মানুষের বিবর্তন কি থেমে গেছে? মানুষ যদি বানর থেকে আসে তাহলে বানরগুলো এখন মানুষে বিবর্তিত হচ্ছে না কেনো? আমরা কেউ না কেউ এরকম বহু প্রশ্নের সম্মুখীন হয়েছি আবার অনেকের মনেও জেগে উঠেছে এ সকল প্রশ্ন। চলুন বিস্তারিত জানা যাক।
মানব বিবর্তন থেমে গেছে কি?
এই প্রশ্নের উত্তরে অনেক খ্যাতিমান বিবর্তনবিদ ইতিবাচক সুরেই মত দিয়েছেন। যেমন, বিশিষ্ট প্যালেওনটোলজিস্ট স্টিফেন জে গোল্ড একবার বলেছিলেন গত ৪০,০০০ বা ৫০,০০০ বছরে মানুষের মধ্যে কোনো জৈবিক পরিবর্তন ঘটেনি। আমাদের যেটা সংস্কৃতি ও সভ্যতা বলে জানি তা আমরা একই দেহ ও মস্তিষ্ক দিয়ে গড়েছি। —এই বক্তব্যের পেছনে মূল যুক্তি হলো, মানব জাতি যখন একটি নির্দিষ্ট মাত্রার বড় মস্তিষ্ক অর্জন করে এবং জটিল সংস্কৃতি গড়ে তোলে, গোল্ডের মতে প্রায় ৪০,০০০–৫০,০০০ বছর আগে তবে অনেকের মতে কৃষির আবির্ভাবের সময় অর্থাৎ ১০,০০০ বছর আগে তখন থেকেই জৈবিক বিবর্তনের জায়গা নেয় সাংস্কৃতিক বিবর্তন।
তবে এই যুক্তি অনেক বিবর্তনবিদ মানেন না, বরং কেউ কেউ সম্পূর্ণ উল্টো মত দিয়েছেন। উদাহরণস্বরূপ, বিবর্তনবিদ কোকরান এবং হার্পেন্ডিং মত দিয়েছেন গত ১০,০০০ বছরে মানুষের বিবর্তন থেমে যাওয়ার বদলে বরং তা অনেক বেশি দ্রুত হয়েছে এমনকি আগের ৬ মিলিয়ন বছরের গড় হারের চেয়ে প্রায় ১০০ গুণ দ্রুত।
এই প্রশ্নের উত্তর স্বাস্থ্য এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। যারা মনে করেন বিবর্তন থেমে গেছে তারা বলেন আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাই এখন জৈবিক বিবর্তনের জায়গা নিয়েছে। তাদের মতে, আমরা এখন আর সংক্রামক রোগের সঙ্গে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে মানিয়ে নিচ্ছি না বরং টিকা, অ্যান্টিবায়োটিক এবং জনস্বাস্থ্যনীতির মতো সাংস্কৃতিক আবিষ্কারের মাধ্যমে টিকে থাকছি।
এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, টাইপ ২ ডায়াবেটিস, হৃদরোগ ইত্যাদির মতো সাধারণ অসংক্রামক রোগগুলো আমাদের সেই জৈবিক অভিযোজনের ফল যা মূলত কৃষির আগের পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর জন্য গড়ে উঠেছিল এবং আজও রয়ে গেছে, কারণ বিবর্তন থেমে গেছে। এমনকি আরমেলাগোস দাবি করেছেন, কৃষির উদ্ভবের পর থেকে অনেকভাবে মানব স্বাস্থ্যের অবনতি ঘটেছে, কারণ আমরা এখনো সেই স্টোন এজ বা প্রস্তর যুগের পরিবেশে মানানসই শরীর নিয়েই বসবাস করছি।
এই পর্যালোচনায় মূল লেখকের দাবি, মানুষের বিবর্তন থেমে যায়নি এবং চলমান এই বিবর্তনের বহু চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যগত তাৎপর্য রয়েছে। মানুষের বিবর্তন থেমে গেছে—এই যুক্তির পেছনে তিনটি বড় ত্রুটি রয়েছে। প্রথমত, এই যুক্তি ধরে নেয় যে সাংস্কৃতিক বিবর্তন হওয়া মানেই প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে অভিযোজন বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে সব প্রাণীই পরিবেশের সঙ্গে খাপ খায়, আর মানুষের ক্ষেত্রে পরিবেশের বড় একটা অংশ তৈরি হয় তার নিজস্ব সংস্কৃতি দিয়ে। অর্থাৎ, সাংস্কৃতিক পরিবর্তন মানুষের অভিযোজনে বাধা দেয় না, বরং তাকে ত্বরান্বিত করে।
দ্বিতীয় ভুলটি হলো— এটি ধরে নেয় বিবর্তন মানেই অভিযোজিত বিবর্তন। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে, বিবর্তন মানে হলো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি জনসংখ্যার জীনপুলে জীন বা জীন-সমষ্টির ধরণ বা হার পরিবর্তিত হওয়া। জীনপুল বলতে বুঝায় একটি প্রজননক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে যেসব জীন একত্রে ভাগাভাগি হয়। প্রাকৃতিক নির্বাচন এই পরিবর্তনের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম হলেও, জীন বিস্তার, প্রজনন পদ্ধতি, জনসংখ্যার আকারসহ অনেক কারণেই বিবর্তন ঘটে। বিবর্তনের ধরন নির্ভর করে এসব উপাদানের সম্মিলিত প্রভাবে। মানুষের সংস্কৃতি এই সব বিবর্তন প্রক্রিয়ার ভারসাম্য অনেকটাই পালটে দিয়েছে, যার ফলে সাম্প্রতিক সময়ে মানব বিবর্তন নতুনভাবে ত্বরান্বিত হয়েছে।
তৃতীয়ত, জেনেটিক বৈশিষ্ট্যগুলো সাধারণত পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়। ফলে, একটি নিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্যও বিবর্তিত হতে পারে অন্য কোনো বৈশিষ্ট্যের ওপর প্রাকৃতিক নির্বাচনের কারণে। সুতরাং, যখন কোনো সাংস্কৃতিক উদ্ভাবন কোনো একটি বৈশিষ্ট্যের ওপর প্রাকৃতিক নির্বাচনের চাপ কমিয়ে দেয় বা তুলে দেয়, তখন এই পরিবর্তন আবার অন্য নিরপেক্ষ বৈশিষ্ট্যের দিকেও বিবর্তনীয় পরিবর্তন ঘটাতে পারে, যদিও তা অভিযোজনমূলক না-ও হতে পারে।
এই যুক্তিগুলো মিলিয়ে দেখা যায়, মানব বিবর্তন থেমে যায়নি, বরং আমাদের সংস্কৃতির হাত ধরে তা নতুনভাবে রূপ নিচ্ছে এবং এর অনেক গভীর স্বাস্থ্যগত ও চিকিৎসাবিদ্যাগত প্রভাব রয়েছে।
মানব সংস্কৃতির মাধ্যমে অভিযোজিত বিবর্তন
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে কৃষির আবিষ্কার এবং এর ধারাবাহিক উন্নয়ন মানব পরিবেশকে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করেছে। সাধারণভাবে পরিবেশে পরিবর্তন আসলে প্রাণীরা নিজেদের অভিযোজিতভাবে বদলায়—এবং মানুষও এর ব্যতিক্রম নয়। এই কথাটা ভালোভাবে বোঝাতে হলে সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে মানুষের অভিযোজনের কিছু উদাহরণ দেওয়া যায়। কৃষি মানব পরিবেশে অনেকরকম পরিবর্তন এনেছে, তবে এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দুটি হলো—মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় জনঘনত্ব বৃদ্ধি।
কৃষির কারণে মানুষ ধীরে ধীরে বসবাসকারী জীবনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে এবং ফসলের জমির কাছাকাছি বসবাস করতে শুরু করে। এর ফলে কৃষির শুরুর দিকেই কিছু এলাকায় মানুষের সংখ্যা এবং ঘনত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। এই মানুষে-ভরা নতুন পরিবেশ হয়ে ওঠে সংক্রামক রোগ ছড়ানোর আদর্শ ক্ষেত্র। ফলে কৃষি সংক্রামক জীবাণুগুলোকে মানুষের বিবর্তনে এক নতুন শক্তিশালী নির্বাচনী শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে। এই বিষয়ে উইসেনফেল্ডের অগ্রণী কাজ থেকে একটি ভালো উদাহরণ পাওয়া যায়। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় প্রথম যে মালয়েশীয় কৃষি পদ্ধতি চালু হয়, সেখানে প্রধানত মূল জাতীয় ফসল ও গাছের ফসল ব্যবহার করা হতো, যা আদ্র ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় পরিবেশের সাথে মানানসই।
এই কৃষি-নির্ভর মালায়ো-পলিনেশীয় জনগোষ্ঠী ছিল দক্ষ নাবিক, যারা বহু দ্বীপে উপনিবেশ গড়েছিল, এমনকি আজ থেকে প্রায় ২০০০ বছর আগে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলে অবস্থিত মাদাগাস্কার দ্বীপেও পৌঁছে গিয়েছিল।
প্রায় ১৫০০ বছর আগে এই একই কৃষি পদ্ধতি আফ্রিকার মূল ভূখণ্ডে বাস করা বান্টু-ভাষী জনগণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি দ্রুত আফ্রিকার আদ্র ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। আফ্রিকার অক্ষত রেইনফরেস্টে ম্যালেরিয়া একদমই বিরল ছিল কিন্তু যেখানে এই কৃষিপদ্ধতি ছড়ানো হয় সেখানে ম্যালেরিয়া সাধারণ রোগ হয়ে ওঠে। মানুষের সংখ্যা ও ঘনত্ব বেড়ে যাওয়ায় অনেকেই একই সময়ে আক্রান্ত হতো এবং সংক্রমিত ব্যক্তিরা সুস্থদের কাছে থাকায় মশার মাধ্যমে রোগ ছড়ানো আরও সহজ হয়।
কৃষির কারণেই ম্যালেরিয়া হয়ে উঠেছিল একটি বড় সংক্রামক সমস্যা এবং এক বিশাল নির্বাচনী শক্তি। এর ফলাফল হিসেবে মানুষের শরীর ধীরে ধীরে ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোজিত হতে শুরু করে। সাব-সাহারান আফ্রিকায় এই অভিযোজনের একটি বড় উদাহরণ হলো সিকল-সেল অ্যালিলের সংখ্যা বৃদ্ধি যা হেমোগ্লোবিন β-চেইন লোকাসে ঘটে এবং এটি ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, যদি ব্যক্তি সিকল-সেল অ্যালিলের হেটারোজাইগাস হয়। শুধু সিকল-সেল নয় এই ধরনের আরও অনেক জেনেটিক অভিযোজন ঘটেছে, যেমন থ্যালাসেমিয়া ও গ্লুকোজ-৬-ফসফেট-ডিহাইড্রোজেনেজ ঘাটতির অ্যালিলগুলোর সংখ্যা বেড়ে গেছে যা মূলত ম্যালেরিয়ার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
সংখ্যার দিক দিয়ে বলতে গেলে, এইসব অ্যান্টি-ম্যালেরিয়াল অভিযোজনই হচ্ছে মানবজাতিকে পীড়িত করা সবচেয়ে প্রচলিত মেন্ডেলিয়ান জেনেটিক রোগগুলোর বড় অংশ। অন্যান্য মেন্ডেলিয়ান রোগগুলোর ক্ষেত্রেও ধারণা করা হয়, সেগুলো মানব-সৃষ্ট পরিবেশে অভিযোজনের ফল। উদাহরণস্বরূপ, আশকেনাজি ইহুদি জনগোষ্ঠীর মধ্যে চারটি জিনে—টায়-স্যাকস, গাউচার, মিউকোলিপিডোসিস টাইপ IV এবং নিয়ামান-পিক রোগ-সম্পর্কিত অ্যালিলের উচ্চ হার দেখা যায় যেগুলো সবই স্পিঙ্গোলিপিড জমার সমস্যা সৃষ্টি করে। মোটুলস্কি নামক একজন গবেষক ধারণা করেন, এইসব জেনেটিক রোগ আসলে যক্ষ্মার বিরুদ্ধে অভিযোজনের ফল, যেটা ইহুদি গেটো গঠনের পর একটি বড় সংক্রামক রোগ হয়ে ওঠে। যদিও এই তত্ত্বটি এখনও বিতর্কিত। তবে যেটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, তা হলো অধিকাংশ জেনেটিক রোগই মানুষের মধ্যে এমন সংক্রামক জীবাণুর বিরুদ্ধে অভিযোজনে উদ্ভূত হয়েছে, যেগুলোর প্রভাব মানব সংস্কৃতির কারণে কমে যায়নি বরং বেড়ে গেছে।
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতির পরেও সংক্রামক জীবাণু এখনো মানুষের ওপর শক্তিশালী প্রভাব রাখে। ম্যালেরিয়ার ভয়াবহতা এখনো শেষ হয়নি প্রতি সপ্তাহে প্রায় ২০ হাজার মানুষ এই রোগে মা রা যাচ্ছে। এর পাশাপাশি, মানুষের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা অন্য প্রজাতির বাসস্থানেও হস্তক্ষেপ করছি যার ফলে প্রাণীদেহে থাকা অনেক সংক্রামক জীবাণুর মানুষের দেহে প্রবেশের সম্ভাবনা বেড়ে গেছে। এর ফলে তৈরি হয়েছে এক নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি— এমার্জিং ইনফেকশাস ডিজিজেস। এদের মধ্যে সবচেয়ে নাটকীয় উদাহরণ হলো HIV-এর উদ্ভব যা SIV থেকে এসেছে—এটি এক ধরনের রেট্রোভাইরাস যা শিম্পাঞ্জির মতো প্রাইমেটদের সংক্রমিত করে। HIV মানুষের শরীরে অভিযোজিত হয়ে উঠেছে এবং এর ফলে আবারও মানুষের শরীর অভিযোজিত হচ্ছে যার প্রমাণ আমরা বর্তমানে দেখতে পাচ্ছি।
উপরের উদাহরণগুলো আমরা স্পষ্ট বুঝি যে মানব সংস্কৃতির বিবর্তন সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে অভিযোজন থামিয়ে দেয়নি বরং আরও তীব্র করে তুলেছে। এই একই বিষয়টি ব্যবস্থাগত রোগ বা সিস্টেমিক ডিজিজের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আগে ধারণা করা হতো এই রোগগুলো প্যালিওলিথিক যুগের বিবর্তনের ফসল কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে যে কৃষি গঠনের পর এসব রোগের সম্ভাব্য জিনগুলো বেছে নেওয়া হয়েছিল। আজকের দিনে মানুষের সবচেয়ে সাধারণ ব্যবস্থাগত রোগগুলোর একটি হলো টাইপ ২ ডায়াবেটিস, যেটি দ্রুত হারে বেড়ে চলেছে।
এই দ্রুততা দেখে বোঝা যায় যে এটি জেনেটিক পরিবর্তনের কারণে হয়নি বরং জীবনধারা ও খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের ফল। তবুও, টাইপ ২ ডায়াবেটিস এবং এই জাতীয় অনেক রোগ আমাদের সাম্প্রতিক বিবর্তনের প্রতিচ্ছবি। টাইপ ২ ডায়াবেটিসের জেনেটিক কারণকে সাম্প্রতিক অভিযোজন হিসেবে প্রথম ব্যাখ্যা করেন নিইল, যার তত্ত্বের নাম “থ্রিফটি জিনোটাইপ হাইপোথেসিস”। এই তত্ত্ব অনুযায়ী ডায়াবেটিসের যে জিনগুলো সমস্যার কারণ, সেগুলো আসলে দেহে দ্রুত ইনসুলিন নিঃসরণ ঘটায় যা অনাহার বা দুর্ভিক্ষের সময়ে উপকারী ছিল কারণ এতে কিডনির মাধ্যমে গ্লুকোজ অপচয় কম হতো এবং খাবার থেকে বেশি শক্তি পাওয়া যেত।
আধুনিক সময়ে যখন খাবার সহজলভ্য তখন এই জিনগুলোর বিরুদ্ধে নির্বাচন ততটা কার্যকর হয়নি কারণ ডায়াবেটিস সাধারণত প্রজননের পরবর্তী সময়ে হয় এবং আধুনিক উচ্চ-চিনি, উচ্চ-ক্যালরি খাদ্য খুব সাম্প্রতিক বিষয়। নেইলের তত্ত্বের সময় জেনেটিক তথ্য ছিল অল্প কিন্তু এখন অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, ডায়াবেটিসের জন্য দায়ী বহু জিনের অস্তিত্ব রয়েছে। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব জনগোষ্ঠী সম্প্রতি অনাহার বা ক্যালরি সংকটের সম্মুখীন হয়েছিল, তাদের মধ্যে বর্তমানে ডায়াবেটিসের হার অনেক বেশি।
উদাহরণস্বরূপ আমেরিকার দক্ষিণ-পশ্চিমের পিমা ইন্ডিয়ানরা একসময় সেচ-নির্ভর কৃষিকাজে লিপ্ত ছিল তবে ১৯ শতকের শেষে শ্বেতাঙ্গ অভিবাসীরা নদীর উৎস দখল করে নেওয়ায় তাদের কৃষি ধ্বংস হয় এবং দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। পরবর্তীতে, তাদের জন্য বরাদ্দকৃত খাদ্য ছিল চর্বিযুক্ত ও প্রসেস করা। বর্তমানে পিমা জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষদের ৩৭% এবং নারীদের ৫৪% টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
এমনই আরেকটি উদাহরণ হচ্ছে নাউরু দ্বীপের বাসিন্দারা। তাদের ইতিহাসে দুবার তীব্র থ্রিফটি জিনের জন্য প্রাকৃতিক নির্বাচন হয়েছে। প্রথমত, তাদের পূর্বপুরুষরা বহু সপ্তাহ ধরে দ্বীপান্তরী ভ্রমণ করতেন যেখানে অনেকেই অনাহারে মারা যেতেন। দ্বিতীয়ত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তারা চরম অনাহারে ভুগেছিল। যুদ্ধের পর তারা ফসফেট খনি বিক্রি করে প্রচুর সম্পদ অর্জন করে এবং উচ্চ-ক্যালরি খাদ্য গ্রহণ শুরু করে। বর্তমানে তাদের মধ্যে প্রাপ্তবয়স্কদের প্রায় ২৮% টাইপ ২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত।
এইসব তথ্য থ্রিফটি জিন তত্ত্বকে সমর্থন করে, তবে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ আসে জেনেটিক অ্যানালাইসিস থেকে যেগুলো নির্বাচিত অ্যালিলের আশেপাশের ডিএনএ অঞ্চল বিশ্লেষণ করে সাম্প্রতিক পজিটিভ সিলেকশনের চিহ্ন শনাক্ত করতে পারে। ডায়াবেটিসের দায়ী কয়েকটি অ্যালিলের মধ্যে এই ধরনের ইতিবাচক নির্বাচনের চিহ্ন পাওয়া গেছে, বিশেষত সেইসব জনগোষ্ঠীতে যারা ডায়াবেটিসে বেশি আক্রান্ত।
এই আধুনিক জিন বিশ্লেষণগুলো আরও অনেক জিন চিহ্নিত করেছে, যেগুলো সাম্প্রতিক সাংস্কৃতিক পরিবর্তন, বিশেষত কৃষির কারণে তীব্রভাবে নির্বাচিত হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, অনুসন্ধানে দেখা গেছে যে শিকারি ও কৃষিজীবী সমাজে খাদ্যসংকটের হার বা ভয়াবহতায় তেমন পার্থক্য নেই। তবে গণিতগত মডেল বলছে, এই ধরনের নির্বাচন ঘটার পর অ্যালিলের হার দ্রুত বেড়ে যায় এবং সময়ের সাথে সাথে কমে আসে। ফলে পাথরের যুগের দুর্ভিক্ষ বর্তমান অ্যালিল হার ব্যাখ্যা করতে পারে না। সবচেয়ে বেশি অ্যালিল দেখা যায় সেইসব সম্প্রদায়ে যাদের সাম্প্রতিক ইতিহাসে দুর্ভিক্ষ ছিল। দুঃখজনকভাবে, থ্রিফটি জিন তত্ত্বকে অনেক সময় ভুলভাবে প্যালিওলিথিক অভিযোজন হিসেবে উপস্থাপন করা হয় যদিও এর প্রবক্তা নেইল বর্তমান বা সাম্প্রতিক দুর্ভিক্ষের উদাহরণ দিয়েই তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।
এই তত্ত্ব এখন অন্যান্য রোগ, যেমন করোনারি আর্টারি ডিজিজ, মেটাবলিক সিনড্রোম, এবং হাইপারটেনশনের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ হচ্ছে। অর্থাৎ, মানুষের সাধারণ ব্যবস্থাগত রোগগুলোও হয়তো প্রকৃতিতে নির্বাচনের মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়েই এত বেশি বিস্তৃত হয়েছে। আমাদের সংস্কৃতি নিজেই মানুষের ওপর নির্বাচন সৃষ্টি করে এবং এভাবেই আধুনিক মানব সমাজেও অভিযোজিত বিবর্তন ঘটছে যার প্রভাব দেখা যায় সংক্রামক, জেনেটিক এবং ব্যবস্থাগত রোগের প্রকোপে।
প্রাকৃতিক নির্বাচন ছাড়া অন্য কারণে সাম্প্রতিক মানব বিবর্তন —
মানব বিবর্তন থেমে গেছে— এমন ধারণা সাধারণত এই ভেবে বলা হয় যে, এখন আমাদের সংস্কৃতি (culture) যত দ্রুত বদলায় তা প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে বিবর্তনকে পেছনে ফেলে দিয়েছে। কিন্তু শুধু প্রাকৃতিক নির্বাচনই বিবর্তনের একমাত্র উপায় নয়। আরও অনেক উপায় রয়েছে, যেমন— জিনে নতুন পরিবর্তন বা mutation, জিনগত এলোমেলো পরিবর্তন বা genetic drift এবং এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে জিনের চলাচল বা gene flow। এই তিনটি উপায় নিয়েই এখানে আলোচনা করা হয়েছে। আধুনিক যুগে এই তিনটি প্রক্রিয়া মানব বিবর্তনের গতিকে ধীর না করে বরং আরও জোরদার করেছে।
কারণ, এগুলো প্রাকৃতিক নির্বাচনের সঙ্গেও মিলেমিশে কাজ করে। আমাদের জনসংখ্যা কৃষির আবির্ভাবের পর থেকেই দ্রুত বাড়ছে। Mutation বা জিনে পরিবর্তন বিবর্তনের মূল উপাদান। ছোট জনসংখ্যায় এই পরিবর্তনগুলো খুব কম ঘটে। যেমন ধরুন, কোনো নির্দিষ্ট জিনে কোনো একটি নির্দিষ্ট পরিবর্তন হওয়ার সম্ভাবনা যদি হয় একশো কোটি জন্মে একবার, তাহলে ৫০০ মানুষের একটি জনগোষ্ঠীতে এই পরিবর্তন ঘটার সম্ভাবনা প্রতি প্রজন্মে এক মিলিয়নের মধ্যে একবার। কিন্তু আজকের পৃথিবীতে যেখানে ৮ বিলিয়ন মানুষ রয়েছে, সেখানে একই ধরনের পরিবর্তন প্রত্যেক প্রজন্মে প্রায় ১৪ বার ঘটার সম্ভাবনা থাকে।
এত বড় জনসংখ্যার কারণে আজকের মানুষ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে প্রায় সব ধরনের একক ধাপের জিনগত পরিবর্তন প্রতি প্রজন্মে ঘটতে পারে। এই অবস্থাকে ‘বিরল বিবর্তনীয় ক্ষেত্র’ বলা যায়। HIV-1 ভাইরাস এই ধরণের অবস্থায় থাকে কারণ এটি একটি সংক্রামিত দেহে বিলিয়ন সংখ্যক কপি তৈরি করে এবং খুব দ্রুত রূপান্তর হয়। তাই এটি নানা ব্যক্তিতে একই সঙ্গে ভিন্ন ভিন্নভাবে দ্রুত বিবর্তিত হতে পারে। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের কারণে আজ মানব জিনে অসংখ্য ধরনের পরিবর্তন তৈরি হচ্ছে, যেগুলো আমাদের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতাও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
এর একটি উদাহরণ হলো প্রায় ১৫০০ বছর আগে যখন বান্টু ভাষাভাষী মানুষরা মালয় কৃষির নানা ফসল গ্রহণ করে তখন আফ্রিকার আর্দ্র ও উষ্ণ এলাকায় নতুন এক পরিবেশ তৈরি হয়। সেখানে তখন একটি নির্দিষ্ট জিনগত পরিবর্তন হিমোগ্লোবিনের বিটা চেইনে ৬ নম্বর কোডনের মাঝের অক্ষরে A থেকে T হওয়া উপকারী হয়ে ওঠে যেটিকে আমরা sickle-cell allele বলে জানি। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই পরিবর্তন একাধিকবার স্বাধীনভাবে আফ্রিকার বিভিন্ন অংশে আলাদাভাবে ঘটেছে।
এর মানে হলো, এখনকার বিশাল জনসংখ্যার কারণে যে পরিবর্তনগুলো আগে কখনো ঘটত না সেগুলো এখন ঘটছে এবং দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে যখন পরিবেশে হঠাৎ করে কঠিন পরিবর্তন আসে, যেমন—খাদ্যাভাব, তখন যেসব জিনগত বৈশিষ্ট্য শরীরে খাবার ধরে রাখতে সাহায্য করে সেগুলোর প্রয়োজনীয়তা বাড়ে। একে বলা হয় thrifty genotype hypothesis। প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহক সমাজে খাদ্যাভাব থাকলেও এসব জিনের উপস্থিতি ছিল বিরল। কিন্তু কৃষিভিত্তিক সমাজে যেখানে অনেক বড় জনসংখ্যা রয়েছে, সেখানে এই জিনগুলোর উপস্থিতি অনেক বেশি সম্ভাব্য তাই তারা দ্রুত নির্বাচিত হয়েছে।
Genetic drift আর gene flow—এই দুটি প্রক্রিয়া একসঙ্গে ব্যাখ্যা করা যায়, কারণ এরা একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কযুক্ত। Genetic drift হলো যখন একটি প্রজন্মের জিন পরবর্তী প্রজন্মে এলোমেলোভাবে চলে যায় সেই এলোমেলোতা থেকেই কিছু জিন একসময় সম্পূর্ণ হারিয়ে যায় বা এককভাবে টিকে থাকে। এটি ছোট জনসংখ্যায় বেশি ঘটে কারণ এলোমেলোতা সেখানে বড় ভূমিকা রাখে। আর gene flow ঘটে যখন মানুষ এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যায় এবং জিনের মিশ্রণ হয়। এটি নতুন জিন এনে দিতে পারে এবং বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে জিনগত বৈচিত্র্য বাড়িয়ে দেয়। এই দুটি প্রক্রিয়ার বিপরীত প্রভাব রয়েছে —drift স্থানীয় বৈচিত্র্য কমায় আর অঞ্চলভেদে পার্থক্য বাড়ায়, কিন্তু gene flow স্থানীয় বৈচিত্র্য বাড়ায় এবং অঞ্চলভেদে পার্থক্য কমায়। তাই এদের ভারসাম্যই নির্ধারণ করে যে একটি প্রজাতির জিনগত বৈচিত্র্য কীভাবে ছড়িয়ে থাকবে।
মানব ইতিহাসে কৃষি আবির্ভাবের পর জনসংখ্যা বেড়েছে, যা drift-এর প্রভাব কমিয়ে দিয়েছে, এবং এক দেশ থেকে আরেক দেশে ভ্রমণ, বিয়ে, বসবাসের সুযোগ বাড়ায় gene flow বেড়েছে। এর ফলে আজকের মানুষদের মধ্যে স্থানীয় বৈচিত্র্য বেড়েছে এবং অঞ্চলভিত্তিক পার্থক্য কমেছে। এর আরেকটি বড় প্রভাব হলো—আজকের মানুষদের দুইটি জিনের কপি (যেমন মায়ের কাছ থেকে এক কপি, বাবার কাছ থেকে আরেক কপি) আগের চেয়ে আলাদা হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে গেছে। এটিকে বলা হয় heterozygosity।
এটি স্বাস্থ্যগত দিক থেকে খুবই ভালো কারণ যেসব এলাকায় মানুষ বিচ্ছিন্নভাবে বাস করে এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের মধ্যেই বিয়ে হয়, সেখানে inbreeding depression দেখা দেয়—অর্থাৎ জিনগত রোগের ঝুঁকি বাড়ে এবং সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও বেশি থাকে। এখনকার উন্নত দেশগুলোতে যেখানে মানুষ বেশি ভ্রমণ করে ও বহুদূরে গিয়েও পরিবার গড়ে, সেখানে এই সমস্যাগুলো অনেক কম। এই heterozygosity বাড়ায় অনেক ইতিবাচক স্বাস্থ্য উপকার। যেমন, ক্রোয়েশিয়ার চারটি ভিন্ন অঞ্চলে গবেষণা করে দেখা গেছে, যেসব অঞ্চলে gene flow বেশি, সেখানে মানুষের মধ্যে heterozygosity বেশি এবং তাদের শারীরিক স্বাস্থ্যও তুলনামূলক ভালো। ভবিষ্যতে এই বৈশিষ্ট্য আরও বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে।
মানব বিবর্তন বন্ধ হয়ে গেছে—এই কথার পেছনে প্রধান যুক্তি হলো, আমাদের সংস্কৃতি এমন কিছু শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ওপর প্রাকৃতিক নির্বাচনের চাপকে শিথিল করে দিয়েছে এমনকি কিছু ক্ষেত্রে একেবারেই তুলে দিয়েছে। তবে সাধারণভাবে যা বোঝা হয় না তা হলো—কোনো একটি বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্বাচনের চাপ কমে গেলেও তা অন্য বৈশিষ্ট্যগুলোর বিবর্তনকে প্রভাবিত করতে পারে কারণ সেগুলোর ওপর তখন প্রাকৃতিক নির্বাচন অব্যাহত থাকে। প্রায়ই আমরা প্রতিটি বৈশিষ্ট্যকে আলাদা করে দেখি যেন প্রত্যেকটি আলাদাভাবে বিবর্তিত হয়।
কিন্তু জীববিজ্ঞানের বাস্তবতা হলো আমাদের শারীরিক বৈশিষ্ট্যগুলো পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত— উন্নয়নজনিত প্রক্রিয়া, জেনেটিক বৈশিষ্ট্যের বহুমুখী প্রভাব ও শারীরবৃত্তীয় সম্পর্কের মাধ্যমে। ফলে, একটি বৈশিষ্ট্যের বিবর্তন খুব সাধারণভাবেই অন্য একটি বৈশিষ্ট্যকে প্রভাবিত করে। যদি আমরা এসব অভ্যন্তরীণ সম্পর্কের ধরন সম্পর্কে জানি বা অনুমান করতে পারি তাহলে আমরা দেখতে পারি, সময়ের সাথে বৈশিষ্ট্যগুলো এই সম্পর্কগুলো ভাঙে কি না এটা প্রাকৃতিক নির্বাচনের একটি পরীক্ষা হতে পারে।
যদি দেখা যায় একটি বৈশিষ্ট্য প্রাকৃতিক নির্বাচনের কারণে বিবর্তিত হচ্ছে অথচ একটি সম্পর্কযুক্ত বৈশিষ্ট্য এখন আর নির্বাচনের আওতায় নেই তাহলে প্রথম বৈশিষ্ট্যটির বিবর্তনের প্রভাবে দ্বিতীয়টি সময়ের সাথে পরিবর্তিত হবে তবে তা হবে সম্পর্ক অনুযায়ী। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গত ২০ লক্ষ বছরে মানুষের মস্তিষ্কের আকার নাটকীয়ভাবে বেড়েছে—এটা নিয়ে কোনো মতভেদ নেই। এই বিবর্তনের অন্যতম চালিকা শক্তি ছিল সাংস্কৃতিক জ্ঞান ও শিখন ক্ষমতা যা মানুষ পরিবেশ ও সামাজিক সম্পর্ক সামলাতে কাজে লাগিয়েছে। যখন মানুষের সাংস্কৃতিক জটিলতা বাড়তে থাকে তখন তা কিছু শারীরিক বৈশিষ্ট্যের ওপর প্রাকৃতিক নির্বাচনের প্রয়োজন কমিয়ে দেয় বা সরিয়েই দেয়।
ধরুন, বেশিরভাগ প্রাণী তাদের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে দাঁত ও চোয়ালের বিবর্তনের ওপর নির্ভর করে। কিন্তু মানুষ ধীরে ধীরে আগুন ও নানা রকম যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে খাবার তৈরি করতে শুরু করে ফলে খাদ্য পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য চোয়াল ও দাঁতের বিবর্তনের গুরুত্ব কমে যায় এবং Cheverud নামের দুই গবেষক এই প্রশ্নটি পরীক্ষা করেছেন যে মানুষের দাঁত ও চোয়ালের বিবর্তন প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলে হয়েছে নাকি নিছক নিরপেক্ষ বিবর্তন ছিল। তারা বিভিন্ন মানবজাতীয় (hominid) জীবাশ্মের মাপজোক করেছেন এবং এগুলো তুলনা করেছেন আধুনিক মানুষ বনমানুষ এবং গরিলার মধ্যে দাঁত, চোয়াল ও মস্তিষ্কের আকারের সম্পর্কের সঙ্গে—যেগুলোর বিকাশগত সম্পর্ক প্রায় অভিন্ন।
গবেষণার ফলাফল একটি চিত্রে দেখানো হয়েছে, যেখানে নিচে একটি gracile australopithecine-এর খুলি রয়েছে এবং সেখান থেকে দুটি শাখা বেরিয়েছে। বাম দিকের শাখাটি robust australopithecines নামে পরিচিত একটি দলকে দেখায় আর ডান দিকের শাখাটি আধুনিক মানুষের দিকে গিয়েছে। রেখাগুলোকে বিভিন্ন ঘনত্বে ছায়াচিত্র দিয়ে দেখানো হয়েছে, যাতে বোঝা যায় কোন শাখায় মুখমণ্ডলের (দাঁত ও চোয়াল) ওপর নির্বাচনের চাপ কতটা ছিল যত গাঢ় ছায়া তত বেশি চাপ। চিত্র অনুযায়ী, robust australopithecines দলের ওপর মুখমণ্ডলে খুব তীব্র প্রাকৃতিক নির্বাচন কাজ করেছিল যা বোঝায় যে তারা দাঁত ও চোয়ালের বিবর্তনের মাধ্যমে খাদ্য পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েছিল।
অন্যদিকে, যে শাখা দিয়ে আধুনিক মানুষ এসেছে, সেই শাখায় সময়ের সাথে সাথে মুখের ওপর নির্বাচনের চাপ কমে গেছে। প্রায় ১৫ লক্ষ বছর আগে থেকে মানুষের দাঁত ও চোয়ালের ওপর আর কোনো পরিলক্ষিত প্রাকৃতিক নির্বাচন দেখা যায় না। Ackerman ও Cheverud মনে করেন, এটা এই ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে সাংস্কৃতিক বিবর্তন মানুষের দাঁত ও চোয়ালের ওপর প্রাকৃতিক নির্বাচন বন্ধ করে দিয়েছে।
কিন্তু, দাঁত ও চোয়ালের ওপর প্রাকৃতিক নির্বাচন বন্ধ হয়ে গেছে এটা মানে এই নয় যে এসব বৈশিষ্ট্য গত ১৫ লক্ষ বছরে বিবর্তিত হয়নি। এই সময়েই মানুষের মস্তিষ্কের আকার প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলে অনেক বেড়েছে এবং যেহেতু মানুষ, বনমানুষ ও গরিলার বিকাশজনিত সীমাবদ্ধতা একরকম তাই মস্তিষ্কের আকার বাড়লে দাঁত ও চোয়ালও প্রভাবিত হবে। এই সম্পর্ক অনুযায়ী, দাঁত ও চোয়াল শরীরের আকারের তুলনায় ছোট হতে থাকবে এবং চোয়াল ছোট হবে দাঁতের চেয়ে তুলনামূলকভাবে দ্রুত। সুতরাং, দাঁত ও চোয়ালের ওপর সরাসরি প্রাকৃতিক নির্বাচন বন্ধ হলেও মস্তিষ্কের আকার বৃদ্ধির কারণে এগুলোর বিবর্তন থেমে থাকেনি।
এই সম্পর্কিত বিবর্তনের ফলাফল হলো—মানুষের মুখমণ্ডল এখন বনমানুষ ও গরিলার তুলনায় ছোট ও চ্যাপ্টা এবং আমাদের চোয়াল দাঁতের তুলনায় এতটাই ছোট যে দাঁতের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা থাকে না। এই সমস্যা থেকেই আধুনিক দন্তচিকিৎসা বা orthodontics পেশার সূচনা হয়েছে।
সংক্ষেপে জানি—মানব বিবর্তন কি থেমে গেছে?
এই প্রশ্নের উত্তর এক কথায়—না, একেবারেই না। প্রকৃতপক্ষে, কোনো জীবিত জীবের বিবর্তন একমাত্র পুরোপুরি থামানো সম্ভব যদি সেই জীব প্রজাতি হিসেবে নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। অর্থাৎ সম্পূর্ণ বিলুপ্তি ছাড়া বিবর্তন থামানো যায় না। হ্যাঁ, বিবর্তনের গতি ধীর করা সম্ভব—যেমন কোনো প্রজাতির জনসংখ্যা যদি দীর্ঘ সময় ধরে খুব কম রাখা হয়, তবে তাদের জিনগত বৈচিত্র্য ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে। এর ফলে নতুন জিনগত পরিবর্তন (mutation) আসার হারও কমে যায়। যেহেতু বিবর্তনের মূল কাঁচামালই হচ্ছে এই জিনগত বৈচিত্র্য তাই দীর্ঘ সময় ধরে জনসংখ্যা খুব কম থাকলে ওই প্রজাতির বিবর্তনের সামর্থ্য অনেকটাই কমে যায়। তবে সেটা একেবারে শূন্য হয়ে যায় না।
কিন্তু মানুষদের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি একেবারেই নেই। বরং গত ১০ হাজার বছর ধরে আমাদের জনসংখ্যা লাগাতার বেড়েই চলেছে। এখন পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা এত বেশি যে আমাদের মধ্যে অসাধারণ রকমের জিনগত বৈচিত্র্য রয়েছে। এই বৈচিত্র্যের জন্যই মানুষের বিবর্তনের সম্ভাবনা ইতিহাসে কোনোদিন এত বেশি ছিল না, যতটা এখন। এই জিনগত বৈচিত্র্যকে কাজে লাগিয়ে গত কয়েক হাজার বছরে আমাদের বিবর্তন ঘটেছে এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা হয়েছে সংস্কৃতির মাধ্যমে তৈরি হওয়া নতুন চাহিদা বা পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে গিয়ে।
অর্থাৎ, সংস্কৃতি বরং অনেকক্ষেত্রে নতুন নতুন বৈশিষ্ট্যের জন্য ইতিবাচক নির্বাচনের পথ তৈরি করেছে থামিয়ে দেয়নি। আমাদের বিবর্তনকে আরেকভাবে ত্বরান্বিত করেছে জিনগত প্রবাহ (gene flow) এবং জিনগত বিচ্যুতি (genetic drift)-এর ভারসাম্যে পরিবর্তন। আজকের পৃথিবীতে মানুষ এত বেশি ভ্রমণ করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে বসবাস করে এবং এত মিশ্র বিবাহ হয় যে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্যে এবং এক জনগোষ্ঠী থেকে আরেকটির মধ্যে জিনের বিনিময় খুব দ্রুত ঘটছে। এর ফলে মানুষের মধ্যে জিনগত বৈচিত্র্যের বিন্যাস বা বণ্টনও দ্রুত বিবর্তিত হচ্ছে।
এমনকি যদি কোনো একটি বৈশিষ্ট্যের ওপর সরাসরি প্রাকৃতিক নির্বাচন না-ও চলে, তবু সেটি বিবর্তিত হতে পারে অন্য কোনো বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে। আর এ ধরনের বিবর্তন সবসময় উপযোগী বা খাপ খাওয়ানো হয় না অনেকসময় তা অপ্রয়োজনীয় বা সামান্য ক্ষতিকরও হতে পারে। সুতরাং যতদিন না মানুষ বিলুপ্ত হচ্ছে, ততদিন মানুষ বিবর্তিত হবেই। গত ১০ হাজার বছরের ইতিহাস আমাদের এই কথাটিই শিখিয়েছে—মানুষ থেমে থাকে না। আর ভবিষ্যতেও মানুষ বিবর্তিত হতেই থাকবে, যতদিন না আমরা পৃথিবীতে টিকে আছি।
লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র : National Institute of Health

