আমাদের পৃথিবীর নীল রঙের সাগর একসময় ছিল সবুজ। কিন্তু কেমন হবে ভবিষ্যতে যদি তা হয় বেগুনি বা লাল? এমনটি হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিজ্ঞানীরা।
পৃথিবীর প্রায় তিন চতুর্থাংশ জুড়ে আছে সাগর। যা মহাকাশ থেকে এক ফ্যাকাশে নীল বিন্দুর মতো দেখা যায়। আসলে সাগরের পানির নিজস্ব কোনো রং নেই, এটি মূলত স্বচ্ছ। তবে সূর্যের আলো পানিতে পড়লে লাল, কমলা আর হলুদ তরঙ্গদৈর্ঘ্যের আলো দ্রুত শোষিত হয়ে যায়, আর নীল আলো তুলনামূলক কম শোষিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। তাই আমাদের চোখে সমুদ্র নীল মনে হয়। কিন্তু অতীতে এর রং পরিবর্তিত হয়েছিল এবং ভবিষ্যতেও পরিবর্তিত হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
সম্প্রতি জাপানি গবেষকরা Nature জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় যুক্তি দিয়েছেন যে পৃথিবীর সাগর এক সময় সবুজ ছিল। এই পরিবর্তনের কারণ ছিল মূলত সাগরের রাসায়নিক গঠন ও সালোকসংশ্লেষণের বিবর্তন। প্রাচীনকালে প্রায় ৩.৮ থেকে ১.৮ বিলিয়ন বছর আগে সাগরের পানিতে আয়রন ছিল প্রচুর এবং বাতাসে অক্সিজেন ছিল না। সেই সময় জীবনের অস্তিত্ব সীমাবদ্ধ ছিল এককোষী প্রাণীদের মধ্যে, যারা সাগরে বাস করত। স্থলভাগ তখন ধূসর, বাদামী আর কালো শিলা ও পলিতে ঢাকা ছিল। বৃষ্টির পানি মহাদেশীয় শিলা থেকে আয়রন দ্রবীভূত করে নদীর মাধ্যমে সাগরে নিয়ে আসত, যা পরে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

(ছবির ক্রেডিট: ফ্যান লি ম্যাককাস্কিল, ইউএসএন, পাবলিক ডোমেইন, উইকিমিডিয়া)
সেসময় কিছু প্রাণী সূর্য থেকে শক্তি আহরণ করত অর্থাৎ তারা সালোকসংশ্লেষণ করত, তবে অক্সিজেন ছাড়াই। পরবর্তীতে যখন কিছু প্রাণী সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে অক্সিজেন তৈরি করতে শুরু করে, তখন সেই অক্সিজেন সাগরের আয়রনের সঙ্গে বিক্রিয়া করে পানিকে সবুজ করে তোলে। ধীরে ধীরে এই অক্সিজেন সাগর ও বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে, যা থেকে শুরু হয় ‘গ্রেট অক্সিডেশন ইভেন্ট’। এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত পালাবদল যা পৃথিবীতে জটিল জীবের জন্য পরিবেশ তৈরি করে।
এই গবেষণাটি শুরু হয় একটি পর্যবেক্ষণ থেকে। গবেষকরা দেখেছেন যে, জাপানের ইও জিমা দ্বীপের আশেপাশের পানির রঙ সবুজাভ। এর একটি কারণ হলো পানিতে উপস্থিত অক্সিডাইজড আয়রন (Fe³⁺)। এই এলাকায় নীল-সবুজ শৈবাল ভালোভাবে বেড়ে ওঠে কারণ তারা সবুজ পানিতে আলো শোষণ করতে বেশি দক্ষ।
এই গবেষণায় আরও বলা হয় যে, সাগরের রঙ নির্ভর করে পানির রাসায়নিক গঠন এবং জীবের উপস্থিতির ওপর। তাই ভবিষ্যতেও সাগরের রঙ পরিবর্তনের সম্ভাবনা বাস্তব। যদি পরিবেশে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায় এবং বেগুনি সালফার ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে সাগরের রঙ বেগুনি হয়ে যেতে পারে।
লাল সাগরের মতো পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে যদি ভূমি থেকে নাইট্রোজেন ও ফসফরাস জাতীয় সার পানিতে অতিরিক্ত মাত্রায় আসে। এটি সাধারণত গ্রীষ্মকালে বেশি ঘটে যখন “রেড টাইড” নামে পরিচিত লাল শৈবালের বিস্তার হয়।
ভবিষ্যতে সূর্য আরও উজ্জ্বল হলে পৃথিবীতে বাষ্পীভবন বাড়বে এবং অতিবেগুনি রশ্মি তীব্র হবে। তখন গভীর সাগরের অক্সিজেনহীন অঞ্চলে থাকা বেগুনি সালফার ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়তে পারে। এতে উপকূলীয় এলাকার পানি বেগুনি, বাদামী কিংবা সবুজ হয়ে উঠতে পারে। আর গভীর নীল সাগর ফাইটোপ্ল্যাঙ্কটনের অভাবে তার রঙ হারাতে পারে।
