একসময় বৈজ্ঞানিক গবেষণার মানচিত্রে পশ্চিমা বিশ্ব, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রই ছিল মূল কেন্দ্র। সেটা এখন বদলাচ্ছে। ধীরে হলেও বদলাচ্ছে। আর এই বদলের সবচেয়ে বড় মুখ চীন। Nature Index ২০২৫-এর হিসাব বলছে, গবেষণার শীর্ষে এখন চীন। দেশটির রিসার্চ শেয়ার ৩২,১২১.৮১, যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় প্রায় ৪৫% বেশি। শুধু শীর্ষে ওঠা নয়, এই ওঠার ভেতরে আছে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ আর গবেষণাকে জাতীয় শক্তিতে রূপ দেওয়ার স্পষ্ট চেষ্টা।
আসলে চীনের গল্পটা এখন ভবিষ্যতের গল্প। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্পেস সায়েন্স, রোবটিক্স, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং, নবায়নযোগ্য শক্তি—সব জায়গাতেই দেশটি জোরে এগোচ্ছে। একসময় যাকে শুধু উৎপাদনের কারখানা হিসেবে দেখা হতো, সেই চীন এখন মৌলিক গবেষণার বড় খেলোয়াড়।
তবে তাই বলে যুক্তরাষ্ট্রকে বাদ দেওয়া যায় না। একদমই না। তাদের গ্লোবাল রিসার্চ শেয়ার ১০.১% কমলেও, উচ্চমানের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনে দেশটি এখনো খুবই শক্তিশালী অবস্থানে আছে। Nature Index ২০২৫ অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল রিসার্চ শেয়ার ২২,০৮২.৫৯। মানে, পতন আছে, কিন্তু ভেঙে পড়া নেই। বরং চীন, ভারত আর দক্ষিণ কোরিয়ার উত্থানে যুক্তরাষ্ট্রের অংশটা একটু সঙ্কুচিত হয়েছে, এই যা।
জাপানের অবস্থা একটু অন্যরকম। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে তাদের ঐতিহ্য পুরোনো, কিন্তু এখন চাপও কম নেই। Nature Index ২০২৫-এ ৫ম স্থানে থাকা জাপানের রিসার্চ শেয়ার ৩,১৮৫.৩৯। আর প্রবৃদ্ধি নেমে গেছে নেতিবাচক ৯%-এ। কেন এমন হচ্ছে? বার্ধক্যজনিত জনসংখ্যা, আর তরুণ গবেষকের ঘাটতি—দুটোই বড় কারণ। আমার কাছে এটা খুবই পরিচিত ধরনের সংকট মনে হয়। দক্ষতা আছে, কিন্তু ধারাবাহিক নতুন শক্তি কমে যাচ্ছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের উত্থানও চোখে পড়ার মতো। ভারত এবার বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের গবেষণা তালিকায় ৯ম স্থানে উঠেছে। দেশের মোট রিসার্চ শেয়ার ১,৭৮৩.৩৪, আর প্রবৃদ্ধি প্রায় ২%। এটা কোনো হঠাৎ উত্থান নয়। গবেষণা পরিকাঠামো, প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন আর নতুন প্রজন্মের বিজ্ঞানমনস্কতা—সব মিলিয়েই এই অগ্রগতি।
পাকিস্তান সংখ্যায় অনেক পিছিয়ে থাকলেও একদম আলাদা করে চোখে পড়ে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে Nature Index ২০২৫-এর শীর্ষ ৫০-এ জায়গা পাওয়া একমাত্র দেশ তারা। ৪৪তম স্থানে থাকা পাকিস্তানের রিসার্চ শেয়ার ৪০.৯০, আর প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ১৪.৩%। সংখ্যাগুলো এখানে আশার চেয়ে বেশি সতর্কবার্তা দেয়।
রাশিয়ার দিকেও তাকাতে হয়। ভূ-রাজনৈতিক চাপের মধ্যেও পদার্থবিজ্ঞান আর নিউক্লিয়ার এনার্জি গবেষণায় দেশটি এখনও নিজেদের জায়গা ধরে রেখেছে। Nature Index ২০২৫-এ রাশিয়া ২২তম স্থানে। রিসার্চ শেয়ার ৪০০.৮২, কিন্তু প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ৮.৪%। মানে শক্তি আছে, কিন্তু গতি কমে এসেছে। এটা খুব পরিষ্কার।
এই বছরের আরেকটা বড় ইঙ্গিত হলো—গবেষণাপত্র প্রকাশের রেকর্ড সংখ্যাও বেড়েছে। চীন, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, জাপান আর ভারত—সবাই এই প্রবাহে বড় ভূমিকা রাখছে। কিন্তু শুধু সংখ্যা বাড়লেই এখন আর হয় না। গবেষণার প্রভাব, মান, আর বাস্তব জীবনের সঙ্গে তার সংযোগ—এগুলোই এখন আসল প্রশ্ন।
আর সেখানেই আসল খেলা। প্রযুক্তিসমৃদ্ধ দেশগুলো গবেষণা আর উন্নয়নে বিপুল টাকা ঢালছে। কেন? কারণ তারা বুঝে গেছে, ভবিষ্যৎ শুধু উৎপাদনে নেই। আছে জ্ঞানে। আছে উদ্ভাবনে।
Nature Index ২০২৫ তাই একটাই কথা বলছে: বৈশ্বিক গবেষণার পুরোনো কেন্দ্রগুলো আর একক আধিপত্য ধরে রাখতে পারছে না। বিশ্ব এখন বহু-কেন্দ্রিক হয়ে উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনও শক্তিশালী, কিন্তু একচ্ছত্র নয়। আর চীন, ভারত, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো এশীয় দেশগুলো এখন শুধু অনুসারী নয়। তারা নিজেরাই নতুন গবেষণা-ক্ষমতার মানচিত্র আঁকছে।

