আজ থেকে প্রায় তেত্রিশ বছর আগের কথা। ১৯৮৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর পৃথিবী এক ভয়ানক পারমাণবিক বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছিল।
সেদিন খুব ভোরে সোভিয়েত ইউনিয়নের মিসাইল ওয়ার্নিং সিস্টেমে ধরা পড়ে যে আমেরিকা থেকে ধেয়ে আসছে একটি মিসাইল। কম্পিউটারের সংকেত জানাচ্ছিল একটা নয় বরং বেশ কয়েকটা মিসাইল ছোড়া হয়েছে আমেরিকা থেকে। সোভিয়েত সেনাবাহিনীর নিয়ম হলো এমন সংকেত পেলে সাথে সাথে পাল্টা পারমাণবিক হামলা চালানো।
ডিউটি অফিসার ছিলেন স্তানিস্লাভ পেত্রভ। শত্রুর মিসাইল হামলার হিসাব রাখা ছিল তার কাজ। কিন্তু তিনি সেই সংকেত ওপরের কর্মকর্তাদের না জানানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি ধরে নিলেন এটা একটা ফলস অ্যালার্ম বা ভুল সংকেত।
পেত্রভের এই সিদ্ধান্ত ছিল তার ওপর দেওয়া আদেশের সরাসরি লঙ্ঘন। নিরাপদ কাজ হতো দায়িত্ব নিজের ঘাড় থেকে সরিয়ে ওপর মহলে জানিয়ে দেওয়া। কিন্তু তার সেই একা নেওয়া সিদ্ধান্তই হয়তো সেদিন পৃথিবীকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল।
সেই ঘটনার ৩০ বছর পর বিবিসির রাশিয়ান সার্ভিসকে তিনি বলেন, “আমার কাছে সব প্রমাণ ছিল যে মিসাইল হামলা চলছে। আমি যদি চেইন অব কমান্ড বা ওপর মহলে রিপোর্টটা পাঠাতাম তবে কেউ এর বিরুদ্ধে একটা কথাও বলত না।”
মস্কোর কাছেই এক ছোট শহরে থাকেন অবসরপ্রাপ্ত এই অফিসার। তিনি খুব দক্ষ একটা দলের সদস্য ছিলেন। তারা কাজ করতেন সোভিয়েত ইউনিয়নের একটা মিসাইল ঘাঁটি বা আর্লি-ওয়ার্নিং বেসে। তাদের ট্রেনিং ছিল কড়া আর নির্দেশ ছিল একদম সাফ।
তার কাজ ছিল যেকোনো মিসাইল হামলার তথ্য রাখা আর সেটা নেতাদের জানানো। ১৯৮৩ সালের সেই পরিস্থিতিতে এমন রিপোর্টের পর পাল্টা মার নিশ্চিত ছিল। কিন্তু যখন সময় এল তিনি যেন পাথর হয়ে গেলেন।
তিনি বলেন, “সাইরেন বেজে উঠল কিন্তু আমি কয়েক সেকেন্ডের জন্য ঠায় বসে রইলাম। সামনে বড় লাল স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছিল – লঞ্চ শব্দটা।” সিস্টেম দেখাচ্ছিল সংকেতটা ১০০ ভাগ খাঁটি। কোনো সন্দেহের সুযোগ ছিল না যে আমেরিকা মিসাইল ছুড়েছে।
পেত্রভ বলেন, “এক মিনিট পরেই আবার সাইরেন বাজল। দ্বিতীয় মিসাইল ছোড়া হয়েছে। এরপর তৃতীয় চতুর্থ আর পঞ্চম। কম্পিউটার তার অ্যালার্ট পাল্টে দেখাল মিসাইল স্ট্রাইক।” সস্তা রাশিয়ান সিগারেটে টান দিতে দিতে পেত্রভ সেই ঘটনার কথা বলছিলেন। তিনি মনে মনে এটা বহুবার ভেবেছেন।
তিনি আমাদের বলেন “রিপোর্ট করার আগে আমরা কতক্ষণ ভাবতে পারব সে বিষয়ে কোনো নিয়ম ছিল না। কিন্তু আমরা জানতাম দেরি করা প্রতিটা সেকেন্ড মূল্যবান সময় নষ্ট করছে। কারণ সোভিয়েত নেতাদের এখনই জানানো দরকার। আমার শুধু ফোনটা তুলে বসদের হটলাইনে কল করার কথা। কিন্তু আমি নড়তে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল আমি যেন ফুটন্ত কড়াইয়ের ওপর বসে আছি”।
সংকেতটা পরিষ্কার হলেও পেত্রভের মনে খটকা ছিল। পেত্রভের মতো আইটি বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি আরেকটা দল স্যাটেলাইট রাডার দিয়ে আমেরিকার ওপর নজর রাখত। তারা জানায় যে তারা কোনো মিসাইল দেখতে পাচ্ছে না।
কিন্তু তারা ছিল সাহায্যকারী দল। নিয়মে বলা ছিল সিদ্ধান্ত নিতে হবে কম্পিউটারের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে। আর সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব ছিল একমাত্র ডিউটি অফিসারের। অর্থাৎ পেত্রভের।
পেত্রভের সন্দেহের মূল কারণ ছিল অ্যালার্ট বা সংকেতটা বেশিই পরিষ্কার ছিল। তিনি বলেন, “সেখানে চেকিংয়ের ২৮ থেকে ২৯টা ধাপ ছিল। টার্গেট ঠিক হলে সেটাকে এই সব ধাপ পার হতে হতো। ওই অবস্থায় আমার মনে হচ্ছিল না যে এটা সম্ভব।”
তিনি তখন সদর দপ্তরে ফোন করে জানালেন যে এটা সিস্টেমের সমস্যা বা মেশিনের ভুল। যদি তিনি ভুল হতেন তবে কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রথম পারমাণবিক বোমাটা ফাটত। তিনি হেসে বলেন, “তেইশ মিনিট পর বুঝলাম কিছুই হয়নি। যদি সত্যিই হামলা হতো তবে এতক্ষণে আমি তা জেনে যেতাম। ওটা ছিল বিরাট স্বস্তির মুহূর্ত।”
ঘটনার প্রায় ৩০ বছর পরে পেত্রভ জানান, সেদিন পরিস্থিতি ঠিকভাবে সামলানোর সম্ভাবনা ছিল ফিফটি-ফিফটি। তিনি স্বীকার করেন, সংকেতটি আসলে ভুল সতর্কতা ছিল কি না—সে বিষয়ে তাঁর নিজের মধ্যেই সন্দেহ রয়ে গিয়েছিল।
তিনি বলেন তার দলের একমাত্র অফিসার হিসেবে তিনি সাধারণ ভার্সিটিতে পড়েছিলেন। “আমার সহকর্মীরা সবাই ছিলেন পেশাদার সৈনিক। তাদের শেখানো হয়েছিল শুধু অর্ডার দেওয়া আর অর্ডার মানা।” তাই তিনি বিশ্বাস করেন যদি সেদিন অন্য কেউ ডিউটিতে থাকত তবে হয়তো বিপদঘণ্টি বাজিয়ে দিত।
ঘটনার কয়েক দিন পর পেত্রভকে সেই রাতের জন্য অফিশিয়ালি বকাঝকা করা হয়। তবে তিনি যা করেছিলেন তার জন্য না বরং লগবুকের খাতাপত্রে ভুলের জন্য।
তিনি ১০ বছর এই বিষয়ে চুপ ছিলেন। তিনি বলেন, “আমি ভেবেছিলাম আমাদের সিস্টেমের এমন ফেইল করাটা আর্মির জন্য লজ্জাজনক।” তবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙার পর ঘটনাটা জানাজানি হয়। পেত্রভ অনেক আন্তর্জাতিক পুরস্কার পান। কিন্তু তিনি নিজেকে হিরো মনে করেন না।
তিনি বলেন
ওটা ছিল আমার ডিউটি। তবে ওদের কপাল ভালো যে সেই রাতে শিফটে আমি ছিলাম।

