ফেসবুক বা ইউটিউবে স্ক্রোল করতে করতে নিশ্চয়ই এমন ভিডিও আপনার চোখে পড়েছে যেখানে সামান্য গরুর দুধের সাথে সয়াবিন তেল, খাবার সোডা, লবণ আর পানি ব্লেন্ড করে চোখের পলকে তৈরি করে ফেলা হচ্ছে ঘন, সাদা অরিজিনাল দুধ। এমনকি ল্যাকটোমিটার টেস্ট ফাঁকি দেওয়ার নানা কৌশলও তারা দেখিয়ে দিচ্ছে। ভিডিওগুলো দেখে যেমন গা শিউরে ওঠে, তেমনই মাথায় প্রশ্ন আসে যে বিজ্ঞান আসলে কী বলে? তেল আর পানি তো সাধারণ নিয়মে মেশার কথা নয়, তাহলে এই জালিয়াতি কীভাবে সম্ভব হচ্ছে?
বিজ্ঞান বলে, তেল আর পানি কখনো নিজে থেকে মেশে না। কিন্তু যখনই এই মিশ্রণে সামান্য একটু আসল দুধ বা খাবার সোডা যোগ করা হয়, তখন সেটি ইমালসিফায়ার হিসেবে কাজ করে। দুধের মধ্যে থাকা কেসিন প্রোটিন এবং সোডা মিলে সয়াবিন তেলের ছোট ছোট ফোঁটাগুলোকে পানির সাথে জোর করে মিশিয়ে দেয়, যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ইমালশন বলা হয়।
আসল দুধও কিন্তু এক ধরণের প্রাকৃতিক ইমালশন, যেখানে পানির মধ্যে চর্বি ছড়ানো থাকে। প্রতারকেরা ঠিক এই বিজ্ঞানটাকেই এখানে অপব্যবহার করছে। যখন সয়াবিন তেল একদম ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণিকায় ভেঙে পানির সাথে মিশে যায়, তখন তার ওপর আলো পড়লে তা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানের এই লাইট স্ক্যাটারিং মেকানিজমের কারণেই মিশ্রণটিকে একদম ধবধবে সাদা এবং ঘন দেখায়, যা দেখে সাধারণ মানুষের বোঝার উপায় থাকে না যে এটা আসলে সয়াবিন তেলের মণ্ড।
ল্যাকটোমিটার ডুবিয়ে পরীক্ষা করার সময় তারা নিখুঁত রিডিং মেলানোর চেষ্টা করে। প্রতারকেরা ভালো করেই জানে, শুধু তেল আর পানি মিশিয়ে দিলে দুধের আপেক্ষিক ঘনত্ব ঠিক থাকে না। তাই পানির পরিমাপ ও ল্যাকটোমিটারের রিডিং সামাল দিতে তারা নিখুঁত মাপে চিনি, লবণ, বা স্টার্চ মিশিয়ে দেয়, যাতে ল্যাকটোমিটারের রিডিং একদম আসল দুধের কাছাকাছি দেখায় এবং সাধারণ মানুষকে ধোঁকা দেওয়া যায়।
বিজ্ঞানের সূত্রের অপব্যবহার করে বানানো এই ভেজাল দুধ আমাদের শরীরের জন্য এক মারাত্মক বিষ। সয়াবিন তেল ও পানির এই কাঁচা মিশ্রণ হজম করা শরীরের জন্য অত্যন্ত কঠিন, যার ফলে নিয়মিত এই দুধ খেলে লিভার ও কিডনির ওপর মারাত্মক চাপ পড়ে এবং তা বিকল হতে পারে। এর ভেতরের অপরিশোধিত চর্বি এবং মাত্রাতিরিক্ত লবণ সরাসরি রক্তচাপ বাড়িয়ে হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি করে। তাছাড়া মিশ্রণে ব্যবহৃত অতিরিক্ত সোডা বা রাসায়নিক পেটের ভেতরের নরম আস্তরণ ধ্বংস করে দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদী গ্যাস্ট্রিক, আলসার ও হজমের সমস্যার মূল কারণ।
