মানব সভ্যতার অগ্রযাত্রায় বিজ্ঞানের অবদান অনস্বীকার্য। পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা, সাহিত্য কিংবা শান্তি এই প্রতিটি ক্ষেত্রে মানবকল্যাণে অসামান্য অবদান রাখা ব্যক্তিদের স্বীকৃতি হিসেবে আজ সারা পৃথিবী যে পুরস্কারটির দিকে তাকিয়ে থাকে, সেটি হলো নোবেল পুরস্কার। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, গণিতের মতো মৌলিক ও প্রাচীন এক বিদ্যা যার উপর ভিত্তি করেই আধুনিক বিজ্ঞান দাঁড়িয়ে আছে, সেই গণিতের জন্য কোনো নোবেল পুরস্কার নেই। এই প্রশ্ন বহু বছর ধরে মানুষকে ভাবিয়েছে কেন গণিত বাদ পড়ল? এই অনুপস্থিতির পেছনে আসলে কী কারণ লুকিয়ে আছে?

আলফ্রেড নোবেল, একজন সুইডিশ রসায়নবিদ, প্রকৌশলী ও আবিষ্কারক, ১৮৯৫ সালের ২৭ নভেম্বর তারিখে নিজের উইলে উল্লেখ করেন যে তার সম্পত্তির একটি বিশাল অংশ থেকে প্রতিবছর পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসা, সাহিত্য এবং শান্তির জন্য পুরস্কার দেওয়া হবে। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে সেখানে গণিতের নামটি একবারও আসেনি। আজও পর্যন্ত সেই উইলের কোথাও গণিত বাদ দেওয়ার কোনো ব্যাখ্যা নেই। এটি ইতিহাসের একটি এমন শূন্যতা যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নানা ব্যাখ্যা, অনুমান এবং কল্পকাহিনির জন্ম দিয়েছে।
সবচেয়ে জনপ্রিয় গল্পটি হলো নোবেল ও এক গণিতবিদের ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে। অনেকে বলেন, নোবেল তার দেশের বিখ্যাত গণিতবিদ গ্যোষ্টা মিটাগ-লেফলারকে অপছন্দ করতেন, এমনকি কেউ কেউ দাবি করেন নোবেলের প্রেমিকা নাকি ওই গণিতবিদের প্রতি অনুরক্ত ছিলেন। ফলে নোবেল ব্যক্তিগত প্রতিশোধ হিসেবে গণিতকে তালিকা থেকে বাদ দেন। কিন্তু ইতিহাসবিদরা এই গল্পকে পুরোপুরি ভিত্তিহীন বলে প্রমাণ করেছেন। কোনো চিঠি, কোনো সরকারি দলিল, এমনকি কোনো সমসাময়িক সাক্ষ্যেই এই কথার সমর্থন মেলে না। প্রকৃতপক্ষে, আলফ্রেড নোবেলের জীবনে এমন কোনো সম্পর্কের উল্লেখই পাওয়া যায় না। ফলে এই ‘রোমান্টিক প্রতিশোধের গল্প’ আজ কেবল একটি মিথ হিসেবেই টিকে আছে।
তাহলে বাস্তব কারণ কী হতে পারে? অনেক গবেষক মনে করেন, নোবেলের মূল উদ্দেশ্য ছিল এমন কাজকে স্বীকৃতি দেওয়া যা সরাসরি মানবকল্যাণে সর্বাধিক উপকার বয়ে আনে। তার নিজের ভাষায়,
“those who have conferred the greatest benefit on mankind।”
উনিশ শতকের শেষভাগে যখন নোবেল তার উইল লেখেন, তখন গণিতকে অনেকে খুব বিমূর্ত একটি বিদ্যা হিসেবে দেখতেন যা বাস্তব জীবনের সমস্যার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত নয়। পদার্থবিজ্ঞান বা রসায়নের মতো তাৎক্ষণিক উপকারের উদাহরণ সেখানে দেখা যেত না। তাই সম্ভবত নোবেল মনে করেছিলেন, গণিত তার বাস্তব উপকারিতার মানদণ্ডে পড়ে না। যদিও আজকের দিনে আমরা জানি, আধুনিক প্রযুক্তি, কম্পিউটার, পরমাণু বিজ্ঞান কিংবা মহাকাশ অনুসন্ধান সবকিছুর মূলে রয়েছে গণিত। কিন্তু উনিশ শতকের সেই দৃষ্টিভঙ্গি ছিল ভিন্ন এবং সেই প্রেক্ষাপটেই হয়তো গণিতকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
আরেকটি যুক্তি হলো প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা। নোবেলের উইল ছিল একটি বৈধ দলিল এবং এর ভাষা পরিবর্তন করা বা নতুন কোনো বিভাগ যুক্ত করা আইনত প্রায় অসম্ভব। নোবেল ফাউন্ডেশন যখন ১৯০১ সালে প্রথম পুরস্কার দিতে শুরু করে, তখন তারা মূল উইলের বাইরে কোনো নতুন ক্ষেত্র যোগ করার অধিকার রাখত না। এমনকি পরবর্তীতে কম্পিউটার বিজ্ঞান, অর্থনীতি বা পরিবেশবিজ্ঞান এইসব আধুনিক ক্ষেত্রও যুক্ত করা যায়নি। কেবল ১৯৬৯ সালে “অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার” সংযোজিত হয়, সেটিও নোবেল ফাউন্ডেশনের অর্থায়নে নয়, বরং সুইডেনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উদ্যোগে। তাই বোঝা যায়, গণিত বাদ পড়ার পর তা পুনরায় যুক্ত করা কাঠামোগতভাবে সম্ভবই ছিল না।
তবে গণিত সমাজ বসে থাকেনি। সময়ের সাথে গণিতবিদেরা নিজেদের স্বীকৃতি তৈরির পথ খুঁজে নিয়েছেন। ১৯৩৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় Fields Medal, যা প্রতি চার বছর পর পর ৪০ বছরের নিচে বয়সের তরুণ গণিতবিদদের অসাধারণ অবদানের জন্য দেওয়া হয়। এটি আজ বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ গণিত পুরস্কার, যদিও এর বয়সসীমা ও চার বছর পর পর প্রদানের নিয়মের কারণে এটি “গণিতের নোবেল” হিসেবে পুরোপুরি সমতুল নয়। তাই ২০০৩ সালে নরওয়ে সরকার প্রতিষ্ঠা করে Abel Prize, যা প্রতি বছর প্রদান করা হয় আজীবন অবদানের জন্য। এর আর্থিক মূল্য ও মর্যাদা নোবেল পুরস্কারের সমান এবং অনেকেই এটিকেই আজ “গণিতের নোবেল পুরস্কার” বলে থাকেন।

এই দুটি পুরস্কারের মাধ্যমে গণিতবিদেরা আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির অভাব পূরণ করতে পেরেছেন। মেরিয়াম মির্জাখানি, ২০১৪ সালে Fields Medal জয়ী প্রথম নারী, কিংবা ২০১৮ সালের Abel বিজয়ী রবার্ট ল্যাংল্যান্ডসের মতো গণিতবিদরা আজ গণিতের জগতে নোবেলবিজয়ীদের মতোই সম্মানিত। Abel Prize প্রবর্তনের মাধ্যমে নরওয়ে আসলে ইতিহাসের সেই শূন্যতাকে পূরণ করেছে, যা নোবেল উইলে রয়ে গিয়েছিল।
তবে নোবেল পুরস্কারের কাঠামোগত কিছু সীমাবদ্ধতা গণিতের অন্তর্ভুক্তিকে আরও জটিল করে তোলে। যেমন, নোবেল পুরস্কার সর্বোচ্চ তিনজন ব্যক্তিকে দেওয়া যায়, অথচ অনেক বড় গণিতীয় আবিষ্কার যৌথ বা ধাপে ধাপে বিকশিত হয়। আবার নোবেল পুরস্কার সাধারণত এমন গবেষণাকে সম্মানিত করে যার প্রভাব দ্রুত দৃশ্যমান, কিন্তু গণিতের ক্ষেত্রে অনেক ফলাফল তাত্ত্বিক পর্যায়ে থেকে শত বছর পরেও প্রয়োগ পায়। এই দীর্ঘ সময়কাল ও বিমূর্ততার কারণে গণিত নোবেল কাঠামোর সঙ্গে সঠিকভাবে খাপ খায় না।
গণিতের নোবেল না থাকা বিষয়টি সংস্কৃতি ও জনমতেও প্রভাব ফেলেছে। পদার্থবিদ বা রসায়নবিদদের নাম সাধারণ মানুষের মুখে ঘুরে বেড়ায়, কারণ নোবেল পুরস্কার তাদের পরিচিতি এনে দেয়। কিন্তু গণিতবিদদের অবদান, যা প্রায়ই বিজ্ঞানের মেরুদণ্ড, তা থেকে সাধারণ মানুষ অনেকটাই অজ্ঞাত থাকে। যদিও Fields বা Abel-এর মতো পুরস্কার সেই অন্ধকার কিছুটা দূর করেছে, তবুও নোবেল নামের আভা এখনো তুলনাহীন। অনেকে মনে করেন, এই কারণেই আজও গণিতের নোবেল না থাকার বিষয়টি একটি সাংস্কৃতিক ক্ষতি যা জনমনে গণিতের মর্যাদা কিছুটা কমিয়ে দেয়।
তবে অন্য দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি দেখা যায়। অনেকেই বলেন, গণিত নোবেল না পেয়েও তার স্বকীয়তা ও বিশুদ্ধতা রক্ষা করেছে। কারণ এখানে পুরস্কারের রাজনীতি নেই, প্রচার নেই আছে শুধু জ্ঞানের অনুসন্ধান ও চিন্তার গভীরতা। গণিতবিদদের কাজের আসল পুরস্কার হলো তাদের তত্ত্বের স্থায়িত্ব ও ভবিষ্যতের প্রভাব। তাই নোবেলের অনুপস্থিতি হয়তো এক অর্থে গণিতকে অন্যরকম এক স্বাধীন মর্যাদা দিয়েছে।
আলফ্রেড নোবেল গণিতকে কেন পুরস্কারের তালিকা থেকে বাদ দিয়েছিলেন, তার চূড়ান্ত উত্তর আমরা কখনোই হয়তো জানব না। কোনো ব্যক্তিগত শত্রুতা, কোনো প্রেমঘটিত নাটক নয় বরং ইতিহাসের বাস্তব প্রেক্ষাপট, প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা ও দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যই এই অনুপস্থিতির আসল কারণ বলে মনে হয়। কিন্তু গণিত নিজেই প্রমাণ করেছে, স্বীকৃতির জন্য সবসময় নোবেল প্রয়োজন হয় না। Fields Medal আর Abel Prize আজ সেই গৌরব বহন করছে, যা এক শতাব্দী আগে অনিচ্ছাকৃতভাবে বাদ পড়েছিল। হয়তো আলফ্রেড নোবেল নিজেও আজ দেখলে সন্তুষ্ট হতেন যে মানব সভ্যতার সবচেয়ে মৌলিক বিদ্যাটি অবশেষে তার প্রাপ্য সম্মান পেয়েছে নিজের আলাদা পথে, নিজের প্রজ্ঞায়।
লেখা: ইমাম হোসাইন আনজির
সূত্র: Wikipedia, Abel Prize Official Site, The New York Times, Britannica, ResearchGate, PubMed Central
