অপরিচিত কারও সঙ্গে প্রথম পরিচয়ে আমরা সাধারণত তাদের সম্পর্কে যে প্রথম তথ্যটা পাই সেটা হলো তাদের নাম। বাবা-মা প্রায়ই সন্তানের নাম কী হবে তা নিয়ে ভীষণ চিন্তায় পড়ে যান, আর শেষ পর্যন্ত অনেক ভাবনা-চিন্তার পর যে নামটা ঠিক করেন সেটাই সন্তানের জন্য বেছে নেন। কিন্তু আশ্চর্য হলেও সত্যি, আমাদের ডাকা নামটা অন্যরা আমাদের সম্পর্কে কীভাবে ভাববে, তাতে বড়সড় প্রভাব ফেলতে পারে।
আমরা প্রায়ই ভাবি বাবা-মা আমাদের জীবনে কীভাবে প্রভাব ফেলেছেন? হয়তো তাদের স্নেহ, কঠোরতা, উদারতা বা জেদের কথা মনে করে ভাবি। কিন্তু তারা আমাদের যে এক বিশেষ উপহার দিয়েছেন সেটা নিয়ে হয়তো খুব বেশি ভেবেছেন কম মানুষই আর সেটা হলো আমাদের নাম। আমরা আমাদের নাম পছন্দ করি কি না, আর সমাজ সেটাকে কীভাবে দেখে সেটাও একটা বড় প্রশ্ন।
সন্তানের নাম ঠিক করতে গিয়ে বাবা-মায়েরা কত না চিন্তিত থাকেন! মনে হয় এটা যেন সৃজনশীলতার একটা পরীক্ষা বা নিজের ব্যক্তিত্ব আর পছন্দকে সন্তানের মাধ্যমে প্রকাশ করার একটা উপায়। কিন্তু অনেকে হয়তো বুঝতে পারেন না যে, যে নামটা তারা বেছে নেন সেটাই সন্তানের চারপাশের মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে সাহায্য করে। আর সেই দৃষ্টিভঙ্গিই শেষ পর্যন্ত সন্তানের ব্যক্তিত্বে প্রভাব ফেলে।
অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির ম্যানেজমেন্ট ও উদ্যোক্তা বিষয়ক অধ্যাপক ডেভিড ঝু যিনি নামের মনস্তত্ত্ব নিয়ে গবেষণা করেন তিনি বলেন,
নাম দিয়ে কাউকে শনাক্ত করা হয় এবং প্রতিদিন তার সঙ্গে কথা বলার জন্য ব্যবহার করা হয়, তাই নাম নিজের পরিচয়ের মূল ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়, বিশেষ করে অন্যদের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে।
অবশ্যই আমাদের ব্যক্তিত্ব তৈরি করে নানান বিষয় ঘিরে। এর কিছুটা আসে জেনেটিক্স বা বংশগত প্রভাব থেকে, কিছু গড়ে ওঠে শৈশবের অভিজ্ঞতা দিয়ে। আমরা কার সঙ্গে মিশি, জীবনযাত্রায় কাজে বা পরিবারে কোন ভূমিকা আছে কি নেই এসবও আমাদের গড়ে তোলে। কিন্তু এই সব কিছুর ভিড়ে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই নামের ভূমিকা যেটা জন্মের পর থেকেই আমাদের জীবনে চাপিয়ে দেওয়া হয় এবং সারা জীবন সঙ্গী হয়ে থাকে। ১৯৬১ সালে ব্যক্তিত্ব মনোবিজ্ঞানের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা গর্ডন অলপোর্ট বলেন,
সারা জীবনে আমাদের আত্মপরিচয়ের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নোঙর হয়ে থাকে আমাদের নিজের নাম।
সবচেয়ে সহজভাবে বললে, আমাদের নাম আমাদের জাতিগত পরিচয় বা পটভূমি সম্পর্কে ইঙ্গিত দিতে পারে। কিন্তু এ পৃথিবীতে সামাজিক পক্ষপাতের কারণে এর ফল ভয়াবহ হতে পারে।
যেমন আমেরিকায় ৯/১১ সন্ত্রাসী হামলার পর এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল একই রকম জীবনবৃত্তান্ত বা রিজিউমি যদি আরবি শোনায় এমন নামের সাথে যুক্ত হয়, তবে সেটা ইন্টারভিউয়ের জন্য কম ডাক পেয়েছে, কিন্তু যদি সাদা চামড়ার মানুষের নাম থাকে তবে সহজেই ডাক পেয়েছে। এটা কতটা অন্যায় তা বলার অপেক্ষা রাখে না, বিশেষ করে যখন নাম দিয়ে সব সময়ই সঠিকভাবে কারও পটভূমি বোঝা যায় না।
এই পরিণতিগুলোকে হালকা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু এখানেই নামের প্রভাব থেমে যায় না। একই সংস্কৃতির মধ্যেই কিছু নাম খুব প্রচলিত আবার কিছু নাম বিরল। কিছু নামের অর্থ ইতিবাচক বা নেতিবাচক ইঙ্গিত দেয়। কিছু নাম শোনায় ফ্যাশনেবল বা পুরনো ঢঙের এবং এসব ধারণা সময়ের সঙ্গে বদলাতেও পারে। আর এই বৈশিষ্ট্যগুলোই শেষ পর্যন্ত প্রভাব ফেলে অন্যরা আমাদের কেমন আচরণ করবে এবং আমরা নিজেদের সম্পর্কে কী ভাবব তার ওপর।
২০০০-এর দশকে মার্কিন মনোবিজ্ঞানী জিন টুয়েঞ্জের নেতৃত্বে করা এক গবেষণায় দেখা গিয়েছিল পরিবারের পটভূমি বা জীবনের প্রতি অসন্তুষ্টি বাদ দিয়েও যারা নিজেদের নাম পছন্দ করেন না তাদের মানসিকভাবে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা সাধারণত কম। কেন এমন হয়?
গবেষকদের মতে, হয়তো তাদের আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদার অভাব তাদের নিজের নাম অপছন্দ করায় বা নাম অপছন্দ করা তাদের আত্মবিশ্বাসে আঘাত করে ফলে নাম একসময় নিজেকে বোঝানোর প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
অন্যরা আমাদের প্রতি কীভাবে আচরণ করে, সেটাতেও নামের প্রভাব দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে ২০১১ সালে করা একটি জার্মান গবেষণার কথা বলা যেতে পারে। সেখানে একটি ডেটিং সাইটের ব্যবহারকারীদের জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল তারা শুধুমাত্র নাম দেখে সম্ভাব্য ডেটের সঙ্গে যোগাযোগ করতে চাইবেন কি না।
ইউনিভার্সিটেট মানহেইম-এর অধ্যাপক ইয়োখেন গেবাউয়ার এবং তাঁর সহকর্মীরা দেখলেন, যেসব নাম তখন অফ্যাশনেবল বা পুরনো ধাঁচের ধরা হতো সেসব নামের মানুষকে বেশি প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছিল, আর যাদের নাম ট্রেন্ডি সেসব মানুষকে বেশি পছন্দ করা হচ্ছিল।
ভাবা যায়, কারও নামের কারণে জীবনে বারবার প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হতে হলে তার জন্য উষ্ণ, বিশ্বাসী স্বভাবের মানুষ হওয়া বেশ কঠিন। ডেটিং সাইটের সেই গবেষণার আরেকটি অংশও এই কথার প্রমাণ দেয় যে যাদের নাম তখন অফ্যাশনেবল বা পুরনো ধাঁচের বলে ধরা হতো এবং যাদের বেশি বার প্রত্যাখ্যান করা হচ্ছিল, তাদের মধ্যে দেখা গেল তারা তুলনামূলকভাবে কম শিক্ষিত এবং আত্মসম্মানও ছিল কম। যেন ডেটিং সাইটের সেই প্রত্যাখ্যানগুলো তাদের জীবনের অন্য দিকের অভিজ্ঞতারই প্রতিফলন।
এ রকম আরও সাম্প্রতিক গবেষণা দেখা যায়, নাম যদি খুব অজনপ্রিয় হয় বা শুনতে নেতিবাচক লাগে তাতেও ক্ষতিকর প্রভাব থাকতে পারে।
বেইজিং-এর ইনস্টিটিউট অব সাইকোলজির গবেষক হুয়াজিয়ান কাই এবং তাঁর সহকর্মীরা কয়েক লক্ষ মানুষের নামের ডেটা নিয়ে তাদের অপরাধে জড়িত হওয়ার সম্ভাবনার সাথে মিলিয়ে দেখেন। তাঁরা দেখলেন, পটভূমির নানা ডেমোগ্রাফিক ফ্যাক্টর হিসেব করেও, যাদের নাম তুলনামূলকভাবে কম জনপ্রিয় বা যেগুলো শুনতে কম নৈতিক মনে হয় তারা অপরাধে জড়িত হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখিয়েছে।
এমন প্রবণতাকে অনেকটা কম Agreeability এর একটা লক্ষণ হিসেবে ধরা যেতে পারে। গবেষকদের মতে, যদি কারও নাম নেতিবাচক বা অপছন্দনীয় হয় তাহলে সেই মানুষটা ছোট থেকে সামাজিক প্রত্যাখ্যানের মুখোমুখি হয় এবং ধীরে ধীরে তার ব্যক্তিত্ব আরও বিরূপ বা অসহযোগী হয়ে উঠতে পারে।
হুয়াজিয়ান কাই বলেন, আমাদের নাম এমন প্রভাব ফেলতে পারে কারণ এটা আমাদের নিজেদের সম্পর্কে কেমন অনুভব করি আর অন্যরা আমাদের কীভাবে আচরণ করে তা নির্ধারণ করে। তিনি আরও বলেন, ভাল বা খারাপ নাম যেহেতু ভাল বা খারাপ ফল বয়ে আনতে পারে, তাই আমি বলব বাবা-মায়েদের উচিত নিজেদের সংস্কৃতির দৃষ্টিতে সন্তানের জন্য যতটা সম্ভব একটি ভাল নাম বেছে নেওয়া।
এখন পর্যন্ত গবেষণাগুলো মূলত নেতিবাচক বা অজনপ্রিয় নামের ক্ষতিকর দিক দেখিয়েছে। কিন্তু কিছু নতুন তথ্য ইঙ্গিত দেয় যে নামের ইতিবাচক প্রভাবও থাকতে পারে। যেমন, যদি কারও নামের উচ্চারণ মধুর বা সহজে প্রবাহিত হয় তাহলে মানুষ সাধারণত ধরে নেয় যে সেই ব্যক্তি বেশি সহৃদয় বা সহযোগী স্বভাবের। কিন্তু যদি নামটা Eric বা Kirk এর মতো হঠাৎ থেমে যাওয়া বা কড়া শব্দের হয়, তখন সেই একই ধারণা নাও জন্মাতে পারে। আর এই ধরণের ধারণা কিন্তু সামাজিক জীবনে বড় সুবিধা এনে দিতে পারে।
তাছাড়া, কম প্রচলিত নাম প্রথম দিকে কিছুটা অসুবিধা তৈরি করতে পারে যেমন মানুষ সহজে প্রত্যাখ্যান করতে পারে বা আপনাকে কম পছন্দ করতে পারে কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর কিছু বাড়তি সুবিধাও থাকতে পারে।
এই ধরনের নাম অনেক সময় মানুষকে নিজের বিশেষত্ব সম্পর্কে গভীর ফিলিংস বা অনুভূতি দেয়। বেইজিংয়ের ইনস্টিটিউট অব সাইকোলজির কাই এবং তার দলের আরেকটি নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবারের অবস্থা বা সামাজিক পটভূমি হিসেব করেও দেখা গেল যে যাদের নাম তুলনামূলকভাবে বিরল, তাদের অদ্ভুত বা সৃষ্টিশীল পেশা বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা বেশি, যেমন চলচ্চিত্র পরিচালক বা বিচারক হওয়া।
গবেষকরা বলেন, জীবনের শুরুতেই কিছু মানুষ নিজের নামের আলাদা বৈশিষ্ট্য থেকে একধরনের অনন্য পরিচয়ের অনুভূতি পায় আর এই অনুভূতিই তাদের ভেতরে একধরনের Distinctiveness Motive বা আলাদা হওয়ার ইচ্ছে তৈরি করে যা পরে তাদেরকে জীবনের পেশাগত দিক থেকেও আলাদা কিছু খুঁজতে প্ররোচিত করে।
এই ধারণা কিছুটা মনে করিয়ে দেয় Nominative Determinism এর কথা, যে ধারণা অনুযায়ী আমাদের নামের অর্থই নাকি জীবনের সিদ্ধান্তগুলোকে প্রভাবিত করে।
আরিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির ঝু এবং তার সহকর্মীদের গবেষণায় দেখা গেছে, অদ্ভুত নাম মানুষকে আরও সৃষ্টিশীল আর উদার মানসিকতার করে তুলতে পারে। ঝু’র দল এক হাজারের বেশি কোম্পানির সিইওদের নাম বিশ্লেষণ করে দেখেছে, যাদের নাম বিরল তারা তুলনামূলকভাবে ব্যতিক্রমী ব্যবসায়িক কৌশল অনুসরণ করেন বিশেষ করে যদি তারা স্বভাবগতভাবেই আত্মবিশ্বাসী হন। ঝু বলেন, অস্বাভাবিক নামধারী সিইওরা নিজেদেরকে আলাদা ভাবে দেখতে শুরু করেন, আর সেই আলাদা হওয়ার অনুভূতিই তাদেরকে ভিন্ন কৌশল বেছে নিতে অনুপ্রাণিত করে।
এই গবেষণায় স্পষ্ট হলো, কমন না হওয়া নামের মানুষদের মধ্যে চলচ্চিত্র পরিচালক বা বিচারকের মতো অপ্রচলিত পেশা বেছে নেওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে বেশি।
তাহলে প্রশ্ন আসে যদি আপনি নতুন বাবা-মা হতে যাচ্ছেন, তাহলে কি সন্তানের জন্য খুব প্রচলিত একটা নাম দেবেন যাতে সে ছোটবেলায় বেশি জনপ্রিয় আর পছন্দনীয় হয় নাকি একেবারে নতুন ও ভিন্নরকম একটা নাম দেবেন যা তাকে নিজের বিশেষত্ব অনুভব করতে সাহায্য করবে আর সৃষ্টিশীল করে তুলবে? ঝু পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, কমন আর আনকমন দুই ধরনের নামেরই সুবিধা-অসুবিধা আছে। তাই বাবা-মায়েদের বোঝা উচিত, যে ধরনের নামই দিন না কেন দুই দিকের কথাই মাথায় রাখতে হবে।
সম্ভবত সবচেয়ে ভালো উপায় হতে পারে দুই দিকই মিলিয়ে নেওয়া। যেমন, সন্তানের জন্য এমন একটা নাম রাখা যা প্রচলিত, কিন্তু পরে সহজেই বিশেষ কোনো ডাকনামে রূপান্তর করা যায়। ঝু বলেন, আপনি যদি খুব প্রচলিত একটা নাম দেন তাহলে শিশু ছোটবেলায় সহজেই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হবে আর সবাই তাকে পছন্দ করবে। কিন্তু বাবা-মায়েরও দরকার, সেই শিশুকে তার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য উপলব্ধি করানো হয়তো তাকে একটা বিশেষ ডাকনাম দিয়ে বা বারবার তার ভিন্নতাটাকে স্বীকৃতি দিয়ে।
সর্বশেষ
নামের মধ্য দিয়ে শিশুর জীবনে এক ধরনের অদৃশ্য কিন্তু গভীর প্রভাব তৈরি হয়। একটি সহজ ও প্রচলিত নাম তাকে সমাজের সঙ্গে দ্রুত মিশে যেতে সাহায্য করে, স্কুলে বা খেলাঘরে তাকে সহজেই গ্রহণযোগ্য করে তোলে এবং অন্যদের স্নেহ পাওয়ার পথ সহজ করে দেয়।
কিন্তু মানুষের পরিচয় কেবল বাইরের দুনিয়ার জন্য নয়, নিজের ভেতরেও একটি স্বতন্ত্র সত্তা লালন করার প্রয়োজন আছে। সেই জায়গাটিই পূরণ করে বিশেষ ডাকনাম। তাই নাম বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে এই দুই দিককে মিলিয়ে দেওয়াই সবচেয়ে বুদ্ধিমানের কাজ।
একটি নামের ভেতর সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা আর ব্যক্তিগত বিশেষত্বকে একসঙ্গে ধারণ করলে শিশু শিখবে, সে যেমন সবার সঙ্গে যুক্ত তেমনি নিজের ভেতরেও রয়েছে এক অনন্য দীপ্তি, যা তাকে ভবিষ্যতে আরও আত্মবিশ্বাসী ও পরিপূর্ণ মানুষ হতে সাহায্য করবে।
লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র : বিবিসি
