আমরা এতদিন জেনে এসেছি যৌন উদ্দীপনা, আকর্ষণ এবং শারীরিক আকাঙ্ক্ষার মতো বিষয়গুলোতে মস্তিষ্কেরই একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ। জানতাম কামোত্তেজনা বা যৌনতার মূল চালিকাশক্তি আমাদের মস্তিষ্ক আর মেরুদণ্ড বা Spinal Cord কেবল মস্তিষ্কের নির্দেশ পালনকারী একটি নিষ্ক্রিয় মাধ্যম মাত্র যার কাজ শেষ মুহূর্তে শুধু বীর্যপাত ঘটানো।
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও নিউরোসায়েন্সের সাম্প্রতিক এক যুগান্তকারী গবেষণা এই পুরনো ধারণা ও Top-down থিওরির মোর ঘুরিয়ে দিয়েছে। পর্তুগালের বিশ্ববিখ্যাত Champalimaud Foundation এর একদল গবেষক প্রমাণ করেছেন যে আমাদের মেরুদণ্ড কেবল মস্তিষ্কের বার্তাবাহক নয় বরং এটি সরাসরি মানুষের যৌন উত্তেজনা নিয়ন্ত্রণ, স্পর্শের অনুভূতি processing এবং যৌনতার পুরো ছন্দ বা Rhythm বজায় রাখতে অত্যন্ত সক্রিয় ও স্বাধীন ভূমিকা পালন করে।
এমন কি আছে মেরুদণ্ডে যা গবেষণার মোর ঘুরিয়ে দিলো?
বিজ্ঞানীরা দেখতে চেয়েছিলেন যৌন মিলনের সময় শরীরের কোন স্নায়বিক সার্কিটগুলো সক্রিয় ভূমিকা রাখে। এক্ষেত্রে তারা পুরুষ ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা চালান কারণ স্তন্যপায়ী প্রাণীদের যৌন আচরণের sequence মানুষের সাথে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ।
অনুসন্ধানে গবেষকরা মেরুদণ্ডের নিচের অংশে একগুচ্ছ বিশেষ নিউরনের সন্ধান পান যেগুলোকে বলা হয় গ্যালানিন-এক্সপ্রেসিং নিউরন বা Gal+ Neurons। বিজ্ঞানীরা দেখান এই Gal+ নিউরনগুলো সরাসরি পুরুষাঙ্গের গোড়ায় থাকা বিশেষ পেশি BSM (Bulbospongiosus Muscle) এর মোটর নিউরনের সাথে যুক্ত যা বীর্য বা শুক্রাণু নিঃসরণের জন্য সরাসরি দায়ী। Patch-clamp electrophysiology প্রযুক্তির মাধ্যমে তারা এটাও প্রমাণ করেন যে এই নিউরনগুলো Glutamate নামক neurotransmitter ব্যবহার করে সরাসরি যৌন পেশিকে সংকুচিত করে।
সিদ্ধান্ত নেয় মেরুদণ্ড!

গবেষণাটির সবচেয়ে চমকপ্রদ আবিষ্কার হলো Gal+ নিউরনগুলো কেবল বীর্যপাতের switch হিসেবে কাজ করে না বরং পুরো যৌন মিলনের সময় উত্তেজনা কেমন হবে, স্পর্শের অনুভূতি কেমন হবে এবং পুরো প্রক্রিয়ার timing কেমন হবে তাও নির্ধারণ করে। বিজ্ঞানীরা মিলনের সময় মেরুদণ্ডের ৩ টি বড় ভূমিকা স্পষ্ট করেছেন।
i. গবেষকরা গবেষণাগারে অবশ করা বা মস্তিষ্ক থেকে বিচ্ছিন্ন করা ইঁদুরের ওপর পরীক্ষা করে দেখান মস্তিষ্কের সিগন্যাল ছাড়াই কেবল যৌনাঙ্গে হালকা স্পর্শ বা stimulation দিলে মেরুদণ্ডের Gal+ নিউরনগুলো নিজে থেকেই সক্রিয় হয়ে ওঠে অর্থাৎ স্পর্শের তীব্রতা পরিমাপ করার ক্ষমতা মেরুদণ্ডের নিজস্ব স্নায়ু সার্কিটের রয়েছে।
ii. আবার বিজ্ঞানীরা কৃত্রিমভাবে এই Gal+ নিউরনগুলোকে নিষ্ক্রিয় বা deactivate করে দেখেন পুরুষ ইঁদুরগুলোর যৌন আচরণে বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছিল। তাদের বীর্যপাতে অস্বাভাবিক দেরি হচ্ছিল এবং মিলনের স্বাভাবিক rhythm বা timing নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল।
iii. যৌন মিলনের পর শরীরের যে সাময়িক শিথিলতা বা ক্লান্তি আসে তাকে Refractory Period বলা হয়। বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন Refractory Period নিয়ন্ত্রণেও মেরুদণ্ডের এই নিউরনগুলো সরাসরি অংশ নেয়। একবার বীর্যপাত ঘটে যাওয়ার পর এই নিউরনগুলো সাময়িকভাবে আর কোনো উদ্দীপনায় সাড়া দেয় না যা শরীরকে বিশ্রামের সংকেত দেয়।
তাহলে মিলনে মস্তিষ্কের কোনো ভূমিকা নেই?
অবশ্যই আছে কিন্তু বিজ্ঞানীরা এক্ষেত্রে মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডের কার্যক্রমকে বর্ণনা করেছেন একটি যৌথ কার্যক্রম বা partnership হিসেবে। সাধারণত মিলনের শুরুতে মস্তিষ্ক থেকে আসা কিছু সংকেত মেরুদণ্ডের সার্কিটকে নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত চেপে বা শান্ত করে রাখে যতক্ষণ না শরীর চূড়ান্ত উত্তেজনার সীমায় পৌঁছায়। যখনই যৌনাঙ্গের স্পর্শ এবং অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায় তখন মেরুদণ্ডের এই নিউরনগুলো সক্রিয় হয়ে ওঠে। বিজ্ঞানীরা বলেন যৌন মিলনের সময় Point of No Return এর সংকেত অর্থাৎ যে মুহূর্তের পর বীর্যপাত অনিবার্য তার সংকেত হয়তো মস্তিষ্ক থেকে আসে না বরং প্রোস্টেট, যৌনাঙ্গ ও মেরুদণ্ডের মধ্যকার একটি অভ্যন্তরীণ কার্যকলাপের মাধ্যমে নির্ধারিত হয়।
নতুন সম্ভাবনা!
এই আবিষ্কার শুধু তাত্ত্বিক বিজ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না এটি মানব স্বাস্থ্য, বিশেষ করে পুরুষদের যৌন চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক বিশাল সম্ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে। বিশ্বজুড়ে অসংখ্য মানুষ Premature Ejaculation বা বিভিন্ন ধরণের যৌন অক্ষমতার বা Sexual Dysfunction সমস্যায় ভুগে থাকেন। এতদিন ধরে এই ধরণের সমস্যার চিকিৎসায় মূলত মানসিক স্বাস্থ্য, অবসাদ বা মস্তিষ্কের হরমোনের ওপর জোর দেওয়া হতো। কিন্তু এখন যেহেতু জানা গেছে যে মেরুদণ্ডের এই Gal+ নিউরন সার্কিটটি যৌনতার timing এবং উত্তেজনা নিখুঁতভাবে নিয়ন্ত্রণ করে তাই ভবিষ্যতে এই নির্দিষ্ট spinal নিউরনগুলোকে লক্ষ্য করে আরও কার্যকরী, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন এবং সুনির্দিষ্ট ওষুধ বা therapy আবিষ্কার করা সম্ভব হবে। তাছাড়াও Spinal Cord Injury বা মেরুদণ্ডে আঘাতপ্রাপ্ত রোগীদের যৌন অনুভূতি ও প্রজনন ক্ষমতা ফিরিয়ে আনার চিকিৎসায়ও এই আবিষ্কার নতুন দিকনির্দেশনা দেবে।
মানব শরীর সৃষ্টির অন্যতম বিস্ময়ের একটি। গবেষকদের এই নতুন আবিষ্কার আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয় মানব যন্ত্র কতটা জটিল ও নিখুঁত রহস্যে ঘেরা। প্রতিনিয়ত যেন এর বিস্ময় বেড়েই চলেছে!
