ধরে নিই এক মুহূর্তের জন্য আপনি আপনার চারপাশে যা দেখছেন, শুনছেন, অনুভব করছেন, সবকিছুই ভুল হতে পারে। এমনকি আপনি নিজেই আছেন কি না সেটাও যদি সন্দেহের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়? এই জটিল প্রশ্নের এক সরল কিন্তু গভীর উত্তর দিয়েছিলেন ফরাসি দার্শনিক রেনে দেকার্তে। তিনি বলেছিলেন, Cogito, ergo sum যার অর্থ আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি।এই কথাটি শুনতে যতটা ছোট মনে হয় এর ভেতরে লুকিয়ে আছে ততটাই বিশাল এক দার্শনিক বিপ্লবের বীজ। এই বাক্য শুধু রেনে দেকার্তেকে বিখ্যাত করেনি, তাকে আধুনিক দর্শনের জনক হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করেছে।

রেনে দেকার্তে ছিলেন ১৭শ শতকের একজন দার্শনিক, গণিতবিদ এবং বিজ্ঞানী। তিনি এমন এক সময়ের মানুষ যখন ইউরোপে অ্যারিস্টটলীয় দর্শন ও ধর্মীয় শিক্ষা ছিল প্রধান জ্ঞানচর্চার ভিত্তি। কিন্তু দেকার্তে এসব প্রচলিত চিন্তাধারাকে প্রশ্ন করতে শুরু করেন। তিনি বলেন, আমাদের যেসব বিশ্বাস আছে সেগুলো যদি সন্দেহজনক হয়, তাহলে কীভাবে নিশ্চিত হওয়া যাবে কোনটা সত্য? তিনি সিদ্ধান্ত নেন—সব কিছু নিয়ে সন্দেহ করা দরকার, এমনকি আমাদের ইন্দ্রিয় দিয়ে পাওয়া জ্ঞান নিয়েও।

তিনি এই পদ্ধতির নাম দেন কার্টেসীয় সন্দেহ বা মেথডিক্যাল ডাউট। এর মানে, আমরা যা-ই বিশ্বাস করি না কেন আগে সেটা নিয়ে গভীরভাবে সন্দেহ করতে হবে। এটা ছিল একধরনের পরীক্ষা—কোন কোন বিশ্বাস একেবারে নিশ্চিতভাবে সত্য সেটা খুঁজে বের করার চেষ্টা।

এই প্রশ্নে চিন্তা করতে গিয়ে দেকার্তে এমন এক জায়গায় পৌঁছান যেখানে সব কিছুতেই সন্দেহ করা সম্ভব—জগতের অস্তিত্ব, অন্য মানুষের অস্তিত্ব এমনকি নিজের শরীরের অস্তিত্বেও। কিন্তু একটি জিনিসে তিনি আর সন্দেহ করতে পারলেন না। সেটা হলো—তাঁর নিজের চিন্তা করার ক্ষমতা।

রেনে দেকার্তের প্রতিকৃতি। চিত্রাঙ্কন করেছেন শিল্পী ফ্রান্স হালস, আনুমানিক ১৬৪৯ থেকে ১৭০০ সালের মধ্যে। সূত্র: উইকিমিডিয়া কমন্স।”

তিনি ভাবলেন—“আমি যদি কিছু নিয়ে সন্দেহ করি, তাহলে আমি অবশ্যই চিন্তা করছি। আর যদি আমি চিন্তা করি, তাহলে আমি তো আছি! কারণ যে চিন্তা করছে সে নিশ্চয়ই অস্তিত্ব রাখে। একমাত্র আমি নিজের অস্তিত্ব নিয়ে নিশ্চিত হতে পারি, কারণ আমি নিজেই তো চিন্তা করছি!”

এই জায়গা থেকেই দেকার্তে বলেন, আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি। অর্থাৎ, আমাদের অস্তিত্বের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হলো—আমাদের নিজের চিন্তা করা।তবে এখানে “আমি” বলতে কে বা কী বোঝানো হচ্ছে—সে প্রশ্ন তখন থেকেই অনেক দার্শনিকের আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেকার্তে নিজেই বলেছেন, “আমি যে আছি, সেটা তো বুঝলাম, কিন্তু আমি আসলে কী? সেটা এখনো পরিষ্কার নয়।” অনেকে বলেছিলেন, চিন্তা হচ্ছে ঠিক আছে, কিন্তু তা থেকে এই ধারণা আসে না যে একটি ব্যক্তি বা সত্তা চিন্তা করছে। কেউ কেউ বলেছেন, “চিন্তা ঘটছে” বলাই যথেষ্ট—“আমি চিন্তা করছি” বলা অতিরঞ্জিত।

তবু দেকার্তে এই ‘আমি’কে একটি চিন্তাশীল সত্তা হিসেবে বিবেচনা করেন। এই সত্তা আমাদের আত্মা বা মন। এখান থেকে তিনি বলেন, আমাদের শরীর ও মন আলাদা জিনিস—এটাই ডুয়ালিজম বা দ্বৈততত্ত্ব। তাঁর মতে শরীর হলো বস্তু যেটা স্থান দখল করে আর মন বা আত্মা হলো অবস্তু, যেটা চিন্তা করে কিন্তু কোনো জায়গা দখল করে না।

দেকার্তে এরপর বলেন, যদিও আমি নিজের চিন্তা করার ক্ষমতা সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পারি কিন্তু বাইরের জগতের অস্তিত্ব নিয়ে নিশ্চিত হতে হলে অন্য কিছুর উপর নির্ভর করতে হবে। তিনি বলেন, যদি কোনো সদাশয় ঈশ্বর থেকে থাকেন যিনি আমাদের সাথে প্রতারণা করেন না তবে আমাদের অনুভূতিগুলোর একটা ভিত্তি থাকতে পারে। এইভাবে ঈশ্বরের অস্তিত্ব এবং ঈশ্বরের সততার মাধ্যমে তিনি বাইরের জগতের সত্যতা নিশ্চিত করতে চান।

এই চিন্তা পদ্ধতি—সব কিছু নিয়ে প্রশ্ন করে নিজের নিশ্চিন্ত সত্য খোঁজা—পরবর্তীতে ইউরোপীয় চিন্তাধারায় গভীর প্রভাব ফেলে। দেকার্তে দেখিয়েছিলেন, সত্যকে জানতে হলে কেবল ধর্ম বা প্রচলিত মতবাদে বিশ্বাস করলেই চলে না। আমাদের নিজেদের বিচারবুদ্ধি, যুক্তি এবং সন্দেহ করার ক্ষমতা ব্যবহার করেই সত্য খুঁজতে হবে।

এভাবেই দেকার্তে শুরু করলেন এক বিপ্লবী দর্শনচর্চা—যেখানে মানুষের নিজস্ব বুদ্ধিকে সর্বোচ্চ মূল্য দেওয়া হয়। পরে এই চিন্তাধারাই ইউরোপে এনলাইটেনমেন্ট বা জ্ঞানালোকে-র যুগের সূচনা করে। আজকে আমরা যখন নিজেরা কিছু নিয়ে ভাবি, যুক্তি খাটি, সন্দেহ করি—তখন আমরা অজান্তেই দেকার্তের দেখানো পথে হাঁটি। “আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি”—এই বাক্য আমাদের শেখায়, নিজের চিন্তা করার ক্ষমতা দিয়ে আমরা নিজেদের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে পারি, এবং এটাই আমাদের জ্ঞানের সবচেয়ে শক্ত ভিত।

রেনে দেকার্তের “আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি” এই বিখ্যাত বাক্যটি কেবল একটি দার্শনিক উক্তিই নয়, বরং এটি আধুনিক দর্শনের ভিত্তি রচনা করেছে। এটি আমাদের শেখায় যে আমাদের অস্তিত্বের সবচেয়ে প্রাথমিক প্রমাণ লুকিয়ে আছে আমাদের চেতনা বা চিন্তার ক্ষমতার মধ্যেই। দেকার্তে দেখিয়েছেন, সবকিছু নিয়ে সন্দেহ করা গেলেও নিজের চিন্তা করাকে অস্বীকার করা যায় না। কারণ যে চিন্তা করছে তার অস্তিত্ব থাকা বাধ্যতামূলক। এই ভাবনা আমাদের ব্যক্তিগত সচেতনতা, আত্মোপলব্ধি এবং যুক্তিবোধের গুরুত্বকে সামনে নিয়ে আসে।

এই দর্শন শুধু দর্শনশাস্ত্রকেই নয়, বিজ্ঞানের যুক্তিনির্ভর পদ্ধতি, মনোবিজ্ঞান এবং জ্ঞানতত্ত্বকেও গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। দেকার্তের মতো চিন্তাবিদদের ভাবনার কারণে মানুষ সত্য ও জ্ঞানের উৎস হিসেবে নিজের বোধশক্তি ও সন্দেহের জায়গাকে ব্যবহার করতে শিখেছে। আজও, যখন কেউ সত্য খুঁজে পেতে চায়, তখন সেই অনুসন্ধান শুরু হয় নিজের চিন্তা থেকেই। “আমি চিন্তা করি, তাই আমি আছি”—এই বাক্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যতই দুনিয়া অনিশ্চিত হোক না কেন, নিজেকে জানার মধ্যেই রয়েছে জ্ঞানের প্রথম ধাপ।

লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র :

Cottingham, J., Stoothoff, R., & Murdoch, D. (1984). দ্য ফিলোসফিক্যাল রাইটিংস অফ দেকার্তে (প্রথম সংস্করণ)। কেমব্রিজ: কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেস।
Stroud, B. (2008). “Our Debt to Descartes,”সম্পাদনা: জ্যানেট ব্রটন ও জন ক্যারিয়েরো। অক্সফোর্ড: ব্ল্যাকওয়েল।

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply