আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ব্যথা পেয়ে থাকি আর এটি এমন এক অভিজ্ঞতা যা এড়িয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব। ছোটখাটো আঘাত থেকে শুরু করে দীর্ঘস্থায়ী শারীরিক কষ্ট, ব্যথা আমাদের শরীর ও মনের উপর সমানভাবে প্রভাব ফেলে। চিকিৎসা বিজ্ঞান ব্যথা কমানোর জন্য নানা পদ্ধতি তৈরি করেছে যেমন ওষুধ, ফিজিওথেরাপি, শল্যচিকিৎসা কিংবা মানসিক ব্যায়াম। তবে সম্প্রতি আলোচনায় উঠে এসেছে এক অদ্ভুত পদ্ধতি যা কোনো চিকিৎসা গবেষণাগার নয় বরং এক গোপন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি (সিআইএ)–এর একটি ডিক্লাসিফাইড বা উন্মুক্ত করা নথিতে দেখা যায় একটি সহজ অনুশীলনের মাধ্যমে নাকি মানুষ ব্যথা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। সেই অনুশীলন হলো ব্যথার জায়গায় মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করে মনের মধ্যে বারবার পাঁচ অঙ্কের একটি সংখ্যা (৫৫৫১৫) উচ্চারণ করা।
এই কৌশলটি প্রথম প্রকাশ্যে আসে সিআইএ–এর গেটওয়ে ইন্টারমিডিয়েট ওয়ার্কবুক নামের একটি প্রশিক্ষণ ম্যানুয়াল থেকে। নথিতে এটি বর্ণনা করা হয়েছে ডেইলি টুল হিসেবে, অর্থাৎ প্রতিদিনের অনুশীলনের একটি অংশ। উদ্দেশ্য ছিল মানসিক নিয়ন্ত্রণ, মনোসংযোগ এবং ব্যথা প্রশমন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে খবরটি ছড়িয়ে পড়ার পর অনেকে কৌতূহলী হয়ে বিষয়টি পরীক্ষা করেছেন, আবার কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন এটি কি সত্যিই বৈজ্ঞানিকভাবে কার্যকর নাকি কেবল মানসিক কল্পনার ফল?
সংখ্যার মাধ্যমে মনোসংযোগ
সংখ্যা মানুষের মস্তিষ্কে এক বিশেষ প্রভাব ফেলে। গণিতের সমস্যার সমাধান কিংবা মন্ত্রের মতো সংখ্যা পুনরাবৃত্তি আমাদের মনকে একটি নির্দিষ্ট ফ্রেমে আটকে দেয়। এই অবস্থায় মস্তিষ্ক তুলনামূলকভাবে অন্য সব উদ্দীপনা উপেক্ষা করতে শুরু করে। যখন কেউ ব্যথার স্থানে মনোযোগ রেখে ৫৫৫১৫ সংখ্যাটি বারবার মনে মনে উচ্চারণ করেন, তখন মস্তিষ্কের একটি অংশ ব্যথা থেকে সরে গিয়ে সংখ্যার পুনরাবৃত্তিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। ফলে ব্যথার তীব্রতা অনুভব কিছুটা কমে যেতে পারে।
মনোবিজ্ঞানে এ ধরণের পদ্ধতিকে সাধারণত ডিসট্র্যাকশন টেকনিক বা মনোযোগ ভিন্ন দিকে সরিয়ে নেওয়া কৌশল বলা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ করে শিশুদের টিকা দেওয়ার সময় খেলনা দেখা বা গান শোনার মতো বিভ্রান্তিমূলক কৌশল ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। সংখ্যার পুনরাবৃত্তিও মূলত একই নীতির উপর ভিত্তি করে কাজ করে।
গাইডেড ইমাজারি ও মন্ত্রের মিল
সিআইএ–এর নথিতে শুধু সংখ্যা নয়, ব্যথার স্থানের চিত্র কল্পনা করার কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ যেই জায়গায় ব্যথা হচ্ছে, সেই অংশকে মনে মনে কল্পনা করা এবং সেখানে সংখ্যা প্রক্ষেপণ করা। এই কৌশলকে বলা হয় গাইডেড ইমাজারি বা নির্দেশিত কল্পনা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে বহু বছর ধরেই গাইডেড ইমাজারি ব্যবহার করা হচ্ছে, বিশেষত ক্যানসার রোগী বা দীর্ঘস্থায়ী ব্যথায় ভোগা মানুষের জন্য। অনেক গবেষণা প্রমাণ করেছে যে নিয়মিত মানসিক কল্পনা শরীরের চাপ কমায়, স্নায়ুর কার্যকলাপে পরিবর্তন আনে এবং ব্যথা সহনীয় করে তোলে।
অন্যদিকে সংখ্যা পুনরাবৃত্তি মন্ত্র বা Mantra Meditation–এর সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। হাজার বছর ধরে মানুষ বিভিন্ন শব্দ বা বাক্যাংশ বারবার উচ্চারণ করে মনকে স্থির করেছে। আধুনিক গবেষণাও বলছে, মন্ত্র উচ্চারণ বা মানসিক পুনরাবৃত্তি রক্তচাপ কমাতে, উদ্বেগ হ্রাস করতে এবং মানসিক শান্তি আনতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। সেই দিক থেকে দেখলে, ৫৫৫১৫ কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং এক ধরনের মন্ত্র হিসেবেও কাজ করতে পারে।
প্রমাণের সীমাবদ্ধতা
তবে এখানে একটি বড় প্রশ্ন থেকে যায় এটি কি আসলেই কাজ করে? সত্যি বলতে গেলে, সুনির্দিষ্টভাবে ৫৫৫১৫ সংখ্যাটি ব্যবহার করে কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণা এখনও হয়নি। সিআইএ–এর ওয়ার্কবুক কোনো মেডিকেল জার্নাল নয়; এটি ছিল তাদের বিশেষ প্রশিক্ষণের অংশ যার উদ্দেশ্য ছিল মানসিক সক্ষমতা বাড়ানো। ফলে এটিকে সরাসরি বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বলা যায় না।
তবে এ নিয়ে প্রচুর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্প পাওয়া যায়। কেউ কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেছেন যে সংখ্যা পুনরাবৃত্তি করার পর তারা ব্যথা কম অনুভব করেছেন। আবার অন্যরা জানিয়েছেন, তেমন কোনো পরিবর্তন তারা লক্ষ্য করেননি। অর্থাৎ ফলাফল সবার ক্ষেত্রে সমান নয়। বৈজ্ঞানিকভাবে এটি ব্যাখ্যা করা যায় প্লাসিবো এফেক্ট বা প্রত্যাশাজনিত প্রভাব দিয়ে। মানুষ যখন বিশ্বাস করে কোনো কৌশল তাদের সাহায্য করবে, তখন সেই বিশ্বাস থেকেই মস্তিষ্কে রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটে এবং ব্যথার অনুভূতি সত্যিই কিছুটা কমে যায়।
বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি
বেদনা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে আধুনিক বিজ্ঞানে বেশ কিছু মনস্তাত্ত্বিক পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত। এর মধ্যে রয়েছে মনোযোগ সরানো, নির্দেশিত কল্পনা, মন্ত্রপাঠ এবং প্লাসিবো ইফেক্ট। সবগুলোই প্রমাণ করে যে মস্তিষ্ক ব্যথার সংকেতকে বাড়াতে বা কমাতে পারে। সুতরাং ৫৫৫১৫ কৌশলটির কার্যকারিতা বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যা করা সম্ভব হলেও এটি সংখ্যাটির বিশেষত্বের কারণে নয়, বরং এর মাধ্যমে মনোসংযোগ, প্রত্যাশা ও মনোযোগ সরানোর মতো প্রক্রিয়া সক্রিয় হওয়ার কারণে।
গবেষণায় দেখা গেছে, হাসপাতালে সার্জারির আগে বা ছোটখাটো অপারেশনে রোগীকে কল্পনা বা গান শোনানো হলে ব্যথা ও উদ্বেগ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। আবার দীর্ঘস্থায়ী ব্যথায় আক্রান্ত রোগীদের জন্য মন্ত্রপাঠের নিয়মিত চর্চা ব্যথা সহনীয় করতে সাহায্য করে। এসব গবেষণা পরোক্ষভাবে প্রমাণ করে যে ৫৫৫১৫–এর মতো কৌশলও কিছু মানুষের ক্ষেত্রে কাজ করতে পারে।
বিতর্ক ও সতর্কতা
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন যে এই কৌশলকে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে দেখা উচিত নয়। হঠাৎ তীব্র ব্যথা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া অপরিহার্য। ৫৫৫১৫ কেবল একটি সহায়ক বা সম্পূরক কৌশল হতে পারে, যেটি হয়তো সাময়িক স্বস্তি দেবে।
এছাড়া অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন ৫৫৫১৫–এর মধ্যে আসলে কী রহস্য আছে? কেন অন্য কোনো সংখ্যা নয়? বিজ্ঞানীরা মনে করেন সংখ্যাটি বেছে নেওয়া হয়েছিল প্রতীকীভাবে বা কেবল একটি নির্দিষ্ট ফোকাস তৈরির জন্য। অর্থাৎ সংখ্যাটি বিশেষ নয়, বরং এর পুনরাবৃত্তিই মূল বিষয়। যে কোনো অন্য সংখ্যা বা শব্দও একইভাবে কাজ করতে পারে।
সর্বশেষ
সিআইএ–এর ডিক্লাসিফাইড ওয়ার্কবুকে পাওয়া ৫৫৫১৫ সংখ্যার কৌশলটি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, মানুষের মস্তিষ্ক ও শরীরের মধ্যে সম্পর্ক কতটা গভীর। যদিও এই নির্দিষ্ট সংখ্যাটির কার্যকারিতা নিয়ে কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই, তবে সংশ্লিষ্ট পদ্ধতি মনোসংযোগ, কল্পনা ও মন্ত্রপাঠ এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। তাই একে সম্পূর্ণ অস্বীকার করার সুযোগ নেই, আবার অতিরিক্ত প্রত্যাশাও করা উচিত নয়।
অবশেষে বলা যায়, ব্যথা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে ৫৫৫১৫ কৌশলটি বৈজ্ঞানিকভাবে নিশ্চিত সমাধান নয় তবে এটি মনোবিজ্ঞানের প্রমাণিত কৌশলগুলির একটি ভিন্ন রূপ। সচেতনভাবে প্রয়োগ করলে এটি কিছু মানুষের জন্য সাময়িক আরাম এনে দিতে পারে। তবে চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে নয়, বরং সহায়ক অনুশীলন হিসেবেই এটিকে দেখা শ্রেয়।
তথ্যসূত্র :
- Gateway Intermediate Workbook (CIA, declassified)
- Daily Mail
- Media Coverage: iHeart, Daily Mail, LADBible
- Tseng, T.-Y., Chen, L., et al. (2022).
- Menzies, V., Taylor, A. G., Bourguignon, C. (2006).
- Bukola, I. M., & Paula, D. (2017).
- Cho, S., & Choi, M. (2021).
