কল্পনা করুন, আপনি একটি সতেজ, লাল আপেলকে একটি সম্পূর্ণ নিশ্ছিদ্র বাক্সের ভেতর রেখে ঢাকনাটি শক্ত করে আটকে দিলেন। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এই বাক্সটি হলো একটি Isolated System। সহজ কথায়, এটি এমন এক বিচ্ছিন্ন জগত, যার ভেতর থেকে কোনো কিছুই (এমনকি তাপ বা আলোও) বাইরে যেতে পারে না এবং বাইরে থেকেও কোনো কিছু ভেতরে প্রবেশ করতে পারে না।
এখন প্রশ্ন হলো, যদি এই বাক্সটিকে অসীম সময়ের জন্য রেখে দেওয়া হয়, তবে বাক্সের ভেতরে কী ঘটবে? সাধারণ কাণ্ডজ্ঞান বলবে, আপেলটি পচে ধুলোয় মিশে যাবে। কিন্তু আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান, বিশেষ করে কোয়ান্টাম মেকানিক্স এবং থার্মোডাইনামিক্স শোনাচ্ছে এক অবিশ্বাস্য গল্প। অসীম সময়ের ব্যবধানে সেই পচে যাওয়া আপেলটি নাকি আবার তার আগের সতেজ রূপে ফিরে আসতে পারে!
বিজ্ঞানের ভাষায় এই ধারণাটি Apple in a Box Theory নামে পরিচিত, যা মূলত Poincaré Recurrence Theorem-এর ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। চলুন, নতুন করে এই অদ্ভুত ঘটনার পেছনের বিজ্ঞানটি বুঝে নেওয়া যাক।
ক্ষয়, বিশৃঙ্খলা এবং হিট ডেথ
শুরুতে আপেলটি স্বাভাবিক নিয়মেই পচতে শুরু করবে। ব্যাকটেরিয়া এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে এটি ধীরে ধীরে ধুলো, গ্যাস এবং শক্তিতে রূপান্তরিত হবে। একটা সময় আসবে যখন আপেলটির আর কোনো অস্তিত্বই থাকবে না, বাক্সের ভেতর শুধু কিছু অণু-পমাণু এবং শক্তি এলোমেলোভাবে ঘুরে বেড়াবে।
এই অবস্থাকে বলা হয় Heat Death বা তাপীয় মৃত্যু। নাম শুনে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এর মানে এই নয় যে সবকিছু ধ্বংস হয়ে গেছে। এর অর্থ হলো, বাক্সের ভেতরের তাপমাত্রা সব জায়গায় সমান হয়ে গেছে এবং শক্তি এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, নতুন করে কোনো কাজ করার মতো বা পরিবর্তন ঘটানোর মতো শক্তি আর অবশিষ্ট নেই। তখন সবকিছু শান্ত এবং স্থির মনে হবে, এটিই সর্বোচ্চ বিশৃঙ্খলা বা Entropy।
ধাক্কাধাক্কি ও শক্তির খেলায় তাপ কোথায় যায়?
এখন আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, বাক্সের ভেতরের কণাগুলো তো অনবরত একে অপরের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে, তাহলে এই সংঘর্ষের ফলে তৈরি হওয়া তাপশক্তি কোথায় যাচ্ছে?
যেহেতু আমাদের বাক্সটি একটি আইসোলেটেড সিস্টেম, তাই ভেতরের কোনো শক্তিই বাইরে বেরিয়ে যেতে পারে না। কণাগুলোর সংঘর্ষে যে তাপ বা গতিশক্তি তৈরি হয়, তা বাক্সের ভেতরেই বন্দি থাকে। এই শক্তি কণাগুলোর মধ্যেই বারবার হাতবদল হতে থাকে। অর্থাৎ, শক্তি হারিয়ে যায় না, বরং তা বারবার রূপ বদলায় এবং কণাগুলোকে অনন্তকাল ধরে ছোটাছুটি করতে সাহায্য করে। এই সংরক্ষিত শক্তিই হলো অসীম সময়ের খেলার মূল জ্বালানি।
অসীম সময় ও আপেলের পুনর্জন্ম
বাক্সের ভেতরের অণু-পরমাণুগুলো স্থির হয়ে বসে থাকে না; তারা অনবরত একে অপরের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে এবং নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করছে। যেহেতু বাক্সের আকার নির্দিষ্ট এবং এর ভেতরে থাকা কণা বা শক্তির পরিমাণও নির্দিষ্ট, তাই এই কণাগুলো যতরকমের পসিবল কনফিগারেশনসে সাজতে পারে, তার একটি গাণিতিক সীমা আছে। সংখ্যাটি বিশাল হতে পারে, কিন্তু তা অসীম নয়।
এখন যদি আপনার হাতে অসীম সময় থাকে, তবে কণাগুলো এলোমেলোভাবে সাজতে সাজতে একসময় তাদের সম্ভাব্য সব বিন্যাস শেষ করে ফেলবে। এই সময়টি এতই দীর্ঘ যে তা আমাদের মহাবিশ্বের বয়সের চেয়েও বহু গুণ বেশি। এরপর কী হবে? যেহেতু সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে না, তাই কণাগুলো বাধ্য হবে তাদের পুরোনো বিন্যাস বা সজ্জার পুনরাবৃত্তি করতে। অনেকটা তাসের বান্ডেল বারবার শাফল করার মতো। অসংখ্যবার পুনঃর্বিন্যাসের ফলে একসময় তাসের ক্রমগুলো মিলতে বাধ্য। মজার ব্যাপার হচ্ছে, শুধু আপেলই নয়, এই দীর্ঘ সময়ে বাক্সের ভেতর আপেলের আকৃতির পাশাপাশি অন্য যেকোনো সম্ভাব্য বস্তুরও (যেমন একটি কমলা বা এক টুকরো পাথর) তৈরি হওয়ার গাণিতিক সম্ভাবনা রয়েছে, যদি তা বাক্সের ভরের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়।
বিষয়টি এমন নয় যে আপেলটি উল্টো পথে পচা থেকে ভালো হয়েছে। বরং, তাপীয় মৃত্যুর পরেও সংরক্ষিত শক্তির প্রভাবে (এলোমেলো কণাগুলো অসীম সম্ভাবনার চক্করে পড়ে) কণাগুলো অনবরত নিজেদের বিন্যাস পাল্টেছে এবং সম্পূর্ণ কাকতালীয়ভাবে আবার আপেলের আকৃতি ধারণ করেছে।
বাস্তবে কি এটি সম্ভব?
তাত্ত্বিকভাবে এটি নিখুঁত হলেও, বাস্তবে এমনটা ঘটা প্রায় অসম্ভব। এর পেছনে প্রধান কারণগুলো হলো:
প্রথমত, মহাবিশ্বে ১০০% নিখুঁত আইসোলেটেড সিস্টেম তৈরি করা সম্ভব নয়। কোয়ান্টাম টানেলিং বা হকিং রেডিয়েশনের মতো প্রক্রিয়ায় কিছু না কিছু শক্তি বাক্স থেকে বেরিয়ে যাবেই। শক্তি বেরিয়ে গেলে কণাগুলোর নড়াচড়া থেমে যাবে এবং পুনরাবৃত্তির সুযোগ থাকবে না।
দ্বিতীয়ত, Proton Decay বা প্রোটন ক্ষয়। অনেক বিজ্ঞানীর মতে, পদার্থের মূল গাঠনিক উপাদান প্রোটনও অমর নয়। অত্যন্ত দীর্ঘ সময় পর প্রোটনও ভেঙে যেতে পারে। যদি আপেলটি ফিরে আসার আগেই তার উপাদানগুলো নষ্ট হয়ে যায়, তবে আপেলটি আর গঠিত হতে পারবে না।
পরিশেষে
Apple In a Box থিওরি আমাদের শেখায় যে, অসীম সময়ের ক্যানভাসে অসম্ভব বলে কিছু নেই। একটি বিচ্ছিন্ন বা আইসোলেটেড সিস্টেমে শক্তি কখনো হারিয়ে যায় না, শুধু রূপ বদলায়। আর এই অফুরন্ত শক্তির জোরেই বিশৃঙ্খল ধুলিকণা থেকেও আবার সুশৃঙ্খল আপেল ফিরে আসা গাণিতিকভাবে সম্ভব। যদিও বাস্তবে আমরা আমাদের প্রিয় আপেলটি ফিরে পাব না, কিন্তু এই চিন্তাটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মহাবিশ্বের নিয়মগুলো আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি রোমাঞ্চকর।

