রাশিয়ার সাইবেরিয়া কিংবা উত্তরাঞ্চলের হাড়কাঁপানো কোনো এক শীতের সকাল। ঘুম ভেঙে জানালার বাইরে তাকাতেই হয়তো আপনার চোখ কপালে উঠবে। দিগন্তের আকাশে একটি নয়, জ্বলজ্বল করছে দুটি কিংবা তিনটি সূর্য! মাঝখানের সূর্যটি সবচেয়ে উজ্জ্বল, আর তার দুই পাশে পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে আছে আরও দুটি আলোর গোলক। সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে এমন ভিডিও প্রায়ই আমাদের টাইমলাইনে ভেসে আসে। কখনো কখনো এই দৃশ্য দেখে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়েন, কেউবা একে কেয়ামতের আলামত বা ভিনগ্রহবাসীদের কাজ বলে মনে করেন। কিন্তু বিজ্ঞানের ভাষায় এই রোমাঞ্চকর ঘটনাটি বায়ুমণ্ডলীয় আলোকবিজ্ঞানের বা Atmospheric Optics -এর অন্যতম সুন্দর একটি উদাহরণ, যার পোশাকি নাম Sun Dog বা Parhelia।
এই মহাজাগতিক দৃশ্যের নেপথ্য কারিগর হলো রাশিয়ার চরম আবহাওয়া। আমরা জানি, রাশিয়া বা সাইবেরিয়ার অঞ্চলগুলোতে শীতকালে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের অনেক নিচে, প্রায় -২০ থেকে -৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত নেমে যায়। সাধারণ অবস্থায় মেঘ আকাশে অনেক উঁচুতে থাকে, যেখানে তাপমাত্রা কম হওয়ায় জলীয় বাষ্প জমে বরফ কণায় পরিণত হয়। কিন্তু রাশিয়ার মতো প্রবল শীতে বাতাস এতটাই ঠান্ডা হয় যে, মাটি থেকে সামান্য উচ্চতাতেই বাতাসে জলীয় বাষ্প জমে বরফের অতি ক্ষুদ্র কণায় রূপ নেয়। একে আবহাওয়াবিজ্ঞানীরা বলেন Diamond Dust বা হীরের ধুলো। এই বরফ কণাগুলো সাধারণ কোনো বরফের টুকরো নয়, এগুলোর জ্যামিতিক গঠন অত্যন্ত নিখুঁত এবং সুনির্দিষ্ট। এগুলো মূলত ষড়ভুজাকৃতি প্লেট বা চাকতির মতো দেখতে হয় এবং সেগুলো একেকটা প্রিজমের ন্যায় আচরণ করে। যখন এই কোটি কোটি আণুবীক্ষণিক বরফের প্রিজম বাতাসে ভেসে বেড়ায়, তখনই মঞ্চ প্রস্তুত হয় এই আলোর খেলার জন্য।
এখন প্রশ্ন হলো, একটি সূর্য থেকে তিনটি সূর্য কীভাবে তৈরি হয়? এর উত্তর লুকিয়ে আছে আলোর প্রতিসরণ বা Refraction-এর নিয়মে। আলো যখন এক মাধ্যম থেকে অন্য মাধ্যমে প্রবেশ করে, তখন তা কিছুটা বেঁকে যায়, যাকে বলা হয় প্রতিসরণ বা Refraction। ছোটবেলায় আমরা প্রিজমের ভেতর দিয়ে আলো যাওয়ার পরীক্ষা হয়তো অনেকেই করেছি, যেখানে সাদা আলো প্রিজমে ঢুকে বেঁকে যায় এবং রংধনুর রঙে ভাগ হয়ে যায়। রাশিয়ার আকাশে ভেসে থাকা ওই ষড়ভুজাকৃতি বরফ কণাগুলো ঠিক একেকটি প্রিজমের মতো কাজ করে। সূর্য যখন দিগন্তের কাছাকাছি থাকে, তখন সূর্যের আলোকরশ্মি এই বরফ কণাগুলোর এক পাশ দিয়ে প্রবেশ করে এবং অন্য পাশ দিয়ে বের হওয়ার সময় ঠিক ২২ ডিগ্রি কোণে বেঁকে যায়। এই ২২ ডিগ্রি সংখ্যাটি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী, বরফের প্রতিসরাঙ্ক এবং এর ষড়ভুজ কাঠামোর কারণে আলো সবসময় এই নির্দিষ্ট কোণেই বাঁকবে।
যখন লক্ষ লক্ষ বরফ কণা আকাশের বুকে মাটির সমান্তরালে ভেসে থাকে, তখন তারা একটি বিশাল লেন্স বা আয়নার মতো আচরণ করে। এই বরফ কণাগুলোর ভেতর দিয়ে আলো ২২ ডিগ্রি কোণে বেঁকে আমাদের চোখে এসে পৌঁছায়। আমাদের মস্তিষ্ক আলো বাঁকা পথে আসার বিষয়টি বুঝতে পারে না; মস্তিষ্ক ধরে নেয় আলোটি সোজাসুজি কোনো উৎস থেকে আসছে। ফলে আমরা আসল সূর্যের ঠিক ২২ ডিগ্রি ডানে এবং ২২ ডিগ্রি বামে দুটি উজ্জ্বল আলোর বিন্দু দেখতে পাই। এগুলোকেই বলা হয় Mock Sun বা নকল সূর্য। কখনো কখনো এই নকল সূর্যগুলো এতটাই উজ্জ্বল হয় যে, চট করে আসল আর নকলের তফাত করা কঠিন হয়ে পড়ে।
কিন্তু এখানেই জনমনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি জাগে যে, আকাশে আসলে কয়টি সূর্য দেখা যায়? দুটি নাকি তিনটি? সংবাদের শিরোনামে প্রায়ই আমরা “রাশিয়ায় ২য় সূর্যের দেখা মিলল” বা “জোড়া সূর্য” জাতীয় খবর দেখি, আবার কখনো দেখি “তিনটি সূর্য”। আসলে বিজ্ঞানের নিখুঁত জ্যামিতি অনুযায়ী আকাশে মোট তিনটি আলোর উৎসই থাকার কথা; মাঝখানে আসল সূর্য এবং দুই পাশে দুটি নকল সূর্য। কিন্তু প্রকৃতি সবসময় জ্যামিতির এই আদর্শ নিয়ম মেনে ছবি আঁকে না। অনেক সময় আকাশের এক পাশে হয়তো বরফ কণা বা ডায়মন্ড ডাস্ট থাকে, কিন্তু অন্য পাশ ঘন মেঘে ঢাকা থাকে বা বরফ কণা থাকে না। তখন এক পাশের নকল সূর্যটি তৈরি হতে পারে না বা আড়াল হয়ে যায়। ফলে আমরা আকাশে কেবল দুটি সূর্য (একটি আসল + একটি নকল) দেখতে পাই। অর্থাৎ, ভিডিও বা খবরে দুটি সূর্য দেখা যাওয়ার দাবিটিও মিথ্যা নয়; এটি কেবল প্রকৃতির ক্যানভাসের অসম্পূর্ণতা বা মেঘের খামখেয়ালিপনা।
সান ডগ বা পারহিলিয়া কেবল সাদা আলোর বিন্দু নয়, ভালো করে লক্ষ্য করলে এতে রঙের ছটাও দেখা যায়। নকল সূর্যগুলোর যে পাশটি আসল সূর্যের দিকে থাকে, সেখানে লালচে আভা দেখা যায় এবং বাইরের দিকে ক্রমশ কমলা থেকে নীলচে রঙে মিশে যায়। এটি ঘটে কারণ, প্রিজমের মতো বরফ কণাও সাদা আলোকে ভেঙে সাতটি রঙে আলাদা করে ফেলে। লাল আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্য বেশি হওয়ায় তা কম বাঁকে, আর নীল আলো বেশি বাঁকে। এই রঙের বিন্যাস দৃশ্যটিকে আরও মোহনীয় করে তোলে। কখনো কখনো এই দুটি নকল সূর্যকে একটি বিশাল গোলাকার আলোর রিং বা Halo (22° Halo) দিয়ে যুক্ত অবস্থায়ও দেখা যায়, যা পুরো দৃশ্যটিকে একটি অলৌকিক রূপ দেয়।
ইতিহাসের পাতাতেও এই তিন সূর্য বা পারহিলিয়ার উল্লেখ পাওয়া যায় বারবার। আজ থেকে প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল তাঁর লেখায় এই ঘটনার উল্লেখ করেছিলেন। মধ্যযুগে ইউরোপে এই দৃশ্যকে যুদ্ধের পূর্বাভাস বা ঈশ্বরের বার্তা হিসেবে দেখা হতো। ১৪৬১ সালে ইংল্যান্ডে মর্টিমারস ক্রস-এর যুদ্ধের আগে আকাশে তিনটি সূর্য দেখা গিয়েছিল বলে কথিত আছে। সে সময় ইয়র্কিস্টরা এটিকে পবিত্র ত্রিত্ববাদ বা হোলি ট্রিনিটির লক্ষণ মনে করে উৎসাহিত হয়েছিল এবং যুদ্ধে জয়লাভ করেছিল। শেক্সপিয়ারের বিখ্যাত নাটক ‘তৃতীয় হেনরি’-তেও এই ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ, মানুষ যুগ যুগ ধরে এই দৃশ্য দেখে আসছে, কিন্তু এর পেছনের বিজ্ঞানটি বুঝতে আমাদের অনেক সময় লেগেছে।
রাশিয়াই কি একমাত্র জায়গা যেখানে এমনটা ঘটে? মোটেও না। কানাডা, উত্তর আমেরিকা, এন্টার্কটিকা, এমনকি উপযুক্ত আবহাওয়া থাকলে বিশ্বের যেকোনো শীতপ্রধান দেশেই সান ডগ দেখা যেতে পারে। তবে রাশিয়ার ভৌগোলিক অবস্থান এবং দীর্ঘস্থায়ী তীব্র শীতকাল এই ঘটনা ঘটার জন্য সবচেয়ে আদর্শ পরিবেশ তৈরি করে। বিশেষ করে যখন আকাশ পরিষ্কার থাকে এবং সূর্য দিগন্তরেখার কাছাকাছি অবস্থান করে, তখনই সান ডগ সবচেয়ে স্পষ্ট ও উজ্জ্বল হয়। সূর্য যত ওপরে উঠতে থাকে, বরফ কণাগুলোর ভেতর দিয়ে আলোর পথ বদলে যায় এবং সান ডগগুলো ধীরে ধীরে অদৃশ্য হয়ে যায় বা দিগন্ত থেকে দূরে সরে যায়।
পরিশেষে বলা যায়, রাশিয়ার আকাশে জোড়া বা তিন সূর্য ওঠার এই ঘটনা কোনো অতিপ্রাকৃত ভোজবাজি নয়, বরং এটি বিশুদ্ধ পদার্থবিজ্ঞান এবং জ্যামিতির এক অপূর্ব মেলবন্ধন। প্রকৃতির এই বিশাল ক্যানভাসে সূর্য হলো আলোর উৎস, বাতাস হলো মাধ্যম, আর বরফের কণাগুলো হলো প্রিজম। এই তিনের সঠিক সমন্বয়েই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে এই মায়াবী বিভ্রম। তাই পরেরবার ইন্টারনেটে বা বাস্তবে এমন দৃশ্য দেখলে ভয় পাওয়ার কিছু নেই; বরং প্রকৃতির এই অদ্ভুত সুন্দর ইঞ্জিনিয়ারিং উপভোগ করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
