আমরা ছোটবেলা থেকেই পদার্থবিজ্ঞান বইয়ে পড়ে আসছি যে, এই মহাবিশ্ব মূলত চারটি মৌলিক বলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। Gravitational Force, Electromagnetic Force, Strong Nuclear Force এবং Weak Nuclear Force—এই চারজনই যেন মহাবিশ্বের প্রধান কান্ডারি। গ্রহ-নক্ষত্রের বিশাল ঘূর্ণন থেকে শুরু করে পরমাণুর ভেতরের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কণার আচরণ, সবকিছুই এই চারটি নিয়মের জালে বাঁধা।
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘকাল ধরে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, এই চারমূর্তির বাইরে আর নতুনের কোনো জায়গা নেই। পদার্থবিজ্ঞানের ‘বাইবেল’ খ্যাত Standard Model এই চারটি বলের (মহাকর্ষ বাদে বাকি তিনটি বলকে এই মডেলে খুব ভালোভাবে একীভূত করা হয়েছে) মাধ্যমেই মহাবিশ্বের ব্যাখ্যা দিয়ে আসছে অত্যন্ত সফলভাবে। কিন্তু ইদানীং সেই আত্মবিশ্বাসের দেয়ালে ফাটল ধরছে। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষাগারে এমন কিছু অদ্ভুত কান্ডকারখানা দেখছেন, যা এই জানা চারটি বল দিয়ে কোনোভাবেই ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। এখান থেকেই জন্ম নিচ্ছে এক রোমাঞ্চকর প্রশ্ন: তবে কি আমাদের অগোচরেই কাজ করে যাচ্ছে প্রকৃতির ‘পঞ্চম মৌলিক বল’?
অদৃশ্য জগতের হাতছানি: ডার্ক ম্যাটার ও ডার্ক এনার্জি
গল্পটা শুরু করা যাক আমাদের জানা জগৎ দিয়েই। আমাদের এই দৃশ্যমান জগৎ, অর্থাৎ আমরা যা কিছু দেখি বা স্পর্শ করি, তা মহাবিশ্বের খুব সামান্য একটি অংশ। আধুনিক বিজ্ঞান বলছে, মহাবিশ্বের প্রায় ৯৫ শতাংশই তৈরি ‘ডার্ক ম্যাটার’ (অদৃশ্য বস্তু) এবং ‘ডার্ক এনার্জি’ (অদৃশ্য শক্তি) দিয়ে, যা আমরা দেখতে পাই না। এর মধ্যে মহাবিশ্বের মোট ভরের প্রায় ৮৫ শতাংশই হলো ডার্ক ম্যাটার।
এই বিশাল অদৃশ্য অংশের সঙ্গে আমাদের চেনা জগতের যোগাযোগটা ঠিক কেমন, তা নিয়ে বিজ্ঞানীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ বহুদিনের। আমরা জানি মহাকর্ষ বল সব ভরের বস্তুকে টানে। কিন্তু মহাকর্ষ দিয়ে ডার্ক ম্যাটারকে ব্যাখ্যা করতে গিয়ে গণিতের খাতা আর বাস্তবে মিল পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যালাক্সিগুলো যেভাবে ঘুরছে, তা নিউটনের বা আইনস্টাইনের মহাকর্ষ সূত্র দিয়ে পুরোপুরি মেলানো যায় না। মনে হয় যেন অদৃশ্য কোনো সুতোর টানে বা অজানা কোনো শক্তির ধাক্কায় সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। বিজ্ঞানীরা সন্দেহ করছেন, এই অদৃশ্য জগতের সঙ্গে আমাদের দৃশ্যমান জগতের যোগাযোগের মাধ্যম বা ‘পোর্টাল’ হিসেবে কাজ করতে পারে একটি অজানা পঞ্চম শক্তি
Fermilab-এর চমক: মিউয়ন কণার রহস্যময় কাঁপুনি
পঞ্চম বলের এই ধারণাটি কেবল মহাকাশের বিশাল নক্ষত্রমণ্ডলীতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পরীক্ষাগারের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জগতেও তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের Fermilab বিজ্ঞানীরা Muon g-2 নামক একটি পরীক্ষায় চমকপ্রদ ফল পেয়েছেন।
সহজ কথায়, Muon হলো ইলেকট্রনের মতো একটি কণা, কিন্তু ভরের দিক থেকে এটি ইলেকট্রনের চেয়ে প্রায় ২০০ গুণ ভারী। এই কণাকে যখন শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্রের মধ্যে ছেড়ে দেওয়া হয়, তখন এটি একটি লাটিমের মতো ঘুরতে বা কাঁপতে থাকে। পদার্থবিজ্ঞানের স্ট্যান্ডার্ড মডেল অনুযায়ী, এই কাঁপুনি বা কম্পনের একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক মান থাকার কথা। কিন্তু পরীক্ষায় দেখা গেল, মিউয়ন কণাটি হিসেব-বহির্ভূতভাবে একটু বেশিই নড়ছে বা কাঁপছে। যেন অদৃশ্য কেউ বা কিছু তাকে ধাক্কা দিচ্ছে। জানা চারটি বলের কোনোটিই এই অতিরিক্ত ধাক্কার কারণ হতে পারে না। বিজ্ঞানীদের মতে, এই অতিরিক্ত নড়াচড়া প্রকৃতির সেই অজানা পঞ্চম বলের অস্তিত্বের দিকেই জোরালো আঙুল তুলছে।
হাঙ্গেরির ল্যাবরেটরি ও ‘X17’ কণার আত্মপ্রকাশ
ফার্মিল্যাবের ফলাফলের আগেই, এই রহস্যের আগুনে ঘি ঢেলেছিল হাঙ্গেরির একদল বিজ্ঞানীর গবেষণা। হাঙ্গেরির Atomki Nuclear Research Institute-এর বিজ্ঞানীরা ২০১৬ সালে Be-8 আইসোটোপ নিয়ে কাজ করার সময় অদ্ভুত কিছু লক্ষ্য করেন।
তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের সময় বেরিলিয়াম থেকে যখন আলো বা ফোটন কণা বের হওয়ার কথা, তখন তা ইলেকট্রন এবং পজিট্রনে ভেঙে যাচ্ছিল। পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, এই কণাগুলো পরস্পর থেকে দূরে সরে যাওয়ার সময় তাদের মধ্যবর্তী কোণ কমে আসার কথা। কিন্তু পরীক্ষায় দেখা গেল, ১৪০ ডিগ্রি কোণে কণাগুলোর সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাচ্ছে, যা আমাদের জানা কোনো নিয়মে পড়ে না। বিজ্ঞানীরা এই ঘটনার নাম দিয়েছেন Atomki Anomaly।
তারা দাবি করেছেন, এই ঘটনার পেছনে রয়েছে একটি সম্পূর্ণ নতুন কণা, যার নাম তারা দিয়েছেন X17 boson। নামের “১৭” সংখ্যাটি এসেছে এর প্রস্তাবিত ভর থেকে, যা প্রায় 17 MeV। যদি এই X17 boson কণাটির অস্তিত্ব সত্যিই প্রমাণিত হয়, তবে এটিই হবে সেই বহুকাঙ্ক্ষিত পঞ্চম বলের বাহক। অর্থাৎ, যেভাবে ফোটন তড়িৎচৌম্বকীয় বল বহন করে, সেভাবেই X17 পঞ্চম বলের বার্তা বহন করছে। মজার বিষয় হলো, পরবর্তীতে তারা হিলিয়াম পরমাণুর পরীক্ষাতেও একই ধরনের অস্বাভাবিকতা দেখার দাবি করেছেন, যা তাদের দাবির ভিত আরও শক্ত করেছে।
কেন এটি আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ?
এখন প্রশ্ন হলো, পঞ্চম বল যদি সত্যিই থাকে, তবে তা আমাদের জীবনের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ? আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে এটি কেবল বিজ্ঞানীদের গবেষণাগারের বিষয়। কিন্তু বাস্তবে এর প্রভাব হতে পারে সুদূরপ্রসারী ও বৈপ্লবিক। কেন? চলুন, সংক্ষেপে জেনে নিই।
মহাবিশ্বের সৃষ্টির আদি মুহূর্তে ঠিক কী ঘটেছিল, তা নিয়ে আমাদের জানা তথ্যে এখনো বড় শূন্যস্থান রয়েছে। বিশেষ করে, বিগ ব্যাং-এর পর Matter ও Anti-matter পারস্পরিক সংঘর্ষে সব ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা থাকলেও কেন আমরা আজও টিকে আছি, তা প্রচলিত চারটি বল দিয়ে ব্যাখ্যা করা কঠিন। বিজ্ঞানীদের ধারণা, সৃষ্টির শুরুতে এই অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ভারসাম্যহীনতা তৈরি করতে হয়তো গোপনে কাজ করেছে প্রকৃতির সেই অজানা পঞ্চম বলটি; তাই এই বল আবিষ্কৃত হলে মহাবিশ্ব ধ্বংস না হয়ে কীভাবে প্রাণের উপযোগী হয়ে উঠল, সেই আদি রহস্যের জট খুলবে।

পাশাপাশি, মহাবিশ্বের ভরের সিংহভাগই যে অদৃশ্য ‘ডার্ক ম্যাটার’ দিয়ে তৈরি, তা আলো বা সাধারণ পদার্থের সঙ্গে কোনো প্রতিক্রিয়া করে না বলে আমরা তাকে দেখতে পাই না। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পঞ্চম বলটি আমাদের দৃশ্যমান জগৎ এবং এই অদৃশ্য ডার্ক ম্যাটার জগতের মধ্যে গোপন একটি ‘সেতু’ বা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কাজ করতে পারে। এতদিন আমরা ডার্ক ম্যাটারকে কেবল মহাকর্ষের মাধ্যমে অনুভব করেছি, কিন্তু পঞ্চম বলের হদিশ মিললে হয়তো জানা যাবে এই অদৃশ্য বস্তুটি আসলে কী দিয়ে তৈরি এবং কীভাবে এটি কাজ করে।
সবশেষে বলা যায়, এই আবিষ্কার প্রযুক্তির জগতে ঘটাতে পারে অকল্পনীয় বিপ্লব। ইতিহাস বলে, মানুষ যখনই প্রকৃতির কোনো মৌলিক বলকে বশে এনেছে, তখনই সভ্যতার মোড় ঘুরে গেছে, যেমন: তড়িৎচৌম্বকীয় বল আবিষ্কারের ফলেই আজ আমরা বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট ব্যবহার করছি। পঞ্চম বল যদি সত্যিই থাকে এবং আমরা তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি, তবে হয়তো ভবিষ্যতে এমন কোনো অফুরন্ত শক্তির উৎস বা যোগাযোগ প্রযুক্তি আমাদের হাতে আসবে, যা আজকের দিনে দাঁড়িয়ে নিছক সায়েন্স ফিকশন বা জাদুর মতো মনে হয়।
সংশয়ের ছায়া ও চূড়ান্ত প্রমাণের অপেক্ষা
তবে এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসার সময় হয়নি। বিজ্ঞান কেবল উত্তেজনায় চলে না; বিজ্ঞান মানেই হলো প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে এগিয়ে চলা। যে দাবি যত বড়, তাকে প্রমাণ করার দায়িত্বও তত কঠিন।
ফার্মিল্যাব বা হাঙ্গেরির ফলাফলগুলো অত্যন্ত জোরালো ইঙ্গিত দিচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সারাবিশ্বের বিজ্ঞানীরা এটি নিয়ে আরও চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন। বিশেষত, হাঙ্গেরির পরীক্ষাটি নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে এই বলে যে, তাদের যন্ত্রের নির্ভরযোগ্যতা ও পরীক্ষার পদ্ধতি কতটা নিখুঁত ছিল? কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি বা পদ্ধতিগত ভুলের কারণে এমন ফল আসছে কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কেউ কেউ একে শতাব্দীর সেরা আবিষ্কার হিসেবে দেখছেন, আবার কেউ কেউ একে গণনার ভুল বলে সন্দেহ প্রকাশ করছেন।
সমস্যা হলো, একই ধরনের পরীক্ষায় বিশ্বের অন্য কোনো গবেষণাগার এখন পর্যন্ত সেই অস্বাভাবিক সিগন্যালটি হুবহু পুনরায় খুঁজে পায়নি। LHC (Large Hadron Collider) বা অন্যান্য Particle Accelerator কণা ত্বরক যন্ত্রে X17-এর সরাসরি প্রমাণ এখনো মেলেনি। অর্থাৎ, আবিষ্কারের দাবি এখনো অপেক্ষমাণ। সেটি সত্য নাকি মিথ্যা, তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য দরকার নির্ভুল পুনরাবৃত্তি।
সবশেষে নতুন অধ্যায়ের অপেক্ষায়
তবে এটাও সত্য যে, প্রকৃতির রহস্য কখনো খুব সহজে ধরা দেয় না। পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে এর আগেও এমন বহু দাবি এসেছে, যেগুলোর কিছু সময়ের পরীক্ষায় বাতিল হয়েছে, আবার কিছু একদিন সত্য প্রমাণিত হয়ে বিপ্লব ঘটিয়েছে। Higgs Boson কণাও একসময় ছিল শুধুই তত্ত্বের সুন্দর অনুমান, যা প্রায় অর্ধশতাব্দী পর পরীক্ষায় ধরা পড়ে।
তাই X17 বা মিউয়নের অস্বাভাবিকতা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও বিজ্ঞানীদের কৌতূহল বিন্দুমাত্র কমেনি, বরং বেড়েছে। ভবিষ্যতের আরও উন্নত প্রযুক্তির ডিটেক্টর এবং নিখুঁত পরীক্ষাই হয়তো একদিন জানিয়ে দেবে যে, আমরা কি সত্যিই প্রকৃতির এক নতুন অধ্যায়ের দ্বারে দাঁড়িয়ে, নাকি কেবল ভুলে যাওয়া কিছু ডেটার শব্দই আমাদের কৌতূহল বাড়িয়ে তুলেছিল।
ততদিন পর্যন্ত এই ‘পঞ্চম শক্তি’ বিজ্ঞানের জগতে এক শিহরণ জাগানিয়া রহস্য হয়েই থাকছে। তবে মানুষের অজানাকে জানার নেশা যে থামবে না, এটুকু নিশ্চিত। বিজ্ঞানের সবচেয়ে সুন্দর দিক সম্ভবত এখানেই—যেখানে সন্দেহ থাকে, সেখানেই নতুনের অনুসন্ধান শুরু হয়।
