অনেকসময় মনে করা হয় রাস্তার কুকুর,বিড়াল কামড় দিলে জলাতঙ্ক হয় আর পোষা বিড়াল, কুকুর কামড় দিলে জলাতঙ্ক হয় না। অনেককে আবার বড় মুখ করে বলতে শোনা যায়, আমাকে বিড়াল কামড়েছিলো, অমুক কে আঁচড় দিয়েছিলো, তমুকের রক্ত বের করেছিলো অথচ কিছুই হয়নি, বিড়াল কামড় বা আঁচড় দিলে কিছুই হয় না ইত্যাদি ইত্যাদি।

কেউ কেউ স্থানীয় কিছু কবিরাজের কাছ থেকে ঝাড় ফুক করিয়ে নেন বা তাদের দেওয়া ঔষুধ সেবন করেন। কিন্তু আসলেই কি সেটা সঠিক চিকিৎসা?
এই প্রবন্ধে কুকুর, বিড়াল কামড়ালে কখন ভ্যাক্সিন নিতে হবে, প্রাথমিক ভাবে কি করা উচিত ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হবে এবং এরপর জলাতঙ্ক ও ভ্যাক্সিন নিয়ে আমাদের কিছু কমন ও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করা হবে।
জলাতঙ্কের প্রভাব ও ভ্যাক্সিনেশনের যৌক্তিকতা-
বিড়াল, কুকুর কামড় দিলে আসলে জলাতঙ্ক হবে কিনা সেটা নির্ভর করে ওই বিড়াল, কুকুরটি Rabies ভাইরাসে আক্রান্ত কিনা তার উপর। র্যাবিস ভাইরাসে সংক্রমিত যেকোনো কুকুর, বিড়াল, শেয়াল, ছুচো, বেজি কামড়ালে বা আঁচড় দিলেই জলাতঙ্ক হতে পারে। সেটা পোষাই হোক আর রাস্তারই হোক অথবা জঙ্গলের। র্যাবিস ভাইরাসে আক্রান্ত কুকুর বা বিড়ালের লালাতে ভাইরাস থাকে। মানুষকে কামড়ানোর সাথে সাথেই ভাইরাস মানব শরীরে প্রবেশ করে এবং মস্তিষ্কে গিয়ে ভয়ানক সংক্রমণ ঘটায়। এছাড়া বিড়ালের কামড় বা আঁচড় থেকে Bertonella Henselae নামক একটি ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ হতে পারে, সাথে জলাতঙ্কও হতে পারে।

জলাতঙ্ক হলে সাধারণত ১ সপ্তাহ থেকে ১ মাসের মধ্যে উপসর্গ দেখা দেয় এবং মানব শরীরে একবার জলাতঙ্কের উপসর্গ দেখা দিলে তার বাঁচার সম্ভাবনা একদম শূন্য! কারন এই ভাইরাস মানবশরীরের প্রবেশের পর প্রথমে পর্যাপ্ত পরিমান বংশ বিস্তার করে এবং তারপর লক্ষন প্রকাশ করে। আর ততদিনে তেমন করার মতো কিছু থাকে না, তাই মৃত্যু নিশ্চিত। শুধু মৃত্যু বললে ভুল হবে, ভয়াবহ বেদনাদায়ক মৃত্যু। এই রোগে আক্রান্ত রোগীর পানির প্রতি ভয় বা ঘৃণা জন্মায়, যাকে বলে হাইড্রোফোবিয়া।
পানি দেখলেই গলায় খিঁচ ধরা শুরু হয়, ঢোক গিলতে না পারা, মুখ থেকে লালা ঝরতে থাকা এসব লক্ষণ দেখা দেয়। কারণ ভাইরাসটি গলার পেশি ও স্নায়ুতে এমনভাবে আক্রমণ করে যে স্বাভাবিক গিলতে পারা বা কথা বলাও অসম্ভব হয়ে যায়। এ অবস্থায় রোগী পানাহারে অক্ষম হয়ে পড়ে, দেহে খিঁচুনি শুরু হয় এবং কখনো কখনো কোমায় চলে যায়। মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রম পুরোপুরি ভেঙে পড়ার পর হৃদযন্ত্র বা শ্বাসতন্ত্র বন্ধ হয়ে রোগীর মৃত্যু হয়।
তাই, ভ্যাক্সিন দিয়ে আপনার লাইফ সুরক্ষিত করবেন নাকি আপনার লাইফের রিস্ক নিবেন সে সিদ্ধান্ত আপনার।
প্রাথমিক চিকিৎসা ও ভ্যাক্সিনেশন পদ্ধতি-
কুকুড়, বিড়াল কামড়ালে ঘাবড়ে না গিয়ে সুন্দরভাবে যায়গাটি প্রথমে পানি ও পরে ডেটল বা অন্য অ্যান্টিসেফপ্টিক লিকুইড দিয়ে অনেকক্ষন ধুয়ে পরিস্কার করে নিবেন। ক্ষত গভীর হলে ধোয়ার পর রক্ত বন্ধ করার জন্য ব্যান্ডেজ করে নিবেন। যত দ্রুত সম্ভব, কামড়ের সাথে সাথে (সবথেকে ভালো হয় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে) প্রথম ডোজ ভ্যাকসিন নিতে হবে। সেটা সম্ভব না হলেও সর্বোচ্চ ৩ দিনের মধ্যে ভ্যাক্সিন নিতেই হবে।
এখন বাংলাদেশের সব হাসপাতালেই এসব ভ্যাক্সিন পাওয়া যায়। সাধারণত ভ্যাকসিন দেয়া হয় ৩/৫ টি ডোজে— ০, ৩, ৭, ১৪ এবং ২৮তম দিনে। গভীর কামড় বা রক্তপাত হলে বা মাথা, গলা, মুখে কামড় হলে ভ্যাকসিনের পাশাপাশি র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবুলিন RIG ও নিতে হয়।

ভ্যাক্সিনের ডোজ মিস করলে করনীয়-
অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় ভ্যাক্সিন নিতে গিয়ে কোন কারনবশত বা ভুলবশত ভ্যাক্সিনের ডোজ মিস করে ফেলেন—এতে ঘাবড়ানোর কিছু নেই। WHO এর মতে যত দ্রুত সম্ভব মিস করে ফেলা ডোজ নিতে হবে তবে ভ্যাক্সিন রি-স্টার্ট করার প্রয়োজন পড়ে না। মানে ধরুন আপনার দ্বিতীয় ভ্যাক্সিন আপনি মিস করেছেন এবং আজকে তৃতীয় ভ্যাক্সিন দিয়েছেন তো চাইলেই আপনি কালকে বা পরশু গিয়ে মিস হয়ে যাওয়া দ্বিতীয় ডোজটি দিতে পারেন।
পোষা প্রাণী থাকলে করনীয়-
যদি বাড়িতে নির্দিষ্ট পোষা প্রাণী থাকে তবে সেই প্রানীকে ভ্যাক্সিনেট করে নিলেই হয়—সাধারন ৬ মাসে একবার। এতে মালিক ও পোষা প্রানী উভয়ই সেইফ থাকে। কিন্তু কেউ যদি বাড়িতে নতুন নতুন প্রাণী আনতেই থাকেন, যেমন অনেকে অসুস্থ প্রাণী রেস্কিউ করে বা সব সময় আলাদা প্রাণীর সংস্পর্শে থাকতে হয় জলাতঙ্কের প্রি ভ্যাক্সিন নিতে হবে। তবে মনে রাখা জরুরি যতদিন মেয়াদি ভ্যাক্সিন দিয়েছেন ততদিন সেফ থাকার নিশ্চয়তা পাবেন, আজীবন নয়।
কুকুর, বিড়াল খাবারে মুখ দিলে করণীয়-
ভ্যাক্সিনেট নয় এমন কুকুর, বিড়াল খাবারে মুখ দিলে সে খাবার ফেলে দেওয়াই উত্তম। তবে ভ্যাক্সিনেট কুকুর, বিড়াল যদি খাবারে মুখ দেয় সেটাও খাওয়াটা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। অনেক সময় আত্নীয়র জন্য প্রচুর রান্না করা খাবারে বিড়াল, কুকুর মুখ দিলে সেগুলো ফেলে দেওয়াও প্রায় অসম্ভব হয়ে যায় অনেকের কাছে। যদি প্রানীটি ভ্যাক্সিনেট হয় তাহলে খাবার আবার প্রচুর তাপে গরম করে খাওয়া যেতে পারে।
পরিশেষে, জলাতঙ্ক হতে সতর্ক থাকুন, সুস্থ থাকুন, অন্যদের সাথে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করুন, সচেতন থাকুন, সচেতন রাখুন।
লেখক : মুগ্ধ সরকার
