নোবেল পুরস্কারকে সাধারণত মানব সভ্যতার সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে দেখা হয়। বিজ্ঞানের জগতে এটি এমন এক সম্মান, যা একজন গবেষকের নামকে ইতিহাসে স্থায়ীভাবে লিখে দেয়। পদার্থবিদ Richard Feynman কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, ইতিহাসের কোনো মৃত ব্যক্তির সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পেলে তিনি কাকে বেছে নিতেন। উত্তরে তিনি বলেছিলেন, তিনি তাঁর বাবার সঙ্গে কথা বলতে চাইবেন এবং শুধু একটি কথাই বলবেন ‘আমি নোবেল পুরস্কার জিতেছি।’ এই উত্তরটাই স্পষ্ট করে, নোবেলের প্রতীকী শক্তি কতটা গভীর।
নোবেল পুরস্কারের ইতিহাস শুরু হয় সুইডিশ শিল্পপতি ও উদ্ভাবক Alfred Nobel এর হাত ধরে। ১৮৯৫ সালে নিজের উইলে তিনি উল্লেখ করেন, তাঁর সম্পদের বড় অংশ এমন একটি তহবিলে দেওয়া হবে, যেখান থেকে প্রতি বছর মানবজাতির সবচেয়ে বড় উপকারে আসা মানুষদের পুরস্কৃত করা হবে। ১৯০১ সালে প্রথমবারের মতো পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, চিকিৎসাবিজ্ঞান, সাহিত্য ও শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। পরে অর্থনীতিও এর সঙ্গে যুক্ত হয়। ধীরে ধীরে নোবেল এমন এক মর্যাদায় পৌঁছে যায় যে, অন্যান্য পুরস্কারকেও এর সঙ্গে তুলনা করে ব্যাখ্যা করা শুরু হয়। গণিতের Fields Medal কে বলা হয় ‘গণিতের নোবেল’, আর হাস্যরসাত্মক Ig Nobel Prize তৈরি হয় নোবেলের ব্যঙ্গাত্মক সংস্করণ হিসেবে।
তবে এই উজ্জ্বল ইতিহাসের আড়ালেও রয়েছে অসংখ্য বিতর্ক। সবচেয়ে বড় সমালোচনার একটি হলো, নোবেল পুরস্কার সর্বোচ্চ তিনজনকে দেওয়া যায়। আধুনিক বিজ্ঞান যেখানে শত শত গবেষকের যৌথ প্রচেষ্টার ফল, সেখানে এই নিয়ম অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিজ্ঞানীকে আড়ালে ফেলে দেয়। ২০০৮ সালের পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়েছিল Makoto Kobayashi এবং Toshihide Maskawa কে। কিন্তু বহু বিজ্ঞানীর মতে, Nicola Cabibbo’র অবদানও সেখানে সমান গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একইভাবে কোয়ান্টাম ইলেকট্রোডাইনামিক্সে অবদানের জন্য Richard Feynman, Julian Schwinger এবং Sin-Itiro Tomonaga নোবেল পেলেও Freeman Dyson বাদ পড়ে যান, যদিও তিনিই গাণিতিকভাবে তাঁদের তত্ত্বগুলোর সমতা দেখিয়েছিলেন।
নারী বিজ্ঞানীদের ক্ষেত্রে নোবেল পুরস্কারের ইতিহাস আরও বেশি বিতর্কিত। বহু গুরুত্বপূর্ণ নারী গবেষক তাঁদের প্রাপ্য স্বীকৃতি পাননি। Chien-Shiung Wu পরীক্ষার মাধ্যমে বিটা ক্ষয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ভবিষ্যদ্বাণী প্রমাণ করেছিলেন। কিন্তু নোবেল দেওয়া হয় শুধু Chen Ning Yang এবং Tsung-Dao Lee কে। একইভাবে ডিএনএর গঠন আবিষ্কারে Rosalind Franklin এর এক্স-রে ডিফ্র্যাকশন ছবি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ১৯৬২ সালে নোবেল পান Francis Crick, James Watson এবং Maurice Wilkins। ফ্র্যাঙ্কলিনের নাম তখন উপেক্ষিতই থেকে যায়। মাত্র ৩৭ বছর বয়সে তিনি ক্যান্সারে মারা যান।
আরেকটি আলোচিত উদাহরণ Jocelyn Bell Burnell। তিনিই প্রথম রেডিও পালসার পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু ১৯৭৪ সালের নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় তাঁর সুপারভাইজার Antony Hewish কে। জ্যোতির্বিজ্ঞানী সমাজ এতটাই ক্ষুব্ধ হয়েছিল যে অনেকে সেই পুরস্কারকে ব্যঙ্গ করে No-Bell Prize বলতে শুরু করেন।
নোবেলকে ঘিরে বহু জনপ্রিয় মিথও তৈরি হয়েছে। সবচেয়ে পরিচিত গল্প হলো, গণিতে নোবেল পুরস্কার নেই কারণ আলফ্রেড নোবেলের স্ত্রী নাকি এক গণিতবিদের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছিলেন। কিন্তু ইতিহাসে এর কোনো প্রমাণ নেই। বাস্তবে নোবেল সম্ভবত এমন ক্ষেত্রগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন যেগুলোর ব্যবহারিক প্রভাব বেশি।
নোবেল পাওয়ার পর অনেক বিজ্ঞানীর জীবনও অদ্ভুতভাবে বদলে গেছে। সম্মান ও খ্যাতির চাপে তাঁদের গবেষণা কমে যায়। Richard Feynman নিজেও আশঙ্কা করেছিলেন, নোবেল জয়ের পর হয়তো তিনি আর গুরুত্বপূর্ণ কিছু করতে পারবেন না। যদিও পরে তিনি আরও উল্লেখযোগ্য কাজ করেন। তবে সবচেয়ে অদ্ভুত উদাহরণ সম্ভবত Brian Josephson। কঠিন অবস্থার পদার্থবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের জন্য নোবেল পাওয়ার পর তিনি অতিপ্রাকৃত বিষয়, টেলিপ্যাথি এবং ধ্যানের সঙ্গে কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের সম্পর্ক খুঁজতে শুরু করেন। বর্তমানে তিনি Mind-Matter Unification Project নামে একটি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত।
নোবেলের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্কও বহুবার অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি করেছে। Linus Pauling একমাত্র ব্যক্তি যিনি দুটি আলাদা নোবেল এককভাবে জিতেছেন—রসায়ন ও শান্তিতে। শান্তিতে নোবেল পাওয়ার পর তাঁকে হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানানো হয়। মজার বিষয় হলো, আমন্ত্রণ পাওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই তিনি মার্কিন সরকারের পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার নীতির বিরুদ্ধে হোয়াইট হাউসের সামনে বিক্ষোভ করছিলেন। তখন প্রেসিডেন্ট John F. Kennedy মজা করে বলেছিলেন, ‘শুনেছি আপনি কয়েকদিন ধরেই হোয়াইট হাউসের আশেপাশে ছিলেন।’
নোবেল পুরস্কার নিঃসন্দেহে মানব সভ্যতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীকগুলোর একটি। কিন্তু এর ইতিহাসকে ঘেঁটে দেখলে বোঝা যায় এটা কখনোই নিখুঁত ছিল না। বিজ্ঞান, রাজনীতি, ব্যক্তিগত পক্ষপাত এবং সামাজিক বাস্তবতার জটিল মিশ্রণ সবসময়ই নোবেলকে ঘিরে থেকেছে, হয়তো থাকবেও।

