১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বার্নহার্ড রিম্যান Mathematical space যাকে গণিতের স্থানও বলা হয় সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবার ধারণা উদ্ভাবন করেন, যা আধুনিক জ্যামিতি এবং পদার্থবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপন করে।
একটা খোলা মাঠের মাঝখানে দাঁড়ালে আপাতদৃষ্টিতে এ পৃথিবীকে সমতল মনে হয়। তখন আমরা সহজেই ভুলে যাই যে আমরা একটি গোলাকার গ্রহে বাস করি। কারণ পৃথিবীর তুলনায় আমরা এতই ছোট যে আমাদের দৃষ্টিতে পৃথিবী সমতল মনে হয়। এরকম আরও অনেক আকৃতি আছে যেগুলো আবার পোকামাকড়ের দৃষ্টিতে সমতল মনে হয়, যদিও তাদের বৈশ্বিক কাঠামো অনেক জটিল। গণিতশাস্ত্রে এই ধরনের আকৃতিগুলোকে মানিফোল্ড বলা হয়।
রিম্যান ১৯ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই ধারণাটি প্রবর্তন করেন। তার ফলে গণিতের জগতে স্থানকে শুধু অন্যান্য গাণিতিক বস্তুগুলোর জন্য একটি পটভূমি হিসেবে নয়, বরং নিজস্বভাবে অধ্যয়নযোগ্য একটি বিমূর্ত এবং সুসংজ্ঞায়িত বস্তু হিসেবে দেখা শুরু হয়।
এই নতুন দৃষ্টিভঙ্গি গণিতবিদদের উচ্চ-মাত্রার স্থান নিয়ে গবেষণা করার সুযোগ তৈরি করে দেয়। এভাবে জন্ম নেয় আধুনিক টপোলজি যা মানিফোল্ডের মতো গাণিতিক স্থান অধ্যয়নের ক্ষেত্র। আজ মানিফোল্ড জ্যামিতি, গতি-সিস্টেম, তথ্য বিশ্লেষণ, পদার্থবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মানিফোল্ড গণিতবিদদের সমাধান করার জন্য একটি সাধারণ ভাষা সৃষ্টি করে। যেমন ভাষার ক্ষেত্রে বর্ণমালা অপরিহার্য, তেমনি গণিতে মানিফোল্ড। যেমন ফ্যাব্রিজিও বিয়াঞ্চি বলেছিলেন,
“যদি আমি সিরিলিক অক্ষর জানি, তবে আমি কি রাশিয়ান জানি? না। কিন্তু সিরিলিক অক্ষর না জানলে রাশিয়ান শেখা প্রায় অসম্ভব।”
ধারণার বিকাশ
হাজার হাজার বছর ধরে জ্যামিতি মূলত ইউক্লিডীয় স্থান বা সমতল স্থানের অধ্যয়ন হিসেবে বিবেচিত হয়। স্পেনের সেভিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান দর্শনবিদ জোসে ফেরেইরোস বলেন,
“১৮০০ সালের আগে স্থান বলতে বোঝানো হতো শুধু শারীরিক স্থান।”
ইউক্লিডীয় স্থানে সবকিছু প্রত্যাশা অনুযায়ী ঘটে: দুই বিন্দুর মধ্যে সবচেয়ে ছোট দূরত্ব হয় সরলরেখা, একটি ত্রিভুজের কোণগুলোর যোগফল ১৮০ ডিগ্রি এবং ক্যালকুলাসের সরঞ্জাম নির্ভরযোগ্য।
কিন্তু ১৯ শতকের শুরুতে কিছু গণিতবিদ অন্য ধরনের স্থান নিয়ে ভাবতে শুরু করেন যেখানে স্থান সমতল নয়, বরং গোলক বা খাটের মতো বক্র। এই ধরনের স্থানে সমান্তরাল রেখা একদিন মিলিত হতে পারে এবং ত্রিভুজের কোণগুলোর যোগফল ১৮০ ডিগ্রির বেশি বা কম হতে পারে। এমন জায়গায় ক্যালকুলাস করা সহজ নয়।
এই নতুন ধারণা গণিতের সাধারণ মানসিকতার জন্য চ্যালেঞ্জিং ছিল। তবে রিম্যান এই ধারণাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যান।

বার্নহার্ড রিম্যান একজন স্বভাবজাত লাজুক মানুষ ছিলেন। তিনি মূলত ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করতে চেয়েছিলেন। তার বাবা একজন পাদ্রি ছিলেন কিন্তু তিনি পরে গণিতের প্রতি আকৃষ্ট হন। ১৮৪৯ সালে তিনি তাঁর ডক্টরেটের জন্য কার্ল ফ্রিডরিখ গাউসের তত্ত্বাবধানে অধ্যয়ন শুরু করেন। গাউস তখন বক্রতা এবং পৃষ্ঠের অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা করছিলেন, যা চারপাশের স্থানকে প্রভাবিত না করেই পর্যবেক্ষণ করা যেত।
১৮৫৪ সালে, রিম্যানকে গোটিংগেন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকের পদ নিশ্চিত করতে একটি বক্তৃতা দিতে হয়। তার বিষয় ছিল জ্যামিতির ভিত্তি। ১০ জুন, জনসমক্ষে বক্তৃতা দেওয়ার ভয় থাকা সত্ত্বেও, তিনি একটি নতুন তত্ত্ব উপস্থাপন করেন যেখানে তিনি গাউসের পৃষ্ঠের জ্যামিতির ধারণাকে যেকোনো মাত্রায় (এমনকি অসীম মাত্রাতেও) সাধারণ করেন।
গাউস তখন মুহূর্তেই মুগ্ধ হয়ে যান। তবে অধিকাংশ গণিতবিদ রিম্যানের ধারণাকে অস্পষ্ট এবং বিমূর্ত মনে করেন। বহু বছর ধরে এই কাজকে তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। রিম্যানের বক্তৃতা ১৮৬৮ সালে ছাপা হয়, তার মৃত্যুর দুই বছর পর।
১৯ শতকের শেষের দিকে হেনরি পয়ঁকারে (Henri Poincaré) রিম্যানের কাজের গুরুত্ব স্বীকার করেন। ১৯১৫ সালে আলবার্ট আইনস্টাইন তার সাধারণ আপেক্ষিকতার তত্ত্বে এই ধারণা ব্যবহার করেন। ২০ শতকের মধ্যভাগে, মানিফোল্ড গণিতের একটি অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠে।
রিম্যান এমন একটি ধারণা উপস্থাপন করেছিলেন যা সব ধরনের জ্যামিতিকে যেকোনো মাত্রায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারে। আর এই ধারণা হলো মানিফোল্ড।
মানিফোল্ডের সংজ্ঞা
মানিফোল্ড শব্দটি রিম্যানের জার্মান শব্দ Mannigfaltigkeit থেকে এসেছে, যার অর্থ বৈচিত্র্য বা গুণাগুণের বহুবিধতা।
একটি মানিফোল্ড হলো এমন স্থান যা তার প্রতিটি বিন্দুতে জুম করলে ইউক্লিডীয় মনে হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি বৃত্ত হলো এক-মাত্রিক মানিফোল্ড। যেকোনো বিন্দুতে জুম করলে এটি একটি সরলরেখার মতো দেখায়। বৃত্তের উপর একটা পোকা রাখলে পোকাটি বুঝবে না এটি আসলে বৃত্তাকার।
কিন্তু একটি figure eight (৮-এর মতো আকৃতি) যেখানে এটি নিজেকে ছেদ করে, সেখানে জুম করলে এটি সরলরেখার মতো দেখাবে না। সুতরাং figure eight মানিফোল্ড নয়।
২-মাত্রার উদাহরণে, পৃথিবীর পৃষ্ঠ একটি মানিফোল্ড। যথেষ্ট জুম করলে এটি সমতল ২-মাত্রিক প্লেনের মতো দেখায়। তবে দুটি শীর্ষ সংযুক্ত ডাবল কোণের পৃষ্ঠ মানিফোল্ড নয়।
মানিফোল্ডের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এটি অন্তর্নিহিত ইউক্লিডীয় প্রকৃতি ধারণ করে। তাই গণিতবিদরা জটিল গঠন নিয়ে বিভ্রান্ত না হয়ে মানিফোল্ডের ছোট ছোট অংশের ইউক্লিডিয়ান বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে গণনা করতে পারেন।
চার্ট এবং এটলাস
মানিফোল্ডকে বোঝার জন্য গণিতবিদরা এটিকে ছোট ছোট অংশে ভাগ করেন। প্রতিটি অংশকে একটি চার্ট দিয়ে প্রকাশ করা হয়। মানিফোল্ডের মাত্রার সমান সংখ্যক কো-অর্ডিনেট দিয়ে। যেসব চার্টের অংশ একে অপরের সাথে মিলিত হয়, তাদের সম্পর্ক বোঝাতে নিয়ম লেখা হয়। সব চার্টের সংগ্রহকে এটলাস বলা হয়।
এটলাস ব্যবহার করে মানিফোল্ডের ছোট ছোট অংশকে ইউক্লিডীয় স্থান হিসেবে বিবেচনা করে সমস্যা সমাধান করা যায়। এরপর সব চার্টের ফলাফল একত্রিত করলে পুরো মানিফোল্ড বোঝা সম্ভব হয়। আজ এই পদ্ধতি গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।
মানিফোল্ডের ব্যবহার
মানিফোল্ড আমাদের ব্রহ্মাণ্ড বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতায় স্পেস-টাইম হলো চার-মাত্রিক মানিফোল্ড এবং মহাকর্ষ হলো সেই মানিফোল্ডের বক্রতা। আমাদের চারপাশের ত্রিমাত্রিক স্থানও মানিফোল্ড।
মানিফোল্ড ব্যবহার করে জটিল ভৌত বা জ্যামিতিক সমস্যা সহজভাবে বোঝা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ডাবল পেনডুলাম অর্থাৎ দুটি পেনডুলামের সংযোগ একটি জটিল গতিবিধি অনুসরণ করে। তবে এর অবস্থার দুইটি কোণ ব্যবহার করে সম্ভাব্য অবস্থার স্থানকে একটি টোরাস বা ডোনাটের মতো মানিফোল্ড হিসেবে দেখানো যায়।
এইভাবে গবেষকরা পদার্থবিজ্ঞানের সমস্যা জ্যামিতিক ভাষায় অনুবাদ করে বোঝা সহজ করেন। একইভাবে, জটিল বীজগাণিতিক সমীকরণের সমাধান বা উচ্চ-মাত্রার ডেটাসেটও মানিফোল্ড হিসেবে বিশ্লেষণ করা যায়।
লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র : Quanta Magazine

