মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি যুগেই মানুষ তার ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করেছে। কিন্তু শিল্পবিপ্লবের পর থেকে যে গতিতে আমাদের সমাজ, প্রযুক্তি ও অর্থনীতি এগোতে শুরু করল সেই গতিই এক সময় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পৃথিবীর সম্পদ সীমিত এ সত্যটা আমরা জানি; কিন্তু সেই সীমার কোথায় গিয়ে ধাক্কা খাব, তা অনেকেই বুঝতে পারছিল না। ঠিক এই মুহূর্তে, ১৯৭২ সালে, MIT’র একদল বিজ্ঞানী Limits to Growth নামে একটি গবেষণা প্রকাশ করেন। এতে দেখানো হয়েছিল যে মানবসভ্যতা যদি একই মাত্রার অর্থনৈতিক ও শিল্প বৃদ্ধি অব্যাহত রাখে, তবে চলতি শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়েই বিশ্বব্যবস্থা বড় ধরনের সংকটে পড়তে পারে। সেই গবেষণার অর্ধশতাব্দী পর আজও আমরা লক্ষ্য করছি তাদের ভবিষ্যদ্বাণী বহু দিক থেকেই বাস্তবের সঙ্গে মিল পাচ্ছে।
এই মডেলটি ছিল World3 নামে পরিচিত সিস্টেম ডায়নামিক্স মডেল। এতে জনসংখ্যা, শিল্প উৎপাদন, সম্পদ, দূষণ এবং খাদ্য উৎপাদনের মতো বড় বড় বিষয়কে একসঙ্গে নিয়ে ভবিষ্যৎ চিত্র আঁকা হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন সম্ভাব্য পথ দেখিয়েছিলেন, যেমন Business as Usual, যেখানে মানবসভ্যতা কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ছাড়াই বর্তমান ধারা বজায় রাখে অথবা Stabilized World, যেখানে সমাজ সচেতনভাবে বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করে এবং টেকসই পথে চলে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, Business as Usual স্যন্যারিও-তেই দেখা যায় পৃথিবীর সম্পদ ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে, দূষণ বাড়ছে, কৃষি ও শিল্প উৎপাদন ধীরে ধীরে কমছে। অবশেষে অর্থনীতি, খাদ্যব্যবস্থা ও সামাজিক কাঠামোর ওপর কঠিন চাপ তৈরি হচ্ছে।
দীর্ঘদিন ধরে কেউ কেউ এই গবেষণাকে অতিরঞ্জিত বা অবাস্তব বলে মনে করেছিল। কিন্তু ২০২০ সালে গবেষক গায়া হ্যারিংটন সীমিত তথ্য ও আধুনিক ডেটার সঙ্গে ১৯৭২ সালের মডেলটির তুলনা করে দেখেন, বাস্তবের প্রবণতা আশ্চর্যভাবে Business as Usual ও Comprehensive Technology স্যন্যারিওর সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, যদি বর্তমান গতিতেই মানবসভ্যতা বৃদ্ধি-মুখী অর্থনীতি চালিয়ে যায়, তবে ২০৪০ সালের দিকে শিল্প উৎপাদন, সম্পদ এবং মানুষের জীবনমান উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে শুরু করতে পারে। তবে তিনি আবার এটিও বলেন, ‘এটি কোনো নিশ্চয়তা নয়; এটি একটি সতর্ক সংকেত। কারণ ভবিষ্যৎ সবসময়ই পরিবর্তনযোগ্য, যদি সমাজ সচেতনভাবে দিক পরিবর্তন করতে পারে।’
সমালোচকেরা বলেন, ১৯৭২ সালের মডেল কিছু সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাজ করেছিল। পৃথিবীর প্রযুক্তিগত অগ্রগতি, নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশ বা দক্ষতা বৃদ্ধির মতো বিষয়গুলো সে সময় ততটা স্পষ্ট ছিল না। তবুও গবেষণাটি একটি মৌলিক সত্য তুলে ধরে যে পৃথিবীর সম্পদ অসীম নয় এবং অবিবেচিত বৃদ্ধি শেষ পর্যন্ত চাপ তৈরি করবে। আজ আমরা যখন দেখি জলবায়ু পরিবর্তন, খরা, পানি সংকট, পরিবেশ দূষণ এবং জ্বালানি-সংকট বিশ্বজুড়ে বাড়ছে, তখন বোঝা যায় মডেলের মূল উদ্বেগ কতটা যথার্থ ছিল।
এখন প্রশ্ন হলো, তাহলে কি মানবসভ্যতা সত্যিই পতনের দিকে এগোচ্ছে? উত্তর অবশ্যই সরল নয়। কারণ পতন শব্দটি কোনো আকস্মিক ধ্বংস বোঝায় না; বরং ধীরে ধীরে উৎপাদন হ্রাস, মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, সম্পদের ঘাটতি, খাদ্য ও পানির চাপ এবং সামাজিক কাঠামোর চাপ বোঝায়। অনেক দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য, রাজনৈতিক অস্থিরতা, জলবায়ু বিপর্যয় এবং খাদ্যনিরাপত্তাজনিত সমস্যা ইতিমধ্যেই সেই দিকের ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে আশার কথা হলো মানুষই হলো অভিযোজ্য প্রাণী। নীতি-নির্ধারণ, প্রযুক্তি, টেকসই অর্থনীতি এবং পরিবেশ সচেতনতাই এই পথ বদলাতে পারে।
১৯৭২ সালে এমআইটির গবেষণা ভবিষ্যৎ নিয়ে এক সতর্কবার্তা দিয়েছিল। আধুনিক তথ্যে দেখা যাচ্ছে, আমরা এখনো সেই ভবিষ্যতের দিকে এগোচ্ছি তবে পথ পরিবর্তনের ক্ষমতা আমাদের হাতেই। পৃথিবীর সম্পদ সীমিত, কিন্তু মানববুদ্ধি সীমাহীন। সমাজ যদি সচেতন সিদ্ধান্ত নিয়ে টেকসই উন্নয়নের পথে হাঁটে, তবে সম্ভাব্য সংকট এড়ানো সম্ভব। তাই সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো ভবিষ্যৎ নির্ধারিত নয়; আমরা চাইলে সেটিকে আরও স্থিতিশীল, মানবিক এবং দীর্ঘস্থায়ী করে তুলতে পারি।
© 2025 KBKh Science. All rights reserved.
Designed & Developed by Reduanul Haque Rana

