আজ আমি আপনাদের এমন এক অদ্ভুত, একই সঙ্গে গভীর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করাতে চাই, যার নিরেট উত্তর আজও বিজ্ঞানের কাছে নেই। আই রিপিট, কারোর কাছেই নেই। পুরো লেখাটি পড়ে শেষ করলে হয়তো আপনি নিজেকেই নতুনভাবে আবিষ্কার করবেন।
প্রশ্নটা হচ্ছে চেতনা বা কনশাসনেস আসলে কী?
খুব সহজ মনে হচ্ছে? একটু দাঁড়ান। আমরা সাধারণত বড় স্কেলে চিন্তা করি। কিন্তু নিজেকে একটু জুম ইন করুন তো। আপনি কিসের তৈরি? হার্ট, কিডনি বা মস্তিষ্ক বাদ দিন। অণুবীক্ষণ যন্ত্রের শেষ সীমায় গেলে আপনি দেখবেন আপনি আসলে কার্বন, হাইড্রোজেন, নাইট্রোজেনের সমষ্টি ছাড়া আর কিছু নন।
আরও গভীরে যান। পাবেন ইলেকট্রন, প্রোটন, নিউট্রন। বর্তমান বিজ্ঞান বলছে ইলেকট্রন মৌলিক হলেও প্রোটন, নিউট্রনকে আরও ভাঙলে ‘কোয়ার্ক’ পাবেন। আবার ভবিষ্যতে কোয়ার্ক ভেঙে প্রমাণ হতে পারে হয়তো তার নিচে ‘স্ট্রিং’ বা ডিপার স্ট্রাকচার আছে।অর্থাৎ দিনশেষে আমি, আপনি সবাই কেবল একগাদা সাবএটমিক পার্টিকল বা অতিপারমাণবিক কণার স্তূপ।

এখন আসল প্রশ্নটা করি। একটি ইলেকট্রনের কি কোনো আবেগ আছে? একটি প্রোটন কি জানে সে বেঁচে আছে? উত্তর হলো—না। এরা একেকটি প্রাণহীন, জড় কণা। এরা কেবল পদার্থবিজ্ঞানের গাণিতিক সমীকরণ মেনে চলে।
১. তাহলে প্যারাডক্সটা কোথায়?
প্যারাডক্সটা হলো— যেসব উপাদান দিয়ে আমি আর আপনি তৈরি, তাদের কারোরই কোনো চেতনা নেই। অথচ সেই কোটি কোটি অচেতন কণা যখন একসাথে হয়ে মস্তিষ্ক গঠন করল, তখন হুট করে সেখানে “আমি আছি” নামক বোধ বা চেতনার জন্ম হলো! কীভাবে?
জড় পদার্থ থেকে চেতনা তৈরি হওয়ার এই রহস্য ভেদ করতে বিজ্ঞানীরা একটি বিশেষ শব্দের আশ্রয় নেন যাকে বলা হয় ‘ইমার্জেন্স’ বা উদ্ভব। আসুন ইমার্জেন্সের বিষয়টা একটু সহজভাবে বুঝাই।
আপনার স্মার্টফোন বা ল্যাপটপের স্ক্রিনটির কথা ভাবুন। এটা লক্ষ লক্ষ ক্ষুদ্র পিক্সেল দিয়ে তৈরি। আপনি যদি একটি একক পিক্সেলের দিকে তাকান কিছুই বুঝবেন না। এটা শুধুই একটি লাল, নীল বা সবুজ বিন্দু। এর কোনো অর্থ নেই, কোনো গল্প নেই, কোনো আবেগ নেই। কিন্তু যখন লক্ষ লক্ষ পিক্সেল একসাথে একটি নির্দিষ্ট প্যাটার্নে জ্বলে ওঠে, তখন আপনি স্ক্রিনে একটি সিনেমা দেখতে পান। সেখানে কান্না আছে, হাসি আছে, টানটান উত্তেজনা আছে।

আমাদের মস্তিষ্কও এমনই এক বিশাল পিক্সেলের জাল। প্রতিটি নিউরন নিজে কোনো সত্তা নয়। তারা মূলত বৈদ্যুতিক ও রাসায়নিক সিগন্যালের মাধ্যমে একে অপরের সাথে যোগাযোগ করে। এটাকে পিক্সেলের অন/অফের সাথে তুলনা করতে পারেন। কিন্তু যখন প্রায় ছিয়াশি বিলিয়ন নিউরন ঠিক এক ছন্দে কাজ করে, তখন তৈরি হয় স্মৃতি, তৈরি হয় আবেগ, তৈরি হয় চেতনা।
আমরা হলাম মহাবিশ্বের সেই সিনেমা, যা পরমাণুর পিক্সেল দিয়ে তৈরি।
২. আমরা কি কেবলই হার্ডওয়্যার?
তবে এখানে আবার দার্শনিকরা বিজ্ঞানীদের প্রশ্ন করে বসেন। তারা বলেন, “ভাই, উপমা তো দিলেন, কিন্তু একটা সমস্যা আছে।” একে বলা হয় ‘দ্য হার্ড প্রবলেম অফ কনশাসনেস’। এই ধারণাটি প্রথম সামনে আনেন দার্শনিক ডেভিড চালমার্স।
কম্পিউটারের পিক্সেল সিনেমা দেখায় ঠিকই, কিন্তু কম্পিউটার কি নিজে সেই সিনেমাটি উপভোগ করে? কম্পিউটার কি হাসে বা কাঁদে? না। সে কেবল ডেটা প্রসেস করে।
কিন্তু আমি আর আপনি যখন সূর্যাস্ত দেখি, আমরা কেবল ডেটা প্রসেস করি না। আমাদের মনের ভেতর একটা ভালোলাগার অনুভূতি কাজ করে। হাতে চিমটি কাটলে কেবল নিউরনে সিগন্যাল যায় না, আমরা আক্ষরিক অর্থেই ব্যথা অনুভব করি। জড় পদার্থ দিয়ে তৈরি একটি বায়োলজিক্যাল মেশিনের ভেতর এই অনুভূতি এল কোত্থেকে?
স্ট্যান্ডার্ড মডেলের কোনো সমীকরণে এই অনুভূতির কোনো জায়গা নেই। এই পার্থক্য কেন তৈরি হয়, সেটাই আজকের বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত প্রশ্ন। মূলত এখানেই বিজ্ঞান থমকে যায়।
৩. আপনি বস্তু নন, আপনি হলেন প্যাটার্ন
আরেকটি তথ্য আপনাকে ভাবাবে। জীববিজ্ঞান বলে মানবদেহের প্রায় সব পরমাণু প্রতি কয়েক বছরে পুরোপুরি বদলে যায়। খাবারের মাধ্যমে নতুন পরমাণু ঢোকে, আর পুরনো পরমাণু বেরিয়ে যায়। অর্থাৎ ১০ বছর আগের আপনি আর এখনকার ‘আপনি’ বস্তুগতভাবে এক মানুষ নন। আপনার শরীরের উপাদান বদলে গেছে। তবুও আপনি ‘আপনিই’ আছেন। আপনার ছোটবেলার স্মৃতি, আপনার ব্যক্তিত্ব সব টিকে আছে। কেন জানেন?
কারণ, আপনি কোনো বস্তু নন, আপনি হলেন একটি প্যাটার্ন।
সাগরের ঢেউ যেমন পানি দিয়ে তৈরি হলেও পানি নয়, বরং পানির আন্দোলন। তেমনি আপনিও পরমাণু দিয়ে তৈরি হলেও পরমাণু নন। আপনি হলেন সেই পরমাণুর বিশেষ নৃত্য বা ছন্দ। যতক্ষণ এই ছন্দ বা প্যাটার্ন টিকে আছে, ততক্ষণ আপনার চেতনা টিকে আছে।
শেষে এক মননশীল ভাবনা শেয়ার করি। মহাবিশ্বের শুরু হয়েছিল প্রচণ্ড বিস্ফোরণ আর প্রাণহীন গ্যাস দিয়ে। বিলিয়ন বিলিয়ন বছর ধরে সেই গ্যাস নক্ষত্রের পেটে পুড়েছে। ভারী মৌল তৈরি করেছে আর শেষে সেই নক্ষত্রের ছাই জড়ো হয়ে আপনার মস্তিষ্ক তৈরি করেছে।
বিখ্যাত কসমোলজিস্ট কার্ল সাগানের সেই উক্তিটি মনে পড়ে?
We are a way for the cosmos to know itself.
কার্ল সাগান
আমরা হয়তো তুচ্ছ ধূলিকণা দিয়ে তৈরি। কিন্তু আমরা সেই বিশেষ ধূলিকণা, যারা উঠে দাঁড়িয়ে মহাকাশের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করতে পারি—
“আমি কে? এই জগত কেন?“
চেতনা হয়তো জড় পদার্থের কোনো সাধারণ ধর্ম নয়। হয়তো এটা মহাবিশ্বের জেগে ওঠার প্রক্রিয়া। এটা অবশ্য বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত নয় বরং একটি দার্শনিক ব্যাখ্যা। এই অসীম শূন্যতায়, আমাদের মস্তিষ্কই হলো সেই আয়না, যেখানে মহাবিশ্ব নিজেকে নিজে দেখার সুযোগ পায়।
৪. তাহলে উত্তরটা কী?
এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এত কথার পর আসল সিদ্ধান্তটা কী? বিজ্ঞানের কাছে কি তবে এর কোনো চূড়ান্ত উত্তর নেই? নাকি আমরা কোনোদিনই তা পাব না?
সতর্ক উত্তর হলো—আপাতত নেই। বিজ্ঞান এখনো অন্ধকারে হাতড়ে বেড়াচ্ছে। হতে পারে উত্তরটা লুকিয়ে আছে কোয়ান্টাম মেকানিক্সের কোনো অজানা সমীকরণে, কিংবা হয়তো চেতনা বিজ্ঞানের সীমানার বাইরের কোনো বিষয়। একসময় বিদ্যুৎ বা চুম্বককেও মানুষ জাদুকরী মনে করত, আজ তা আমাদের হাতের মুঠোয়। চেতনার রহস্যও হয়তো একদিন গণিতের খাতায় ধরা দেবে।
তবে উত্তর না থাকাটাই কিন্তু এই গল্পের সবচেয়ে সুন্দর অংশ। কারণ সব রহস্যের সমাধান হয়ে গেলে বেঁচে থাকার সেই আদিম রোমাঞ্চটুকু আর অবশিষ্ট থাকত না। এই না জানাটাই আমাদের প্রতিনিয়ত কৌতূহলী করে রাখে। আমরা উত্তর খুঁজছি, আর এই মহাজাগতিক খোঁজার প্রক্রিয়ার নামই হলো জীবন।
আপনার কী মনে হয়? এই যে আপনি এখন লেখাটি পড়লেন, এই ‘আপনি’ কি শুধুই নিউরনের খেলা, নাকি এর চেয়েও গভীর কিছু?


2টি মন্তব্য
Onek age thekei ai bisoye amar agroho chilo.ami akta bostu, aitar pran kotha theke elo,keno kichukkon amar sorirer karjokrom bondo rakle amar pran ar thakena.aita kothay jay.kichukone somoyer bebodane ai sorirei keno amar jibon moron!(bigganer chintay er uttor kujtam)
matinsiddique1958@gmail.com