এই মহাবিশ্বে যেসব রাসায়নিক পদার্থ বা কেমিক্যাল আছে তার মাত্র ১% আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে পেরেছেন। ভাবতে কেমন লাগে? গোটা বিশ্ব রাসায়নিক পদার্থে ভর্তি অথচ আমরা তার প্রায় কিছুই জানি না। আর ঠিক এই কারণেই বিজ্ঞানীরা দিনরাত চেষ্টা করে যাচ্ছেন সেই বাকি ৯৯% অজানা রাসায়নিকগুলো খুঁজে বের করার জন্য। কারণ এসব অজানা রাসায়নিকের মধ্যে হয়তো লুকিয়ে আছে কোনো দুর্দান্ত ঔষধ বা এমন কোনো উপাদান যা পরিবেশ থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস দূর করে দিতে পারে।
রসায়নবিদেরা যুগ যুগ ধরে রাসায়নিক পদার্থ নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই চলেছেন। ১৮৬৯ সালে রুশ বিজ্ঞানী দিমিত্রি মেন্ডেলেভ এমন এক চমৎকার জিনিস তৈরি করেলছিলেন যেটাকে বলা হয় পারমাণবিক সারণি বা Periodic Table। এটা এমন একটা তালিকা যেখানে সব ধরণের মৌল উপাদান বা এলিমেন্ট সাজানো থাকে। একে আপনি একপ্রকার লেগো সেট ভাবতে পারেন—যার অংশগুলো জোড়া লাগিয়ে তৈরি করা যায় হাজারো নতুন রাসায়নিক।
এই পারমাণবিক সারণির শেষ দিককার কয়েকটা এলিমেন্ট আবিষ্কার করতে বিজ্ঞানীদের ব্যবহার করতে হয়েছে নিউক্লিয়ার ফিউশন মানে এমন এক ধরনের পারমাণবিক সংঘর্ষ যেখানে অ্যাটমগুলোকে আলোর গতিতে একে অপরের দিকে ধাক্কা দেওয়া হয়। এমনভাবেই ২০১০ সালে বিজ্ঞানীরা তৈরি করেন ১১৭ নম্বর মৌল—টেনেসিন (Tennessine)।
রাসায়নিক যৌগ কীভাবে তৈরি হয়?
রাসায়নিক যৌগ বলতে বোঝায় এমন পদার্থ, যা দুই বা তার বেশি পরমাণু মিলে তৈরি হয়। কিছু যৌগ প্রকৃতিতে এমনিতেই গঠিত হয়—যেমন পানি (H₂O), যেখানে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন আছে। আবার কিছু যৌগ বিজ্ঞানীরা ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করে তৈরি করেন—যেমন নাইলন। এগুলোর অনেকটাই আমরা এখন কলকারখানায় উৎপাদন করি। এখন প্রশ্ন হলো আমাদের হাতে থাকা ১১৮টি মৌল বা এলিমেন্ট দিয়ে আমরা মোট কতগুলো রাসায়নিক যৌগ বানাতে পারি ?এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের নিয়ে যাবে এক বিশাল সংখ্যার জগতে।
প্রথমে ভাবুন শুধু মাত্র দুইটি পরমাণু মিলিয়ে তৈরি করা যায় কত যৌগ? যেমন—N₂ (নাইট্রোজেন) ও O₂ (অক্সিজেন), যা আমাদের শ্বাস নেওয়ার বাতাসের ৯৯% তৈরি করে। এমনভাবে হিসাব করলে দেখা যায়, দুই পরমাণুর মোট ৬,৯০৩টি যৌগ সম্ভব। এক একজন রসায়নবিদ যদি বছরে একটি করে যৌগ তৈরি করেন, তাহলে এই কাজেই কয়েক হাজার বিজ্ঞানীদের দরকার পড়বে।
তিনটি পরমাণু নিয়ে তৈরি হতে পারে প্রায় ১৬ লক্ষ যৌগ! হ্যাঁ, ঠিক শুনেছেন—যেমন জল (H₂O) বা কার্বন ডাই-অক্সাইড (CO₂)। এই সংখ্যা এত বেশি যে এটি যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম ও এডিনবরার মোট জনসংখ্যার সমান। আর যখন আমরা চার বা পাঁচটি পরমাণু নিয়ে যৌগ বানাতে চাই, তখন এই কাজের জন্য প্রায় পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে নিয়োজিত করতে হবে—প্রতিজনকে অন্তত তিনটি করে যৌগ বানাতে হবে! তার মানে, এই পুরো কাজ করতে আমাদের মহাবিশ্বের সব উপাদান একাধিকবার ব্যবহার করে ফেলতে হবে!
সব যৌগ কি সত্যিই বানানো সম্ভব?
আসলে এই হিসাবগুলো বাস্তবে অনেক জটিল। কারণ প্রতিটি যৌগের গঠন এবং তার স্থিতিশীলতা বা টিকে থাকার ক্ষমতা নির্ভর করে বিভিন্ন নিয়মের ওপর। আর এসব নিয়ম সবসময় কঠিন নয়—অনেক সময় সহজ হয়ে যায়। যেমন—নোবেল গ্যাস নামে পরিচিত গ্যাসগুলো (হিলিয়াম, নিয়ন, আর্গন, জেনন) সাধারণত অন্য কোনো পরমাণুর সঙ্গে মিশতে চায় না। কিন্তু বিশেষ পরিস্থিতিতে, যেমন মহাশূন্যের কঠিন পরিবেশে বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন—এই গ্যাসগুলিও যৌগ গঠন করতে পারে! উদাহরণস্বরূপ Argon hydride বা ArH⁺ নামের একটি যৌগ, যেটা পৃথিবীতে স্বাভাবিকভাবে পাওয়া যায় না, কিন্তু মহাকাশে পাওয়া গেছে।
আরো একটা চমকপ্রদ বিষয় হলো, যেমন ধরুন কার্বন সাধারণত একসঙ্গে ১ থেকে ৪টি পরমাণুর সঙ্গে যুক্ত থাকে। কিন্তু খুব অল্প সময়ের জন্য বিজ্ঞানীরা দেখতে পেয়েছেন এটি কখনো কখনো পাঁচটি পরমাণুর সঙ্গে সংযুক্ত হতে পারে! উদাহরণ হিসেবে বলা যায় একটা গাড়ি যেখানে সর্বোচ্চ চারজন উঠতে পারে, কিন্তু স্টপে কেউ উঠছে, কেউ নামছে আর এই ভিড়ের মাঝে এক ঝটকায় পাঁচজন ঢুকে পড়ল!
অনেক বিজ্ঞানী আছেন যারা তাদের পুরো জীবন উৎসর্গ করেছেন এমনসব যৌগ বানাতে, যেগুলো সাধারণ রসায়নের নিয়মে অসম্ভব বলে মনে হয়। অথচ কিছু কিছু সময়ে তাঁদের সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করে দেখানো যায়।
নতুন যৌগ খোঁজার উপায়
বিজ্ঞানীরা সাধারণত নতুন যৌগ খোঁজেন দুটি প্রধান পদ্ধতিতে। একটি হলো আগে থেকেই পরিচিত কোনো যৌগকে একটু পরিবর্তন করা। মানে, কিছু পরমাণু যোগ করা, বাদ দেওয়া, কিংবা বদলে ফেলা। আরেকটি হলো কোনো পরিচিত রাসায়নিক বিক্রিয়া বা chemical reaction ব্যবহার করে নতুন নতুন মৌল থেকে নতুন যৌগ বানানো। ঠিক যেমন—আপনি একটা বাড়ি বানালেন, তারপর তার সঙ্গে আরেকটা ঘর যুক্ত করলেন। এরকম করেই ধাপে ধাপে বিজ্ঞানীরা একেকটা নতুন রাসায়নিক ভবনের পথ তৈরি করেন।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, যদি আমরা একেবারে নতুন ধরনের যৌগ খুঁজতে চাই, যেটা আগে কখনো বানানো হয়নি? তাহলে কী করব?
এর উত্তর খুঁজতে অনেক বিজ্ঞানী আবার ফিরে যান প্রকৃতির দিকে। যেমন ১৯২৮ সালে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং লক্ষ করেছিলেন, তাঁর পেট্রি ডিশে গজানো একধরনের ছাঁচ বা ছত্রাক আশেপাশের ব্যাকটেরিয়াগুলোকে মেরে ফেলছে। সেখান থেকেই শুরু—পেনিসিলিন নামের এক যুগান্তকারী ওষুধের আবিষ্কার।
এরপর হাওয়ার্ড ফ্লোরি নামে এক বিজ্ঞানী ১৯৪০ সাল নাগাদ বুঝতে পারেন কীভাবে পেনিসিলিনকে বেশি পরিমাণে বানানো যায়। তবে এর প্রকৃত রাসায়নিক গঠন বা structure শনাক্ত করতে সময় লেগে যায় আরও অনেক বছর। ডরোথি ক্রোফুট হজকিন ১৯৪৫ সালে একে নির্ধারণ করতে সক্ষম হন।
এই পেনিসিলিনের গঠন এতটাই অদ্ভুত—যেখানে পরমাণুগুলো এক ধরনের চারকোণা কাঠামোয় সাজানো যা তৈরি করাই খুব কঠিন। অথচ এটা জানার পর বিজ্ঞানীরা সেই কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে অন্য ওষুধ তৈরি করতে সক্ষম হন। আপনি যদি পেনিসিলিনে অ্যালার্জিক হন এবং ডাক্তার আপনাকে অন্য কোনো অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে থাকেন, তবে সেটার পেছনে হজকিনের অবদানই রয়েছে।
আজকাল অবশ্য এসব গঠন শনাক্ত করা অনেক সহজ হয়েছে। হজকিন যে এক্স-রে কৌশল ব্যবহার করতেন, সেটাই এখন সারা পৃথিবীতে রাসায়নিক যৌগ বিশ্লেষণে ব্যবহৃত হয়। এমনকি হাসপাতালে ব্যবহৃত MRI প্রযুক্তিও রাসায়নিক যৌগ বিশ্লেষণে ব্যবহৃত হতে পারে।
কিন্তু যেকোনো যৌগের কাঠামো কল্পনা করা মানেই নয় যে আমরা সেটাকে বানাতে পারব। সেটার জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিবেশ, সঠিক উপকরণ, আর জটিল গবেষণা।অনেক সময় এমনও হয় যে, যে যৌগ প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হয় যেমন গাছ, ছত্রাক বা পোকামাকড়ের দেহে তা তৈরি করতে গেলে ল্যাবের চেয়ে সোজা হয় প্রাকৃতিক উৎস থেকে সংগ্রহ করাই। তাই আজও, নতুন রাসায়নিক যৌগ খুঁজতে হলে বিজ্ঞানীদের ফিরে যেতে হয় প্রকৃতির ক্ষুদ্রতম কোণায়।
লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র : Live Science
