বর্তমান সময়ের সবচেয়ে ব্যবহৃত ওষুধ এর মধ্যে একটি হলো অ্যান্টিবায়োটিক যা অনেক ক্ষেত্রে জীবন বাঁচানোর পিছনেও দায়ী বটে। তবে বর্তমানে সবচেয়ে বড় চিন্তার যে বিষয় তা হচ্ছে অ্যান্টিবায়োটিক রেসিসটেন্স। কিন্তু কেনো এটা এত চিন্তার বিষয়? চলুন সংক্ষেপে অ্যান্টিবায়োটিক এবং অ্যান্টিবায়োটিক রেসিসটেন্স সম্পর্কে সংক্ষেপে জেনে আসি শুরুতে তাহলে।
অ্যান্টিবায়োটিক হলো এমন এক ধরনের ওষুধ যা ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে বা তাদের বৃদ্ধি থামিয়ে দেয়। এটা মূলত ব্যাকটেরিয়াল সংক্রমণ নিরাময়ের জন্য ব্যবহার করা হয়। প্রথম অ্যান্টিবায়োটিকের গল্প শুরু হয়েছিল ১৯২৮ সালে। ব্রিটিশ বিজ্ঞানী অ্যালেকজান্ডার ফ্লেমিং লক্ষ্য করেন যে Penicillium notatum নামের এক ছত্রাক চারপাশের ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলছে।

সেখান থেকেই তৈরি হয় প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক পেনিসিলিন। পেনিসিলিন আবিষ্কার মানুষের চিকিৎসায় বিপ্লব ঘটায়। আগে যেসব সংক্রমণে মানুষ সহজেই মারা যেত, যেমন নিউমোনিয়া বা ক্ষত সংক্রমণ সেগুলো অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে সহজেই চিকিৎসা সম্ভব হলো।তাহলে কি বুঝতে পারছেন অ্যান্টিবায়োটিক ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ? এখন প্রশ্ন উঠছে অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স টা তাহলে আবার কি?
অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স হলো সেই ক্ষমতা যার ফলে ব্যাকটেরিয়া কোনো অ্যান্টিবায়োটিক দ্বারা মারা যায় না বা তাদের বৃদ্ধি থামে না। প্রথম এন্টিবায়োটিকের ব্যবহার শুরু হওয়ার পর খুব দ্রুত বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেন কিছু ব্যাকটেরিয়া পেনিসিলিনের মতো ওষুধের ওপর প্রতিরোধ ক্ষমতা দেখাচ্ছে। ১৯৪০-এর দশকে চিকিৎসকরা লক্ষ্য করেন, একই সংক্রমণ আবারও হয় এবং ওষুধ ঠিক মতো কাজ করছে না। গবেষকরা বুঝতে পারলেন, ব্যাকটেরিয়ার ডিএনএ-তে আকস্মিক পরিবর্তন বা প্লাজমিডে রেসিস্ট্যান্ট জিন থাকায় তারা বাঁচতে সক্ষম হচ্ছে। ধীরে ধীরে মানুষ জানল ওষুধ বেশি বা ভুলভাবে ব্যবহার করলে এই প্রতিরোধ ক্ষমতা ছড়ায়। আসুন এর ভয়াবহতা কতটুকু তা একটু জেনে নেওয়া যাক।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) ২০২৩ সালের একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে যে, ২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী ব্যাকটেরিয়াল AMR সরাসরি ১.২৭ মিলিয়ন মৃত্যুর জন্য দায়ী ছিল এবং মোট ৪.৯৫ মিলিয়ন মৃত্যুর সাথে সম্পর্কিত ছিল। এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
The Business Standard (TBS, Bangladesh) এবং Institute of Epidemiology Disease Control and Research (IEDCR) এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে, ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্সের হার ১১% বৃদ্ধি পেয়েছে। এছাড়া, কিছু অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা ৮২% পর্যন্ত কমে গেছে, যা ২০১৭ সালে ছিল ৭১%। এটি হাসপাতাল এবং বহির্বিভাগ উভয় ক্ষেত্রেই লক্ষণীয়।
The Lancet / Global Research on Antimicrobial Resistance (GRAM) Project এর এক গবেষণাপত্র অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী, ২০২৫ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক সংক্রান্ত মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় ৩৯ মিলিয়ন হতে পারে, যা বছরে ৮.২২ মিলিয়ন পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এই পরিস্থিতি স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করবে এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির কারণ হবে।
অ্যান্টিবায়োটিক মানুষের চিকিৎসা বিজ্ঞানে এক অনন্য আশীর্বাদ। কিন্তু এর অযথা ও অতিরিক্ত ব্যবহার এখন আমাদের জন্য এক বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্স। যদি এই প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অর্জিত বহু সাফল্য আবারও ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে। সহজ সংক্রমণ, যেগুলো একসময় অ্যান্টিবায়োটিকের মাধ্যমে সহজেই নিরাময় করা যেত, ভবিষ্যতে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। তাই আমাদের প্রত্যেকের সচেতন হওয়া জরুরি শুধু চিকিৎসকের পরামর্শে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা, পুরো কোর্স সম্পন্ন করা এবং অপ্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে এড়িয়ে চলা।
লেখক : মাহীয়ান মীন

