বিড়াল সাধারণত স্বভাবে সংবেদনশীল, সজাগ ও চঞ্চল প্রাণী। তারা প্রতিটি শব্দ, আলো, গন্ধ বা নড়াচড়ার প্রতি অত্যন্ত সতর্ক থাকে। কিন্তু বিগত কয়েক বছরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টিকটক, ইউটিউবে অদ্ভুত ও মজার দৃশ্য অনেকবার দেখা গেছে যে বিড়াল তার খাবার খাচ্ছে বা মেঝেতে নিশ্চিন্তে বসে আছে, হঠাৎ তার পেছনে একটি শসা রাখা হলো, আর সঙ্গে সঙ্গে সে লাফিয়ে উঠে আতঙ্কে ছুটে পালিয়ে যাচ্ছে। এই আচরণ যেমন হাস্যকর, তেমনি অনেকের মনে প্রশ্ন জাগায়—একটি নিরীহ সবজি দেখে বিড়াল এত ভয় পায় কেন? এই প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে খুঁজে দেখা যাক।

আকৃতি ও রঙের বিভ্রম: শসা নাকি সাপ?
গবেষক ও পশু-আচরণবিদদের মতে, বিড়ালের এই আচরণটি একেবারে এলোমেলো নয়। শসার আকৃতি ও রঙ অনেকটা সাপের মতো। বিড়ালদের পূর্বপুরুষেরা বন্য পরিবেশে বসবাস করত, যেখানে সাপ ছিল অন্যতম শত্রু। ফলে প্রাকৃতিকভাবে বিড়ালের মস্তিষ্কে একটি ‘প্রতিরক্ষা প্রতিক্রিয়া’ গড়ে উঠেছে—তারা সাপের মতো আকৃতি দেখলে স্বাভাবিকভাবেই সতর্ক হয়ে যায় অথবা পালিয়ে যায়। শসা যখন বিড়ালের পেছনে রাখা হয় এবং তারা ঘুরে দেখার পর তা দেখতে পায়, তখন স্বভাবতই সেটিকে তারা সাপ বা বিপজ্জনক কিছু হিসেবে মনে করে। Cornell Feline Health Center ও Purina-এর গবেষণায় এই বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে যে, হঠাৎ দেখা অচেনা সবুজ বস্তু বিড়ালের জন্য বিপদের সংকেত হতে পারে।

তবে শুধুমাত্র শসার আকৃতিই নয়, বরং যেভাবে সেটি উপস্থাপন করা হয়, সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। বিড়াল সাধারণত যখন খায় বা নিচু হয়ে কিছু করে, তখন তারা সবচেয়ে নির্ভার থাকে। এই মুহূর্তে যদি তাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে হঠাৎ একটি বস্তু উপস্থিত হয়, সেটি যে কোনো কিছুই হোক—শসা, খেলনা বা অন্য কিছু—তারা চমকে ওঠে। বিড়ালের চারপাশের পরিবেশে পরিবর্তন খুব দ্রুত তাদের মস্তিষ্কে সতর্কতা সংকেত পাঠায় এবং তারা আত্মরক্ষামূলক আচরণ হিসেবে পালিয়ে যায়। IFLScience ও BBC-এর গবেষণা বলছে, এই আচরণ মূলত ‘novelty response’ অর্থাৎ অচেনা ও অপ্রত্যাশিত কিছু দেখলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া, যা প্রাকৃতিকভাবেই বিড়ালের মধ্যে বিদ্যমান।

বিড়ালের উপর মানসিক চাপ পড়বে কী?
যদিও শসা দিয়ে বিড়ালকে চমকে দেওয়া অনেকের কাছে একটি মজার খেলা মনে হতে পারে, তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এর ফলে বিড়ালের উপর দীর্ঘমেয়াদে মানসিক চাপ পড়তে পারে। Business Insider-এর একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই ধরনের আচরণ বিড়ালের নিরাপত্তা বোধে ব্যাঘাত ঘটায়। বিড়াল যদি প্রতিবার তার খাবার খাওয়ার সময় বা নির্দিষ্ট কোনো স্থানে থাকাকালীন ভয় পায়, তাহলে পরবর্তীতে সেই স্থানটি এড়িয়ে চলতে পারে, এমনকি খাওয়া-দাওয়াও বন্ধ করে দিতে পারে। এটি তার দৈনন্দিন জীবন ও স্বাস্থ্যকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষ করে যারা ঘরে বিড়াল পোষেন, তাদের জন্য এটা একটি সতর্কবার্তা।

শুধু শসা নয়, যেকোনো অচেনা বস্তুতেই এমন প্রতিক্রিয়া দেখাতে পারে —
রেডিট এবং অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বহু বিড়ালপ্রেমী জানিয়েছেন, তাদের বিড়াল শুধু শসা নয়—যেকোনো হঠাৎ উপস্থিত বস্তু দেখলেও একইভাবে লাফিয়ে উঠে। অর্থাৎ শসার প্রতি ভয় না, বরং অচেনা ও হঠাৎ আসা বস্তুই তাদের ভয় পাইয়ে তোলে। কোনো খেলনা, ফল, এমনকি প্লাস্টিকের বোতল রাখলেও অনুরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে।

বিশেষজ্ঞরা একমত যে, বিড়ালের সঙ্গে এমন প্র্যাংক করা উচিত নয়। যদিও এটি প্রথমবারে হাস্যকর মনে হতে পারে, কিন্তু এটি একটি জীবন্ত প্রাণীর উপর মানসিক আঘাত হতে পারে। বরং বিড়ালের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক তৈরি করুন, তার সঙ্গে খেলুন, তাকে প্রশিক্ষণ দিন এবং একটি নিরাপদ পরিবেশ দিন যেখানে সে নিজেকে ভালোবাসা ও নিরাপত্তার মাঝে রাখতে পারে।

বিড়ালের শসা দেখে ভয় পাওয়ার ঘটনা একটি নিছক মজার অনলাইন ট্রেন্ড হিসেবে শুরু হলেও, এর পেছনে আছে গভীর প্রাণিবিদ্যা ও আচরণগত ব্যাখ্যা। শসা তাদের কাছে সাপের মতো মনে হতে পারে, এবং হঠাৎ অজানা বস্তুর উপস্থিতি তাদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। এই আচরণ একদিকে যেমন তাদের প্রাকৃতিক আত্মরক্ষার অংশ, তেমনি অন্যদিকে এটি আমাদের জন্য একটি শিক্ষণীয় বিষয়—প্রাণীর মানসিক অবস্থা বুঝে আমাদের আচরণ নির্ধারণ করা জরুরি। বিড়ালের ভয়কে মজা হিসেবে না নিয়ে বরং তাদের যত্নে ও ভালোবাসায় রাখাই আমাদের প্রকৃত দায়িত্ব।

লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র : IFLScience: “Why Are Cats Scared of Cucumbers?”, BBC Science Focus: “Why do cats jump when they see cucumbers?”, Cornell Feline Health Center, Purina Petcare Research, Business Insider

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply