মাংস আমাদের প্রায় সবার জন্যই প্রতিদিনের খাবার তালিকার অবিচ্ছেদ্য অংশ। সকাল, দুপুর বা রাতের খাবারে মাংস ছাড়া যেন চলেই না! পুষ্টি, শক্তি আর স্বাদের জন্য বহু মানুষ মাংস খেতে ভালোবাসেন। তবে আপনি কি জানেন, প্রাগৈতিহাসিক যুগের মানুষদেরও কি মাংসের প্রতি একই রকম আসক্তি ছিল? হয়তো ভাবছেন, হ্যাঁ, তারা তো শিকার করেই খাবার জোগাড় করত! কিন্তু নতুন এক গবেষণা এই প্রচলিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সেই প্রাচীন মানুষেরা সবাই মাংসপ্রেমী ছিলেন না, বরং অনেকেই উদ্ভিদভিত্তিক খাবারেই ভরসা করতেন। গবেষণায় দেখা গেছে, আন্দিজ পর্বতমালায় প্রায় ৯,০০০ থেকে ৬,৫০০ বছর আগে বসবাস করা প্রাচীন মানুষেরা তাদের খাবারের বেশিরভাগ অংশ উদ্ভিদ থেকেই গ্রহণ করত।
প্রাচীন মানুষের খাবার
প্রাচীন মানুষেরা কী খেতেন? অনেক দিন ধরেই গবেষকরা মনে করতেন যে প্রাগৈতিহাসিক মানুষেরা প্রধানত মাংস খেত। কিন্তু সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় (PLOS ONE জার্নালে) দেখা গেছে, সেই ধারণা পুরোপুরি ঠিক নয়। ইউনিভার্সিটি অফ ওয়াইয়োমিং-এর অধ্যাপক র্যান্ডি হ্যাস এবং তার দল পেরুর Wilamaya Patjxa ও Soro Mik’aya Patjxa নামের দুটি প্রত্নতাত্ত্বিক সাইট থেকে ২৪ জন মানুষের দেহাবশেষ পরীক্ষা করেন। এতে দেখা যায়, এই অঞ্চলের মানুষের খাবারের ৮০ শতাংশই উদ্ভিদ আর মাংস ছিল মাত্র ২০ শতাংশ। সেসময় এই মানুষরা স্তন্যপায়ী প্রাণী শিকার করত বটে, কিন্তু হাড়ের রাসায়নিক পরীক্ষা (আইসোটোপ বিশ্লেষণ) দেখায়, তাদের প্রধান খাবার ছিল উদ্ভিদ। এছাড়া পোড়া উদ্ভিদের অংশ আর দাঁতের ক্ষয় দেখে বোঝা যায়, তারা মূলত আলুর মতো মাটির নিচে জন্মানো শেকড়জাতীয় খাবার খেত। র্যান্ডি হ্যাস বলেন, “আমাদের গবেষণায় আন্দিজের প্রাচীন মানুষের খাবার নিয়ে সবচেয়ে পরিষ্কার আর সঠিক তথ্য পাওয়া গেছে। এই ফলাফল থেকে আন্দিজ অঞ্চলের প্রাচীন শিকারী-সংগ্রাহক সমাজ থেকে কৃষিভিত্তিক সমাজের দিকে পরিবর্তনের পথ আরও ভালোভাবে বোঝা যায়।” নতুন প্রযুক্তির সাহায্যে প্রত্নতত্ত্ববিদেরা এখন প্রাচীন মানুষের খাবার নিয়ে আরও সঠিক তথ্য পেয়েছেন। র্যান্ডি হ্যাসের মতে, অন্য অঞ্চলগুলিতেও এ ধরনের গবেষণায় হয়তো দেখা যাবে যে, আমরা আগে যা ভেবেছি, তা সবক্ষেত্রে ঠিক নয়।
মানুষ কখন থেকে মাংস খেতে শুরু করল?
বিজ্ঞানীদের মতে, প্রায় ২৫ লাখ বছর আগে প্রাচীন মানুষ মাংস খেতে শুরু করেছিল। মানুষ আর অন্যান্য প্রাইমেট (বানর, শিম্পাঞ্জি) সবাই সর্বভূক হলেও, মানুষেরা তুলনায় অনেক বেশি মাংস খায়। শিম্পাঞ্জি আর অন্যান্য প্রাইমেট খুবই কম মাংস খায়, তারা বেশি ফল, পাতা আর পোকামাকড় খেতে পছন্দ করে। মানুষের হজম পদ্ধতি আর শরীরের শক্তির চাহিদা মাংসকে পুষ্টিকর খাবার হিসেবে তুলে ধরে। তবে মানুষকে সিংহ-টিগারের মতো আসল মাংসাশী প্রাণীর সঙ্গে তুলনা করা যায় না, কারণ মানুষের ধারালো দাঁত বা নখর নেই। প্রাচীন মানুষেরা পাথরের তৈরি সরঞ্জাম দিয়ে মাংস কাটত, যাতে কাঁচা মাংস খাওয়া সহজ হয়। পরে রান্নার আবিষ্কার হলে মাংস আরও সহজপাচ্য আর পুষ্টিকর হয়ে ওঠে। রান্না ঠিক কবে থেকে শুরু হয়েছে, তা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, কিছু প্রমাণে দেখা যায়, প্রায় ৭,৮০০০০ বছর আগে থেকেই মানুষ মাংস রান্না করত।
লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র : ডিসকাভার ম্যাগাজিন
