কখনো কি এমন হয়েছে যে কোনো একটা কাজ করার পর হঠাৎ মনে হলো কাজটা হয়তো ঠিক হয়নি? অথচ কিছুক্ষণ পরই নিজের মনকে বোঝাতে শুরু করেছেন যে না, আসলে যা করেছি ঠিকই করেছি।
মজার ব্যাপার হলো, এই ঘটনা শুধু আপনার বা আমার সঙ্গে নয়। প্রায় সব মানুষের সঙ্গেই এমনটা ঘটে। আমরা যখন কোনো সিদ্ধান্ত নিই, কোনো অভ্যাস ধরে রাখি বা এমন কিছু করি যা আমাদের নিজের বিশ্বাসের সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না, তখন মনের ভেতরে এক ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়। আর সেই অস্বস্তি কমাতেই শুরু হয় নানারকম যুক্তি খোঁজার চেষ্টা।

মনোবিজ্ঞানী Leon Festinger ১৯৫৭ সালে এই বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। মনোবিজ্ঞানে এর নাম Cognitive Dissonance। সহজভাবে বললে, যখন আমাদের বিশ্বাস আর কাজ একে অপরের সঙ্গে মেলে না, তখন মনের ভেতরে যে অস্বস্তি তৈরি হয়, সেটিই এই ঘটনার মূল বিষয়।
জানার পরও কেন আমরা একই ভুল বারবার করি?
ধরা যাক, একজন মানুষ জানে যে ধূমপান শরীরের জন্য ক্ষতিকর। তবুও তিনি নিয়মিত ধূমপান করছেন। একদিকে তার জানা আছে যে অভ্যাসটি ভালো নয়, অন্যদিকে তিনি সেটি চালিয়ে যাচ্ছেন। এই দুই অবস্থানের মধ্যে একটা টানাপোড়েন তৈরি হয়। কারণ মানুষের মন সাধারণত চায় চিন্তা আর কাজের মধ্যে মিল থাকুক। যখন সেই মিল থাকে না, তখন ভেতরে ভেতরে অস্বস্তি কাজ করতে শুরু করে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষ অস্বস্তিটা দূর করার চেষ্টা করে, অভ্যাসটা পরিবর্তন করার আগে।

একই বিষয় দেখা যায় কেনাকাটার ক্ষেত্রেও। ধরুন, বাজেটের বাইরে গিয়ে একটি জামা কিনে ফেললেন। কিছুক্ষণ পর মনে হতে পারে, হয়তো এত টাকা খরচ না করলেও চলত। তখন নিজের মনকে বোঝাতে শুরু করলেন যে জামাটা খুব দরকার ছিল, অথবা এমন সুযোগ পরে আর পাওয়া যেত না। আসলে এসব যুক্তি অনেক সময় সত্যি পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার জন্য নয়, বরং নিজের অস্বস্তি কমানোর জন্য তৈরি হয়।
এই মানসিক অস্বস্তি থেকে বাঁচতে আমরা কী করি?
এই মানসিক অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেতে আমাদের মস্তিষ্ক মূলত তিনটি উপায় বেছে নেয়। প্রথমত, মানুষ তার আচরণ বা কাজটি বদলে ফেলার চেষ্টা করে যা সবচেয়ে কঠিন। যেমন- ধূমপানের ক্ষতি বুঝতে পেরে সেটি পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, মানুষ তার পুরোনো বিশ্বাসকে হালকা করার জন্য নতুন কোনো যুক্তি বা তথ্য খোঁজার চেষ্টা করে। যেমন- নিজেকে এই বলে সান্ত্বনা দেওয়া যে অনেক মানুষই তো ধূমপান করেও দীর্ঘকাল বেঁচে থাকেন, তাই আমার হয়তো কিছুই হবে না।

আরেকটি বিষয় প্রায়ই দেখা যায়। মানুষ তখন শুধু সেই তথ্যগুলো খুঁজতে শুরু করে যা তার বর্তমান অবস্থানকে সমর্থন করে। বিপরীত তথ্যগুলোকে গুরুত্ব দিতে চায় না। মনোবিজ্ঞানে এই প্রবণতাকে Confirmation Bias বলা হয়। ফলে মানুষ নিজের পছন্দের তথ্যগুলো আঁকড়ে ধরে এবং অস্বস্তিটাকে কিছুটা কমিয়ে ফেলার চেষ্টা করে।
কগনিটিভ ডিসোন্যান্স: এটা আমাদের জন্য দুর্বলতা নাকি শক্তি?
শুনতে একটু নেতিবাচক মনে হলেও, Cognitive Dissonance আমাদের জীবনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি ভূমিকা পালন করে। মনের এই অস্বস্তিই আসলে আমাদের বুঝিয়ে দেয় যে আমাদের চিন্তা, বিশ্বাস বা কাজের কোথাও না কোথাও একটা অমিল আছে। আর এই অমিলের অনুভূতিই মানুষকে নিজের ভুলগুলো নিয়ে ভাবতে শেখায়।
যদি এই অস্বস্তি না থাকত, তাহলে মানুষ হয়তো নিজের ভুল সংশোধন করার প্রয়োজনই অনুভব করত না। অনেক সময় এই মানসিক দ্বন্দ্বই মানুষকে ক্ষতিকর অভ্যাস ছাড়তে, ভুল সিদ্ধান্ত থেকে ফিরে আসতে এবং আরও ভালো অভ্যাস গড়ে তুলতে উৎসাহ দেয়। তাই Cognitive Dissonance- এর শুধু নেতিবাচক দিক দেখলে চলবে না, কারন অনেক সময় এটি মানুষকে নিজের জীবনে ভালো পরিবর্তন আনতে সাহায্য করে।

তবে এর আরেকটি দিকও আছে। যদি কেউ সবসময় নিজের ভুলকে যুক্তি দিয়ে ঢাকার চেষ্টা করে, তাহলে একসময় সে নিজের ভুলগুলো আর স্পষ্টভাবে দেখতে পারে না। তখন শেখার সুযোগ কমে যায় এবং একই ভুল বারবার করার সম্ভাবনাও বেড়ে যায়।
আমাদের ভেতরের বিশ্বাস আর বাইরের আচরণের এই অমিল আমাদের প্রতিনিয়ত এক অদৃশ্য আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়। নিজের মনকে ফাঁকি দিয়ে সাময়িক শান্তি পাওয়া হয়তো সম্ভব, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি মানসিক প্রশান্তির জন্য চিন্তার স্বচ্ছতা বড্ড বেশি প্রয়োজন। হয়তো এ কারণেই ভুল করার পর আমরা এত সহজে নিজেদের কাছে হার মানতে চাই না। আমরা গল্প বানাই, যুক্তি খুঁজি, নিজের পক্ষ নিই। কারণ আমাদের মন সবসময় একটা জিনিসই চায়, ভেতরের অস্বস্তিটা যত দ্রুত সম্ভব কমিয়ে ফেলতে। আর সেই চেষ্টার মধ্যেই লুকিয়ে আছে মানুষের মনের সবচেয়ে মজার বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি ‘Cognitive Dissonance’
