রাতের আকাশের দিকে তাকালে আমরা যা দেখি তা মূলত অসংখ্য তারা, নীহারিকা আর দূরবর্তী গ্যালাক্সির ঝিলমিল আলো। এই দৃশ্য আমাদের বিস্মিত করে, কিন্তু এর পেছনে আরও একটি গভীর প্রশ্ন লুকিয়ে থাকে—এই বিশাল মহাবিশ্ব আসলে কী দিয়ে তৈরি? আমরা জানি, আমাদের শরীর, পৃথিবী, সূর্য, এমনকি দূরবর্তী নক্ষত্রও গঠিত হয়েছে ক্ষুদ্র কণিকা দিয়ে, যাদের আমরা বলি পরমাণু। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই দৃশ্যমান মহাবিশ্বে মোট কতগুলো পরমাণু থাকতে পারে? সংখ্যাটা কি সত্যিই গণনার বাইরে, নাকি বিজ্ঞানের হাত ধরে আমরা অন্তত একটি যুক্তিসংগত অনুমানে পৌঁছাতে পারি? আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ও পদার্থবিজ্ঞান এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করেছে, এবং সেই অনুসন্ধানই আমাদের নিয়ে যায় এক অবিশ্বাস্য সংখ্যার কাছে।
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। বিজ্ঞানীরা যখন ‘মহাবিশ্বে কতগুলো পরমাণু আছে’ বলেন, তখন তারা পুরো মহাবিশ্বকে বোঝান না। কারণ পুরো মহাবিশ্বের আকার আদৌ সীমিত কি না তা আমরা জানি না। অনেক মহাজাগতিক মডেল অনুযায়ী মহাবিশ্ব অসীমও হতে পারে। তাই অসীম মহাবিশ্বে মোট পরমাণুর সংখ্যা নির্ধারণ করা অর্থহীন। এজন্য বিজ্ঞানীরা একটি নির্দিষ্ট ধারণা ব্যবহার করেন, যাকে বলা হয় দৃশ্যমান মহাবিশ্ব বা observable universe। দৃশ্যমান মহাবিশ্ব বলতে বোঝানো হয় সেই অংশটুকু, যেখান থেকে আলো মহাবিশ্বের বয়সের মধ্যে আমাদের কাছে পৌঁছাতে পেরেছে। বর্তমান হিসাব অনুযায়ী, এই দৃশ্যমান মহাবিশ্বের ব্যাস প্রায় ৯৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ।

এখন প্রশ্ন আসে, এই দৃশ্যমান মহাবিশ্বে আসলে কী পরিমাণ বস্তু আছে? আধুনিক কসমোলজি আমাদের বলে যে মহাবিশ্বে যা কিছু আছে তার সবটাই পরমাণু দিয়ে তৈরি নয়। মোট শক্তি-ঘনত্বের প্রায় ৬৮ শতাংশ হলো ডার্ক এনার্জি, প্রায় ২৭ শতাংশ ডার্ক ম্যাটার, আর মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ হলো সাধারণ বা ব্যারিয়নিক পদার্থ। এই ব্যারিয়নিক পদার্থই পরমাণু দিয়ে তৈরি। অর্থাৎ, আমাদের চারপাশের পরিচিত সবকিছু যেমন গাছ, মানুষ, গ্রহ, তারা সব মিলিয়ে মহাবিশ্বের মোট বস্তুর খুবই ছোট একটি অংশ।
এই ৫ শতাংশ সাধারণ পদার্থের পরিমাণ জানার জন্য বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ব্যবহার করেন। কসমিক মাইক্রোওয়েভ ব্যাকগ্রাউন্ড বিকিরণ, গ্যালাক্সির গতি, গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের ভর এই সব তথ্য মিলিয়ে তারা অনুমান করেন দৃশ্যমান মহাবিশ্বে মোট কত ভর পরিমাণ সাধারণ পদার্থ আছে। এই ভরকে যদি কিলোগ্রামে প্রকাশ করা হয়, তাহলে তা প্রায় ১০৫৩ থেকে ১০৫৪ কিলোগ্রামের কাছাকাছি।
এখন এই ভরকে পরমাণুর সংখ্যায় রূপান্তর করতে হলে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা দরকার। মহাবিশ্বের অধিকাংশ পরমাণুই হাইড্রোজেন। হাইড্রোজেন পরমাণু সবচেয়ে হালকা এবং বিগ ব্যাংয়ের পর প্রথমেই সবচেয়ে বেশি তৈরি হয়েছিল। একটি হাইড্রোজেন পরমাণুর ভর প্রায় ১.৬৭ × ১০⁻২৭ কিলোগ্রাম। যদিও হিলিয়াম এবং আরও ভারী মৌলও আছে, তবুও গড় হিসেবে হাইড্রোজেন ধরলে হিসাব খুব বেশি ভুল হয় না।
এখন যদি আমরা মোট ব্যারিয়নিক পদার্থের ভরকে একটি পরমাণুর ভর দিয়ে ভাগ করি, তাহলে একটি বিশাল সংখ্যা পাওয়া যায়। এই হিসাব অনুযায়ী, দৃশ্যমান মহাবিশ্বে মোট পরমাণুর সংখ্যা প্রায় ১০৮২ এর কাছাকাছি। এই সংখ্যাটিকে ভাষায় প্রকাশ করা সত্যিই কঠিন। এটি হলো ১ এর পরে ৮২টি শূন্য। অর্থাৎ, পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বে প্রায় ১০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০,০০০ টি পরমাণু রয়েছে । আমাদের দৈনন্দিন জীবনের যেকোনো সংখ্যার তুলনায় এটি অকল্পনীয়ভাবে বড়।
এই সংখ্যা শুনে অনেকেই ভাবতে পারেন, এটি কি নিশ্চিত সংখ্যা? এর উত্তর হলো—না। এটি একটি আনুমানিক হিসাব। বিজ্ঞানীরাও এই বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত নন। কারণ এই হিসাবের পেছনে কিছু অনুমান আছে। যেমন, সাধারণ পদার্থ মহাবিশ্বে সমানভাবে ছড়িয়ে আছে বলে ধরা হয়, পরমাণুর গড় ভর হিসেবে হাইড্রোজেনকে ধরা হয় এবং পর্যবেক্ষণযোগ্য তথ্যগুলোরও নিজস্ব সীমাবদ্ধতা আছে। তাই প্রকৃত সংখ্যা এর কাছাকাছি হলেও কিছুটা কম বা বেশি হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই হিসাব কেবল দৃশ্যমান মহাবিশ্বের জন্য। দৃশ্যমান মহাবিশ্বের বাইরে কী আছে, আমরা জানি না। যদি মহাবিশ্ব সত্যিই অসীম হয়, তাহলে পরমাণুর সংখ্যাও অসীম হতে পারে। আবার যদি মহাবিশ্ব সীমিত কিন্তু দৃশ্যমান অংশের চেয়ে অনেক বড় হয়, তাহলেও মোট পরমাণুর সংখ্যা আমাদের অনুমানের চেয়ে অনেক বেশি হতে পারে। বর্তমান বিজ্ঞান এই প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দিতে পারে না।
তবুও এই আনুমানিক সংখ্যা আমাদের একটি গভীর দৃষ্টিভঙ্গি দেয়। আমরা বুঝতে পারি, মহাবিশ্ব কতটা বিশাল এবং আমাদের অস্তিত্ব কতটা ক্ষুদ্র। একই সঙ্গে এটাও বোঝা যায়, এত অগণিত পরমাণুর ভেতর নির্দিষ্ট কিছু পরমাণু একত্র হয়ে জীবনের জন্ম দিয়েছে, চিন্তা ও চেতনার উদ্ভব ঘটিয়েছে যা নিজেই এক বিস্ময়কর ঘটনা।
সবশেষে বলা যায়, দৃশ্যমান মহাবিশ্বে মোট পরমাণুর সংখ্যা প্রায় ১০৮২—এই ধারণাটি কোনো কল্পবিজ্ঞান নয়, বরং আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ও কসমোলজির যৌথ প্রয়াসের ফল। যদিও এই সংখ্যা চূড়ান্ত বা নির্ভুল নয়, তবুও এটি আমাদের মহাবিশ্ব সম্পর্কে ভাবার একটি শক্ত ভিত্তি দেয়। এই বিশাল সংখ্যার ভেতর দাঁড়িয়ে মানুষ নিজেকে হয়তো খুব ছোট মনে করতে পারে, কিন্তু একই সঙ্গে এই মহাবিশ্বকে বোঝার ক্ষমতাই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।
