প্রতিদিন বিকালে ফ্রেন্চ ফ্রাই, সমুচা, পিৎজা না হলে চলেই না তাই না! আর সকাল সন্ধ্যা একটু বেশি করে চিনি দিয়ে চা না খেলে মনে হয় যেন দিনটাই বৃথা। আর এই গরমে তো কোল্ড ড্রিংকস ছাড়া জীবন কল্পনাই করা যায় না! তবে ব্যস্ত জীবনে এই অতিরিক্ত চর্বি এবং অতিরিক্ত চিনি যুক্ত খাবারগুলো আমাদের সাময়িক তৃপ্তি দেয় ঠিকই কিন্তু অজান্তেই আমাদের ব্রেইনের মারাত্মক ক্ষতি করে চলেছে।
নিউরোসায়েন্সের সাম্প্রতিক গবেষণাগুলো একটি চমৎকার কিন্তু ভীতিজনক তথ্য সামনে এনেছে। তাদের মতে আমরা যা খাই তা সরাসরি আমাদের মস্তিষ্কের কার্যক্রমের উপর প্রভাব ফেলে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের এই High Fat ও High Sugar যুক্ত খাবারগুলো আমাদের জ্ঞানীয় নমনীয়তা বা Cognitive Flexibility তথা পরিস্থিতি অনুযায়ী দ্রুত সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কমিয়ে দেয়। আরও চিন্তার বিষয় হলো এই ক্ষতিগুলো স্থায়ী রূপও নিতে পারে। চলুন তো দেখি চিকিৎসা বিজ্ঞান কি বলছে।
Cognitive Flexibility কি?
জ্ঞানীয় নমনীয়তা বা Cognitive Flexibility হলো আমাদের মস্তিষ্কের এমন একটি ক্ষমতা যার মাধ্যমে আমরা যেকোনো নতুন কিংবা আকস্মিক বা পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে নিজেকে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারি। ধরুন একজন প্রতিদিন একই রাস্তা দিয়ে বাজারে যায় কিন্তু হঠাৎ একদিন রাস্তার মেরামত কাজ চলায় সে ওই রাস্তা দিয়ে যেতে পারছে না। সে বিচলিত না হয়ে তৎক্ষনাৎ চিন্তাভাবনা করে বিকল্প এক রাস্তা দিয়ে বাজারে পৌঁছে গেলো। সে এটা করতে পেরেছে তার জ্ঞানের নমনীয়তার কারণে। যদি তার জ্ঞানের নমনীয়তা কমে যায় সে এই আকস্মিক পরিবর্তনে বিচলিত হয়ে পড়বে এবং খাপ খাওয়াতে বেশি সময় নিবে। Cognitive Flexibility তথা জ্ঞানীয় নমনীয়তাই আমাদের অভিযোজন ও খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করে। কারও Cognitive Flexibility কমে গেলে সে সহজেই মানসিক চাপে পড়ে এবং সহজে যেকোনো সমস্যার সমাধান করতে পারে না।
কিভাবে অতিরিক্ত চর্বি বা চিনি Cognitive Flexibility কমায়?
বিজ্ঞানীরা এর পেছনে দুটি মূল জৈবিক কারণ বা mechanism খুঁজে পেয়েছেন।
i. অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়া ও মস্তিষ্কের যোগসূত্র :
আমাদের পেটে বা অন্ত্রে প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়া বাস করে যাদের একত্রে বলা হয় Microbiome। এই ব্যাকটেরিয়াগুলো শুধু খাবার হজম করে না সাথে এমন কিছু রাসায়নিক ও নিউরোট্রান্সমিটার তৈরি করে যা সরাসরি মস্তিষ্কে সংকেত পাঠায়। অতিরিক্ত চিনি ও চর্বি খাওয়ার মাত্র ২-৪ সপ্তাহের মধ্যে অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়া যেমন Bacteroidales মারাত্মকভাবে কমে যায় এবং ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া যেমন Clostridiales অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। অন্ত্রের ব্যাকটেরিয়ার এই ভারসাম্যহীনতা সরাসরি মস্তিষ্কের স্বাভাবিক যোগাযোগ ব্যবস্থাকে block করে দেয় যা জ্ঞানীয় নমনীয়তা বা Cognitive Flexibility হ্রাসের মূল কারণ।
ii. মস্তিষ্কের প্রদাহ বা Neuroinflammation :
সাম্প্রতিক সময়ে Nutritional Neuroscience এবং Neuron জার্নালে প্রকাশিত মেটা এনালাইসিস থেকে জানা যায় অতিরিক্ত চিনি ও চর্বি বা তেল আমাদের মস্তিষ্কের স্মৃতিশক্তির কেন্দ্র হিপোক্যাম্পাস এ তীব্র প্রদাহ বা inflammation তৈরি করে যার কারণে মস্তিষ্কের নতুন কোষ তৈরির প্রক্রিয়া ব্যাহত হয় এবং মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যকার যোগাযোগ দুর্বল হয়ে পড়ে ফলে আমাদের চিন্তা করার গতি ধীর হয়ে যায়। সার্বিকভাবে Cognitive Flexibility হ্রাস পায়।
একবার Cognitive Flexibility কমে গেলে কি ডায়েটের মাধ্যমে পুরোপুরি রিকোভার করা সম্ভব?
অনেকেই ভাবেন কয়েক বছর উল্টোপাল্টা খেয়ে নিই পরে ডায়েট কন্ট্রোল করলেই তো সব ঠিক হয়ে যাবে তবে বিজ্ঞান কিন্তু এখানে একটি বড় সতর্কবার্তা দিচ্ছে। সাম্প্রতিক ২৭টি আন্তর্জাতিক গবেষণার একটি বৃহৎ মেটা এনালাইসিস এ দেখা গেছে দীর্ঘদিন অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার পর আবার সুস্থ ডায়েটে ফিরে আসলে শরীর এবং মেমোরির কিছুটা উন্নতি হয় ঠিকই কিন্তু তা শতভাগ আগের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায় না। বিশেষত যেসব খাবারে অতিরিক্ত চিনি বা চিনি ও চর্বির কম্বিনেশন ছিল তার ফলে হওয়া মানসিক ক্ষতি বা জ্ঞানীয় ধীরতা অনেক বেশি স্থায়ী এবং দীর্ঘমেয়াদী হয়। উচ্চ-চর্বিযুক্ত খাবারের ক্ষতি ডায়েটের মাধ্যমে বদলে কিছুটা রিকভার করা গেলেও উচ্চ-চিনিযুক্ত খাবারের কারণে মস্তিষ্কের কোষের যে ক্ষতি হয় তা সহজে পিছু ছাড়ে না।
তাহলে করণীয়!
আমরা পুরোপুরি ফাস্টফুড বর্জন করতে না পারলেও আমাদের মস্তিষ্ককে বাঁচাতে কিছু উপযুক্ত প্রাকৃতিক বিকল্প বেছে নিতে হবে। যেমন –
i. কোল্ড ড্রিংকস, প্যাকেটজাত জুস, এনার্জি ড্রিংকস এবং অতিরিক্ত মিষ্টি খাবার খাওয়া কমিয়ে মিষ্টির বিকল্প হিসেবে প্রাকৃতিক ফল বেছে নিতে হবে।
ii. ডুবো তেলে ভাজা খাদ্য গ্রহন কমিয়ে খাদ্যতালিকায় মাছ, বাদাম, চিয়া সিড, শর্ষের তেল বা এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল রাখা । এগুলো স্বাস্থ্যের উন্নতির পাশাপাশি মস্তিষ্কের প্রদাহও কমায়।
iii. অন্ত্রের ভালো ব্যাকটেরিয়া টিকিয়ে রাখতে দই , ছানা, এবং প্রচুর পরিমাণে শাকসবজি ও ফলমূল খুবই উপকারি।
আমরা প্রতিদিন প্লেটে যা তুলছি তা কেবল আমাদের ওজন বা ভুঁড়ি বাড়াচ্ছে না সরাসরি আমাদের বুদ্ধি, মেধা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। আজকের একটি ভুল খাবার হয়তো আগামীকালের একটি ভুল সিদ্ধান্তের কারণ হতে পারে। তাই কর্মক্ষেত্রে, পড়াশোনায় বা দৈনন্দিন জীবনে নিজেকে সবসময় মানসিক দিক থেকে চটপটে ও বুদ্ধিমত্তার শীর্ষে রাখতে আজ থেকেই চিনি এবং অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবারকে বিদায় জানান। আপনার পেটের স্বাস্থ্য ভালো থাকলে ব্রেইনও চটপটে থাকবে।
