পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বতের নাম বললে অধিকাংশ মানুষ নিঃসন্দেহে মাউন্ট এভারেস্টের নামই বলবে। বহু দশক ধরে এটিই প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে স্বীকৃত। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এভারেস্টের উচ্চতা প্রায় ৮,৮৪৯ মিটার, যা পৃথিবীর যেকোনো পর্বতের চেয়ে বেশি। কিন্তু যদি দাবি করা হয় —‘পৃথিবীতে সবচাইতে উঁচু পয়েন্ট মাউন্ট এভারেস্টে নয়। তার চাইতে মাউন্ট চিম্বোরাজো ১.৮ কিলোমিটার উঁচু।’ এটা কতটুকু যৌক্তিক? চলুন জেনে নেই এর পেছনে থাকা উচ্চতা পরিমাপের ভিন্ন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা।
সাধারণভাবে আমরা কোনো পাহাড় বা পর্বতের উচ্চতা মাপি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে। সেই মানদণ্ডে এভারেস্টই পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত এবং এ নিয়ে বৈজ্ঞানিকভাবে কোনো বিতর্ক নেই। হিমালয় পর্বতমালায় অবস্থিত এই পর্বতটির উচ্চতা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। অন্যদিকে ইকুয়েডরে অবস্থিত চিম্বোরাজোর উচ্চতা মাত্র প্রায় ৬,২৬৩ মিটার। অর্থাৎ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে হিসাব করলে এভারেস্ট চিম্বোরাজোর তুলনায় অনেক বেশি উঁচু।
তবে বিভ্রান্তির সূত্রপাত ঘটে যখন উচ্চতা শব্দটির অন্য একটি সংজ্ঞা সামনে আসে। পৃথিবীকে আমরা সাধারণত নিখুঁত গোলাকার কল্পনা করলেও বাস্তবে পৃথিবী পুরোপুরি গোল নয়। পৃথিবী একটি অবলেট স্ফেরয়েড, অর্থাৎ এটি মেরু অঞ্চলে সামান্য চাপা এবং বিষুবরেখার দিকে কিছুটা স্ফীত। এই কারণে বিষুবরেখার কাছাকাছি অবস্থিত স্থানগুলো পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে তুলনামূলক বেশি দূরে অবস্থান করে।

চিম্বোরাজো পৃথিবীর বিষুবরেখার খুব কাছাকাছি অবস্থিত। ফলে এটি এমন একটি অঞ্চলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যা পৃথিবীর স্বাভাবিক স্ফীত অংশের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে এভারেস্ট বিষুবরেখা থেকে অনেক দূরে, তুলনামূলকভাবে মেরুর দিকে অবস্থিত। তাই সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এভারেস্টের উচ্চতা বেশি হলেও পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে দূরত্বের ক্ষেত্রে চিম্বোরাজো এগিয়ে যায়।
গবেষণা অনুযায়ী, চিম্বোরাজোর চূড়া পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে প্রায় ৬,৩৮৪.৪ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত, যেখানে এভারেস্টের চূড়ার দূরত্ব প্রায় ৬,৩৮২.৩ কিলোমিটার। অর্থাৎ পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে হিসাব করলে চিম্বোরাজো এভারেস্টের তুলনায় প্রায় ২.১ কিলোমিটার বেশি দূরে অবস্থিত। এ কারণেই বলা হয়, চিম্বোরাজো পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে সবচেয়ে দূরের স্থান।
এই পুরো আলোচনাটি মূলত নির্ভর করে সবচেয়ে উঁচু বলতে আমরা ঠিক কী বোঝাচ্ছি তার ওপর। যদি সমুদ্রপৃষ্ঠকে ভিত্তি ধরা হয়, তাহলে এভারেস্টই পৃথিবীর সর্বোচ্চ পর্বত। কিন্তু যদি পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে দূরত্বকে মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়, তাহলে চিম্বোরাজো এগিয়ে যাবে। অর্থাৎ এখানে দ্বন্দ্বটি তথ্যের নয় বরং পরিমাপের পদ্ধতির।
মজার বিষয় হলো, ভিন্ন সংজ্ঞায় পৃথিবীর অন্য পর্বতগুলোকেও সবচেয়ে বড় বলা হয়। উদাহরণস্বরূপ, হাওয়াইয়ের মাউনা কেয়াকে অনেক সময় পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা পর্বত বলা হয়। কারণ এর বিশাল অংশ সমুদ্রের নিচে ডুবে রয়েছে। সমুদ্রতল থেকে চূড়া পর্যন্ত সম্পূর্ণ উচ্চতা বিবেচনা করলে এটি এভারেস্টের চেয়েও বড় হয়ে যায়।
তাই পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু পর্বত প্রশ্নটির একক কোনো উত্তর নেই। উত্তরটি নির্ভর করে কোন বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে উচ্চতার বিচারে এভারেস্টই সর্বোচ্চ, আর পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে দূরত্বের বিচারে চিম্বোরাজো সবচেয়ে এগিয়ে।
