ক্যাপ্টেন আমেরিকা, চরিত্রটিকে আমরা কে না চিনি? আর তার হাতে থাকা ঢালকে তো আমরা বন্দুকের গুলি থামানো থেকে শুরু করে বিস্ফোরণের আঘাত সহ্য করা, এমনকি দেয়ালে আঘাত করে আবার ক্যাপ্টেনের হাতে ফিরে আসতে দেখি যা এই ঢালকে প্রায় অবিনাশী হিসেবেই দেখানো হয়। সিনেমায় এর মূল উপাদান হিসেবে দেখানো হয়েছে কাল্পনিক ধাতু ভাইব্রেনিয়াম। কিন্তু বাস্তব বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এমন কোনো পদার্থ কি সত্যিই সম্ভব? এ নিয়ে বিজ্ঞানীরা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছেন, বাস্তব পৃথিবীর কোন কোন উপাদান মিলে ক্যাপ্টেন আমেরিকার ঢালের কাছাকাছি কিছু তৈরি করা যেতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, বাস্তবে এমন কোনো একক পদার্থ নেই যা একই সঙ্গে অতিরিক্ত হালকা, অত্যন্ত শক্ত, বিস্ফোরণ প্রতিরোধী এবং তাপ সহনশীল হতে পারে। কারণ পদার্থবিজ্ঞানে প্রতিটি বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে অন্য বৈশিষ্ট্যের একটি ভারসাম্য কাজ করে। কোনো ধাতু খুব শক্ত হলে সেটি সাধারণত ভঙ্গুর হয়। আবার কোনো পদার্থ নমনীয় হলে সেটি অতিরিক্ত আঘাত সহ্য করতে পারে না। তাই বাস্তব জীবনে সুপার ম্যাটেরিয়াল তৈরি করা খুব কঠিন।
প্রথমেই যে উপাদানের কথা বলতে হয় সেটি হলো টাংস্টেন কার্বাইড। এটি অত্যন্ত শক্ত একটি যৌগিক পদার্থ। শিল্পকারখানার কাটিং টুল কিংবা ভারী যন্ত্রপাতিতে এটি ব্যবহার করা হয়। প্রচণ্ড চাপ সহ্য করার ক্ষমতা থাকলেও এর একটি বড় সমস্যা হলো এটি খুব ভারী। ফলে পুরো ঢাল যদি এই উপাদান দিয়ে তৈরি করা হয়, তাহলে সেটি বহন করাই কঠিন হয়ে যাবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি হলো মেটাল ম্যাট্রিক্স কম্পোজিট। এতে ধাতুর সঙ্গে সিরামিক উপাদান যুক্ত করা হয়। এই ধরনের কম্পোজিট অনেক বেশি শক্তিশালী এবং উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে সক্ষম। মহাকাশ প্রযুক্তি ও সামরিক সরঞ্জামে এমন উপাদান ব্যবহার করা হয়। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, ক্যাপ্টেন আমেরিকার ঢালের বাইরের স্তরে এ ধরনের উপাদান ব্যবহার করা হলে সেটি আঘাত ও তাপের বিরুদ্ধে অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে।
বুলেট প্রতিরোধের ক্ষেত্রে কপার-ট্যানটালাম অ্যালয় নিয়েও গবেষণা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক গবেষণাগারে এই ধাতব সংকর নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। এর বিশেষ গঠন আঘাতের শক্তি ছড়িয়ে দিতে সাহায্য করে। ফলে গুলির আঘাত সরাসরি ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না। বাস্তব জীবনের বর্ম প্রযুক্তিতে এই ধরনের উপাদান ভবিষ্যতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তাপ প্রতিরোধের জন্য সিরামিক স্তরের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। নাসার মহাকাশযানের হিট শিল্ডে বিশেষ সিরামিক আবরণ ব্যবহার করা হয়, যাতে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় প্রচণ্ড তাপ থেকে যন্ত্রপাতি রক্ষা পায়। ক্যাপ্টেন আমেরিকার ঢালের মতো কিছু তৈরি করতে হলে এমন তাপ সহনশীল স্তর প্রয়োজন হবে।
সবচেয়ে আকর্ষণীয় উপাদানগুলোর একটি হলো নাইটিনল। এটি নিকেল ও টাইটেনিয়ামের সংকর ধাতু। এর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো বাঁকানো বা বিকৃত হওয়ার পর আবার আগের আকারে ফিরে আসতে পারে। বিজ্ঞানীরা একে শেপ মেমোরি অ্যালয় বলেন। ঢাল আঘাতের পরও যাতে সহজে বিকৃত না হয়, সে ক্ষেত্রে এমন উপাদান কার্যকর হতে পারে।
তবে সিনেমার মতো ঢাল বাস্তবে তৈরি করতে সবচেয়ে বড় বাধা হলো শক্তির আচরণ। সিনেমায় দেখা যায় ঢাল আঘাতের শক্তি শোষণও করে, আবার একই সঙ্গে প্রতিফলিতও করে। বাস্তব পদার্থবিজ্ঞানে এই দুই বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে পুরোপুরি পাওয়া প্রায় অসম্ভব। তাই ক্যাপ্টেন আমেরিকার ঢাল এখনো বিজ্ঞান কল্পকাহিনির জগতেই সীমাবদ্ধ রয়েছে, যদিও আধুনিক উপাদান বিজ্ঞান সেই কল্পনাকে ধীরে ধীরে বাস্তবের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে।

