প্রতিটি বাবা-মায়ের জীবনেই সেই বিশেষ সময়টি আসে, যখন আদরের ছোট সন্তানকে প্রথমবারের মতো স্কুলের গণ্ডিতে পাঠাতে হয়। সাধারণত বছরের শুরুতেই বাচ্চার বয়স তিন, চার বা পাঁচ পূর্ণ হলেই আমরা ধরে নিই যে সে এখন স্কুলের জন্য তৈরি। স্কুলের ভর্তি ফর্মে বয়সের ঘরটি পূরণ করা সহজ, কিন্তু শিশুটি মানসিকভাবে বা শারীরিকভাবে সেই নতুন পরিবেশের জন্য তৈরি কি না, তা বোঝাটা বেশ কঠিন। অনেক সময় দেখা যায়, বয়সের কোটা পূর্ণ হওয়ার পরেও স্কুলে গিয়ে শিশুটি খাপ খাওয়াতে পারছে না, কান্নাকাটি করছে কিংবা ক্লাসের কার্যক্রমে পিছিয়ে পড়ছে। এর মূল কারণ হলো, স্কুল রেডিনেস বা স্কুল প্রস্তুতি। এটি কেবল বয়সের ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে শিশুর সামগ্রিক বিকাশের ওপর।
স্কুল মানেই কেবল বই-খাতা আর পড়াশোনা নয়; এটি একটি সামাজিক প্রতিষ্ঠান যেখানে শিশুকে দীর্ঘ সময় বাবা-মা ছাড়া থাকতে হয়। তাই প্রথম যে লক্ষণটি আপনার খেয়াল করা উচিত তা হলো শিশুর স্বাবলম্বী হওয়ার ক্ষমতা। লক্ষ্য করে দেখুন, আপনার সন্তান কি ছোটখাটো কাজগুলো একা করতে পারে? যেমন: নিজের জুতো পরা, টিফিন বক্স খোলা, বোতল থেকে পানি খাওয়া বা প্রয়োজনে টয়লেট ব্যবহার করা। স্কুলের পরিবেশে একজন শিক্ষকের পক্ষে প্রতিটি বাচ্চার ব্যক্তিগত কাজ করে দেওয়া সম্ভব হয় না। তাই যদি দেখেন আপনার সন্তান টয়লেট ব্যবহারে অভ্যস্ত নয় কিংবা নিজের প্যান্ট নিজে ঠিক করতে পারছে না, তবে বুঝতে হবে তার প্রস্তুতির এখনো কিছুটা বাকি আছে। এই ছোট ছোট কাজগুলো একা করতে পারা শিশুর আত্মবিশ্বাস বাড়ায় এবং স্কুলে তাকে স্বাচ্ছন্দ্য দেয়।
দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো ভাব বিনিময়ের দক্ষতা বা কমিউনিকেশন স্কিল। এখানে ভাব বিনিময় বলতে খুব কঠিন শব্দ ব্যবহার করে কথা বলা বোঝায় না। বরং শিশু তার নিজের প্রয়োজনগুলো স্পষ্ট করে বলতে পারছে কি না, সেটাই দেখার বিষয়। ক্ষুধা লাগলে, টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন হলে কিংবা কেউ ব্যথা দিলে সে কি তা শিক্ষককে বুঝিয়ে বলতে পারে? অনেক শিশু বাসায় ইশারায় কথা বলে এবং বাবা-মা তা সহজেই বুঝে যান। কিন্তু স্কুলের শিক্ষক বা আয়া হয়তো সেই ইশারা বুঝবেন না। তাই সন্তান যদি পূর্ণ বাক্যে নিজের প্রয়োজন প্রকাশ করতে পারে এবং অন্যের ছোট ছোট নির্দেশনা (যেমন: বইটি ব্যাগে রাখো বা লাইনে দাঁড়াও) শুনে বুঝতে পারে, তবেই তাকে স্কুলের জন্য প্রস্তুত বলা যাবে।
আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক দক্ষতা হলো স্কুল প্রস্তুতির অন্যতম বড় মাপকাঠি। বাসায় শিশুটি হয়তো একাই রাজত্ব করে, খেলনা নিয়ে কারো সাথে ভাগাভাগি করতে হয় না। কিন্তু স্কুলে তাকে অন্য শিশুদের সাথে মিশতে হবে, খেলনা শেয়ার করতে হবে এবং নিজের পালা আসার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। খেয়াল করুন, আপনার সন্তান কি অন্য বাচ্চাদের সাথে মিশতে আগ্রহ দেখায়? নাকি সে সবসময় নিজেকে গুটিয়ে রাখে? খেলার সময় হার-জিত মেনে নেওয়ার মানসিকতা তার তৈরি হয়েছে কি না, তাও জরুরি। এ ছাড়া বাবা-মাকে ছাড়া কয়েক ঘণ্টা থাকার মানসিক প্রস্তুতিও খুব দরকার। স্কুলে যাওয়ার শুরুতে কান্নাকাটি করাটা স্বাভাবিক, কিন্তু যদি দেখেন সে কোনোভাবেই আপনাকে ছাড়তে চাইছে না বা শান্ত হচ্ছে না, তবে হয়তো তার সেপারেশন অ্যাংজাইটি বা বিচ্ছেদ ভীতি কাটানোর জন্য আরও কিছুটা সময়ের প্রয়োজন।
শারীরিক বিকাশের দিকটিও উপেক্ষা করা যাবে না। স্কুলে শিশুকে অনেকক্ষণ বসে থাকতে হয় এবং পেন্সিল বা রঙ পেন্সিল ধরতে হয়। একে বলা হয় Fine Motor Skill। আপনার সন্তান কি কাঁচি দিয়ে কাগজ কাটতে পারে? কিংবা রঙ পেন্সিল দিয়ে আঁকিবুঁকি করার সময় তার হাতের গ্রিপ কি শক্ত? এই দক্ষতাগুলো লেখা শেখার পূর্বশর্ত। পাশাপাশি তার দৌড়াদৌড়ি, লাফানো বা সিঁড়ি দিয়ে ওঠার মতো Gross Motor Skill ঠিকঠাক আছে কি না, তাও দেখে নেওয়া উচিত। কারণ স্কুলের মাঠে খেলাধুলাও শিক্ষারই একটা অংশ। যদি দেখেন শিশু বেশিক্ষণ এক জায়গায় স্থির হয়ে বসতে পারছে না বা অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ছে, তবে তার স্ট্যামিনা বাড়ানোর দিকে নজর দিতে হবে।
সবশেষে যে বিষয়টি খেয়াল করবেন তা হলো শিশুর কৌতূহল এবং মনোযোগের স্থায়িত্ব। নতুন কিছু শেখার প্রতি কি তার আগ্রহ আছে? সে কি আপনাকে প্রশ্ন করে যে, এটা কেন হলো? বা ওটা কী? এই কৌতূহলই তাকে স্কুলে শিখতে সাহায্য করবে। পাশাপাশি, অন্তত ১০-১৫ মিনিট একনাগাড়ে কোনো গল্পের বই শোনা বা কোনো কাজ করার মতো ধৈর্য তার আছে কি না, তা যাচাই করে নিন। ক্লাসরুমে শিক্ষকের কথা শোনার জন্য এইটুকু মনোযোগ থাকা আবশ্যক।
মনে রাখবেন, প্রতিটি শিশুর বিকাশের গতি ভিন্ন। আপনার প্রতিবেশী বা আত্মীয়ের সমবয়সী শিশু স্কুলে যাচ্ছে বলে আপনার সন্তানকেও জোর করে পাঠাতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। ওপরের লক্ষণগুলো যদি আপনার সন্তানের মধ্যে পুরোপুরি না-ও থাকে, তবুও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। এই দক্ষতাগুলো চর্চার মাধ্যমে গড়ে তোলা যায়। তাকে সময় দিন, বাসায় ছোট ছোট দায়িত্ব পালন করতে শেখান এবং অন্য শিশুদের সাথে মেলামেশার সুযোগ করে দিন। স্কুল যেন শিশুর কাছে ভয়ের জায়গা না হয়ে আনন্দের জায়গা হয়, তা নিশ্চিত করা আমাদেরই দায়িত্ব। একটি প্রস্তুত শিশু কেবল ভালো ছাত্রই হয় না, সে তার শৈশবকেও উপভোগ করতে শেখে।
