আপনি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। হঠাৎ করে আপনার ঘুম ভেঙে গেল। আপনি জেগে উঠেছেন, চারপাশের সবকিছু টের পাচ্ছেন, কিন্তু ভয়ানক ব্যাপার হলো আপনি আপনার শরীরের কোনো অংশ নাড়াতে পারছেন না। চিৎকার করতে চাইছেন, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো আওয়াজই বের হচ্ছে না। বুকের উপর মনে হয় যেন ভারি কিছু চেপে বসে আছে, মনে হচ্ছে কেউ আপনার গলা টিপে ধরেছে। তার সাথে  দেখছেন আশেপাশে ভেসে বেড়াচ্ছে অদ্ভুত সব আওয়াজ, হয়তো দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে কালো কোনো ছায়ামূর্তি, যার দিকে তাকাতেও পারছ না। ভয়ে বুকটা ধড়াস ধড়াস করছে।


এই ধরনের অভিজ্ঞতাকে গ্রামবাংলায় বোবায় ধরা বলে । গ্রামবাংলায় এর সাথে জড়িয়ে আছে নানা লোককথা আর ভৌতিক বিশ্বাস। কিন্ত বিজ্ঞান এর ব্যাখ্যা ভিন্নভাবে দেয় । বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় স্লিপ প্যারালাইসিস (Sleep Paralysis)।

স্লিপ প্যারালাইসিস কেন হয় ?


মানুষের ঘুম মূলত দুটি প্রধান পর্যায়ে বিভক্ত। একটা হলো নন-র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট (NREM) ঘুম এবং আরেকটি  র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট (REM) ঘুম। REM স্লিপের সময়ই মানুষ স্বপ্ন দেখে। এই সময়ে আমাদের মস্তিষ্ক খুব সক্রিয় থাকে, প্রায় জেগে থাকার মতোই।  একটা সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে মানুষের শরীরে একটা টেম্পোরারি প্যারালাইসিস বা সাময়িক অবশ  হয় এই রেম স্লিপে।  একারণে কেউস্বপ্ন দেখার সময়  বাস্তবে হাত-পা ছুঁড়ে নিজেদের বা পাশে থাকা কাউকে আঘাত পারে না।

এই অবস্থাকে ‘অ্যাটোনিয়া’ (Atonia) বা পেশীর শিথিলতা বলা হয়। স্লিপ প্যারালাইসিস তখনই ঘটে, যখন মানুষের মন বা চেতনা জেগে উঠলে কিন্ত শরীরটা REM ঘুমের সেই অ্যাটোনিয়া অবস্থা থেকে বের হতে পারে না।ফলে মানুষ সজাগ থেকেও নিজেকে প্যারালাইজড অবস্থায় আবিষ্কার করে।

এই প্যারালাইজড অবস্থাটা কয়েক সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এসময় যুক্ত হয় হ্যালুসিনেশন। মস্তিষ্ক তখনও আংশিকভাবে সেই স্বপ্নের স্টেটে থাকে বা ঘুম ভাঙার এই ট্রানজিশনাল মুহূর্তে অদ্ভুত কিছু ইমেজ তৈরি করে ফেলে। এই হ্যালুসিনেশনগুলো একেবারে বাস্তব মনে হয়, আর সেগুলো প্রায়শই ভীষণ নেগেটিভ, ভীতিকর রকমের হয়।

কেউ কেউ ঘরের কোনায় কালো, মানবাকৃতির ছায়া দেখতে পান যেটা কাছে আসছে। কারো কারো মনে হয় শয়তান বা কোনো ভূত বুকে চেপে বসেছে, শ্বাস রোধ করে দিচ্ছে। কানে ভেসে আসতে পারে ফিসফিস শব্দ, হাসি, কান্না, পায়ের শব্দ, এমনকি পুরো কথোপকথনও। কারো কারো মনে হয় ঘরের ভেতর কেউ ঢুকেছে বা বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। এই ভিজ্যুয়াল বা অডিটরি হ্যালুসিনেশনগুলো স্লিপ প্যারালাইসিস এর ভয়ঙ্কর করে তোলে।

এছাড়াও, এই সময়ে প্রচণ্ড এক ধরনের হেলপলেসনেস কাজ করে। কিছুই করার নেই, শুধু অপেক্ষা করতে হয় কখন এই অবস্থা কাটবে।

স্লিপ প্যারালাইসিস কাদের বেশি হয় ?


যেকোনো বয়সের মানুষেরই স্লিপ প্যারালাইসিস হতে পারে।তবে কিছু কিছু বিষয় এর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।  যেমন, ঘুমের অভাব বা অনিয়মিত ঘুমের অভ্যাস। যারা রাত জেগে কাজ করেন বা পড়াশোনা করেন, তাদের ক্ষেত্রে এটা বেশি দেখা যায়। মানসিক চাপ, উদ্বেগ বা ডিপ্রেশনের মতো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাও এর একটা বড় কারণ হতে পারে।



গবেষণায় দেখা গেছে, পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (PTSD) বা প্যানিক ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে স্লিপ প্যারালাইসিসের হার তুলনামূলকভাবে বেশি। এছাড়াও, চিৎ হয়ে ঘুমানোর অভ্যাস অনেকের ক্ষেত্রে বোবায় ধরার ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে মনে করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে এটি জেনেটিক বা বংশগত হতে পারে এবং নারকোলেপসি (Narcolepsy) নামক এক ধরনের ঘুমজনিত রোগের অন্যতম প্রধান লক্ষণ হিসেবেও প্রকাশ পায়।

বোবায় ধরা বা স্লিপ প্যারালাইসিস কমানোর উপায় :

  • পর্যাপ্ত ঘুম: প্রতিদিন রাতে ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানোর চেষ্টা করতে হবে । ঘুমের অভাব এই সমস্যার প্রধান কারণ।
  • নির্দিষ্ট ঘুমের রুটিন: প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমাতে যান এবং ঘুম থেকে উঠেন, এমনকি ছুটির দিনেও। এটি আপনার শরীরের জৈবিক ঘড়িকে (biological clock) ঠিক রাখতে সাহায্য করবে।
  • মানসিক চাপ কমানো: দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপ কমান। ঘুমানোর আগে মনকে শান্ত রাখার চেষ্টা করতে হবে।
  • ঘুমের পরিবেশ: শোবার ঘরটি শান্ত, অন্ধকার এবং আরামদায়ক তাপমাত্রায় রাখুন। আরামদায়ক ঘুমের পরিবেশ তৈরি করুন।
  • নিয়মিত ব্যায়াম: নিয়মিত শরীরচর্চা করুন, তবে ঘুমাতে যাওয়ার ঠিক আগে ভারী ব্যায়াম না করাই মঙ্গল।
  • শোয়ার ভঙ্গি পরিবর্তন: চিৎ হয়ে ঘুমানোর অভ্যাস থাকলে পাশ ফিরে ঘুমানোর চেষ্টা করুন।
  • ক্যাফেইন ও অ্যালকোহল বর্জন: সন্ধ্যা বা রাতের দিকে চা, কফি, অ্যালকোহল এবং নিকোটিন জাতীয় উত্তেজক পদার্থ এড়িয়ে চলতে হবে।
  • ঘুমানোর আগেই স্ক্রিন থেকে বিরতি: ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত এক ঘণ্টা আগে মোবাইল, ল্যাপটপ বা টিভি দেখা বন্ধ করুন। এই ডিভাইসগুলোর ব্লু লাইট ঘুম নষ্ট করে।
  • বোবা ধরার সময় শান্ত থাকা: যদি বোবায় ধরে, তবে আতঙ্কিত না হয়ে নিজেকে মনে করান যে এটা স্বাভাবিক অস্থায়ী অবস্থা এবং এতে কোনো ক্ষতি হবে না। এসময় হাত বা পায়ের আঙুলের মতো ছোট কোনো অঙ্গ নাড়ানোর চেষ্টা করলে প্যারালাইসিস দ্রুত কেটে যেতে পারে।
  • ডাক্তারের পরামর্শ: যদি বোঝেন সমস্যাটি খুব ঘন ঘন হচ্ছে আর আপনার অস্বাভাবিক লাগছে, তবে অবশ্যই একজন ডাক্তার এর পরামর্শ নেওয়া ভালো ।
বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply