ফুটবলকে বলা হয় অনিশ্চয়তার খেলা। এখানে হট ফেভারিট দল তুলনামূলক দুর্বল দলের কাছে হেরে যায়। আবার অনেক অপ্রত্যাশিত দল বিশ্বমঞ্চে দেখায় তাদের শ্রেষ্ঠত্ব। তবে বিশ্বকাপে এগুলোর দেখা মিলুক কিংবা না, একটা ঘটনা প্রায়শই দেখা যায়। কেউ বলে এবার বিশ্বকাপ জিতবে ব্রাজিল, কেউবা বলে আর্জেন্টিনাই সেরা। কিন্তু এই অনিশ্চয়তার খেলাকেও কি গণিতের মাধ্যমে বশে আনা সম্ভব! বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা কি আগে থেকেই গণিত দিয়ে হিসাব করা যায়?

জানলে অবাক হবেন, জার্মান অর্থনীতিবিদ ও পরিসংখ্যান বিশ্লেষক Joachim Klement তার গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে পরপর তিনটি বিশ্বকাপের সম্ভাব্য বিজয়ীর নাম ঘোষণা করেন। আশ্চর্যের বিষয় তার ঘোষিত দলগুলোই পরবর্তীতে দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থের শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছে। যার মধ্যে রয়েছে ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ জয়ী জার্মানি, ২০১৮ সালের ফ্রান্স এবং সর্বশেষ ২০২২ সালের আর্জেন্টিনা। এছাড়াও অনলাইন গেমভিত্তিক প্রতিষ্ঠান Electronics Arts তাদের নিজস্ব সিমুলেশনের মাধ্যমে পরপর চারটি অর্থাৎ ২০১০, ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২২ সালের বিশ্বকাপ জয়ী দলের নাম নির্ভুলভাবে অনুমান করেছিল বলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। ক্যান ইউ ইমাজিন!
গোল, অ্যাসিস্ট, ড্রিবলিং, পাস, পেনাল্টি, লাল কার্ড, হলুদ কার্ড, ট্যাকেল, ফ্রিকিক কী নেই ফুটবলে! প্রতি মিনিটে জন্ম নেয় নতুন নতুন তথ্য-উপাত্ত। তাহলে এতকিছুর মাঝেও কীভাবে অনুমান করা হয় সম্ভাব্য শিরোপা জয়ীর নাম?
চলুন ধাপে ধাপে জেনে নেওয়া যাক সেই গাণিতিক মডেল সম্পর্কে।
ধাপ-১: এই ধাপে প্রতিটি দলের বিপুল পরিমাণ তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে গত কয়েক বছরে দলটি কতটি ম্যাচ জিতেছে, কতটি গোল করেছে, কতটি গোল হজম করেছে, শক্তিশালী কিংবা তুলনামূলক দুর্বল প্রতিপক্ষের সাথে পারফরম্যান্স কেমন ছিল, বর্তমান ফর্ম কেমন ইত্যাদি বিষয় পর্যালোচনা করা হয়।
ধাপ-২: দ্বিতীয় ধাপে প্রতিটি দলের গাণিতিক রেটিং তৈরি করা হয়। ধাপ-১ হতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিটি দলকে আলাদা করে রেটিং দেওয়া হয়। এছাড়াও একটি হাইভোল্টেজ ম্যাচে দলটির পারফরম্যান্স আশানুরূপ ছিল কি-না তা বিশ্লেষণ করা হয়। পারফরম্যান্স ভালো হলে দলটি ভালো রেটিং পায়। আর পারফরম্যান্স আশানুরূপ না হলে রেটিং কমতে থাকে।
ধাপ-৩: তৃতীয় ধাপটিতে মূলত আগের ডেটা অ্যানালাইসিস করে দুইটি দলের মাঝে অনুষ্ঠিত ম্যাচে কোন দল জিততে পারে তা অনুমান করা হয়। ধরি, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মাঝে একটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। এক্ষেত্রে নির্ধারণ করা হবে ম্যাচটিতে ব্রাজিলের জয়ের সম্ভাবনা কেমন, আর্জেন্টিনার জয়ের সম্ভাবনা কেমন অথবা ম্যাচটি যদি ড্র হয়, তাহলে ড্রয়ের সম্ভাবনা কেমন।
ধাপ-৪: এই ধাপটি অনেকটা কম্পিউটার নির্ভর। সিমুলেশন মডেলের মাধ্যমে আগের সংগৃহীত তথ্য ব্যবহার করে একটি কাল্পনিক বিশ্বকাপ আয়োজন করা হয় এই ধাপে। বাস্তব বিশ্বকাপের মতো এখানেও গ্রুপ পর্ব, রাউন্ড অব ১৬, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়। যার মাধ্যমে অনেকগুলো ম্যাচ আয়োজন করে নির্ধারণ করা হয় একটি বিজয়ী দলকে।
ধাপ-৫: সম্ভাব্য বিজয়ী নির্বাচনে এই ধাপটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সিমুলেশনের মাধ্যমে বারবার ফলাফল তৈরি করা হয়। চতুর্থ ধাপের সিমুলেশনটিই মূলত এই ধাপে পুনরাবৃত্তি করা হয়। এই পুনরাবৃত্তি ১ লক্ষ বার থেকে ১ মিলিয়ন বার পর্যন্ত হতে পারে কিংবা তারও বেশি।
ধাপ-৬: গণিত দিয়ে বিশ্বকাপের সম্ভাব্য বিজয়ী নিবার্চনে এই ধাপকে মোটামুটি শেষ ধাপ বলা যায়। ধরা যাক, সিমুলেশনটি ১ লক্ষ বার সম্পন্ন করা হয়েছে। এক্ষেত্রে বিজয়ী হিসেবে ব্রাজিলের নাম উঠে এসেছে ২৫ হাজার বার, আর্জেন্টিনার ১৯ হাজার বার, স্পেনের ১২ হাজার বার আর ফ্রান্সের ১০ হাজার বার। অর্থাৎ ব্রাজিলের বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা ২৫%। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা, স্পেন ও ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জয়ের সম্ভাবনা যথাক্রমে ১৯%, ১২% ও ১০%।
কিন্তু অনেক সময় বিশ্বকাপ শুরুর আগে দেখা যায় কিছু অপ্রত্যাশিত দল অনেক ভালো ফর্মে থাকে। যেমন: ২০২৬ বিশ্বকাপে কথা বললে কেপ ভার্দের কথা উল্লেখ করা যায়। অন্যদিকে তুলনামূলক শক্তিশালী দলের তারকা প্লেয়ার ইঞ্জুরির থাবায় পড়ে। যেমন: ব্রাজিলের রাইটব্যাক ওয়েসলি। তখন এই সিমুলেশন মডেল কীভাবে কাজ করে? এক্ষেত্রে সিমুলেশনের মডেল প্রতিটি ধাপ ঠিক রেখে দলগুলো বর্তমান ফর্ম অনুযায়ী নতুন কিছু পরিসংখ্যান তৈরি করে আগের ফলাফলের সাথে সমন্বয় করে সর্বশেষ সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়।
কী হতো যদি গণিতের মাধ্যমে প্রতিটি ফুটবল ম্যাচের ফলাফল আগে থেকে জানা যেতো? সে কথায় না যাই। কারণ তা আমরা সবাই জানি। তাই, গণিত বিশ্বকাপের সম্ভাব্য চ্যাম্পিয়নকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করুক। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ট্রফি সেই দলই জিতুক, যারা সমীকরণের বাইরে গিয়েও বিশ্বমঞ্চে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করার যোগ্যতা রাখে।
