আমরা জানি, মানুষ, পশু-পাখি অর্থাৎ প্রাণীরা ব্যথা অনুভব করে। কারণ তাদের দেহে ব্যথা বোঝার জন্য বিশেষ রিসেপ্টর, স্নায়ু, আর মস্তিষ্ক আছে—যেগুলোর মাধ্যমে শরীরে আঘাত লাগলে তার সংকেত পায় এবং প্রতিক্রিয়া জানায়। কিন্তু গাছের দেহে এসব কিছুই নেই। গাছের নেই কোনো ব্যথা রিসেপ্টর, নেই স্নায়ু বা মস্তিষ্ক যা আঘাত লাগলে বোঝতে পারবে। তাই আপনি যদি একটি গাছ তুলে ফেলেন বা একটি গাছের ডাল কেটে ফেলেন, তাহলে সেটা গাছের জন্য কোনো নির্যাতন নয়। গাছকে কষে আঘাত করলে গাছ কষ্ট পাচ্ছে—এমন চিন্তা করার কোনো দরকার নেই। কারণ, গাছ ব্যথা অনুভব করে না।

তবে, এতেও একটা চমক আছে। গাছ ব্যথা না পেলেও তারা চারপাশের ছোঁয়া, আঘাত বা ক্ষতি বুঝতে পারে এবং সে অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানায়। আর অনেক ক্ষেত্রে তাদের এই প্রতিক্রিয়া এতটাই সূক্ষ্ম ও জটিল যে বিজ্ঞানীরা এখনো এসব নিয়ে বিস্মিত।

venus fly trap

কিছু গাছের সেন্সিং ক্ষমতা আমাদের চোখে দেখা যায়। যেমন ধরুন ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ (venus fly trap)। এই গাছটি পোকা ধরার জন্য এমন একধরনের ফাঁদ ব্যবহার করে, যেটা মাত্র আধ সেকেন্ডে বন্ধ হয়ে পোকাটি ধর ফেলে। আবার ‘সেনসিটিভ প্ল্যান্ট’ বা লজ্জাবতী গাছের কথা ধরুন। একে ছুঁলেই এর পাতা সঙ্গে সঙ্গে গুটিয়ে যায়। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই প্রতিক্রিয়াগুলো গাছকে রক্ষা করার জন্য, যেন তৃণভোজী প্রাণীরা এগুলো দেখে ভয় পায় বা আগ্রহ হারায়।

Arabidopsis thaliana

তবে শুধু এই ধরণের গাছ নয়—অনেক সাধারণ গাছও বাইরের স্পর্শ বা ক্ষতির প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে, যদিও সেটা আমাদের চোখে পড়ে না। উদাহরণ হিসেবে নেওয়া যায় Arabidopsis নামে এক ধরনের সরিষার গাছ, যেটা গবেষণায় বহুল ব্যবহৃত হয়। যখন এ গাছের পাতায় কীটপতঙ্গ, যেমন ক্যাটারপিলার বা এফিড এসে খেতে থাকে, তখন গাছ এক পাতা থেকে আরেক পাতায় বৈদ্যুতিক সংকেত পাঠাতে শুরু করে। এই সংকেত পৌঁছে দিলে গাছ নিজের মধ্যে রাসায়নিক প্রতিরক্ষা তৈরি করে, যেন পোকাগুলো দূরে সরে যায়।

এই বৈদ্যুতিক সংকেত ঠিক মানুষের ব্যথার সংকেতের মতো নয়। আমরা যেমন ব্যথা পেলে কষ্ট পাই, কেঁদে ফেলি বা চিৎকার করি, গাছের ক্ষেত্রে তেমন কিছু ঘটে না। তাই কোনো গাছ আহত হলে আমরা যদি বলি “গাছ ব্যথা পাচ্ছে”, সেটা হবে ভুল। এটা মানুষের মতো করে ভাবার একধরনের প্রবণতা—যাকে বলে “anthropomorphism” অর্থাৎ মানবীয় বৈশিষ্ট্য অন্য কিছুর ওপর আরোপ করা।

সত্যিটা হলো, গাছ আশ্চর্যজনকভাবে সূর্যের আলো, মাধ্যাকর্ষণ, বাতাসের দোলা, এমনকি পোকামাকড়ের হালকা কামড়েরও প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। কিন্তু তারা ব্যথা পায় না। তাদের বিবর্তনের পথে কখনোই “ভোগান্তি” বা “যন্ত্রণা” কোনো ফ্যাক্টর ছিল না। তারা শুধু জীবন ও মৃত্যুর মাঝে টিকে থাকার লড়াই করে গেছে—নীরবে, নিঃশব্দে।

সুতরাং, গাছ কষ্ট পায় না। তারা ব্যথা বোঝে না। তবে তারা বোঝে পরিবেশ বদলাচ্ছে, কোথাও কিছু ঘটছে, এবং সেই অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া জানিয়ে তারা নিজেদের রক্ষা করার চেষ্টা করে। এটা অবাক করার মতোই একটি প্রক্রিয়া, কিন্তু সেটা ব্যথা নয়।

লেখকঃ ইমাম হোসাইন আনজির
সূত্রঃ Britannica

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply