মহাকাশে যুদ্ধ?

১৯৪৫ সালে পৃথিবী প্রথমবারের মতো পারমাণবিক বোমার স্বাদ পায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষপ্রান্তে হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে ঘটে যাওয়া সেই বিভীষিকাময় বিস্ফোরণ কেবল যুদ্ধের চিত্রই পাল্টায়নি, মানবসভ্যতার ইতিহাসেও এক স্থায়ী আতঙ্কের ছাপ রেখে গেছে। এরপর পারমাণবিক অস্ত্র শুধুই যুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকেনি। একে ঘিরে গড়ে ওঠে বৈজ্ঞানিক গবেষণা, কূটনৈতিক শক্তির ভারসাম্য, এবং মহাশক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে এক ঠাণ্ডা প্রতিযোগিতা।

এই প্রেক্ষাপটেই, ১৯৫০-এর দশকে যুক্তরাষ্ট্র গোপনে হাতে নেয় একটি ব্যতিক্রমী প্রকল্প Project A119। এর লক্ষ্য ছিল চাঁদের পৃষ্ঠে একটি পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো, যেন পৃথিবী থেকে টেলিস্কোপ দিয়ে তা দেখা যায় এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের উপর “বিজ্ঞানী ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব” প্রমাণ করা যায়। সৌভাগ্যক্রমে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র উদ্বিগ্ন ছিল যে সোভিয়েত ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি এত দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে, যা তারা সামাল দিতে পারছিল না! ছবি: গেটি ইমেজেস

কিন্তু থামো একবার। যদি প্রকল্পটি সত্যিই বাস্তব হতো? অথবা আজকের দিনে, যদি প্রযুক্তির চরম শিখরে পৌঁছানো মানুষ চাঁদ, মঙ্গল কিংবা বৃহস্পতি বা নেপচুনের মতো গ্রহে পারমাণবিক বোমা ফেলে, তবে কী ঘটবে?

এই প্রশ্নটি আজ আর শুধুই কল্পনা নয়। বরং এটি একটি বাস্তব বৈজ্ঞানিক চিন্তা: মহাকাশে যদি পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো হয়, তাহলে তার তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কী হতে পারে? শুধু ঐ গ্রহে নয়, মহাকাশের পরিবেশ, এমনকি পৃথিবীতেও কি এর কোনো প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে?

এই আর্টিকেলে আমরা প্রথমে চাঁদ ও প্রতিটি গ্রহের প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করব—সেই জায়গার ভৌত ও রাসায়নিক বৈশিষ্ট্যের প্রেক্ষাপটে কী ধরনের ফলাফল হতে পারে। তারপর আমরা একত্রে বুঝে নেব, এই সম্ভাব্য বিস্ফোরণগুলো একসাথে ঘটলে তা আমাদের সৌরজগত এবং আমাদের ভবিষ্যতের জন্য কী বার্তা দেয়।

এটি কল্পবিজ্ঞানের কোনো দৃশ্য নয়। এটি বাস্তব বিজ্ঞানের আয়নায় ভবিষ্যতের এক সতর্ক দৃষ্টিপাত।

চাঁদে বিস্ফোরণ

চাঁদের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো এখানে বায়ুমণ্ডল নেই, অন্তত আমাদের পরিচিত অর্থে নয়। ফলে যদি কোনো পারমাণবিক বোমা চাঁদের মাটিতে বিস্ফোরিত হয়, তাহলে তার সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো জিনিস হবে আলোর তীব্র ঝলকানি আর তাপমাত্রার আকস্মিক বৃদ্ধি। কিন্তু সেখানে শব্দ ছড়াবে না, কারণ শব্দ প্রক্ষেপণের জন্য প্রয়োজন হয় মাধ্যম, যা চাঁদে অনুপস্থিত। সুতরাং, চাঁদের পৃষ্ঠে দাঁড়িয়ে থাকলে বিস্ফোরণ “দেখতে” পারা গেলেও তা “শোনা” যাবে না।

NASA-এর গবেষণা অনুযায়ী, চাঁদের রেগোলিথ—এক প্রকার ধুলোমিশ্রিত, বালির মতো ভঙ্গুর পাথুরে উপাদান—এই তীব্র তাপে ছিন্নবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিস্ফোরণের কেন্দ্র থেকে এই রেগোলিথ ছিটকে পড়ে ঘন্টায় হাজার কিলোমিটার বেগে চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে। তবে এই ধ্বংসাবশেষ মহাশূন্যে খুব বেশি দূর যেতে পারবে না, কারণ চাঁদের বাইরের স্তর এক্সোস্ফিয়ার একটি সীমাবদ্ধ গণ্ডি তৈরি করে দেয়, যেখানে এদের গতি শিথিল হয়ে পড়ে। তা-ও, কোনো বড় মাপের ভূতাত্ত্বিক বা কক্ষপথগত পরিবর্তনের সম্ভাবনা একেবারেই নেই।

চাঁদে পারমাণবিক বিস্ফোরণের একটি অন্য দিক হলো এর ভিজ্যুয়াল প্রভাব। পৃথিবী থেকে কেউ যদি এই মুহূর্তটিকে দেখে, তাহলে রাতের আকাশ হঠাৎ করে যেন কয়েক সেকেন্ডের জন্য দিনের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে পারে। তবে এই আলো ক্ষণস্থায়ী হবে, আর চাঁদের আলো সবসময়ই প্রতিফলিত সূর্যালোক হওয়ায় এই পরমাণু বিস্ফোরণ আলোর সেই স্বাভাবিকতায় এক নাটকীয় ব্যতিক্রম হিসেবে ধরা দেবে।

মঙ্গল বা শুক্রে বিস্ফোরণ

মঙ্গল (Mars) ও শুক্র (Venus)—এ দুটি গ্রহে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটালে, সবার আগে যে বিষয়টি মাথায় আসে তা হলো তাদের বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর তুলনায় সম্পূর্ণ আলাদা ও চরম বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। ফলে সেখানে বিস্ফোরণের প্রতিক্রিয়াও হবে ভিন্নধর্মী।

প্রথমে যদি মঙ্গলের কথা বলি, তবে দেখা যাবে মঙ্গলের বায়ুমণ্ডল অত্যন্ত পাতলা ও কার্বন ডাই-অক্সাইডে পূর্ণ। এই বায়ুমণ্ডলের ঘনত্ব পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের মাত্র ১%। এমন হালকা বায়ুতে পারমাণবিক বিস্ফোরণের shockwave (আঘাত তরঙ্গ) খুব বেশি দূর বিস্তার লাভ করতে পারবে না। ফলে বিস্ফোরণের কেন্দ্রস্থলে তাপমাত্রা মুহূর্তে হাজার হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছালেও, তার প্রভাব খুব দ্রুত হ্রাস পাবে আশেপাশে। এই বিস্ফোরণ শুধু রেজোলিথ ধুলোর ঝড় তুলবে, কিন্তু মাটির গভীর কোনো পরিবর্তন ঘটাবে না। ভূমির গঠন এমন যে সেখানে বিস্ফোরণের ফলে বড় কোনো গর্ত বা প্লেট টেকটোনিক পরিবর্তনের সম্ভাবনা প্রায় নেই। সবমিলিয়ে, এটি হবে একধরনের নির্জীব, সীমিত এবং নিঃশব্দ ধ্বংস, যা হবে বিজ্ঞানীদের জন্য চোখধাঁধানো, কিন্তু পরিবেশগতভাবে নিরীহ।

অন্যদিকে, শুক্র একেবারে উল্টো। এই গ্রহের বায়ুমণ্ডল পৃথিবীর তুলনায় প্রায় ৯০ গুণ ঘন এবং এটি মূলত কার্বন ডাই-অক্সাইড ও সালফিউরিক অ্যাসিডযুক্ত অ্যারোসল দিয়ে গঠিত। এমন ঘন ও অ্যাসিডিক বায়ুমণ্ডল একটি পারমাণবিক বিস্ফোরণকে যেন আঁকড়ে ধরে। সেখানে বিস্ফোরণ ঘটলে প্রচণ্ড তাপ ও গ্যাসীয় বিক্রিয়া ছড়ালেও, তা খুব তাড়াতাড়ি বায়ুবাহিত তীব্র প্রতিক্রিয়ায় বিলীন হয়ে যাবে। এই প্রক্রিয়াকে বলা যায় যেন মহাকাশ নিজেই এর প্রতিবাদ জানাচ্ছে, তার ক্ষোভে নয় বরং তার ধীরে ধীরে “নিভিয়ে ফেলা” প্রতিক্রিয়ায়।

তবে বিস্ফোরণ থেকে তৈরি হওয়া তাপীয় প্রভাব ও বিকিরণ শুক্রের অ্যাসিডিক মেঘস্তরের রসায়নে সামান্য পরিবর্তন ঘটাতে পারে—যেমন কিছু নতুন যৌগের সৃষ্টি বা বায়ুমণ্ডলীয় মেঘে ঘনীভবন হার কমে যাওয়া।

তবুও, এই বিস্ফোরণগুলো যত ভয়াবহই মনে হোক, পৃথিবীর দিক থেকে এগুলো একেবারেই নিরীহ। এই বিস্ফোরণ থেকে সৃষ্ট কোনো বিকিরণ, কণিকা বা ধাক্কা পৃথিবীর পরিবেশে এসে পৌঁছানোর সম্ভাবনা নেই, কারণ গ্রহগুলোর দূরত্ব এত বেশি যে মহাকাশের মধ্যবর্তী শূন্যতায় সবই বিলীন হয়ে যায়।

বৃহস্পতি, শনি ও গ্যাসীয় দৈত্যগ্রহসমূহ

বৃহস্পতি (Jupiter), শনি (Saturn), ইউরেনাস (Uranus) এবং নেপচুন (Neptune)—এই চারটি গ্রহকে বলা হয় “জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক দৈত্য” বা Gas Giants/Ice Giants। এদের পৃষ্ঠ বলতে আদতে কোনো কঠিন স্তর নেই, বরং বায়ু ও গ্যাসের স্তর একের পর এক ঘন হয়ে গিয়ে গভীরে উচ্চচাপ ও উচ্চতাপযুক্ত অঞ্চলে রূপ নেয়।

যদি এই গ্রহগুলোর যেকোনো একটিতে একটি পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়, তবে তার প্রথম প্রতিক্রিয়া হবে বিস্ময়কর এবং কিছুটা নিরুত্তাপ। বোমাটি কোনো পৃষ্ঠে বিস্ফোরিত হবে না; বরং ধীরে ধীরে বায়ুমণ্ডলের গভীরে তলিয়ে যাবে। তারপরে সেই তলদেশে, যেখানে চাপ হাজার হাজার গুণ বেশি এবং তাপমাত্রা কয়েক হাজার ডিগ্রির কাছাকাছি, সেখানে পারমাণবিক বোমার fission বা fusion বিক্রিয়া মুহূর্তের মধ্যেই ঘটবে। তবে তা হবে যেন গ্যাসীয় জগতের ভেতরে আত্মহত্যা।

এই বিস্ফোরণ হবে ভয়ঙ্কর শক্তিশালী, কিন্তু তার শক্তির ব্যাপ্তি ও প্রতিফলন খুব সম্ভবত সেই গ্রহের ঘন গ্যাসীয় স্তরেই হারিয়ে যাবে। কোনো দৃশ্যমান ধ্বংস বা স্থায়ী গঠনগত পরিবর্তন হবে না, কারণ গ্রহের পৃষ্ঠ বলতেই কিছু নেই—শুধু অসীম গ্যাসের ঢেউ।

তবে সবচেয়ে বড় আশঙ্কা ও বৈজ্ঞানিক কৌতূহলের জায়গাটি হলো এই গ্রহগুলোর বায়ুমণ্ডল ও অভ্যন্তরে বিপুল পরিমাণ হাইড্রোজেন ও হেলিয়াম উপস্থিত। এই গ্যাসদ্বয় অত্যন্ত দাহ্য এবং নিদৃষ্ট পরিবেশে পারমাণবিক প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণহীন থার্মোনিউক্লিয়ার বা প্লাজমা স্ফুরণ ঘটাতে পারে।

বিশেষত বৃহস্পতির মতো গ্রহ, যার অভ্যন্তর গঠন সৌরজগতের ক্ষুদ্রতম নক্ষত্রের সাথে তুলনীয়, সেখানে এই বিপর্যয় একরকম ক্ষুদ্র নক্ষত্র সৃষ্টির উপযোগী পরিবেশও তৈরি করতে পারে। যদিও বাস্তবতা হলো—গ্রহের গভীরতর গ্যাসীয় স্তরগুলি এমনভাবে সেই তাপ ও চাপ শোষণ করে নেয় যে বিস্ফোরণ এক পর্যায়ে বিক্ষিপ্ত গ্যাসীয় ঢেউ বা কম্পনের বাইরে কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না।

তাহলে প্রশ্ন থেকে যায়: এই বিস্ফোরণের প্রভাব কি আমাদের পৃথিবী পর্যন্ত পৌঁছাবে? সম্ভাবনা প্রায় নেই। এই গ্রহগুলো পৃথিবী থেকে এত দূরে অবস্থিত যে বিস্ফোরণের shockwave, তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ বা গামা রশ্মি পৃথিবীর দিকে আসার আগেই মহাশূন্যের অন্ধকারে বিলীন হয়ে যাবে। হয়তো কয়েকটি গামা ফ্ল্যাশ বা কসমিক রশ্মি রেকর্ড করা যাবে দূরবর্তী কোনো টেলিস্কোপে, কিন্তু তা হবে অতি ক্ষণস্থায়ী ও দুর্বল।

অর্থাৎ, এই গ্যাসীয় দৈত্যদের গহ্বরে পারমাণবিক বিস্ফোরণ ঘটানো অনেকটা শূন্যে চিৎকার করার মতো—প্রতিক্রিয়া ঘটবে, কিন্তু প্রতিধ্বনি পাওয়া যাবে না। তবে বিজ্ঞানীদের জন্য এটি হয়ে উঠতে পারে এক বিরল প্রকৃতি-পরীক্ষা, যেখানে মহাবিশ্বের নিঃসীম গ্যাসের রাজ্যে মানুষের ক্ষুদ্র প্রযুক্তির এক ধোঁয়াটে চিহ্ন রেখে যায়।

প্লুটো

প্লুটো একটি দূরবর্তী ও রহস্যঘেরা বামন গ্রহ (Dwarf Planet)। এটি সৌরজগতের প্রান্তসীমায় অবস্থিত, যেখানে সূর্যের আলোও দুর্বল হয়ে পড়ে। প্লুটোর বায়ুমণ্ডল প্রায় নেই বললেই চলে, শুধুমাত্র খুব ঠাণ্ডা অবস্থায় কিছু পাতলা নাইট্রোজেন, মিথেন ও কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসের অণু তার উপরিভাগে ভেসে বেড়ায়। অধিকাংশ সময়ই এই গ্যাসগুলো বরফে পরিণত হয়ে জমে থাকে, কারণ প্লুটোর তাপমাত্রা গড়পড়তায় -220 ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে থাকে।

এইরকম একটি শীতল, নিঃস্তব্ধ ও গ্যাসশূন্য গ্রহে যদি একটি পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরিত হয়, তাহলে সেটি হবে নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ, কিন্তু বিচ্ছিন্ন। বিস্ফোরণ স্থানিকভাবে তীব্র আলো ও তাপ সৃষ্টি করবে, যা সরাসরি সৌরবিকিরণের থেকে বহু গুণ বেশি হবে।

এই তাপমাধ্যমে বরফে ঢাকা বিশাল অঞ্চল কয়েক সেকেন্ডে গলে যেতে পারে, এবং যে পাতলা নাইট্রোজেন বায়ুমণ্ডল রয়েছে, তা অত্যন্ত নিম্নচাপে হঠাৎ সম্প্রসারিত হয়ে মহাশূন্যে ছড়িয়ে পড়বে। বিস্ফোরণের কেন্দ্রবিন্দুতে বরফ গলে তৈরি হবে বাষ্পীয় গর্ত, যার চারপাশে সৃষ্ট তাপীয় চাপ নতুন কোনো মাইক্রো-গঠন তৈরি করতে পারে—যেমন পাথরের ফাটল, গ্যাস ফেটে বের হওয়া, বা ভূ-পৃষ্ঠে সূক্ষ্ম পরিবর্তন।

তবে এই বিস্ফোরণ হবে নিঃশব্দ, কারণ সাউন্ড-ওয়েভ বা শব্দতরঙ্গ ছড়ানোর মতো যথেষ্ট ঘনমাধ্যম নেই প্লুটোর বায়ুমণ্ডলে। এবং যেহেতু প্লুটো পৃথিবী থেকে এতটাই দূরে, এবং তার ভর এতটাই কম যে বিস্ফোরণের কোনো কম্পন বা বিকিরণ পৃথিবীর মতো স্থিতিশীল গ্রহে পৌঁছাবে না।

এমনকি, এই বিস্ফোরণের ফলে কোনো গ্রহগত কক্ষপথ, মহাজাগতিক ভারসাম্য বা বৃহত্তর সৌরজগতীয় ঘটনার সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই নেই। এটি হবে একান্তই স্থানীয়, সীমিত, ও বৈজ্ঞানিকভাবে বিচ্ছিন্ন ঘটনা, যার নৃশংসতা বা সৌন্দর্য একমাত্র উপগ্রহ কিংবা দূরবর্তী মহাকাশযান থেকেই উপভোগযোগ্য।

সারসংক্ষেপে, প্লুটোর মতো একটি ছোট, বরফে ঢাকা ও গ্যাসহীন জগতে পারমাণবিক বিস্ফোরণ অনেকটা মহাকাশের মৃতপ্রায় এক প্রান্তে একঝলক আগুন জ্বালিয়ে আবার নিভে যাওয়ার মতো—অলংকৃত, ক্ষণস্থায়ী, এবং নীরব।

তাহলে পৃথিবীতে কী ঘটবে?

এই প্রশ্নের উত্তর হলো যে পৃথিবীর আকাশে হয়তো এক মুহূর্তের জন্য এক ঝলক উজ্জ্বল আলো দেখা যেতে পারে, যেন চাঁদের একপাশ হঠাৎ করে আগুনের ফুলকি হয়ে উঠেছে। তবে এই আলো খুবই ক্ষণস্থায়ী, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তা মিলিয়ে যাবে। যারা দূরবীন বা মহাকাশ পর্যবেক্ষণ যন্ত্র দিয়ে আকাশ দেখছে, তারাই কেবল এই দৃষ্টিনন্দন ঝলক উপভোগ করতে পারবে।

১৯৬২ সালে হাওয়াইয়ের কাছে মহাশূন্যে স্টারফিশ প্রাইম পারমাণবিক বিস্ফোরণের কয়েক মিনিট পর নজরদারি বিমানের ভেতর থেকে দেখা কৃত্রিম অরোরা। – ছবি: অ্যালামি

কিন্তু এটাই সব নয়—পৃথিবীর মাটিতে বসে কেউ কোনো কম্পন বা চাপ অনুভব করবে না। আমাদের বাতাস, সমুদ্র, স্থলভাগ কিংবা জীবজগত—কিছুই নড়বে না, কাঁপবে না।

এর প্রধান কারণ হলো দূরত্ব। চাঁদ আর পৃথিবীর মাঝখানে প্রায় ৩ লক্ষ ৮৪ হাজার কিলোমিটার ব্যবধান রয়েছে। এতো বিশাল দূরত্ব অতিক্রম করে কোনো শকওয়েভ, বিকিরণ বা ধাক্কা আমাদের নাগালে পৌঁছায় না।

রেডিয়েশন বা পারমাণবিক বিকিরণও আমাদের পক্ষে প্রায় নিরীহ। মহাশূন্যে এই বিকিরণ ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন দিকে হারিয়ে যায়, পৃথিবীর চৌম্বকক্ষেত্র এবং বায়ুমণ্ডল এটি আটকে রাখে বা প্রতিহত করে।

তেমনি, EMP (Electromagnetic Pulse)—যা পৃথিবীতে বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতির মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে—চাঁদের মতো বায়ুশূন্য পরিবেশে তার কার্যক্ষমতা হারায়। EMP-এর জন্য পরিবাহী মাধ্যম দরকার হয়, কিন্তু মহাশূন্যে তা নেই বললেই চলে। ফলে EMP ও অন্যান্য বিকিরণ মহাশূন্যেই নিঃশেষ হয়ে যায়।

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply