেখানে ব্যক্তি খুব বেশি ভয় পায় ছোট, বন্ধ বা চাপা জায়গার মধ্যে থাকার কথা ভেবেই। কখনো কখনো ভয় এতটাই তীব্র হয় যে শ্বাসকষ্ট, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়া বা আতঙ্কের মতো ঘটনা ঘটাতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের জীবদ্দশায় বা কোনও এক বছরে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার ৭.৭% থেকে ১২.৫% পর্যন্ত হতে পারে। নারীদের মধ্যে এই ধরনের নির্দিষ্ট ভয়ের প্রবণতা পুরুষদের তুলনায় বেশি দেখা যায়। গবেষণা আরও জানায়, ১৬ বছর হওয়ার আগেই প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জনের মধ্যে কোনো না কোনো রকম উদ্বেগজনিত সমস্যা তৈরি হয়। ২০০৭ সালের একটি ইউরোপীয় গবেষণায় দেখা গেছে, এমআরআই (MRI) করাতে আসা রোগীদের মধ্যে ১% থেকে ১৫% পর্যন্ত মানুষের মধ্যে ক্লস্ট্রোফোবিয়ার উপসর্গ পাওয়া গেছে, এবং গড়ে ২.৩% রোগীর ক্ষেত্রে এতটাই ভয় কাজ করেছে যে তাদের চিত্রায়ন করানো সম্ভব হয়নি বা তাদের অজ্ঞান করতে হয়েছে। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১২.৫% এই ভয়ে ভুগছেন, যাদের বেশিরভাগই হলেন নারী।
ক্লস্ট্রোফোবিয়া আসলে কী?
ক্লস্ট্রোফোবিয়া হলো একটি বিশেষ ধরনের উদ্বেগজনিত ব্যাধি, যা মানুষকে ছোট বা সীমিত জায়গায় আটকে যাওয়ার আতঙ্কে ভোগায়। এটি সাধারণ কোনো ভয় নয় বরং এটি এমন এক মানসিক প্রতিক্রিয়া যেখানে ব্যক্তি সেই পরিস্থিতিতে শারীরিক ও মানসিকভাবে অস্বস্তি বোধ করে। এমনকি কখনো কখনো সেই ব্যক্তি কোনোভাবে সেই জায়গা থেকে বেরিয়ে না আসা পর্যন্ত স্বাভাবিক হতে পারেন না। অনেকে তো ছোট কোনো ঘর, সরু গলি কিংবা খুবই চাপা জায়গায় ঢুকতেই চায় না।
কী কারণে হয় এই ফোবিয়া?
ক্লস্ট্রোফোবিয়ার নির্দিষ্ট কোনো একক কারণ নেই, তবে বেশ কিছু বিষয় একে প্রভাবিত করতে পারে। ছোটবেলায় কেউ যদি কোনো ছোট ঘরে আটকে পড়ে থাকে বা দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো কোনো অভিজ্ঞতা পেয়ে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে এই ভয় জন্ম নিতে পারে। আবার কারো পরিবারের মধ্যে যদি আগে থেকেই কাউকে এই ধরনের সমস্যায় ভুগতে দেখা যায়, তাহলে জেনেটিক বা পারিবারিক প্রভাব থেকেও তা হতে পারে।
মনোবিজ্ঞানীরা বলেন, মস্তিষ্কের অ্যামিগডালা নামক অংশটি ভয় ও আবেগ নিয়ন্ত্রণ করে। অনেক সময় এই অংশটির অতিরিক্ত সক্রিয়তা বা অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়াও ক্লস্ট্রোফোবিয়ার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি, কেউ যদি দীর্ঘদিন মানসিক চাপে থাকেন বা উদ্বেগে ভোগেন, তবে তার ক্ষেত্রেও ফোবিয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়।

কোথায় কোথায় ক্লস্ট্রোফোবিয়া দেখা দিতে পারে?
ক্লস্ট্রোফোবিয়া নির্দিষ্ট কিছু পরিবেশ বা পরিস্থিতিতে বেশি দেখা দেয়। যেমন:
• লিফটে একা থাকা বা অতি ছোট রুমে থাকা
• সাবওয়ে বা ট্রেনের ভেতরে অবস্থান
• জানালাবিহীন রুম বা টয়লেট
• MRI বা CT scan মেশিনের ভেতর
• বিমানের জানালাবিহীন সিটে বসা
• ভিড়ের মধ্যে নিজেকে আটকে পড়া মনে হওয়া
• সরু গলি কিংবা কম ফাঁকা জায়গার মধ্যে প্রবেশ
এমনকি কেউ কেউ কোনো ঘরের দরজা বন্ধ থাকলেই অস্বস্তি অনুভব করেন, যদিও ঘরটি ছোট না-ও হতে পারে। এর পেছনে মূলত নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার ভয় কাজ করে—তাদের মনে হয়, তারা এখান থেকে আর বের হতে পারবেন না।
এই সমস্যা হলে কী করা উচিত?
ভয়ের সঙ্গে লড়াই করা সহজ নয়, তবে চিকিৎসা বা সহায়তা নিলে ক্লস্ট্রোফোবিয়া অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। কগনিটিভ বিহেভিয়র থেরাপি (CBT) এই ক্ষেত্রে অত্যন্ত কার্যকর পদ্ধতি, যেখানে ব্যক্তিকে ধীরে ধীরে সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে শেখানো হয় এবং তার মানসিক প্রতিক্রিয়া গঠনমূলকভাবে বদলে দেওয়া হয়। এছাড়া এক্সপোজার থেরাপি নামক আরেকটি পদ্ধতিতে ধাপে ধাপে চাপা জায়গায় থাকার অনুশীলনের মাধ্যমে ভয় কাটানো হয়। কিছু ক্ষেত্রে মানসিক চাপ কমানোর জন্য চিকিৎসকের পরামর্শে ওষুধ ব্যবহার করাও হয়।
শরীর ও মনের প্রশান্তির জন্য শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম, মেডিটেশন, বা যোগব্যায়াম অনেক সময় সহায়ক হতে পারে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—এই সমস্যাকে গোপন না রেখে তা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের কাছে প্রকাশ করা। এতে শুধু উপশমই নয়, অনেক ক্ষেত্রেই পুরোপুরি নিরাময় সম্ভব হয়।
লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র : Medical News Today, National Institute of Health, Healthline

