বয়ঃসন্ধি এমন একটি সময়, যখন একটি শিশুর শরীর ও মনে একসঙ্গে অনেক পরিবর্তন আসে। মেয়েদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ঋতুস্রাব বা পিরিয়ডের শুরু। কিন্তু এই পরিবর্তন যদি খুব অল্প বয়সে শুরু হয়, তাহলে সেটি অনেক সময় শুধু শারীরিক নয়, মানসিক ও সামাজিক নানা চ্যালেঞ্জও নিয়ে আসে।
ধরুন, একটি ১০ বা ১১ বছরের মেয়ে। তার সহপাঠীরা তখনও খেলাধুলা, কার্টুন আর শৈশবের সরল জীবন নিয়ে ব্যস্ত। কিন্তু তার শরীরে শুরু হয়ে গেছে কৈশোরের পরিবর্তন। শরীর দ্রুত বড় হচ্ছে, অথচ মন তখনও শিশুসুলভ। এই অসামঞ্জস্যই অনেক সময় তাকে নানা সমস্যার মুখোমুখি করে।
দীর্ঘদিন ধরে এ বিষয়ে গবেষণা চলছে। ১৯৭০-এর দশকে সমাজবিজ্ঞানী J. Richard Udry প্রথম দেখান যে যেসব মেয়ের শারীরিক পরিপক্বতা তুলনামূলক দ্রুত ঘটে, তাদের মধ্যে জৈবিক তাড়না, কৌতূহল এবং ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা সমবয়সীদের তুলনায় কিছুটা বেশি দেখা যেতে পারে।
পরে Journal of Adolescent Health, Pediatrics-সহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাগুলোতেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, যেসব মেয়ের ১০ বছর বা তারও আগে প্রথম ঋতুস্রাব হয়, তাদের মধ্যে কৈশোরে গর্ভধারণ বা ঝুঁকিপূর্ণ যৌন আচরণে জড়িয়ে পড়ার হার তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।
তবে এর মানে এই নয় যে অল্প বয়সে পিরিয়ড হওয়া মেয়েরা অবশ্যই এসব আচরণে জড়িয়ে পড়বে। গবেষণা কেবল ঝুঁকি বৃদ্ধির কথা বলে, নিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা নয়।
২০১৭ সালে PLOS ONE-এ প্রকাশিত একটি গুরুত্বপূর্ণ মেটা-অ্যানালাইসিসে গবেষক Mobolaji Ibitoye ও Marni Sommer বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল এবং আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের পূর্ববর্তী গবেষণা বিশ্লেষণ করেন। তারা দেখান, অনেক সমাজে এখনও একটি ভুল ধারণা প্রচলিত আছে—মেয়ের পিরিয়ড শুরু মানেই সে বিয়ে ও সন্তান ধারণের জন্য প্রস্তুত। এই সামাজিক ধারণার কারণেই অনেক ক্ষেত্রে অল্প বয়সে পিরিয়ড হওয়া মেয়েদের স্কুল ছাড়তে হয়, দ্রুত বিয়ে দেওয়া হয় অথবা তারা বিভিন্ন সামাজিক ঝুঁকির মুখে পড়ে।
এদিকে সুইডিশ গবেষক Håkan Stattin ও David Magnusson দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখিয়েছেন, যেসব মেয়ের পিরিয়ড দ্রুত শুরু হয় তারা অনেক সময় সমবয়সীদের তুলনায় বয়সে বড় দেখায়। ফলে তারা নিজেরাও অপেক্ষাকৃত বড় বয়সী বন্ধুদের সঙ্গে মিশতে শুরু করে, আবার বড় ছেলেরাও তাদের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে। এই পরিবেশগত প্রভাবের কারণেই অনেক সময় ধূমপান, মদ্যপান, অল্প বয়সে প্রেম, বিয়ে কিংবা অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ আচরণের সম্ভাবনা বাড়ে। গবেষকরা এই বিষয়টিকে Biological-Social Interaction Theory নামে ব্যাখ্যা করেছেন।
কিন্তু কেন এমন হয়?

এর উত্তর লুকিয়ে আছে আমাদের শরীরের হরমোন ব্যবস্থায়।
সাধারণত পিরিয়ড শুরু হওয়ার প্রক্রিয়াটি মস্তিষ্কের Hypothalamus-Pituitary-Gonadal বা HPG Axis সক্রিয় হওয়ার মাধ্যমে শুরু হয়। একে অনেকটা শরীরের “হরমোন নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র” বলা যায়। যেসব মেয়ের ১২ বছরের আগেই ঋতুস্রাব শুরু হয়, তাদের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা সময়ের আগেই সক্রিয় হয়ে যায়।
ফলে শরীরে Estrogen ও Progesterone হরমোনের মাত্রা দ্রুত বাড়তে থাকে। এর প্রভাবে স্তনের বৃদ্ধি, শরীরের গঠন পরিবর্তন, বগল ও যৌনাঙ্গে লোম গজানোসহ কৈশোরের বিভিন্ন লক্ষণ দ্রুত দেখা দেয়।
তবে সমস্যা হলো, শরীরের এই পরিবর্তনের সঙ্গে মন সবসময় তাল মিলিয়ে চলতে পারে না।
মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী Limbic System হরমোনের ওঠানামার প্রতি খুবই সংবেদনশীল। ফলে অনেক কিশোরী হঠাৎ রেগে যাওয়া, অকারণে কান্না পাওয়া, খিটখিটে মেজাজ বা আবেগের ওঠানামার অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যায়।
অন্যদিকে ভালো-মন্দ বিচার করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল বিবেচনা করার সঙ্গে সম্পর্কিত মস্তিষ্কের অংশ Prefrontal Cortex পুরোপুরি পরিণত হতে সাধারণত বিশের কোঠার মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত লাগে। ফলে শরীর দ্রুত বড় হয়ে গেলেও মানসিক পরিপক্বতা একই গতিতে এগোয় না।
এই কারণেই অনেক গবেষক বলেন, early menarche-এর ক্ষেত্রে জৈবিক পরিপক্বতা এবং মানসিক পরিপক্বতার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয়।
অল্প বয়সে পিরিয়ডের আরও কিছু শারীরিক প্রভাব রয়েছে। Estrogen হাড়ের বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণকারী Epiphyseal Plate দ্রুত বন্ধ করে দেয়। এজন্য পিরিয়ড শুরু হওয়ার পর সাধারণত মেয়েদের উচ্চতা আর খুব বেশি বাড়ে না। অনেক সময় দেখা যায়, কম বয়সে পিরিয়ড হওয়া মেয়েরা শুরুতে সমবয়সীদের চেয়ে লম্বা হলেও পরিণত বয়সে তাদের চূড়ান্ত উচ্চতা তুলনামূলক কম হতে পারে।
হরমোনের প্রভাবে ত্বকে তেলের নিঃসরণও বেড়ে যায়। ফলে ব্রণ দেখা দিতে পারে, শরীরে লোম বাড়তে পারে এবং নিজের শরীরের পরিবর্তন নিয়ে অস্বস্তিও তৈরি হতে পারে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক চাপ। যখন ক্লাসের অন্য শিশুরা এখনও শিশু হিসেবেই দেখা হয়, তখন একজন মেয়েকে হঠাৎ বড়দের মতো পোশাক পরা, আচরণ করা কিংবা নানা সামাজিক নিয়ম মেনে চলার প্রত্যাশার মুখোমুখি হতে হয়। অনেকেই নিজের শরীর নিয়ে লজ্জা, সংকোচ বা হীনমন্যতায় ভোগে।
গবেষণায় দেখা গেছে, early menarche-এর অভিজ্ঞতা থাকা মেয়েদের মধ্যে কৈশোরে উদ্বেগ, আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি এবং বিষণ্নতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তবে আশার কথা হলো, Danish National Birth Cohort Study অনুযায়ী এই পার্থক্য স্থায়ী নয়। যেসব মেয়ের অল্প বয়সে পিরিয়ড হয়েছিল তারা ১৪ থেকে ১৬ বছর বয়সে কিছু মানসিক ও আচরণগত সমস্যার মুখোমুখি হলেও পরবর্তী প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে তাদের মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মবিশ্বাস সাধারণত অন্য নারীদের সমপর্যায়ে চলে আসে।
সবকিছু মিলিয়ে বলা যায়, ১২ বছরের আগে ঋতুস্রাব শুরু হওয়া কোনো রোগ নয়, কিন্তু এটি এমন একটি অবস্থা যেখানে একটি মেয়ের অতিরিক্ত মানসিক, সামাজিক ও পারিবারিক সহায়তা প্রয়োজন হতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ২০–২৫ শতাংশ মেয়ের মধ্যে early menarche দেখা যায়। বাংলাদেশের কিছু সমীক্ষায় এ হার আরও বেশি হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
তাই কোনো মেয়ের অল্প বয়সে পিরিয়ড শুরু হলে তাকে ভয় দেখানো, লজ্জা দেওয়া বা তার স্বাধীনতা সীমিত করার পরিবর্তে প্রয়োজন তার পাশে দাঁড়ানো। তাকে শরীরের পরিবর্তন সম্পর্কে সঠিক তথ্য দেওয়া, তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়া এবং এমন একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে সে নির্ভয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে।
কারণ শরীর বয়সের আগেই বড় হয়ে যেতে পারে, কিন্তু মনকে বড় হওয়ার জন্য সময় দিতে হয়। আর সেই সময়টুকুতে পরিবারের ভালোবাসা, সচেতনতা ও সহযোগিতাই হতে পারে একটি কিশোরীর সবচেয়ে বড় শক্তি।
