আমরা সবাই কমবেশি “ইউরেনিয়াম” নামটি শুনেছি। সাধারণত এটি শুনলেই মাথায় আসে পারমাণবিক বোমা, যুদ্ধ কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্রের ছবি। কিন্তু জানলে অবাক হবে, আমরা প্রতিদিনই অল্প অল্প ইউরেনিয়াম খাচ্ছি নিজের অজান্তেই! আজকে আমরা জানব ইউরেনিয়াম আসলে কী, এটা কীভাবে আমাদের খাবারে আসে, আমাদের শরীরে কী করে এবং ভুল করে যদি অনেক বেশি ইউরেনিয়াম খেয়ে ফেলি, তাহলে কী হতে পারে।

Image Credit : Getty Images

ইউরেনিয়াম কী?

ইউরেনিয়াম এক ধরনের ধাতু। এটি পৃথিবীর মাটিতে, পাথরে, পানিতে এমনকি কিছু খাবারেও প্রাকৃতিকভাবে থাকে। এর পারমাণবিক সংখ্যা ৯২। মানে এটি মৌলিক পর্যায় সারণির (Periodic Table) ৯২ নম্বর উপাদান। ইউরেনিয়াম একটু তেজস্ক্রিয়, অর্থাৎ এটি থেকে ক্ষুদ্র পরিমাণে বিকিরণ বা রেডিয়েশন বের হয়।

ইউরেনিয়াম সাধারণত তিন ধরনের আইসোটোপ (ভিন্ন ভিন্ন পরমাণু কাঠামো) হিসেবে থাকে: U-234, U-235, আর U-238। এর মধ্যে U-238 সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। যখন বিজ্ঞানীরা ইউরেনিয়াম সংগ্রহ করেন, তখন সেটিকে বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করেন — যেমন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে, পারমাণবিক অস্ত্রে, যুদ্ধের গোলাবারুদে ইত্যাদি।

কীভাবে আমরা ইউরেনিয়াম খাই?

আপনি হয়তো ভাবছেন, আমরা কবে ইউরেনিয়াম খেয়ে ফেললাম? আসলে আমাদের চারপাশের মাটি, পানি এবং পরিবেশে সামান্য পরিমাণ ইউরেনিয়াম সবসময়ই থাকে। সেই মাটি বা পানি থেকে উদ্ভিদ একটু একটু করে ইউরেনিয়াম শোষণ করে। ফলে আমাদের খাবারেও চলে আসে সামান্য ইউরেনিয়াম। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আলু, শালগম (Turnip), গাজর, এবং অন্যান্য মাটির নিচে জন্মানো শাকসবজিতে তুলনামূলকভাবে বেশি ইউরেনিয়াম থাকে।

আমেরিকার পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (EPA) জানিয়েছে, একজন মানুষ গড়ে প্রতিদিন ০.০৭ থেকে ১.১ মাইক্রোগ্রাম ইউরেনিয়াম খায়। এই পরিমাণটা এতই কম যে শরীরের কোনো ক্ষতি হয় না।

শরীর ইউরেনিয়ামকে কীভাবে সামলায়?

ভাগ্য ভালো, আমাদের শরীর ইউরেনিয়াম সহজে শোষণ করতে পারে না। বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমরা যেটুকু ইউরেনিয়াম খাই, তার ৯৫ থেকে ৯৯ শতাংশ মলের (stool) সাথে বেরিয়ে যায়। বাকিটা প্রস্রাবের মাধ্যমে বেরিয়ে যায়।

শুধুমাত্র সামান্য কিছু ইউরেনিয়াম হাড়ে জমে থাকতে পারে। তবে সেটিও এত কম যে স্বাভাবিক অবস্থায় কোনো সমস্যা হয় না। শরীর ধীরে ধীরে সেগুলোকেও কমিয়ে ফেলে। তাই প্রতিদিনের খাবারে থাকা অল্প ইউরেনিয়াম নিয়ে চিন্তার কিছু নেই।

কিন্তু বেশি ইউরেনিয়াম খেলে কী হবে?

এতক্ষণ যা বললাম, সবই স্বাভাবিক অল্প পরিমাণ ইউরেনিয়াম নিয়ে। কিন্তু যদি কেউ ভুল করে বা ইচ্ছে করে অনেক বেশি ইউরেনিয়াম খেয়ে ফেলে তাহলে কী হবে?

আমরা অনেকেই ভাবতে পারি, বেশি ইউরেনিয়াম খেলে বুঝি শুধুমাত্র তেজস্ক্রিয়তার (Radiation) জন্যই ক্ষতি হবে। আসলে প্রথম বিপদটা আসে ইউরেনিয়ামের রাসায়নিক বিষক্রিয়া থেকে। ইউরেনিয়াম শরীরে ঢুকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে কিডনিতে। ২৫ মিলিগ্রাম ইউরেনিয়াম শরীরে গেলে কিডনির সমস্যা শুরু হতে পারে। ৫০ মিলিগ্রাম বা তার বেশি গেলে কিডনি পুরোপুরি বিকল হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। তেজস্ক্রিয়তা থেকে ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনাও আছে, তবে সেটি অনেক দিনের দীর্ঘমেয়াদী ঝুঁকি। স্বল্প সময়ে ইউরেনিয়ামের রাসায়নিক বিষক্রিয়াই বেশি ভয়ংকর।

গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?

গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব ইঁদুরকে দীর্ঘ সময় ইউরেনিয়াম খাওয়ানো হয়েছে, তাদের মস্তিষ্কে রাসায়নিক পরিবর্তন দেখা গেছে। যদিও মানুষের ওপর সরাসরি এমন পরীক্ষা করা হয়নি, তবুও বিজ্ঞানীরা ধারণা করেন, একই ধরণের প্রভাব মানুষেরও হতে পারে। তবে আশার কথা হচ্ছে — এখন পর্যন্ত পৃথিবীতে কেউ ইউরেনিয়াম খেয়ে সরাসরি মারা গেছে — এমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

তাহলে কি চিন্তা করার কিছু নেই?

প্রতিদিনের খাবারে থাকা অতি সামান্য ইউরেনিয়াম নিয়ে দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। মাটি থেকে যেটুকু খাবারে আসে, সেটি শরীর সহজেই ঝেড়ে ফেলে দেয়। তবে ইচ্ছাকৃতভাবে কখনোই ইউরেনিয়াম খাওয়া উচিত নয়।বিশেষ করে পারমাণবিক শিল্পের যারা কাজ করেন, তাদের জন্য ইউরেনিয়াম ধুলাবালি শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে গেলে সেটা অনেক বেশি বিপজ্জনক। কারণ শ্বাসের মাধ্যমে শরীরে ঢোকা ইউরেনিয়াম ফুসফুস থেকে রক্তে সহজে মিশে যায় এবং শরীরে দীর্ঘদিন থেকে যেতে পারে।

ইউরেনিয়াম শুনলেই অনেকে আতঙ্কিত হন। তবে জানলে ভালো লাগে যে আমাদের দৈনন্দিন খাবারে থাকা সামান্য ইউরেনিয়াম শরীরের জন্য তেমন ক্ষতিকর নয়। কারণ শরীর নিজেই এটিকে সামাল দিতে জানে। তবে বেশি মাত্রায় ইউরেনিয়াম খাওয়া বা গ্রহণ করা অবশ্যই বিপজ্জনক। তাই পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউরেনিয়াম বা যুদ্ধাস্ত্রের ইউরেনিয়াম নিয়ে ভাবতে হবে বিশেষজ্ঞদের। আর আমাদের চিন্তা করার দরকার শুধু সেই চকলেট ফ্রস্টিং দেওয়া কেক নিয়েই, ইউরেনিয়াম ইয়েলোকেক নিয়ে নয়!

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।

একটি মন্তব্য

Leave A Reply