আইনস্টাইন একবার বিরক্ত হয়ে তাঁর এক বন্ধূকে জিজ্ঞেস করেছিলেন—‘তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস করো যে চাঁদটা কেবল তখনই আকাশে থাকে যখন তুমি সেদিকে তাকাও?’

আপনার উত্তরটা কি হতো? সাধারণ বুদ্ধিতে উত্তরটা হলো ‘অবশ্যই না! আমি না তাকালেও চাঁদ ওখানেই থাকে, সবসময় থাকে।’ কিন্তু কোয়ান্টাম মেকানিক্সের জগতটা আমাদের এই সাধারণ বুদ্ধির ধার ধারে না। সেখানে কোনো কণার আচরণ অনেক ক্ষেত্রে নির্ভর করে আমরা কীভাবে তাকে পরিমাপ করছি বা পর্যবেক্ষণ করছি তার উপর।

আপনি যদি বিজ্ঞানের ছাত্র হন তবে ডাবল স্লিট এক্সপেরিমেন্ট এর নাম হয়তো শুনেছেন। এই পরীক্ষার ফলাফলের একটি লাইন বিজ্ঞানপ্রেমীদের রাতের ঘুম হারাম করার জন্য যথেষ্ট। সেটা হলো—

ফোটন বা আলোর কণা কীভাবে জানে যে তাকে দেখা হচ্ছে?

An illustration of the ‘Double-slit experiment’ in physics.
By Original: NekoJaNekoJa Vector: Johannes Kalliauer

১.

আরেকটু ব্যাখ্যা করে বলছি। কোয়ান্টাম জগতের এই অদ্ভুত আচরণ বোঝার জন্য আমাদের প্রথমে চিরাচরিত পদার্থবিজ্ঞানের দুটি পরিচিত উদাহরণ দেখতে হবে।

ক.
ধরুন, একটি দেওয়ালের মাঝে দুটি ছিদ্র বা স্লিট আছে। আপনি দূর থেকে সেই ছিদ্র লক্ষ্য করে অনেকগুলো মার্বেল ছুড়ে মারলেন। কী ঘটবে? কিছু মার্বেল দেওয়ালের গায়ে লেগে পড়ে যাবে। আর যেগুলো ছিদ্র দিয়ে যাবে সেগুলো পেছনের পর্দায় দুটি সোজা লাইনে জমা হবে। এটা খুব স্বাভাবিক। এটা কণার চিরচেনা স্বভাব।

খ.
এবার মার্বেলের বদলে ভাবুন পানির ঢেউয়ের কথা। পুকুরে ঢিল ছুড়লে যেমন ঢেউ ওঠে। সেই ঢেউ যখন ওই দুটি ছিদ্র দিয়ে পার হয়, তখন ওপাশে গিয়ে তারা একে অপরের সাথে মিশে যায়। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ইন্টারফেরেন্স বা ব্যতিচার। এর ফলে পর্দায় দুটি দাগের বদলে তৈরি হয় অনেকগুলো উজ্জ্বল ও অন্ধকার ডোরার নকশা।

আসল চমক শুরু হলো তখন, যখন বিজ্ঞানীরা এই পরীক্ষাটি আলো বা ইলেকট্রন দিয়ে করলেন। আমরা জানি আলো ফোটন নামক কণা দিয়ে তৈরি। তাই মার্বেলের মতো তারও উচিত ছিল পর্দায় দুটো দাগ তৈরি করা।

কিন্তু বিজ্ঞানীরা যখন একে একে ফোটন ছুড়লেন, তখন দেখা গেল তারা পর্দায় মার্বেলের মতো আচরণ না করে ঢেউয়ের মতো সেই ‘ইন্টারফেরেন্স প্যাটার্ন’ তৈরি করছে! এর মানে হলো, একটি মাত্র ফোটন একই সময়ে দুটি ছিদ্র দিয়ে যাচ্ছে এবং নিজের সাথে নিজেই ধাক্কা খাচ্ছে! একে বলা হয় সুপারপজিশন

বিজ্ঞানীরা অবাক হলেন। তারা ভাবলেন, ফোটন একাই কীভাবে দুই দিক দিয়ে যায়? এটা দেখতে তারা ছিদ্রের পাশে একটা ক্যামেরা বা ডিটেক্টর বসানোর কথা ভাবলেন। গল্পের মোড় এখানেই ঘুরে গেল।

যেই ভাবনা সেই কাজ। যেই মুহূর্তে বিজ্ঞানীরা ছিদ্রের পাশে একটি ডিটেক্টর বসালেন এটা দেখার জন্য যে ফোটনটি আসলে কোন পথ দিয়ে যাচ্ছে, অমনি ফোটনটি তার আচরণ বদলে ফেলল। সে আর ঢেউয়ের মতো আচরণ না করে সাধারণ মার্বেলের মতো আচরণ শুরু করল এবং পর্দায় মাত্র দুটি দাগ তৈরি করল। যেন ফোটনটি জানত যে তাকে কেউ পর্যবেক্ষণ করছে!

২. এখন প্রশ্ন হলো দেখা বা না দেখার সাথে ফোটনের সম্পর্ক কি? তার কি চোখ আছে?

না, ফোটন কোনো বুদ্ধিমান সত্তা নয়। এখানে ‘দেখা’ বা ‘পর্যবেক্ষণ’ শব্দটা একটু বিভ্রান্তিকর। কোয়ান্টাম জগতে দেখা মানে শুধু তাকিয়ে থাকা নয়। এর মানে হলো স্পর্শ করা বা ইন্টারঅ্যাক্ট করা।

একটি সহজ উপমা দিই। ধরুন, একটি ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরে একটি ফুটবল রাখা আছে। আপনি জানেন না বলটি কোথায়। আপনি একটি টর্চ জ্বালালেন। টর্চের আলো গিয়ে ফুটবলের গায়ে লাগল এবং প্রতিফলিত হয়ে আপনার চোখে এল। আপনি বলটি দেখলেন। এতে ফুটবলের কোনো ক্ষতি হলো না বা জায়গাও বদলাল না। কারণ বলটি অনেক বড় ভারী।

কিন্তু কোয়ান্টাম জগত এতই সূক্ষ্ম যে, সেখানে একটি ইলেকট্রনকে দেখতে হলে তার গায়ে অন্তত একটি আলোর কণা বা ফোটন ফেলতে হয়। ইলেকট্রন এতই হালকা যে টর্চের আলোর ওই একটি ফোটন যখন তাকে ধাক্কা দেয়। তখন সেই ভৌত স্পর্শে ইলেকট্রনটি তার আদি অবস্থা বদলে ফেলে।

অর্থাৎ, আমরা যখনই তথ্য সংগ্রহ করতে যাই, আমাদের সেই দেখার প্রক্রিয়াটিই কণাটির তরঙ্গ ধর্মকে নষ্ট করে দেয়। একেই বলে ওয়েভ ফাংশন কলাপস

৩. তবুও প্রশ্ন থেকে যায় যে পর্যবেক্ষক কে?

বিজ্ঞানীরা এতক্ষণে এটা পরিষ্কার বুঝলেন যে, মাপতে গেলে বা স্পর্শ করলেই কণা তার রূপ বদলে ফেলে। কিন্তু সবচেয়ে বড় খটকা লাগল অন্য জায়গায়। এই বদলে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা নিচ্ছে কে? একটি যন্ত্র? প্রকৃতি? নাকি খোদ মানুষ? এই একটিমাত্র প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে আধুনিক বিজ্ঞান আড়াআড়িভাবে চারটি প্রধান দর্শনে বিভক্ত হয়ে গেছে।

ক. কোপেনহেগেন ইন্টারপ্রিটেশন

কোয়ান্টাম মেকানিক্সের এই সবচেয়ে প্রভাবশালী এবং ক্লাসিক্যাল ব্যাখ্যাটি দেন নোবেল বিজয়ী পদার্থবিদ নিলস বোর এবং তার সহকর্মীরা। এই ব্যাখ্যার সার কথা হলো এই যে, যতক্ষণ না আমরা মাপছি, ততক্ষণ বাস্তবতা বা রিয়েলিটি বলে আসলে কিচ্ছু নেই।

তাদের মতে, মাপার আগে একটি ফোটন কোনো নির্দিষ্ট কণা নয়, সে মহাবিশ্বের বুকে কেবলই একটি গাণিতিক সম্ভাবনা হয়ে ভাসে। যেই মুহূর্তে আপনি তার দিকে তাকালেন বা মাপলেন, অমনি মহাবিশ্ব বাধ্য হয় সেই সম্ভাবনাকে একটি নির্দিষ্ট বাস্তবে রূপ দিতে। আইনস্টাইন এই কথা শুনে ভীষণ রেগে গিয়েছিলেন। আর শুরুতে বলা সেই বিখ্যাত প্রশ্নটি হাঁটতে হাঁটতে তাঁর সহকর্মী আব্রাহাম পাইসকে করেছিলেন,

তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস করো যে চাঁদটা কেবল তখনই আকাশে থাকে যখন তুমি সেদিকে তাকাও?

খ. ডিকোহেরেন্স

আপনার মনে একটি খুব লজিক্যাল প্রশ্ন জাগতে পারে, “আমিও তো বিলিয়ন বিলিয়ন ফোটন আর ইলেকট্রন দিয়ে তৈরি। তাহলে আমি কেন দরজার দুই পাশ দিয়ে একসাথে যেতে পারি না? আমি কেন জাদুর মতো গায়েব হয়ে যাই না? আমি কেন সবসময় একটা নির্দিষ্ট জায়গায় থাকি?”

এর চমৎকার উত্তর দেয় ডিকোহেরেন্স থিওরি। এই মতবাদ অনুযায়ী, পর্যবেক্ষক হওয়ার জন্য চোখওয়ালা কোনো মানুষের দরকার নেই। এই বিশাল পরিবেশই হলো সবচেয়ে বড় পর্যবেক্ষক।

কোয়ান্টাম জগতের ওই সুপারপজিশন হলো সাবানের ফেনার মতো অত্যন্ত নাজুক। আমাদের চারপাশে থাকা বাতাস, তাপ, আলো, ওয়াই ফাই সিগন্যাল বা মহাজাগতিক রশ্মি প্রতিনিয়ত আমাদের শরীরের কণাগুলোকে ধাক্কা দিচ্ছে। এই যে সারাক্ষণ পরিবেশের সাথে আমাদের শরীরের কণাগুলোর সংঘর্ষ হচ্ছে, একেই বলে ডিকোহেরেন্স।

পরিবেশ সারাক্ষণ আমাদের পরিমাপ করে চলেছে। কোটি কোটি কণার এই অবিরত ধাক্কাধাক্কিতে আমাদের শরীরের সেই কোয়ান্টাম জাদু মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে যায়। কিন্তু ল্যাবরেটরিতে একটি ফোটনকে যখন একদম শূন্যস্থানে বা ভ্যাকুয়ামে আলাদা করে রাখা হয়, তখন পরিবেশ তাকে আর স্পর্শ করতে পারে না। ঠিক তখনই সে তার জাদুকরী রূপ দেখাতে পারে।

গ. চেতনার ভূমিকা

এটা হলো বিজ্ঞানীদের দেওয়া সবচেয়ে বিতর্কিত, রহস্যময় এবং রোমাঞ্চকর ব্যাখ্যা। জন ভন নিউম্যান এবং ইউজিন উইগনারের মতো কিংবদন্তি বিজ্ঞানীরা একসময় বলেছিলেন, যতই যন্ত্র বা ক্যামেরা দিয়ে ফোটনকে মাপা হোক না কেন, যন্ত্র তো আর নিজে কিছু বোঝে না। যন্ত্রের ডেটা শেষ পর্যন্ত কার চোখে পৌঁছায়? একটি সচেতন মানুষের মস্তিষ্কে।

তাই তাদের মতে, মানুষের ‘চেতনা’ ছাড়া কোয়ান্টাম ওয়েভ ফাংশন কলাপস করে না। অর্থাৎ, মহাবিশ্ব একটি অসীম সম্ভাবনার ক্যানভাস হয়ে পড়ে থাকে, যতক্ষণ না কোনো ‘সচেতন সত্তা’ সেদিকে তাকায়। মানুষ তাকালেই কেবল মহাবিশ্ব বাস্তবে রূপ নেয়। এই থিওরি মানলে, আমরা এই মহাবিশ্বের ক্ষুদ্র কোনো অংশ নই, বরং আমাদের চেতনার কারণেই মহাবিশ্বের অস্তিত্ব টিকে আছে! যদিও আধুনিক বিজ্ঞান এই মতবাদকে এখন খুব একটা সমর্থন করে না।

ঘ. মেনি ওয়ার্ল্ডস থিওরি

সবশেষে হিউ এভারেট নিয়ে এলেন এক মাথা নষ্ট করা থিওরি, যা সাইন্স ফিকশনকেও হার মানায়। তিনি বললেন, “ফোটন আসলে তার আচরণ বদলায় না, আর কেউ সম্ভাবনাকেও নষ্ট করে না। বরং ফোটন যখন কোনো সিদ্ধান্তের মুখে পড়ে, সে ডান দিকে যাবে নাকি বাম দিকে, তখন পুরো মহাবিশ্বটিই দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়!”

এক মহাবিশ্বে ফোটনটি ডান দিক দিয়ে যায়, আর ঠিক তার সমান্তরাল আরেক মহাবিশ্বে ফোটনটি বাম দিক দিয়ে যায়। আপনি আছেন যেকোনো একটি মহাবিশ্বে, তাই আপনি কেবল একটি ফলাফল দেখছেন। কিন্তু অন্য মহাবিশ্বে আপনারই আর একটি ভার্সন সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি ফলাফল দেখছে।

তার মানে হলো, এই মহাবিশ্বে আপনি হয়তো এই আর্টিকেলটি পড়ছেন, কিন্তু ঠিক এই মুহূর্তেই জন্ম নেওয়া আরেকটি সমান্তরাল মহাবিশ্বে আপনি হয়তো ফোন রেখে ঘুমিয়ে পড়েছেন! প্রতিটি ছোট-বড় ঘটনার সাথে সাথে প্রতি সেকেন্ডে এভাবেই জন্ম নিচ্ছে কোটি কোটি নতুন মহাবিশ্ব!

৫. অতীত কি বদলে দেওয়া সম্ভব?

যদি ওপরের থিওরিগুলো পড়ে আপনার মাথা এরই মধ্যে ঘুরতে শুরু করে, তবে এবার একটু শক্ত হয়ে বসুন। কারণ ১৯৯৯ সালে করা ‘ডিলেইড চয়েস কোয়ান্টাম ইরেজার’ এক্সপেরিমেন্টটি শুনলে আপনি আক্ষরিক অর্থেই চমকে উঠবেন। এই পরীক্ষাটি আমাদের সময় এর চিরচেনা ধারণাকেই চ্যালেঞ্জ করে বসে।

বিজ্ঞানীরা এই পরীক্ষায় ফোটনের সাথে একটি অভাবনীয় ছলনা করেছিলেন। তারা সাধারণ একটি ফোটন না নিয়ে, বিশেষ ক্রিস্টালের মাধ্যমে একটি ফোটনকে ভেঙে দুটি জমজ ফোটন তৈরি করলেন। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট। এই জমজ ভাইদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, মহাবিশ্বের দুই প্রান্তে থাকলেও এরা একে অপরের সব খবর মুহূর্তের মধ্যে জেনে যায়। বোঝার সুবিধার্থে চলুন এদের নাম দিই ‘ফোটন ক’ এবং ‘ফোটন খ’

কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গেলমেন্ট : যখন দুটি কোয়ান্টাম কণা একে অপরের সাথে ‘এনট্যাঙ্গেলড’ বা যুক্ত হয়ে যায়, তখন তাদের মধ্যে দূরত্বের আর কোনো বাধা থাকে না। ছবিটিতে যেমন দেখা যাচ্ছে এদের একটিকে যদি পৃথিবীতে আর অন্যটিকে কোটি আলোকবর্ষ দূরে মহাকাশেও রাখা হয়, তবুও তারা জাদুর মতো একে অপরের সাথে যুক্ত থাকে। আপনি পৃথিবীর কণাটির ‘স্পিন’ বা অবস্থা পরিবর্তন করলে বা মাপলে, ঠিক শূন্য সেকেন্ড সময়ে (আলোর চেয়েও দ্রুত) দূরের কণাটিও সাথে সাথে উল্টো দিকে তার অবস্থা বদলে ফেলে! দূরত্বের বাধা না মানা এই অদ্ভুত যোগাযোগ দেখেই বিজ্ঞানী আইনস্টাইন অবাক হয়ে এর নাম দিয়েছিলেন— “স্পুকি অ্যাকশন অ্যাট আ ডিসট্যান্স” বা দূরবর্তী ভৌতিক কাণ্ড!

বিজ্ঞানীরা ‘ফোটন ক’ কে সরাসরি পাঠিয়ে দিলেন সামনের পর্দার দিকে, যাতে সে পর্দায় আঘাত করে তার নির্দিষ্ট নকশা তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে ‘ফোটন খ’ কে পাঠানো হলো আয়না এবং ডিটেক্টরের এক জটিল গোলকধাঁধায়।

এখানে মজার এবং অদ্ভুত কৌশলটি ছিল দূরত্বের। ‘ফোটন খ’ এর গোলকধাঁধার রাস্তাটি ইচ্ছা করেই অনেক বড় রাখা হয়েছিল। এর ফলে, ‘ফোটন ক’ পর্দায় আঘাত করে ফেলার বেশ কিছুক্ষণ পর ‘ফোটন খ’ গিয়ে ডিটেক্টরে পৌঁছায়। সহজ কথায়, ‘ফোটন ক’ ততক্ষণে পর্দায় তার ছাপ ফেলে দিয়েছে এবং তার কাজ শেষ। অর্থাৎ তার অতীত তৈরি হয়ে গেছে।

এখন বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে বিজ্ঞানীরা ‘ফোটন খ’ কে নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিলেন। তারা চাইলে ডিটেক্টর দিয়ে মেপে দেখতে পারেন ‘ফোটন খ’ আসলে কোন পথ দিয়ে এসেছে। অথবা তারা চাইলে সেই পথের সম্পূর্ণ তথ্য চিরতরে মুছেও ফেলতে পারেন।

সাধারণ যুক্তি অনুযায়ী, ‘ফোটন ক’ তো অনেক আগেই পর্দায় আঘাত করে ফেলেছে। তাই এখন তো আর তার অতীত বদলে ফেলার কোনো সুযোগ নেই।

কিন্তু পরীক্ষার চূড়ান্ত ফলাফল দেখে বিজ্ঞানীদের চোখ কপালে উঠল! বিজ্ঞানীরা যখন দেখলেন যে তারা ‘ফোটন খ’ এর পথের তথ্য মাপছেন, তখন তারা পর্দার দিকে তাকিয়ে দেখলেন অতীত হয়ে যাওয়া ‘ফোটন ক’ পর্দায় সাধারণ মার্বেলের মতো দুটি সোজা দাগ তৈরি করে রেখেছে।

Delayed Choice Quantum Eraser experiment setup

আর যখন বিজ্ঞানীরা ‘ফোটন খ’ এর তথ্য মুছে ফেললেন, তখন অবাক বিস্ময়ে তারা দেখলেন অতীতে আঘাত করাফোটন ক’ তার রূপ বদলে ফেলেছে। সে পর্দায় ঢেউয়ের মতো জাদুকরী নকশা বা ইন্টারফেরেন্স প্যাটার্ন তৈরি করে রেখেছে!

বিষয়টা দেখলে মনে হয় যেন ‘ফোটন ক’ ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে দেখতে পেয়েছিল যে, বিজ্ঞানীরা তার জমজ ভাইয়ের সাথে ঠিক কী করতে যাচ্ছেন! সে যখন বুঝতে পারল যে ভবিষ্যতে তার তথ্য মাপা হবে, সে সাথে সাথে অতীতে গিয়ে নিজের রূপ বদলে মার্বেল হয়ে গেল! আবার যখন সে বুঝতে পারল ভবিষ্যতে তার সব তথ্য মুছে ফেলা হবে, সে আবার অতীতে ফিরে গিয়ে ঢেউ হয়ে গেল!

তবে এর মানে এই নয় যে ফোটন কোনো টাইম মেশিনে চড়ে টাইম ট্রাভেল করছে। আধুনিক বিজ্ঞান বলছে এর ভেতরের অর্থ আরও অনেক গভীর, আর তা হলো ‘তথ্য’ বা Information

এই মহাবিশ্ব আসলে কঠিন কোনো বস্তু দিয়ে নয়, বরং তথ্য দিয়ে তৈরি। সময় বা স্পেস এখানে কোনো বাধা হিসেবে কাজ করে না। মহাবিশ্বের যেকোনো জায়গায় বা যেকোনো সময়ে যদি আপনার পথের তথ্য সংরক্ষিত থাকে, তবে বাস্তবতা একরকম আচরণ করবে। আর যদি সেই তথ্য চিরতরে মুছে ফেলা হয়, তবে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি রূপ নেবে।

অর্থাৎ যতক্ষণ তথ্য আছে, ততক্ষণ এক বাস্তবতা থাকে। আর তথ্য মুছে ফেললে তৈরি হয় অন্য বাস্তবতা। বিষয়টা দেখলে মনে হয় যেন পুরো মহাবিশ্বটি একটি অসীম কোডের জাল, যা শুধু তথ্যের অপেক্ষায় বসে আছে নিজেকে প্রকাশ করার জন্য!

৬. ভিডিও গেম এবং আমাদের বাস্তবতা

আধুনিক বিজ্ঞান এবং দর্শন আজ এক অদ্ভুত বিন্দুতে এসে মিলেছে। ফোটনের এই রহস্যময় আচরণের ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে এখন অনেকেই আমাদের মহাবিশ্বকে তুলনা করছেন বিশাল কোনো ভিডিও গেমের সাথে।

একবার ভাবুন তো জিটিএ বা পাবজির মতো গেমগুলোর কথা। পুরো গেমের এত বিশাল ম্যাপ কি কম্পিউটার সবসময় একসাথে লোড করে রাখে?

মোটেও না। প্লেয়ার গেমের ভেতর যেদিকে তাকায় বা যেদিকে যায়, কম্পিউটার শুধু সেইটুকু দৃশ্যই রেন্ডার বা তৈরি করে। পেছনের না দেখা জগতটা তখন কেবলই কিছু গাণিতিক কোড বা ডেটা হিসেবে পড়ে থাকে।

আমাদের মহাবিশ্বের সিস্টেমও কি ঠিক একই রকম? নিজের শক্তি বা এনার্জি বাঁচানোর জন্য প্রকৃতি কি শুধু তখনই বাস্তবতা তৈরি করে যখন আমরা সেদিকে তাকাই? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে জন হুইলারের মতো কিংবদন্তি পদার্থবিজ্ঞানীরা এক যুগান্তকারী কথা বলেছেন। তাদের মতে, মহাবিশ্ব আগে থেকে তৈরি করে রাখা কোনো স্টেজ বা মঞ্চ নয়। আমরা এই মহাবিশ্বের সাধারণ কোনো দর্শক নই, বরং আমরা হলাম এর সক্রিয় অংশীদার বা পার্টিসিপেটর।

এই কথাটি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের এক গভীর ও দার্শনিক সত্যের সাথে আমাদের মুখোমুখি দাঁড় করায়। আমরা আসলেই এই বিশাল মহাবিশ্বের কোনো বিচ্ছিন্ন বা সাধারণ দর্শক নই। আমাদের প্রতিটি পরিমাপ এবং প্রতিটি ইন্টারঅ্যাকশন মহাবিশ্বের অগণিত সম্ভাবনা থেকে একটি নির্দিষ্ট বাস্তবতাকে বেছে নিতে সাহায্য করে। এখানে পর্যবেক্ষণ মানে কেবল চোখ দিয়ে দেখা নয়। এটি হলো চারপাশের প্রকৃতির সাথে আমাদের তথ্যের অবিরাম আদানপ্রদান।

আমরা যদি সত্যিই এই মহাজাগতিক নাটকের একজন সক্রিয় অংশীদার হই, তবে একবার শান্ত হয়ে ভাবুন। আজ আপনি ঠিক কোন বাস্তবতাকে আপনার পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সত্য করে তুলছেন? এই অসীম মহাবিশ্ব হয়তো আপনার দিকেই তাকিয়ে আছে। সে হয়তো আপনারই একটি সজাগ দৃষ্টির অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। কখন আপনি সচেতনভাবে চারপাশের দিকে তাকাবেন এবং এই ভাসমান সম্ভাবনার মেঘকে একটি নির্দিষ্ট ও সুন্দর বাস্তবে রূপ দেবেন, হয়তো সেটাই মহাবিশ্বের সবচেয়ে বড় অপেক্ষা।

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply