মানুষ পৃথিবীর সবচেয়ে অভিযোজনক্ষম প্রাণী। বরফে ঢাকা আর্কটিক অঞ্চল থেকে শুরু করে তপ্ত মরুভূমি, ঘন জঙ্গল কিংবা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে হাজার হাজার ফুট উঁচু পাহাড় প্রায় সব ধরনের পরিবেশেই মানুষ টিকে থাকতে পেরেছে। কিন্তু একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন দীর্ঘদিন ধরে বিজ্ঞানীদের ভাবিয়েছে। মানুষ এত দ্রুত পৃথিবীর নানা পরিবেশে কীভাবে ছড়িয়ে পড়ল? শুধুই কি জিনগত বিবর্তনের কারণে এটি সম্ভব হয়েছে?
সম্প্রতি প্রকাশিত কিছু গবেষণা বলছে, এর উত্তর শুধু জিনে লুকিয়ে নেই। মানুষের সাফল্যের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল সংস্কৃতি, শেখার ক্ষমতা এবং সামাজিক জ্ঞান। গবেষকদের মতে, মানুষ পৃথিবী জয় করেছে জিনগত বিবর্তনের চেয়ে প্রায় ৩০০ গুণ দ্রুত গতিতে।
সাধারণভাবে বিবর্তন বলতে আমরা বুঝি জিনগত পরিবর্তন। একটি প্রাণী নতুন পরিবেশে টিকে থাকার জন্য ধীরে ধীরে তার শরীরে পরিবর্তন আনে। এই পরিবর্তন ঘটতে হাজার হাজার বছর লেগে যায়। উদাহরণ হিসেবে ধরা যায় মেরু অঞ্চলের প্রাণীদের কথা। ঠান্ডা পরিবেশে টিকে থাকার জন্য তাদের শরীরে ধীরে ধীরে ঘন লোম, চর্বি বা বিশেষ ধরনের শারীরিক বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে। কিন্তু মানুষের ক্ষেত্রে চিত্রটি অনেক ভিন্ন।
মানুষ বরফাচ্ছন্ন অঞ্চলে টিকে থেকেছে মূলত আগুন ব্যবহার করে, পশুর চামড়া দিয়ে পোশাক বানিয়ে এবং আশ্রয় তৈরি করে। অর্থাৎ শরীর বদলানোর আগেই মানুষ তার বুদ্ধি ও সামাজিক জ্ঞান ব্যবহার করে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছে। এখানেই মানুষের বিশেষত্ব।
বিজ্ঞানীরা এই প্রক্রিয়াকে বলেন সাংস্কৃতিক বিবর্তন। এটি এমন এক ধরনের অভিযোজন, যা জিনের মাধ্যমে নয়, বরং শেখা ও জ্ঞান বিনিময়ের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। একজন মানুষ নতুন কিছু আবিষ্কার করলে সেটি অন্যদের শেখাতে পারে। ফলে একটি ধারণা বা প্রযুক্তি খুব দ্রুত পুরো সমাজে ছড়িয়ে যায়। জিনগত বিবর্তনের মতো এর জন্য হাজার বছর অপেক্ষা করতে হয় না।
ধরা যাক আগুন আবিষ্কারের কথা। আগুন মানুষকে শুধু উষ্ণতাই দেয়নি, খাবার রান্না করার সুযোগও দিয়েছে। রান্না করা খাবার সহজে হজম হয় এবং শরীর বেশি শক্তি পায়। আবার আগুন মানুষকে বন্য প্রাণীর আক্রমণ থেকেও সুরক্ষা দিয়েছে। একইভাবে পাথরের অস্ত্র, ভাষা, কৃষিকাজ কিংবা নৌকা তৈরির মতো আবিষ্কার মানুষের বিস্তারকে আরও দ্রুত করেছে।
গবেষকদের মতে, মানুষের এই সাংস্কৃতিক অভিযোজন পৃথিবীতে বিস্ময়কর গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে অন্যান্য প্রাণীর একটি নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে লক্ষ লক্ষ বছর লাগতে পারে, সেখানে মানুষ কয়েক হাজার বছরের মধ্যেই নতুন অঞ্চলে বসতি গড়ে তুলেছে। এই কারণেই গবেষণায় বলা হচ্ছে, মানুষের বিস্তার জিনগত বিবর্তনের তুলনায় বহু গুণ দ্রুত ঘটেছে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে মানুষের জিনগত বিবর্তন থেমে গেছে। মানুষ এখনও বিবর্তিত হচ্ছে। উদাহরণ হিসেবে দুধ হজমের ক্ষমতার কথা বলা যায়। বহু মানুষের শরীরে এমন জিনগত পরিবর্তন এসেছে, যার ফলে তারা বড় হওয়ার পরও দুধ হজম করতে পারে। আবার আফ্রিকার কিছু অঞ্চলে ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্যও বিশেষ জিনগত অভিযোজন দেখা যায়। তিব্বতের মানুষের শরীরে উচ্চভূমির কম অক্সিজেনে টিকে থাকার মতো পরিবর্তনও তৈরি হয়েছে।
অর্থাৎ মানুষের ক্ষেত্রে দুটি প্রক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করেছে। একদিকে জিনগত বিবর্তন, অন্যদিকে সাংস্কৃতিক বিবর্তন। তবে গবেষকদের মতে, মানুষের দ্রুত বৈশ্বিক সাফল্যের পেছনে সাংস্কৃতিক অভিযোজনের ভূমিকাই সবচেয়ে বড়।
এখানে ভাষার গুরুত্বও বিশাল। ভাষা মানুষকে জ্ঞান সংরক্ষণ ও ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা দিয়েছে। অন্য প্রাণীরাও শেখে, কিন্তু তারা মানুষের মতো জটিলভাবে তথ্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পৌঁছে দিতে পারে না। মানুষ তার পূর্বপুরুষের জ্ঞান ব্যবহার করে নতুন প্রযুক্তি তৈরি করেছে। ফলে প্রতিটি প্রজন্মকে নতুন করে সবকিছু আবিষ্কার করতে হয়নি।
এ কারণেই মানুষ কেবল একটি প্রাণী নয়, বরং “জ্ঞানভিত্তিক প্রজাতি” হিসেবেও বিবেচিত হয়। আমাদের সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে সমষ্টিগত শেখা ও সহযোগিতার উপর। একজন ব্যক্তি একা আধুনিক সভ্যতা তৈরি করতে পারত না। কিন্তু লাখো মানুষের অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান একত্রিত হয়ে আজকের পৃথিবী তৈরি করেছে।
বিজ্ঞানীরা এখন gene-culture coevolution নামে একটি ধারণা নিয়ে কাজ করছেন। এর অর্থ হলো জিন ও সংস্কৃতি একে অপরকে প্রভাবিত করে বিবর্তনের পথ তৈরি করেছে। যেমন কৃষিকাজ শুরু হওয়ার পর মানুষের খাদ্যাভ্যাস বদলেছে, আর সেই পরিবর্তন আবার জিনগত অভিযোজনকে প্রভাবিত করেছে।
মানুষের সাফল্যের গল্প তাই কেবল শরীরের বিবর্তনের গল্প নয়। এটি বুদ্ধি, সহযোগিতা, ভাষা এবং সংস্কৃতির গল্পও। পৃথিবীর ইতিহাসে মানুষই একমাত্র প্রজাতি, যে নিজের পরিবেশ বদলে ফেলার ক্ষমতা অর্জন করেছে।
