প্রথম মিলনে রক্তপাত কখনোই কুমারিত্ব প্রমাণ করে না। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোয় এমন ধারণা পালিত হয় যে প্রথম মিলনে রক্তপাত না হলে মেয়েটির কুমারিত্ব নেই। এর ফলে নারীদের অকথ্য ভোগান্তি পোহাতে হয়, নারীর চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয় এবং তাদের ব্যাক্তি সম্মানে আঘাত দেয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে ধারণাটি সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক এবং ভিত্তিহীন। আজকের লেখায় আমরা প্রমাণ করব সামান্য রক্তপাত নারীর সতিত্ব নির্ধারণ করতে পারে না।
সমাজের প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী যদি বিয়ের পর প্রথম মিলনে কোনো নারীর রক্তপাত না হয় তবে সে কুমারী নয় অর্থাৎ সে আগেও শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে বলে বিশ্বাস করা হয়। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান শুরু থেকেই এই ধারণার বিরোধিতা করে আসছে। প্রথম মিলনে কোনো নারীর রক্তপাত হবে কিনা তা নির্ভর করে নারীর যোনিপথের মুখে থাকা হাইমেন নামক পর্দার গঠন ও উপস্থিতির উপর। সব মানুষের গাঁয়ের রং যেমন এক নয় তেমনি সব নারীর হাইমেন এর গঠনও এক নয়। তাই যদি প্রথম মিলনে কোনো নারীর রক্তপাত না হয় সেটা খুবই স্বাভাবিক।
হাইমেন কী?

হাইমেন হলো নারীদের যোনিপথের প্রবেশদ্বারের মুখে থাকা অর্ধচন্দ্রাকৃতির একটি পাতলা, নমনীয় এবং স্থিতিস্থাপক টিস্যু বা চামড়ার ভাঁজ বা পর্দা। জন্মগতভবেই নারীদের হাইমেন এ এক বা একাধিক ছিদ্র থাকে যা দিয়ে মাসিকের সময় রক্ত বের হয়। ভ্রূণের বিকাশের সময় যোনিপথ তৈরি প্রক্রিয়ার একটি অবশিষ্টাংশ হিসেবে এই হাইমেন টিস্যুটি রয়ে যায়। এটি আমাদের শরীরের কোনো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ নয়। অনেক মেয়েই জন্মগতভাবে এই পর্দ ছাড়া জন্ম নেয় সেক্ষেত্রে তাদের মিলনের সময় রক্তপাত হওয়ার প্রশ্নই আসে না। Appendix যেমন আমাদের শরীরের একটি বাড়তি অঙ্গ হাইমেন ও ঠিক তেমনি।
রক্তপাত কখন হবে?
প্রথম মিলনে রক্তপাত হবে কিনা কিংবা কি পরিমাণ রক্তপাত হবে তা নির্ভর করে নারীর হাইমেনের গঠনের উপর। হাইমেন এর গঠনকে প্রধানত ৫ থেকে ৬টি মূল প্রকারে ভাগ করা হয়। চলুন জেনে নিই প্রতিটি প্রকারভেদ হাইমেন এর গঠনের ভিন্নতা এবং রক্তপাতের সম্ভাবনা –
i. অ্যানুলার হাইমেন : এটি হাইমেনের সবচেয়ে সাধারণ গঠন। এটি দেখতে একটি বৃত্তাকার আংটি বা রিং এর মতো যার ঠিক মাঝখানে একটি স্বাভাবিক গোলাকার ছিদ্র থাকে। যেহেতু এই প্রকার হাইমেন এর উপরের অংশটি আগে থেকেই সম্পূর্ণ উন্মুক্ত তাই এক্ষেত্রে রক্তপাত হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।
ii. ক্রিসেন্টিক বা সেমিলুনার হাইমেন : এগুলো অর্ধচন্দ্রাকৃতির।এধরনের হাইমেন এর যোনিপথের নিচের অংশে টিস্যু কিছুটা চওড়া থাকে এবং ওপরের অংশটি সম্পূর্ণ খোলা থাকে। তাই রক্তপাত না হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি।
iii. ইলাস্টিক বা কমপ্লায়েন্ট হাইমেন : এটি হাইমেন এর কোনো আলাদা প্রকার নয় বরং হাইমেনের একটি বিশেষ গুণ। এই প্রকারের হাইমেনে ইলাস্টিন ফাইবারের পরিমাণ অনেক বেশি থাকায় এটি রাবারের মতো প্রচুর পরিমাণে প্রসারিত হতে পারে। তাই এটি পেনিস বা ট্যাম্পন প্রবেশের সময় কোনো রকম ইনজুরি বা ছিঁড়ে যাওয়া ছাড়াই সম্পূর্ণ প্রসারিত হয়ে যায় এবং পরে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে। এক্ষেত্রে কোনো রক্তপাতই হয় না।
iv. সেপ্টেট হাইমেন : এই ধরনের হাইমেনে স্বাভাবিক ছিদ্রটির মাঝখান দিয়ে অতিরিক্ত একটি টিস্যুর দেয়াল থাকে। যেহেতু মাঝখানে একটি অতিরিক্ত টিস্যুর বাধা থাকে তাই প্রথমবার মিলনের সময় বা ট্যাম্পন ব্যবহারের সময় ওই মাঝখানের টিস্যুর দেয়ালটি ছিঁড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। তাই অন্যান্য সাধারণ হাইমেনের তুলনায় এতে কিছুটা বেশি রক্তপাত ও সামান্য ব্যথা হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
v. মাইক্রোপারফোরেট এবং ক্রিব্রিফর্ম হাইমেন: মাইক্রোপারফোরেট হাইমেনের ছিদ্রটি সুঁইয়ের মাথার মতো অত্যন্ত ছোট হয় এবং ক্রিব্রিফর্ম হাইমেনে একটি বড় ছিদ্রের বদলে জালের মতো অনেকগুলো ছোট ছোট ছিদ্র থাকে। এই দুই ধরনের গঠনে মাসিকের রক্ত বের হতে পারলেও যোনিপথের মুখটি অত্যন্ত সংকীর্ণ থাকায় প্রথমবার মিলনের চেষ্টা করলে তীব্র ব্যথা হতে পারে এবং টিস্যু ছিঁড়ে গিয়ে রক্তপাতের সম্ভাবনা বেশ বেশি থাকে। অনেক সময় ছোটো অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে এই অতিরিক্ত টিস্যু কেটে যোনিপথ স্বাভাবিক করা হয়।
vi. ইমপারফোরেট হাইমেন: এটি একটি জন্মগত মেডিকেল ত্রুটি যেখানে হাইমেনে কোনো ছিদ্রই থাকে না এবং যোনিপথ সম্পূর্ণ চামড়া দিয়ে বন্ধ থাকে। এক্ষেত্রে যৌন মিলন অসম্ভব এবং বয়ঃসন্ধির পর মাসিকের রক্ত ভেতরে জমা হয়ে তীব্র ব্যথা হয়। এটি সার্জারির মাধ্যমে কেটে স্বাভাবিক করতে হয়। মিলনের সময় রক্তপাতের সাথে এর সম্পর্ক নেই কারণ এটি আগে থেকেই চিকিৎসকের দ্বারা ঠিক করা প্রয়োজন হয়।
যৌনমিলন ছাড়াও কি হাইমেন ছিঁড়ে যাওয়া সম্ভব?
হ্যাঁ যৌনমিলন ছাড়াও হাইমেন ছিঁড়ে যাওয়া সম্ভব। হাইমেন অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং নমনীয়। মেয়েদের শৈশব বা কৈশোরে সাইকেল চালানো, সাঁতার কাটা, নাচ, জিমন্যাস্টিকস, অ্যাথলেটিক্স বা যেকোনো ভারী ব্যায়ামের কারণে অজান্তেই হাইমেন প্রসারিত হয়ে যেতে পারে বা ছিঁড়ে যেতে পারে। এর সাথে যৌনমিলনের কোনো সম্পর্কই নেই।
আবার পূর্ব উত্তেজনার অভাব রক্তপাতের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়। প্রথম মিলনের সময় নারী যদি মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকেন এবং উত্তেজিত হন তবে যোনিপথে Vaginal Lubricant বা যোনিরস নামক প্রাকৃতিক রস নিঃসৃত হয়। যার ফলে যোনিপথের পেশি শিথিল হয় এবং হাইমেন না ছিঁড়েই মিলন সম্ভব হয় ফলে কোনো রক্তপাত হয় না। কিন্তু উত্তজনার অঅধিকাংশভাব থাকলে রস নিঃসৃত হয় না তখন যোনিপথ এবং হাইমেন দুটিই শুষ্ক অবস্থায় থাকে। ফলে তখন পেনিস বা টেম্পন প্রবেশের সময় ঘষা লেগে রক্তপাত হতে পারে।
এখন এটা স্পষ্ট যে প্রথম মিলনে রক্তপাত হতেই হবে এমন কোনো কথা নেই বরং না হওয়াটাই স্বাভাবিক। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ডাটা বিশ্লেষণ এবং বৈজ্ঞানিক জরিপ মতে শতকরা ৫০% এরও অধিক নারীর প্রথম মিলনে রক্তপাত হয় না। তাই প্রথম মিলনের রক্তপাত কখনোই কুমারিত্বের মাপকাঠি নয়।
বিতর্কিত Two-finger test!

ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় Two-finger test বা আঙ্গুল দিয়ে কুমারীত্ব পরীক্ষা করার বৈজ্ঞানিক কোনো ভিত্তি কখনোই ছিল না। এর উৎপত্তি মূলত পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা এবং ঔপনিবেশিক আমলের কিছু ভুল চিকিৎসা ব্যাবস্থা থেকে। মধ্যযুগ ও প্রাক-আধুনিক যুগে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে বিশেষ করে – এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকার কিছু অংশে নারীর সতীত্ব বা কুমারীত্বকে তার সামাজিক মূল্য, বিয়ে এবং পারিবারিক সম্মানের মাপকাঠি ধরা হতো।
কোনো নারী যদি নিয়মিত যৌন মিলনে অভ্যস্ত হন তবে তার যোনিপথের পেশি শিথিল হয়ে যায়। এই অবৈজ্ঞানিক ধারণার ওপর ভিত্তি করেই চিকিৎসকরা বা ধাত্রীরা নারীর যোনিপথে দুটি আঙুল প্রবেশ করিয়ে পরীক্ষা করতেন। আঙুল সহজে প্রবেশ করলে ধরে নেওয়া হতো নারীটি যৌন মিলনে অভ্যস্ত আর বাধা পেলে ভাবা হতো তিনি কুমারী।
তৎকালীন সময়ে কোনো নারী ধর্ষণের শিকার হলে তার মেডিকেল পরীক্ষার অংশ হিসেবে চিকিৎসকরা বাধ্যতামূলকভাবে এই টু-ফিঙ্গার টেস্ট করতেন। আর তার রিপোর্টে লিখা হতো Habituated to sexual intercourse অর্থাৎ যৌন মিলনে অভ্যস্ত। আদালতে আসামীপক্ষের আইনজীবীরা এই রিপোর্টের অজুহাতে ভুক্তভোগী নারীর চরিত্র নিয়ে সহজেই প্রশ্ন তুলতেন এবং যুক্তি দিতেন— যেহেতু নারীটি আগে থেকেই মিলনে অভ্যস্ত তাই এই ঘটনাটি ধর্ষণ নয় বরং পারস্পরিক সম্মতিতেই হয়েছে। এই একটি মাত্র অবৈজ্ঞানিক পরীক্ষার কারণে হাজার হাজার ধর্ষণের মামলার আসামী খালাস পেয়ে যেত এবং ভুক্তভোগী নারী আইনি বিচার থেকে বঞ্চিত হতেন।
অবশেষে একবিংশ শতাব্দীর শুরুতে বিশ্বজুড়ে চিকিৎসা বিজ্ঞানী এবং মানবাধিকার কর্মীরা এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হলে চিকিৎসাবিজ্ঞান স্পষ্ট করে দেয় যে যোনিপথের পেশির শিথিলতা বা সংকোচন সম্পূর্ণ একটি হরমোনাল এবং পেশীগত বিষয় যার সাথে অতীতে যৌন মিলন হওয়া বা না হওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নেই। ২০১৪ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তথা WHO তাদের গাইডলাইনে স্পষ্ট ভাষায় জানায় যে – টু-ফিঙ্গার টেস্ট বা কুমারীত্ব পরীক্ষার কোনো বৈজ্ঞানিক বা চিকিৎসাগত ভিত্তি নেই। এটি একটি অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক, অবমাননাকর এবং বৈষম্যমূলক প্রথা, যা নারীর মৌলিক মানবাধিকারের লঙ্ঘন।
যদিও প্রথম মিলনে রক্তপাত হওয়ার সাথে নারীর কুমারিত্বের কোনো সম্পর্ক না থাকার স্পষ্ট বার্তা চিকিৎসা বিজ্ঞান দিয়েছে তবুও উপযুক্ত জ্ঞান এবং শিক্ষার অভাবে আমাদের সমাজের মানুষরা এখনও সচেতন নয়। অধিকাংশ সমাজেই এখনও বিশ্বাস করা হয় রক্তপাত হয়নি মানেই নারীটি চরিত্রহীন যা অত্যন্ত হতাশাজনক এবং অবমাননাকর। আমাদের সমাজকে জানাতে হবে সামান্য কিছু রক্তের ফোঁটা কখনো কোনো নারীর সম্মান মাপতে পারে না। এই ভিত্তিহীন অসম্মান ও হেনস্তা থেকে আমাদের মা-বোনদের রক্ষার দায়িত্ব আমাদেরই।
