সন্তানের জন্ম প্রতিটি পরিবারেই খুশির বার্তা নিয়ে আসে। কিন্তু প্রসবের সময় এগিয়ে আসার সাথে সাথে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে হয় পরিবারকে – বাচ্চাটা নরমাল ডেলিভারিতে হবে নাকি সিজারে! এই সিদ্ধান্তের ওপর বাচ্চার এবং মায়ের ডেলিভারি পরবর্তী শারিরীক ও মানসিক স্বাস্থ্য নির্ভর করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাসহ বিশ্বের স্বনামধন্য সকল চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে অতিরিক্ত সংকটাপন্ন পরিস্থিতি ব্যাতিত কখনোই সিজারের মাধ্যমে ডেলিভারি করা উচিত নয়। কেনো উচিত নয়! তাই জানবো আজকের লেখায়।
নরমাল ডেলিভারি কি? কিভাবে কাজ করে?

নরমাল ডেলিভারি হলো একটি সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। সৃষ্টির শুরু থেকেই নারীদের শরীর এই প্রক্রিয়ার জন্য উপযুক্ত করে তৈরি এবং এভাবেই সন্তানের জন্ম হওয়া স্বাভাবিক ও কাম্য।
এই প্রক্রিয়ায় মায়ের প্রসব ব্যাথা শুরু হওয়ার পর জরায়ু নিয়মিত সংকুচিত হতে শুরু করে। এই সংকোচনের ফলে জরায়ুর মুখ অর্থাৎ Cervix আস্তে আস্তে খুলে ১০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত চওড়া হয় যাতে বাচ্চার মাথা বের হতে পারে। জরায়ুর মুখ পুরোপুরি খুলে গেলে চিকিৎসক মাকে নিচের দিকে চাপ দিতে বলেন। মায়ের এই pushing এবং জরায়ুর প্রাকৃতিক সংকোচনের সম্মিলিত চেষ্টায় বাচ্চা আস্তে আস্তে birth canal বা প্রসব পথ দিয়ে বের হয়ে আসে। এক্ষেত্রে সাধারণত প্রথমে বাচ্চার মাথা এবং পরে শরীর বের হয়।
এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিতে প্রসব বেদনা শুরু হওয়া থেকে বাচ্চা হওয়া পর্যন্ত সাধারণত ১২ থেকে ১৮ ঘণ্টা বা কখনো কখনো ২৪ ঘণ্টাও লাগতে পারে। তবে বাচ্চা বের হওয়ার ধাপে ১ থেকে ২ ঘণ্টা সময় লাগে। তবে যদি এটি মায়ের ২য় বা ততোধিক প্রসব হয় তখন প্রক্রিয়াটি অনেক দ্রুত হয়। সাধারণত ৬ থেকে ১০ ঘণ্টা সময় লাগে এবং পুশিংয়ের ধাপটি ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়।
এই পদ্ধতিতে সন্তান প্রসবের প্রধান সুবিধা হলো মায়ের দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা। ডেলিভারির কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মা স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে পারেন এবং শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন। এতে infection বা রক্তক্ষরণের ঝুঁকি অনেক কম থাকে। নরমাল ডেলিভারির ক্ষেত্রে Birth Canal দিয়ে আসার সময় বাচ্চার বুক ও ফুসফুসে প্রাকৃতিক চাপ পড়ে। ফলে গর্ভে থাকা অবস্থায় বাচ্চার ফুসফুসে Amniotic fluid নামক যে তরল থাকে তা প্রাকৃতিকভাবেই বের হয়ে যায়। ফলে জন্মের পর বাচ্চা খুব সহজেই প্রথম শ্বাস নিতে পারে। Birth Canal দিয়ে আসার সময় বাচ্চার শরীরে মায়ের কিছু উপকারী ব্যাকটেরিয়া লেগে যায়। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো বাচ্চার অন্ত্রে গিয়ে তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দ্রুত শক্তিশালী করে তোলে। নরমাল ডেলিভারির সময় বাচ্চার শরীরে কিছু ভালো স্ট্রেস হরমোন যেমন- ক্যাটেকোলামাইন নিঃসৃত হয়। এগুলো বাচ্চাকে বাইরের পরিবেশে দ্রুত সজাগ হতে এবং মায়ের শরীরের তাপমাত্রা ও রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে।
সিজারিয়ান সেকশন কি? কিভাবে এই পদ্ধতিতে প্রসব হয়?

সিজারিয়ান সেকশন মূলত অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে প্রসব ব্যাবস্থা। এটি কখনোই সাধারণ প্রক্রিয়া তথা নরমাল ডেলিভারির বিকল্প হতে পারে না। যখন নরমাল ডেলিভারি করানো মা বা শিশুর জন্য চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়ায় তখনই কেবল সিজার করা উচিত। যেমন গর্ভে শিশুর অবস্থান উল্টো বা বাঁকা থাকলে, শিশুর হৃদস্পন্দন কমে গেলে, প্রসব বেদনা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে মা ক্লান্ত হয়ে পড়লে কিংবা মায়ের উচ্চ রক্তচাপ বা ডায়াবেটিসের মতো জটিলতা থাকলে সিজার করা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে সিজারই মা ও শিশুর জীবন বাঁচানোর একমাত্র উত্তম উপায়। সিজারে কোনো প্রসব বেদনা বা চাপ ছাড়াই বাচ্চাকে সরাসরি মায়ের পেট থেকে বের করা হয়।
এ প্রক্রিয়ায় প্রথমে মায়ের কোমরে injection দিয়ে Spinal Anesthesia এর মাধ্যমে শরীরের নিচের অংশ অবশ করা হয়। এতে মা সম্পূর্ণ সজাগ থাকেন কিন্তু কোনো ব্যথা পান না। এরপর সার্জন পেটের নিচের অংশে সাধারণত বিকিনি লাইনের ঠিক উপরে আনুভূমিক বরাবর কাঁটেন এবং ভেতরের জরায়ুর দেওয়ালে আরেকটি ছোট কাট দেন। জরায়ু কাটার পর ডাক্তার হাত দিয়ে আলতো করে বাচ্চার মাথা এবং শরীর পেটের ভেতর থেকে টেনে বের করে আনেন। সাথে সাথেই বাচ্চার নাক ও মুখ পরিষ্কার করা হয় এবং আম্বিলিকাল কর্ড বা নাড়ি কেটে ফেলা হয়। সবশেষে বাচ্চার জন্মের পর গর্ভফুল বের করে আনা হয় এবং সবশেষে জরায়ু ও পেটের চামড়া কয়েক স্তরে সেলাই করে দেওয়া হয়।
এই সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটিতে সাধারণত ৪৫ থেকে ৬০ মিনিট সময় লাগে। এক্ষেত্রে অপারেশন শুরু করার পর মাত্র ৫ থেকে ১০ মিনিটের মধ্যেই বাচ্চা বের করে আনা হয়। বাকি ৪৫ থেকে ৫০ মিনিট সময় লাগে জরায়ু এবং পেটের কাঁটা অংশগুলো নিখুঁতভাবে সেলাই করতে।
মায়ের গর্ভের নিরাপদ ও উষ্ণ পরিবেশ থেকে বাইরের পৃথিবীতে আসার প্রক্রিয়াটি বাচ্চার জন্য একটি বিশাল পরিবর্তন। কিন্তু যখন বাচ্চাটি নরমাল ডেলিভারিতে বের করা হয় তখন সে বেশ জটিল একটা প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আসে এবং পথে বাইরের পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও নিয়ে আসে। যেটা সিজারের ক্ষেত্রে হয় না। সিজারে ডেলিভারিতে বাচ্চাকে তৎক্ষনাৎ মায়ের পেট থেকে বের করে ফেলা হয় যার দরুন হুট করে পরিবেশের এই পরিবর্তন বাচ্চার ওপর নেতিবাচক প্রভাব বেশি ফেলে।
যেহেতু সিজারের বাচ্চার ফুসফুসে প্রাকৃতিক চাপ লাগে না তাই অনেক সময় তাদের ফুসফুসের ভেতরে তরল থেকে যায়। ফলে সিজারে হওয়া বাচ্চাদের জন্মের পর শ্বাসকষ্ট বা দ্রুত শ্বাস নেওয়ার সমস্যা যেমন Transient Tachypnea of the Newborn – TTN বেশি দেখা যায়। আবার মাকে অবশ করার জন্য যে ওষুধ দেওয়া হয় তার কিছুটা অংশ বাচ্চার রক্তেও মিশতে পারে। যার ফলে সিজারের বাচ্চা জন্মের পর কিছুটা ঝিমুনি ভাব বা অলস প্রকৃতির হতে পারে এবং কাঁদতে সামান্য দেরি হয়। এসব বাচ্চারা মায়ের শরীরের উপকারী ব্যাকটেরিয়াগুলোর সংস্পর্শ না পাওয়ায় এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হতে নরমাল ডেলিভারির বাচ্চাদের চেয়ে একটু বেশি সময় লাগে।
তুলনা করতে গেলে দেখা যায়
নরমাল ডেলিভারির বাচ্চারা বার্থ ক্যানেলের চাপের কারণে সাধারণত জন্মের সাথে সাথেই জোরে কেঁদে ওঠে এবং দ্রুত বাইরের বাতাসের অক্সিজেন ফুসফুসে নিতে পারে। সিজারের বাচ্চাদের ফুসফুস পরিষ্কার করতে বা তাদের কাঁদানোর জন্য প্রায়ই ডাক্তারের কৃত্রিম সহায়তার যেমন- সাকশন পাইপ দিয়ে তরল পরিষ্কার করার প্রয়োজন হয়।
নরমাল ডেলিভারির পর মা দ্রুত সুস্থ বোধ করেন এবং বাচ্চাও সজাগ থাকে ফলে জন্মের প্রথম ঘণ্টার মধ্যেই বাচ্চা মায়ের বুকের দুধ খাওয়া শুরু করতে পারে। কিন্তু সিজারের পর মায়ের অপারেশনের ব্যথা এবং বাচ্চার ঝিমুনি ভাবের কারণে বুকের দুধ খাওয়ানো শুরু করতে কিছুটা দেরি হয় যা বাচ্চার বাইরের পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার গতিকে ধীর করে।
নরমাল ডেলিভারির বাচ্চাকে দ্রুত মায়ের বুকের ওপর Skin-to-Skin contact এর জন্য দেওয়া সম্ভব হয় যা বাচ্চার শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখতে দারুণ সাহায্য করে। সিজারের ক্ষেত্রে অপারেশনের পরবর্তী আনুষ্ঠানিকতার কারণে এই সুযোগটি পেতে বেশ কিছুটা দেরি হয়।
আবার সিজারে জন্ম নেওয়া বাচ্চাদের ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে কিছু স্বাস্থ্য সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। যেমন অ্যাজমা বা হাঁপানি, অ্যালার্জি এবং Obesity বা অতিরিক্ত ওজন। কারণ সিজারের বাচ্চারা প্রসব পথের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার সংস্পর্শ পায় না যা তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে কিছুটা দুর্বল করে। তবে নরমাল ডেলিভারিতে হওয়া বাচ্চারা কিন্তু এিসব রিস্ক থেকে স্বাভাবিকভাবে মুক্ত থাকে।
মায়ের ওপর কেমন প্রভাব ফেলে?
সিজারের সময় কোমরে যে অ্যানেস্থেশিয়ার ইনজেকশন দেওয়া হয় সেটার কারণে কয়েকদিন বা কয়েক সপ্তাহ মায়ের কোমরে বা পিঠে ব্যথা থাকতে পারে।
একবার সিজার হলে পরবর্তী সন্তান জন্মের সময় লেবার পেইন উঠলে আগের সিজারের সেলাইয়ের স্থানটি দুর্বল হয়ে ফেটে যাওয়ার একটি ছোট ঝুঁকি থাকে। পরবর্তী গর্ভাবস্থায় গর্ভফুল জরায়ুর নিচের দিকে বা আগের কাটার জায়গার ওপর বসে জরায়ুর মুখ বন্ধ করে দিতে পারে যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ মা ও বাচ্চা উভয়ের জন্যই।
আবার পেটের যে অংশটি কেটে সিজার করা হয় তার ভেতরের পেশি যদি পুরোপুরি শক্তভাবে জোড়া না লাগে তবে দীর্ঘ সময় পরও সেই কাটার স্থান দিয়ে ভেতরের চর্বি বা নাড়ি কিছুটা ঝুলে পড়তে পারে যাকে Incisional Hernia বলা হয়। সিজারের পর ভারী জিনিস তুললে বা কোষ্ঠকাঠিন্যের সমস্যা থাকলে এই ঝুঁকি বাড়ে। যেহেতু সিজারের সময় পেটের চামড়া ও মাংসপেশির কিছু স্নায়ু বা Nerves কেটে যায় তাই সিজারের দাগের চারপাশের অংশ মাসের পর মাস এমনকি বছর জুড়ে অবশ বা অসাড় লাগতে পারে। এছাড়া অনেকের তলপেটের চামড়া ঝুলে চর্বির একটি স্থায়ী ভাঁজ তৈরি হয়।
অন্যদিকে নরমাল ডেলিভারিতে মায়ের সাময়িক কষ্ট হয় ঠিকই তবে দীর্ঘস্থায়ী এইসব সমস্যার সম্ভাবনা থাকে না। মা এবং শিশু দুইজনই খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠে এবং শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি নিশ্চিত হয়।
সর্বোপরি প্রাকৃতিক ব্যাবস্থাই সর্বোত্তম। প্রতিটি শিশু স্বাভাবিক প্রসব প্রক্রিয়ার হকদার। যদি কোনো Critical Conditions না থাকে তাহলে কখনোই সিজার করা উচিত না। কিন্তু বর্তমানে বিশ্বজুড়ে জন্ম নেওয়া শিশুদের মধ্যে প্রায় ২১% বা প্রতি ৫ জনে ১ জন শিশু সিজারের মাধ্যমে পৃথিবীতে আসছে যা হতাশাজনক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা WHO এর মতে যেকোনো দেশের জন্য সিজারের আদর্শ হার হওয়া উচিত মাত্র ১০% থেকে ১৫%। অর্থাৎ চিকিৎসাগতভাবে প্রতি ১০০ জন মায়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ১০-১৫ জনের সিজার প্রয়োজন হতে পারে বাকিদের নরমাল ডেলিভারি সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে তা হচ্ছে না। অধিকাংশ সময়ই দেখা যাচ্ছে চিকিৎসকরা অধিক টাকা উপার্জনের জন্য কারণ ছাড়াই সিজার করাচ্ছেন। উপযুক্ত জ্ঞানের অভাবে মায়ের পরিবারও তা মেনে নিচ্ছে এবং অজান্তেই বাচ্চার ও মায়ের শারীরিক সমস্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশে এই চিত্র আরও ভায়ানক। দক্ষিণ এশিয়ায় বিশেষ করে বাংলাদেশে এই হার আশঙ্কাজনকভাবে বেশি প্রায় ৪৫%-এর উপরে। যার একটি বড় অংশই সম্পন্ন হয় বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে। এটি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশিত সীমার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি।
WHO থেকে স্পষ্ট জানানো হয়েছে সিজারিয়ান সেকশন শুধুমাত্র তখনই করা উচিত যখন এটি চিকিৎসাগতভাবে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। সংস্থাটির মতে –
সিজারিয়ান সেকশন মা ও শিশুর মৃত্যুর হার কমাতে অত্যন্ত কার্যকর তবে তা তখনই প্রযোজ্য যখন এর পেছনে সুনির্দিষ্ট মেডিকেল কারণ থাকে। অপ্রয়োজনীয় সিজার মা ও শিশু উভয়ের জন্যই স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।
অপ্রয়োজনীয় সিজার রোধ করা প্রতিটি পরিবার, সমাজ এবং নাগরিকের কর্তব্য। জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং কঠোর আইন প্রণয়নের মাধ্যমে এই সমস্যা নির্মূল সম্ভব। তাই আমাদের সচেতনতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে তাবেই আমাদের মায়েরা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবন পাবে।

Thanks for this informative article
lekhata onk informative chilo amar onek confusion clear hocyechhe. 🥰