ওয়্যারলেস প্রযুক্তির উন্নতি আমাদের জীবনযাত্রায় বিপ্লব এনেছে। 3G থেকে 4G আর এখন 5G, প্রতিটি ধাপেই গতি, সংযোগ আর সক্ষমতা বেড়েছে। তবে এর পাশাপাশি ছড়িয়েছে একগুচ্ছ গুজব ও ভুল ধারণা।
বুঝে হোক বা না বুঝে, শুধুমাত্র ভিউ কুড়ানোর উদ্দেশ্যে কেউ কেউ সোশ্যাল মিডিয়ায় স্যাড মিউজিক লাগিয়ে, ক্যাপশনে আবেগঘন কিছু লাইন লিখে দাবি করেন: “রেডিয়েশনের কারণে পাখি মরছে।” আবার কোনো না কোনো দিন নিশ্চয় আপনার বাবা-মা কিংবা আত্মীয়স্বজনও বলেছেন, “কানের পাশে ফোন রেখে ঘুমালে ক্যান্সার হয়।” এটি সবচেয়ে প্রচলিত গুজবের একটি।
কিছু গ্রামে এরকমও শোনা যায় যে, “টাওয়ার বসেছে ওই পাড়ায়, তাই আমাদের এলাকায় ক্যান্সার বেড়ে গেছে।” আবার অনেকে এরকমও বলেন, মোবাইল টাওয়ারের কাছাকাছি নারকেল গাছে ডাব ধরলেও ভেতরে পানি হয় না। সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ধরনের ভয় বা উদ্বেগের মূল কারণ আসলে রেডিয়েশন নিয়ে বিভ্রান্তি এবং বিষয়টি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকা।
প্রশ্ন হলো, আসলেই কি রেডিয়েশন আমাদের বা প্রকৃতির জন্য এতটা ভয়ঙ্কর? নাকি এগুলো শুধু আধুনিক যুগের কল্পকাহিনি?
রেডিয়েশন বা বিকিরণ আসলে কী?
রেডিয়েশন আমাদের চারপাশের জগতের একটি স্বাভাবিক অংশ। সহজ ভাষায়, রেডিয়েশন হলো শক্তির এমন একটি রূপ যা কণা বা তরঙ্গের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করে। এর সবচেয়ে পরিচিত উদাহরণ হলো আলো। আমরা প্রতিদিন যে আলো দেখি, তা নিজেও এক ধরনের ইলেকট্রোম্যাগনেটিক রেডিয়েশন। আমাদের চোখ কেবল একটি নির্দিষ্ট সীমার (৩৮০ থেকে ৭৮০ ন্যানোমিটার) তরঙ্গদৈর্ঘ্য দেখতে পায়, কিন্তু এর বাইরেও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের রেডিয়েশন যা আমরা খালি চোখে দেখি না। এর বাইরে আছে রেডিও ওয়েভ, এক্স-রে, অতিবেগুনি রশ্মি, এবং মোবাইল ফোনের সিগন্যাল। এই কারণেই মোবাইল ফোন, 5G নেটওয়ার্ক বা অন্যান্য প্রযুক্তি নিয়ে আমাদের মনে নানা প্রশ্ন ও ভয় জাগে। কিন্তু এই ভয় দূর করার জন্য আগে জানা প্রয়োজন, সব রেডিয়েশন এক নয়। তাদের প্রভাবও একরকম নয় এবং মূল পার্থক্যটি নির্ভর করে তাদের শক্তির উপর।
রেডিয়েশন দুই ধরনের—
আয়োনাইজিং রেডিয়েশন (Ionizing Radiation): এই রেডিয়েশনের তরঙ্গদৈর্ঘ্য দৃশ্যমান আলোর চেয়ে কম এবং এর শক্তি অনেক বেশি। এটি আমাদের শরীরের কোষের ভেতরকার পরমাণু থেকে ইলেকট্রনকে সরিয়ে দিতে পারে এবং ডিএনএ এর গঠন ভেঙে দিতে পারে। এই ধরনের ক্ষতি থেকেই ক্যান্সারের ঝুঁকি তৈরি হয়। এক্স-রে, গামা রশ্মি এবং সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি এর প্রধান উদাহরণ।
নিচের ডায়াগ্রাম লক্ষ্য করুন —

নন-আয়োনাইজিং রেডিয়েশন (Non-ionizing Radiation): এই রেডিয়েশনের তরঙ্গদৈর্ঘ্য দৃশ্যমান আলোর চেয়ে বেশি এবং এর শক্তি অনেক কম, যা ডিএনএ-কে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে না। তাই এর থেকে সরাসরি ক্যান্সারের কোনো ঝুঁকি নেই। আমাদের ব্যবহৃত রেডিও ওয়েভ, মাইক্রোওয়েভ এবং মোবাইল ফোনের সিগন্যাল (3G, 4G বা 5G) এই নন-আয়োনাইজিং রেডিয়েশনের অন্তর্ভুক্ত।
সুতরাং, মূল কথা হলো, মোবাইল ফোন এবং 4G/5G নেটওয়ার্ক যে ধরনের রেডিয়েশন ব্যবহার করে, তা নন-আয়োনাইজিং এবং তুলনামূলকভাবে নিরাপদ।
আপনার ফোন কঠোর নিরাপত্তা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ
প্রতিটি মোবাইল ফোন বাজারে ছাড়ার আগে একটি কঠোর নিরাপত্তা পরীক্ষার মধ্যে দিয়ে যায়। এই পরীক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো স্পেসিফিক অ্যাবসোর্পশন রেট (SAR) পরিমাপ করা। সহজ ভাষায়, SAR হলো আপনার শরীর ফোন থেকে আসা রেডিও তরঙ্গের ঠিক কতটুকু শক্তি শোষণ করছে তার পরিমাপ।
- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (FCC) এই সীমা রেখেছে ১ গ্রাম টিস্যুর জন্য ১.৬ W/kg।
- ইউরোপে (ICNIRP) এই সীমা নির্ধারণ করেছে ১০ গ্রাম টিস্যুর জন্য ২.০ W/kg।
| অঞ্চল | সর্বোচ্চ অনুমোদিত SAR | পরিমাপের স্থান |
| যুক্তরাষ্ট্র (FCC) | ১.৬ W/kg | মাথা বা শরীরের ১ গ্রাম টিস্যুতে |
| ইউরোপ (ICNIRP) | ২.০ W/kg | মাথা বা শরীরের ১০ গ্রাম টিস্যুতে |
| বাংলাদেশ | সাধারণত FCC বা ICNIRP অনুসরণ করে |
দীর্ঘমেয়াদী বৈজ্ঞানিক গবেষণার পর এই সীমাগুলো এমনভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে যেন এর নিচে থাকলে মানবদেহে কোনো ক্ষতিকর প্রভাব না পড়ে। আপনি যখন কথা বলেন, ভিডিও কল করেন বা ইন্টারনেট ব্যবহার করেন, তখন আপনার ফোন স্যাটেলাইটে RF সিগনাল পাঠায়, এবং এই পাঠানো সিগনালের শক্তি থেকেই SAR তৈরি হয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, 5G সহ সকল আধুনিক স্মার্টফোনের রেডিয়েশন নিঃসরণ SAR নিরাপদ সীমার অনেক নিচে থাকে। এই সীমা কোনো মোবাইল কোম্পানি অতিক্রম করলে সেই ডিভাইসের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
নিচের টেবিলে তিনটি ডিভাইসের জন্য SAR সীমা উল্লেখ করা হলো।
| ফোনের মডেল | মাথার SAR | শরীরের SAR |
| Samsung Galaxy S21 5G | 1.03 W/kg | 1.59 W/kg |
| iPhone 13 Pro 5G | 1.19 W/kg | 1.19 W/kg |
| Xiaomi Mi 11 5G | 0.95 W/kg | 1.20 W/kg |
আপনার ডিভাইসের SAR কত সেটা এখান থেকে দেখে নিন।
রেডিওফ্রিকোয়েন্সি রেডিয়েশনের মূল প্রভাব হলো শরীরের টিস্যুতে সামান্য তাপ তৈরি হওয়া, যা আমাদের শরীর রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সম্প্রতি বিখ্যাত বিজ্ঞান জার্নাল নেচারে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, 5G নেটওয়ার্কের 3.5 GHz ফ্রিকোয়েন্সি মানব ত্বকে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস বা ডিএনএ মেরামতের প্রক্রিয়ায় কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটায় না।
যদিও কিছু গবেষণায় অ-তাপীয় প্রভাবের সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে, যেমন DNA ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বা স্নায়বিক পরিবর্তন। তবে এসব দাবির পেছনে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ এখনও স্পষ্ট নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই গবেষণাগুলোতে পদ্ধতিগত সীমাবদ্ধতা থাকে—যেমন ছোট নমুনা, পর্যাপ্ত নিয়ন্ত্রণের অভাব, বা বাস্তব জীবনের পরিস্থিতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যতা। যার ফলে ফলাফলগুলোকে নিশ্চিতভাবে গ্রহণ করা যায় না।
মিথ ১: মাথার পাশে ফোন রেখে ঘুমালে ক্যান্সার হবে
এটি সম্ভবত সবচেয়ে প্রচলিত একটি গুজব। তবে, জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউট এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতো শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে যে মোবাইল ফোন ব্যবহারের সাথে ক্যান্সারের সরাসরি কোনো যোগসূত্র বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি।
অনেকেই বলে থাকেন যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার অধীনস্থ গবেষণা সংস্থা IARC ২০১১ সালে মোবাইল ফোনের রেডিওফ্রিকোয়েন্সি (RF-EMF)-কে ‘সম্ভাব্য মানব ক্যান্সারজনক’ (possibly carcinogenic) হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। কিন্তু এখানে একটা ব্যাপার বোঝা জরুরি—’সম্ভাব্য’ মানেই নিশ্চিত নয়। এই শ্রেণিটা (Group 2B) সেই সব কিছুকে বোঝায় যেগুলোর ক্যান্সারের সাথে সম্পর্কের কিছু সীমিত প্রমাণ আছে, তবে স্পষ্ট বা নিশ্চিত নয়।
মজার ব্যাপার হলো, এই একই ক্যাটাগরিতে এমন কিছু খাবারও আছে যেগুলো আমরা প্রতিদিন খাই। যেমন: আচারজাত সবজি, কফি (আগে ছিল, এখন ঝুঁকি অনেকটাই খারিজ করা হয়েছে), অত্যন্ত গরম পানীয় (৬৫°C এর উপরে চা, কফি, স্যুপ)। অর্থাৎ, এগুলোকে যেমন সরাসরি ক্যান্সারের কারণ বলা যায় না, ঠিক তেমনই RF-EMF সম্পর্কেও এখনো নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যায় না।
RF-EMF নিয়ে যে সিদ্ধান্তটি দেওয়া হয়েছিল, তার পেছনে বেশিরভাগ প্রমাণ এসেছিল ইঁদুরের উপর পরীক্ষার ফলাফল থেকে যা মানুষের ক্ষেত্রে সরাসরি তুলনা করা ঠিক নয়। ইঁদুরের উপর গবেষণায় সীমাবদ্ধতাগুলো হলো:
- গবেষণায় ব্যবহৃত রেডিয়েশনের মাত্রা ছিল মানুষের জন্য নির্ধারিত নিরাপদ সীমার চেয়ে বহুগুণ বেশি (১.৫ থেকে ৬ ওয়াট/কেজি)।
- ইঁদুরগুলোকে প্রতিদিন টানা ৯ ঘণ্টা করে দুই বছর ধরে এই উচ্চ মাত্রার রেডিয়েশনের সংস্পর্শে রাখা হয়েছিল, যা মানুষের স্বাভাবিক ফোন ব্যবহারের সাথে তুলনীয় নয়।
| ব্যবহারকারী | RF-EMF শক্তি (SAR) | সময়কাল |
| ইঁদুরের ওপর পরীক্ষায় | 1.5-6 W/kg | প্রতিদিন ৯ ঘণ্টা, ২ বছর |
| সাধারণ মোবাইল ব্যবহারকারী | 0.1-1.6 W/kg | গড় ৩০ মিনিট-২ ঘণ্টা |
এই চরম পরিস্থিতি গবেষণায় ইচ্ছাকৃতভাবেই তৈরি করা হয়েছিল, যাতে সম্ভাব্য যেকোনো ক্ষতিকর প্রভাব চিহ্নিত করা যায়। এই পরীক্ষায় উচ্চমাত্রার রেডিয়েশনের কারণে ইঁদুরের মস্তিষ্কে গ্লিওমা (glioma) এবং হৃদপিণ্ডে ম্যালিগন্যান্ট শোয়ানোমা (malignant schwannoma) নামক টিউমার দেখা গিয়েছিল। তবে বিজ্ঞানীরা স্পষ্ট করেছেন যে, এই গবেষণার ফলাফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।
তবে, ঘুমের সময় ফোন কাছে রাখার কিছু বাস্তব সমস্যা আছে। যেমন, ফোনের স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো আমাদের ঘুমের জন্য প্রয়োজনীয় মেলাটোনিন হরমোনের উৎপাদন কমিয়ে দেয়। এছাড়া, চার্জ দেওয়ার সময় ফোন অতিরিক্ত গরম হয়ে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
মিথ ২: 5G নেটওয়ার্ক এবং পাখির মৃত্যুর গুজব
২০১৯ সালে নেদারল্যান্ডসে কিছু পাখির মৃত্যুকে কেন্দ্র করে এই গুজবটি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। তখন দাবি করা হয় যে, একটি 5G নেটওয়ার্ক পরীক্ষার কারণেই পাখিগুলো মারা গেছে। পরবর্তীতে তদন্তে প্রমাণিত হয়, পাখিগুলোর মৃত্যুর কারণ ছিল প্রাকৃতিক এবং এর সাথে 5G-এর কোনো সম্পর্ক ছিল না। ভারতীয় সিনেমা ‘রোবট 2.0’ এই ভুল ধারণাটিকে আরও বেশি জনপ্রিয় করে তোলে।
বাস্তবতা হলো, বিশেষজ্ঞ এবং বিজ্ঞানীরা এই দাবিকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল অডুবন সোসাইটি (একটি প্রকৃতি সংরক্ষণ সংস্থা) জানিয়েছে, 10 MHz-এর উপরের রেডিও তরঙ্গ সাধারণত পাখিদের কোনো শারীরিক ক্ষতি করে না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও স্পষ্টভাবে বলেছে যে মোবাইল বেস স্টেশনের বিকিরণের সাথে কোনো স্বাস্থ্য সমস্যার স্পষ্ট সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়নি।
আসল প্রশ্ন পাখির মৃত্যু নয়, পথের দিশা নিয়ে
যদিও 5G রেডিয়েশনের কারণে পাখি মারা যাওয়ার বিষয়টি একটি গুজব, বিজ্ঞানীরা একটি সূক্ষ্ম সম্ভাবনা নিয়ে গবেষণা করছেন। সেটি হলো পাখিদের দিক নির্ণয় করার ক্ষমতা বা নেভিগেশন।
পাখিদের চোখে ক্রিপ্টোক্রোম (Cryptochrome) নামক এক বিশেষ প্রোটিন থাকে। এই প্রোটিনটি পাখিদের পৃথিবীর চৌম্বক ক্ষেত্র অনুভব করতে সাহায্য করে। এই প্রক্রিয়াটি কোয়ান্টাম মেকানিক্সের ওপর নির্ভরশীল। চৌম্বক ক্ষেত্রের প্রভাবে এই প্রোটিনের ইলেক্ট্রনগুলো একটি বিশেষ ‘কোয়ান্টাম স্পিন’ অবস্থায় আসে, যা পাখিদের দিক নির্ণয়ে সহায়তা করে।
কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, নির্দিষ্ট ফ্রিকোয়েন্সির রেডিও তরঙ্গ (RF-EMF) এই ক্রিপ্টোক্রোম প্রোটিনের সূক্ষ্ম কোয়ান্টাম স্পিনের ওপর ব্যাঘাত ঘটাতে পারে, যা পাখিদের দিক নির্ণয়ের ক্ষমতাকে কিছুটা প্রভাবিত করতে পারে। তবে, বর্তমানে মোবাইল নেটওয়ার্কে যে ফ্রিকোয়েন্সি ব্যবহার করা হয়, তার প্রভাব মূলত ত্বকের উপরিভাগে সীমাবদ্ধ থাকে। তাই পাখিদের দিক নির্ণয়ের কম্পাসে এর সরাসরি বড় কোনো প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা খুব কম। তবুও বিজ্ঞানীরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বোঝার জন্য আরও গবেষণা দরকার।
প্রকৃত সমস্যা কোথায়?
রেডিয়েশনের কারণে নয়, বরং অবকাঠামোগত কারণে পাখির ক্ষতি হতে পারে। যেমন, সেল টাওয়ারের আলোতে বিভ্রান্ত হয়ে পাখি ধাক্কা খেয়ে মারা যেতে পারে। আবার বড় টাওয়ার বসানোর জন্য বন বা ঝোপঝাড় কেটে ফেলা হলে তাদের আবাসস্থল নষ্ট হয়। এগুলো বাস্তব সমস্যা, তবে এর সঙ্গে রেডিয়েশনের সম্পর্ক নেই।
মোবাইল নেটওয়ার্ক টাওয়ারের আশে পাশে নারিকেল গাছের ডাবে পানি থাকেনা কেন?
মোবাইল টাওয়ারের আশেপাশে নারিকেল ডাবে পানি না থাকার ধারণাটি মূলত স্থানীয় মানুষ ও কৃষকদের পর্যবেক্ষণ থেকে এসেছে। তবে এ বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। যদিও কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে যে টাওয়ারের রেডিয়েশন উদ্ভিদের উপর প্রভাব ফেলতে পারে, যা পুরোপুরি অগ্রাহ্য করার মতো নয়।
উদাহরণস্বরূপ, জার্মানির একটি গবেষণায় দেখা গেছে টাওয়ারের কাছাকাছি গাছপালায় দৃশ্যমান ক্ষতির চিহ্ন দেখা যায়। আরও কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, রেডিয়েশন উদ্ভিদের ক্লোরোফিল উৎপাদন, এনজাইম কার্যক্রম, বীজ অঙ্কুরোদগম এবং পাতার বৃদ্ধিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন এটি কোষের ক্যালসিয়াম চ্যানেলে প্রভাব ফেলে অক্সিডেটিভ স্ট্রেস তৈরি করে, যা সালোকসংশ্লেষণ ও পুষ্টি পরিবহন প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করতে পারে।
তবুও সরাসরি নারিকেল বা অন্যান্য গাছের উপর এর প্রভাব নিয়ে গবেষণা খুব সীমিত এবং বিভিন্ন গবেষণার ফলও একে অপরের সাথে মিলছে না। তাছাড়া গবেষণায় ব্যবহৃত রেডিয়েশনের মাত্রা তুলনামূলক বেশি ছিল। আসলে মাটির মান, পানির অভাব, রোগবালাই, জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা টাওয়ার নির্মাণের কারণে পরিবেশগত ক্ষতি, এসব বিষয় গাছের উপর রেডিয়েশনের চেয়ে অনেক বেশি প্রভাব ফেলে। ফলে শুধু রেডিয়েশনকেই দায়ী করার মতো যথেষ্ট প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
শেষ পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে, 5G বা অন্যান্য প্রজন্মের রেডিয়েশন নিয়ে আমাদের বেশিরভাগ ভয়ই ভিত্তিহীন গুজব বা অতিরঞ্জিত তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এখন পর্যন্ত সব গবেষণা বলছে এই প্রযুক্তির রেডিয়েশন নিরাপদ সীমার মধ্যেই আছে। লক্ষ্য করলে দেখবেন এ সব গুজব তখনি বেশি ছড়ায় যখন প্রযুক্তি এক ধাপ থেকে আরেক ধাপে (যেমন: 4G থেকে 5G) উন্নতি হয়।
যখন আপনার কাছে বিজ্ঞানের সঠিক তথ্য থাকবে, তখন ভয় এবং গুজবের মধ্যে পার্থক্য করা অনেক সহজ হয়ে যায়। সমস্যা হচ্ছে, অধিকাংশ মানুষের মধ্যে এসকল কনসেপ্ট ক্লিয়ার থাকে না। প্রযুক্তির অগ্রগতির এই যুগে যেকোনো তথ্য বিশ্বাস করার আগে তা যাচাই করে নেওয়াটা কি আমাদের সকলের দায়িত্ব নয়? আপনার কী মনে হয়?
লেখাঃ রেদোয়ানুল হক রানা
সূত্রঃ
World Health Organization (WHO)
American Cancer Society
National Cancer Institute
International Commission on Non-Ionizing Radiation Protection (ICNIRP)
IEEE COMAR
National Audubon Society
Environmental Health Trust
National Toxicology Program
