রেডশিফট ও ব্লুশিফট কী?

ধরুন, আপনি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন এবং একটি অ্যাম্বুলেন্স সাইরেন বাজিয়ে আপনার দিকে দ্রুত আসছে। আপনি খেয়াল করবেন, সাইরেনের শব্দ যখন আপনার কাছে আসে, তখন এটি খুব তীক্ষ্ণ শোনায়। পক্ষান্তরে আপনার থেকে দ্রুত দূরে সরে যাওয়ার সেই শব্দটা কিছুটা ভারী ও নিচু হয়ে যায়।এই ঘটনাকে বলে ডপলার প্রভাব(Doppler effect)। 

অ্যাম্বুলেন্সটার মতো কোনো তরঙ্গের উৎস , শ্রোতার দিকে এগিয়ে আসে বা শ্রোতা থেকে দূরে সরে যায় তখন এই প্রভাবটা দেখা যায়। শব্দ  বাতাসের মধ্যে দিয়ে  তরঙ্গের মতো করে ছড়িয়ে পড়ে। অ্যাম্বুলেন্সটা আপনার দিকে আসার সময়  ক্রমাগত শব্দতরঙ্গ তৈরি করছে আর নিজেই সেই তরঙ্গগুলোর দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।ফলে প্রতিটি নতুন তরঙ্গ আগের তরঙ্গের চেয়ে তোমার একটু বেশি কাছ থেকে শুরু হচ্ছে। এর মানে হলো, তরঙ্গগুলো পরপর আপনার কানে এসে ধাক্কা মারছে খুব দ্রুত কারণ তরঙ্গ গুলোর মধ্যেকার দূরত্ব কমে গেছে। তরঙ্গের এই ঘন ঘন ধাক্কাই হলো উচ্চ তরঙ্গ দৈর্ঘ্য আর এই উচ্চ তরঙ্গ দৈর্ঘ্যর শব্দই আমাদের কানে তীক্ষ্ণ শোনায়।

Doppler frequency GIF
একটি গাড়ি চলার সময় এর সামনের সাউন্ড ওয়েভগুলো সংকুচিত হয়, আর পেছনেরগুলো উপর ছড়িয়ে পড়ে। এতে শোনা ফ্রিকোয়েন্সি পরিবর্তিত হয় এবং গাড়ি আমাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় আমরা শব্দের তীক্ষ্ণতার পরিবর্তন অনুভব করতে পারি। ছবি : Wikimedia

অ্যাম্বুলেন্সটা দূরে সরে যাওয়ার সময় এই ঘটনার বিপরীত ঘটান ঘটে। দূরে সরে যাওয়ার সময় প্রতিটি তরঙ্গের মধ্যে দূরত্ব বেড়ে যায়। ফলে ফ্রিকোয়েন্সি কমে যায়, আর শব্দ ভারী ও নিচু শোনায়।তরঙ্গের উৎস যদি আমাদের সাপেক্ষে গতিশীল থাকে, মানে হয় আমাদের দিকে এগিয়ে আসে অথবা আমাদের থেকে দূরে সরে যায়, তখনই এর কম্পাঙ্ক পরিবর্তিত হয়ে যায়, যার ফলে আমরা সেই তরঙ্গকে ভিন্নভাবে অনুভব করি বা দেখতে পাই।

আলোর ক্ষেত্রে এই Doppler effect-কে আমরা খালি চোখে রঙের পরিবর্তনের মাধ্যমে বুঝতে পারি। এই Doppler Effect মহাকাশ গবেষণার এক গুরুত্বপুর্ণ হাতিয়ার।আলোর “পিচ” বা তীক্ষ্ণতা যদি পরিবর্তিত হয়, সেটা তার তরঙ্গদৈর্ঘ্য  ওপর ভিত্তি করে রঙের পরিবর্তন ঘটায়। উদাহরণস্বরূপ যদি কোনো আলোর উৎস আমাদের থেকে দূরে সরে যেতে থাকে, তাহলে আলোর তরঙ্গগুলো ঠিক অ্যাম্বুলেন্সের শব্দের মতো করেই প্রসারিত হয়ে যাবে, অর্থাৎ  সেগুলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বেড়ে যাবে। তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বেড়ে যাওয়া মানে হলো কম্পাঙ্ক কমে যাওয়া। 

আলোর বর্ণালীতে লাল রঙের তরঙ্গদৈর্ঘ্য সবচেয়ে বেশি। এজন্য  কোনো দূরবর্তী মহাজাগতিক অবজেক্ট থেকে আসা আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য এইভাবে বেড়ে যায়,ফলে সেই আলো বর্ণালীর লাল প্রান্তের দিকে সরে যায়। এই ঘটনাই হলো রেডশিফট । ফলস্বরূপ বহুদূরের গ্যালাক্সি বা তারা যেগুলো পৃথিবী থেকে দ্রুত দূরে সরে যাচ্ছে, লালচে দেখায়। যত বেশি গতিতে দূরে সরে যায়, রেডশিফট তত বেশি হয়।

চলন্ত অ্যাম্বুলেন্সর শব্দের মতোই, যখন একটি তারা আমাদের থেকে দূরে সরে যায়, তখন তার আলো আরও লালচে দেখায়। আর যখন এটি আমাদের দিকে আসে, তখন আলো আরও নীলচে দেখায়। ছবি: Wikimedia।

এর ঠিক বিপরীত ঘটনাও ঘটে। কোনো আলোর উৎস আমাদের দিকে প্রচণ্ড গতিতে এগিয়ে আসার সময়, আলোর তরঙ্গগুলো সংকুচিত হয়ে যায়, ফলে তাদের তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমে যায়। তরঙ্গদৈর্ঘ্য কমে যাওয়া মানে হলো কম্পাঙ্ক বেড়ে যাওয়া। আলোর বর্ণালীতে নীল বা বেগুনী রঙের আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য  কম। তাই, যখন দূরের কোনো মহাজাগতিক বস্তু পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসে তখন আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য এভাবে কমে যায়, তখন সেই আলো বর্ণালীর নীল প্রান্তের দিকে সরে যায়। এই ঘটনাকে বলা হয় Blueshift। 

রেডশিফটও ব্লুশিফট একে অপরের উল্টোটা। যে সমস্ত মহাজাগতিক বস্তু পৃথিবীর দিকে দ্রুত গতিতে ধেয়ে আসে তখন তরঙ্গ দৈর্ঘ্য কমে গিয়ে নীল প্রান্তের দিকে সরে যায়, তাদের আলোতে Blueshift দেখা যায়। ফলে তাদের কিছুটা নীলচে মনে হয়। Redshift এর ক্ষেত্রে কোনো মহাকাশীয় বস্তু থেকে আসা আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য বেড়ে যায় এবং তা বর্ণালীর লাল প্রান্তের দিকে সরে যায়, এর মানে বস্তুটি আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হলো, বিজ্ঞানীরা কীভাবে এই রেডশিফট বা ব্লুশিফট পরিমাপ করেন?

বিজ্ঞানীরা স্পেকট্রোস্কোপি নামের পদ্ধতিতে রেডশিফট বা ব্লুশিফট পরিমাপ করেন। এই পদ্ধতিতে, জ্যোতিষ্ক থেকে আসা আলোকে স্পেকট্রোস্কোপের মধ্যে দিয়ে পাঠানো হয়, যা আলোকে উপাদান বর্ণে বিশ্লিষ্ট করে। বিজ্ঞানীরা বর্ণালীতে বিভিন্ন মৌলের পরমাণুর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ শোষণ রেখা খুঁজে বের করেন। প্রতিটি মৌলের কিছু নির্দিষ্ট তরঙ্গদৈর্ঘ্যে এই রেখাগুলো দেখা যায়। পরিচিত মৌলের রেখাগুলো স্বাভাবিক অবস্থান থেকে লাল বা নীল দিকে সরে গেলে, বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন বস্তুটি কত দ্রুত দূরে যাচ্ছে বা কাছে আসছে, এবং সরণের পরিমাণ মেপে ফেলতে পারেন।

১৯২৯ সালে, বিখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানী এডউইন হাবল বিভিন্ন গ্যালাক্সির আলো পর্যবেক্ষণ করে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় লক্ষ্য করেন।  তিনি লক্ষ্য করেন হাতে গোনা কয়েকটি ছাড়া প্রায় সব গ্যালাক্সিই আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যে গ্যালাক্সি যত বেশি দূরে, তার দূরে সরে যাওয়ার গতিও তত বেশি, অর্থাৎ তার Redshift-এর পরিমাণও তত বেশি। পরে এটি হাবলের সূত্র নামে পরিচিতি লাভ করে । এটিই প্রথম সুস্পষ্ট প্রমাণ দেয় যে আমাদের এই মহাবিশ্ব স্থির নয়, এটি ক্রমাগত প্রসারিত হচ্ছে। এই প্রসারণের ধারণাটি Big Bang তত্ত্বের একটি অত্যন্ত শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।

বিগ ব্যাং তত্ত্ব সবারই জানা। এই তত্ত্বেনুসারে, মহাবিশ্বের শুরু হয়েছিল একটি অত্যন্ত ঘনত্ব এবং তাপমাত্রার অবস্থা থেকে এবং তারপর থেকে এটি প্রসারিত ও শীতল হচ্ছে। তবে সব গ্যালাক্সিই যে দূরে সরে যাচ্ছে তা নয়। আমাদের সবচেয়ে কাছের বড়ো প্রতিবেশী গ্যালাক্সি, যার নাম অ্যান্ড্রোমিডা (Andromeda), সেটি কিন্তু Blueshift দেখায়।এর কারণ হলো, অ্যান্ড্রোমিডা সেই হাতে গোনা কয়েকটি গ্যালাক্সির মধ্যে একটি যারা আমাদের ছায়াপথ বা মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির দিকে এগিয়ে আসছে। বিজ্ঞানীদের অনুমান, আজ থেকে প্রায় ৪ বিলিয়ন বছর বা ৪০০ কোটি বছর পরে অ্যান্ড্রোমিডা আর আমাদের মিল্কিওয়ের মধ্যে এক বিশাল সংঘর্ষ ঘটবে, যার ফলে একটি আরও বড়ো, নতুন গ্যালাক্সি তৈরি হতে পারে।

Redshift / Blueshift কিন্তু শুধু গ্যালাক্সির দূরত্ব মাপা আর মহাবিশ্বের প্রসারণ বোঝার কাজেই লাগে না, এর আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার রয়েছে।

যেমন, এটি আমাদের সৌরজগতের বাইরের গ্রহ বা Exoplanet খুঁজে বের করতে সাহায্য করে। কোনো নক্ষত্রের চারপাশে গ্রহ ঘুরলে, গ্রহের মহাকর্ষীয় বলের কারণে নক্ষত্রটিও সামান্য দুলতে থাকে। নক্ষত্রের এই দোলন তার আলোতে পর্যায়ক্রমিক রেডশিফট ও ব্লুশিফট তৈরি করে। এই সূক্ষ্ম পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন নক্ষত্রের চারপাশে গ্রহ ঘুরছে, এবং গ্রহের ভর ও কক্ষপথ সম্পর্কে ধারণা করতে পারেন। মহাকর্ষীয় তরঙ্গের গবেষণাতেও রেডশিফট গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রক্রিয়া রেডিয়াল ভেলোসিটি পদ্ধতি (Radial Velocity Method) নামে পরিচিত।

গ্রহের মহাকর্ষীয় টানের ফলে তারাও সামান্য দুলে, যা রেডশিফট ও ব্লুশিফটের মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়। এই পদ্ধতিকে রেডিয়াল ভেলোসিটি বা ডপলার স্পেকট্রোস্কপি বলা হয়। এটি এক্সোপ্ল্যানেট শনাক্তকরণের একটি সফল পদ্ধতি।
ছবি:ESO
গ্রহের মহাকর্ষীয় টানের ফলে তারাও সামান্য দুলে, যা রেডশিফট ও ব্লুশিফটের মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়। এই পদ্ধতিকে রেডিয়াল ভেলোসিটি বা ডপলার স্পেকট্রোস্কপি বলা হয়। এটি এক্সোপ্ল্যানেট শনাক্তকরণের একটি সফল পদ্ধতি।
ছবি:ESO

এছাড়াও, ১৯৯৮ সালে বিজ্ঞানীরা দূরের সুপারনোভা থেকে আসা আলোর রেডশিফট পরিমাপ করে লক্ষ্য করে মহাবিশ্বের প্রসারণের গতি শুধু বাড়ছে না, সময়ের সাথে ত্বরান্বিত হচ্ছে। এই ত্বরণের পেছনের কারণ হিসেবে বিজ্ঞানীরা ডার্ক এনার্জির ধারণা প্রস্তাব করেছেন। ডার্ক এনার্জি কী, তা এখনও পুরোপুরি পরিষ্কার না। এটি মহাবিশ্বে ছড়িয়ে থাকা একধরনের শক্তি, যা মহাকর্ষের আকর্ষণের বিপরীতে কাজ করে মহাবিশ্বকে দ্রুত প্রসারিত করছে। ডার্ক এনার্জি মহাবিশ্বের মোট শক্তি-ঘনত্বের প্রায় ৬৮% জুড়ে রয়েছে।

জেমস ওয়েব স্পেস টেলিস্কোপের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা এখন উচ্চ রেডশিফটযুক্ত গ্যালাক্সি পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন। যেমন, GN-z11 গ্যালাক্সির রেডশিফট ১১.০৯, যার অর্থ এর আলো আমাদের কাছে পৌঁছাতে প্রায় ১৩.৪ বিলিয়ন বছর সময় নিয়েছে। অর্থাৎ, আমরা GN-z11-কে দেখলে মহাবিশ্বের শৈশবাবস্থা দেখি, যখন তার বয়স ছিল মাত্র কয়েকশো মিলিয়ন বছর। এই পর্যবেক্ষণ মহাবিশ্বের প্রারম্ভিক গঠন, প্রথম নক্ষত্র ও গ্যালাক্সির সৃষ্টি ও বিবর্তন সম্পর্কে তথ্য দিচ্ছে। এই টেলিস্কোপগুলো অবলোহিত আলো দেখার জন্য তৈরি, কারণ দূরের বস্তু থেকে আসা দৃশ্যমান আলো রেডশিফট হয়ে অবলোহিত অঞ্চলে চলে যায়। রেডশিফট ও ব্লুশিফট মহাবিশ্বের গতি, অতীত, বিবর্তন ও গঠন জানার গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার ।

তথ্য সূত্র : সায়েন্স এলার্ট,স্পেস ডট কম

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply