মানুষের মস্তিষ্ক এক বিস্ময়কর যন্ত্র। মাত্র ২০ ওয়াট শক্তির বিনিময়ে এটি যে জটিল চিন্তাভাবনা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং সৃজনশীল কাজ করতে পারে, তা আজকের দিনের সবচেয়ে শক্তিশালী সুপারকম্পিউটারগুলোর পক্ষেও করা কঠিন। বর্তমানের প্রচলিত কম্পিউটারগুলো গাণিতিক হিসাবে অবিশ্বাস্য দ্রুত হলেও, মস্তিষ্কের মতো শিখতে বা বুঝতে পারে না। ঠিক এই সীমাবদ্ধতা দূর করতেই বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির জগতে এখন এক নতুন বিপ্লবের সূচনা হয়েছে, যার নাম Neuromorphic Computing।
সহজ কথায় বলতে গেলে, এটি হলো সিলিকন চিপের ওপর কৃত্রিম মস্তিষ্ক তৈরি করার এক অভিনব প্রয়াস। বিজ্ঞানীরা এখন এমন কম্পিউটার প্রসেসর তৈরি করছেন যা ঠিক আমাদের মস্তিষ্কের নিউরন এবং সিন্যাপ্সের আদলে কাজ করবে। এই প্রযুক্তির হাত ধরেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তার পরবর্তী ধাপে পা রাখতে যাচ্ছে।
প্রচলিত কম্পিউটারের মূল সমস্যাটি বুঝতে হলে আমাদের ফিরে তাকাতে হবে এর মৌলিক কাঠামোর দিকে। আমরা বর্তমানে যে কম্পিউটার বা স্মার্টফোন ব্যবহার করি, তা মূলত Von Neumann architecture মেনে চলে। এই পদ্ধতিতে মেমোরি এবং প্রসেসর সম্পূর্ণ আলাদা থাকে। ফলে কোনো কাজ করার সময় প্রসেসরকে বারবার মেমোরি থেকে তথ্য আনতে হয় এবং কাজ শেষে আবার ফেরত পাঠাতে হয়। তথ্যের এই আসা-যাওয়ার পথে একটি অদৃশ্য ট্রাফিক জ্যাম বা বাধার সৃষ্টি হয়, যাকে প্রযুক্তিবিদরা Von Neumann bottleneck বলেন। এই প্রক্রিয়ায় প্রচুর সময় ও শক্তির অপচয় হয়।
কিন্তু আমাদের মস্তিষ্ক এভাবে কাজ করে না। মস্তিষ্কের ভেতরে স্মৃতি এবং প্রসেসিং আলাদা কোনো ইউনিটে ভাগ করা নেই; বরং বিলিয়ন বিলিয়ন নিউরন এবং তাদের সংযোগস্থল বা সিন্যাপ্সের মধ্যেই তথ্য জমা থাকে এবং সেখানেই প্রক্রিয়াজাত হয়। নিউরোমরফিক চিপ ঠিক এই জৈবিক পদ্ধতিটিকেই নকল করার চেষ্টা করছে, যেখানে মেমোরি এবং কম্পিউটেশন একই স্থানে অবস্থান করে।
নিউরোমরফিক চিপের কার্যপদ্ধতি প্রচলিত চিপের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। সাধারণ কম্পিউটার বাইনারি পদ্ধতিতে অর্থাৎ সব সময় ০ এবং ১-এর নিরবচ্ছিন্ন প্রবাহ নিয়ে কাজ করে। কিন্তু নিউরোমরফিক চিপ কাজ করে Spiking Neural Networks বা SNNs ব্যবহার করে। মস্তিষ্কের নিউরনগুলো যেমন সব সময় সচল থাকে না, বরং কেবল কোনো উদ্দীপনা পেলেই বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠায়, ঠিক তেমনি এই চিপগুলোর কৃত্রিম নিউরনগুলোও কেবল দরকারি মুহূর্তে সক্রিয় হয়। একে বলা হয় Event Based Processing।
ধরা যাক, একটি সাধারণ ক্যামেরা ভিডিও করার সময় প্রতিটি ফ্রেমের সব পিক্সেল রেকর্ড করতে থাকে, এমনকি যদি দৃশ্যের কোনো পরিবর্তন নাও হয়। কিন্তু একটি Neuromorphic Sensor বা Event Camera কেবল তখনই তথ্য পাঠাবে যদি দৃশ্যে কোনো নড়াচড়া বা আলোর পরিবর্তন ঘটে। এই পদ্ধতির কারণে নিউরোমরফিক চিপগুলো প্রচলিত চিপের তুলনায় অবিশ্বাস্য রকমের কম বিদ্যুৎ খরচ করে। গবেষণায় দেখা গেছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে এই চিপগুলো প্রচলিত GPU-এর চেয়ে প্রায় ১০০০ গুণ বেশি শক্তি সাশ্রয়ী হতে পারে।
এই প্রযুক্তির অগ্রভাগে রয়েছে Intel এবং IBM-এর মতো প্রযুক্তি জায়ান্টরা। Intel তাদের Loihi 2 চিপ এবং সম্প্রতি Hala Point নামক বিশ্বের বৃহত্তম নিউরোমরফিক সিস্টেম তৈরি করেছে, যা ১১৫ কোটি কৃত্রিম নিউরন ধারণ করতে সক্ষম। এই সিস্টেমটি পেঁচার মস্তিষ্কের সমতুল্য নিউরন ক্ষমতা রাখে এবং এটি প্রচলিত কম্পিউটারের চেয়ে ৫০ গুণ দ্রুত কাজ করতে পারে ১০০ গুণ কম শক্তি খরচ করে। অন্যদিকে, IBM তৈরি করেছে NorthPole এবং এর আগে TrueNorth নামক চিপ, যা মানুষের মস্তিষ্কের মতোই মেমোরি এবং প্রসেসিংকে একত্রিত করে ফেলেছে। এই চিপগুলো কেবল ল্যাবরেটরিতেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মহাকাশ গবেষণা থেকে শুরু করে রোবোটিক্স পর্যন্ত নানা ক্ষেত্রে এদের ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, নাসা বা মহাকাশ সংস্থাগুলো এমন রোবট চাইছে যা পৃথিবীর সাথে যোগাযোগ ছাড়াই নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে, আর এই কাজের জন্য কম শক্তির নিউরোমরফিক চিপ আদর্শ।
নিউরোমরফিক চিপের সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যবহার হতে যাচ্ছে Edge Computing এবং রোবোটিক্সে। বর্তমানে আমাদের স্মার্ট ডিভাইসগুলো বা এআই অ্যাসিস্ট্যান্টগুলো (যেমন সিরি বা অ্যালেক্সা) জটিল কোনো প্রশ্নের উত্তর দিতে ইন্টারনেটের মাধ্যমে ক্লাউড সার্ভারের সাহায্য নেয়। কিন্তু নিউরোমরফিক চিপ যুক্ত থাকলে ডিভাইসটি নিজের ভেতরেই, ইন্টারনেটের সাহায্য ছাড়াই দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। এটি কেবল ব্যক্তিগত গোপনীয়তাই রক্ষা করবে না, বরং চালকবিহীন গাড়ি বা ড্রোনকে আরও নিরাপদ করে তুলবে। কারণ, রাস্তায় হঠাৎ কোনো বাধা আসলে মুহূর্তের মধ্যে ব্রেক কষার সিদ্ধান্তটি ক্লাউড থেকে ঘুরে আসার চেয়ে চিপের ভেতরেই নেওয়া অনেক বেশি নিরাপদ। এ ছাড়া, কৃত্রিম হাত-পা বা প্রস্থেটিক্সে Electronic Skin বা কৃত্রিম ত্বক তৈরিতেও এই চিপ ব্যবহার করা হচ্ছে, যা স্পর্শের অনুভূতি মস্তিষ্কে পাঠাতে পারে, ঠিক আসল চামড়ার মতো।
যদিও আমরা এখনো মানুষের মস্তিষ্কের মতো সম্পূর্ণ সক্ষম কৃত্রিম মস্তিষ্ক তৈরি থেকে কিছুটা দূরে আছি, তবুও নিউরোমরফিক চিপ সেই লক্ষ্যের দিকে একটি বিশাল সফলতা। এতদিন কম্পিউটার ছিল কেবল একটি গণনাকারী যন্ত্র, কিন্তু এই প্রযুক্তির মাধ্যমে কম্পিউটার হয়ে উঠছে একটি অনুভবকারী ও শিক্ষণক্ষম সত্তা। শক্তির অপচয় কমিয়ে এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে আমাদের হাতের মুঠোয় নিয়ে আসার মাধ্যমে নিউরোমরফিক চিপ আগামী দিনের প্রযুক্তির মানচিত্রকেই বদলে দিতে যাচ্ছে। হয়তো খুব শীঘ্রই আমরা এমন সব স্মার্ট গ্যাজেট দেখব, যা চার্জ দেওয়া ছাড়াই মাসের পর মাস চলবে এবং আমাদের প্রয়োজনগুলো আমাদের বলার আগেই বুঝতে পারবে। সিলিকন এবং জীববিজ্ঞানের এই মেলবন্ধন আমাদের এক নতুন ভবিষ্যতের দিকে নিয়ে যাচ্ছে, যেখানে যন্ত্র কেবল নির্দেশ পালন করবে না, বরং পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে নিতেও শিখবে।
