ক্রিস্টোফার নোলান সিনেমা জগতে সবেচেয় আলোচিত একটা নাম । তার সিনেমা তৈরির ধরন অন্যান্য পরিচালকদের থেকে আলাদা করেছে। যেমন আইম্যাক্স ক্যামেরার ব্যবহার, নন-লিনিয়ার স্টোরি টেলিং এবং CGI এর পরিবর্তে বাস্তবসম্মত স্পেশাল ইফেক্টের উপর নির্ভরতা । ২০১৪ সালের অক্টোবরে মুক্তি পায় তার মহাকাশভিত্তিক সায়েন্স-ফিকশন মুভি Interstellar. মুক্তির পর থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে । অভিনেতাদের অনবদ্য অভিনিয়ের সাথে Hans Zimmer এর মন্ত্রমুগ্ধকর ব্যাক গ্রাউন্ড মিউজিক আর অসাধারন স্টোরি টেলিং সিনেমাটাকে নিয়ে গিয়েছিল অন্যান্য উচ্চতায়। শুধু Sci-fi মুভি লাভার না সাধারণ দর্শকের কাছেও জনপ্রিয় হয়ে উঠে সিনেমাটি। অনেক দর্শক আগ্রহী হয়ে উঠে সিনেমায় দেখানো সাইন্টিফিক কনসেপ্ট গুলো নিয়ে। অনেকেরই প্রশ্ন এসেছে মনে ইন্টারস্টেলার এ দেখানো বৈজ্ঞানিক বিষয় গুলো কতটা নির্ভুল?
মহাকর্ষ শক্তি, ওয়ার্মহোল ,ব্ল্যাকহোল—এমন অনেক সাইন্টিফিক জটিল কনসেপ্ট ইন্টারস্টেলর এ তুলে ধরা হয় ছিল । এই কনসেপ্ট গুলোর থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স এর নিবিড় সম্পর্ক আছে এমন না যে এগুলো সিনেমার প্লট এর জন্য আলাদা করে এনেছে।
সিনেমার বৈজ্ঞানিক দিকগুলো কতটা বাস্তবসম্মত?
ইন্টারস্টেলার মুভিতে দেখা যায়, ভবিষ্যতের এক সময়ে পৃথিবীর পরিবেশগত বিপর্যয় ও খাদ্যসংকটের কারণে মানবজাতি টিকে থাকার জন্য বিকল্প গ্রহ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে। নাসার এক গোপন মিশনে, কিছু বিজ্ঞানী ও নভোচারী একটি ওয়ার্মহোল পেরিয়ে এমন এক গ্যালাক্সিতে যায় যেখানে বসবাসযোগ্য নতুন গ্রহের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।
এই সিনেমায় ওয়ার্মহোল, ব্ল্যাক হোল, টাইম ডাইলেশন, গ্র্যাভিটেশনাল স্লোইং অফ টাইমের মতো জটিল বিজ্ঞানভিত্তিক ধারণা উঠে এসেছে। অনেকগুলো ধারণাই তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যদিও সেগুলোর সবকটিরই বাস্তব প্রমাণ এখনো আমাদের হাতে নেই। এই লেখায় আমরা এসব বিষয় একটু গভীরভাবে দেখব—এগুলো কতটা বিজ্ঞানসম্মত, আর বাস্তবে কতটা সম্ভব।
মানুষ কি সত্যি ওয়ার্মহোল দিয়ে ভ্রমণ করতে পারে?
ইন্টারস্টেলার সিনেমায় ওয়ার্মহোল হচ্ছে পুরো গল্পের মূল চালিকাশক্তি। সিনেমার শুরুতে দেখা যায়, শনির কক্ষপথের কাছে হঠাৎ একটি ওয়ার্মহোলের আবির্ভাব ঘটে—যেটি, সিনেমার ভাষ্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতের কোনো পঞ্চম মাত্রার উন্নত সত্ত্বা বা প্রাণীর সৃষ্টি। এই ওয়ার্মহোলের মাধ্যমে মিশনের নভোচারীরা পৌঁছে যায় এক ভিন্ন গ্যালাক্সিতে, যেখানে কয়েকটি সম্ভাব্য বাসযোগ্য গ্রহ ঘুরছে একটি সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোল Gargantua এর চারপাশে।
ওয়ার্মহোল আসলে কী? সহজভাবে বললে, এটি একটি সুড়ঙ্গ—যা স্থান ও কাল (space-time) কে বাঁকিয়ে এক স্থান থেকে আরেক স্থানে দ্রুত যাতায়াতের পথ তৈরি করে দিতে পারে। সিনেমায় Romilly চরিত্রটি একটি কাগজ ভাঁজ করে ছিদ্র করে সুন্দরভাবে এই ধারণাটি বোঝানোর চেষ্টা করেছিল।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ওয়ার্মহোল কি বাস্তবেও থাকতে পারে?
বিজ্ঞান বলছে, ওয়ার্মহোলের অস্তিত্ব তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব। আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী কিছু নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে ওয়ার্মহোল গঠিত হতে পারে, তবে এখনো পর্যন্ত বাস্তবে এর কোনো অস্তিত্বের প্রমাণ মেলেনি।
এ ছাড়াও একটি বড় সমস্যা হলো, ওয়ার্মহোল সাধারণত অত্যন্ত অস্থির প্রকৃতির। এর দেয়ালগুলো নিজের ভারে ভেঙে পড়তে পারে যেকোনো মুহূর্তে। কেউ যদি এর ভেতর দিয়ে যাত্রা করতে চায়, তাহলে দরকার পড়ে এমন কোনো প্রযুক্তি বা শক্তির, যা wormhole কে স্থিতিশীল রাখতে পারে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এমন কিছু করতে হলে হয়তো নেগেটিভ এনার্জি বা এক্সটিক ম্যাটার ব্যবহার করতে হবে, যেগুলোর অস্তিত্ব আমরা কেবল কাগজে কলমেই চিন্তা করতে পারি।
সাধারণভাবে বলতে গেলে, প্রকৃতিতে এমন একটি wormhole আপনা আপনি পাওয়ার সম্ভাবনা এতই ক্ষীণ যে, তা প্রায় অসম্ভব বললেই চলে। তাই কেউ যদি এর মাধ্যমে ভ্রমণ করতে চায়, তাহলে সেই ওয়ার্মহোলকে তৈরি করতে হবে অত্যন্ত উন্নত কোনো সভ্যতা দ্বারা, যারা চাইলে একটি পূর্ণ নক্ষত্রকে সরিয়ে ফেলতেও সক্ষম।
বলে রাখা ভালো, এই ধারণাগুলো শুনতে যতই অবাস্তব মনে হোক না কেন, থিওরিটিক্যাল ফিজিক্স এই সম্ভাবনাকে পুরোপুরি অস্বীকার করে না।

TARS এর মতো রোবট কি বাস্তবে তৈরি করা সম্ভব?
Interstellar সিনেমায় যে রোবট চরিত্র দুটি সবচেয়ে বেশি নজর কেড়েছে, তাদের একটি হলো TARS, আরেকটি CASE। এই রোবট দুটো শুধু চরিত্র হিসেবেই নয়, প্রযুক্তির দিক থেকেও দর্শকদের কৌতূহলের কেন্দ্রে চলে আসে। প্রশ্ন জাগে, বাস্তবে কি এমন রোবট বানানো সম্ভব?
এই ধরনের রোবট তৈরির সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence)। বাহ্যিক ডিজাইন বা মোটরের চেয়েও বেশি জটিল হলো তাদের চিন্তাশক্তি, সিদ্ধান্ত নেওয়া, ভাষা বুঝে প্রতিক্রিয়া জানানো, এমনকি মাঝে মাঝে রসবোধের প্রকাশ! বাস্তবে এখনো পর্যন্ত এমন কোন রোবট তৈরি হয়নি যেটি TARSএর মতো বুদ্ধিমান, কৌশলী এবং একইসঙ্গে হিউমারাস হতে পারে।
TARS এর চৌকো, ব্লক-আকৃতির ডিজাইনটা দেখতে অদ্ভুত হলেও এতে একটা গভীরতা আছে। এটা শুধু অভিনব ও ইউনিকই নয়, বরং এর পেছনে একটি সিনেমাটিক রেফারেন্সও রয়েছে, যা ১৯৬৮ সালের ‘2001: A Space Odyssey’ সিনেমার বিখ্যাত রহস্যময় monolith এর কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে এই ডিজাইন কেবল প্রতীকী নয়, বাস্তব দৃষ্টিকোণ থেকেও কার্যকর। কারণ, এমন আকৃতির একটি রোবট ভারসাম্য বজায় রাখা, শক্তি বাঁচানো এবং জটিল মেকানিক্যাল অংশ ছাড়াই কাজ করার জন্য বেশ উপযোগী হতে পারে। তবে সিনেমায় যেমন দেখা যায়, বিশাল ঢেউয়ের মধ্যে cartwheel করে ছুটে যাওয়া বা মানুষের শরীর বহন করা, এসব বাস্তবে বাস্তবায়ন করতে হলে অত্যন্ত শক্তিশালী মোটর, জটিল হাইড্রোলিক সিস্টেম এবং ভারসাম্য রক্ষা প্রযুক্তির প্রয়োজন হবে। যা এখনও অনেকটাই গবেষণার পর্যায়ে।
বাস্তব দুনিয়ার রোবট, যেমন Boston Dynamics এর Atlas বা Spot—যদিও অনেক কিছু করতে পারে, তবুও TARS-এর মতো ভাষা বোঝা, ঠাট্টা করা, সিদ্ধান্ত নেওয়া, বিপদের মুহূর্তে কাজের বুদ্ধি দেখানো, এসব গুণ সম্পন্ন রোবট তৈরি করতে হলে আজকের প্রযুক্তির সীমা অনেক পেরিয়ে যেতে হবে।
সিনেমার ভাষ্য অনুযায়ী, TARS হলো পুরোনো এক মিলিটারি রোবট, যাকে পরবর্তীতে অভিযানের উপযোগী করে সাজানো হয়েছে। এই ব্যাখ্যাটি সিনেমার ভবিষ্যত ভিত্তিক পৃথিবীর সঙ্গে খাপ খায়। তবে বাস্তবে, এমন একটি রোবট তৈরি করতে গেলে একাধিক বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে শত শত প্রকৌশলী, গবেষক ও প্রোগ্রামার নিয়ে বহু বছর ধরে কাজ করতে হবে এবং সেটাও নিশ্চিতভাবে সফল হবে কিনা বলা যায় না।

এই দিক থেকে বলা যায়, Interstellar সিনেমাটি বিজ্ঞানের বাস্তবতা আর কল্পনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে এক চমৎকার ভারসাম্য তৈরি করেছে। হোক তা ওয়ার্মহোল, ব্ল্যাক হোল বা TARS এর মতো রোবট – সবকিছুই আমাদের ভবিষ্যতের সম্ভাবনার কথা বলে। যদিও সেগুলোর বেশিরভাগই আজও কল্পনার জগতে আটকে আছে, তবুও এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এই সিনেমা বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের কৌতূহল অনেকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।
ইন্টারস্টেলার সিনেমায় ‘গ্র্যাভিটি ইকুয়েশন’ কীভাবে মানবজাতিকে বাঁচাতে সাহায্য করে?
Interstellar সিনেমায় মার্ফ যেই অঙ্ক মেলানোর চেষ্টা করে, সেটিই সিনেমার ভাষায় পরিচিত ‘গ্র্যাভিটি ইকুয়েশন’ নামে। বাস্তব জীবনেও অবশ্য মাধ্যাকর্ষণ নিয়ে বিজ্ঞানীদের কিছু সমীকরণ আছে—বিশেষ করে আইনস্টাইনের ফিল্ড ইকুয়েশন, তবে মুভিতে যেটা দেখানো হয়েছে, তা আরও জটিল, একটি সম্পূর্ণ থিওরি অফ গ্র্যাভিটি।
সিনেমায় প্রফেসর ব্র্যান্ড এবং মার্ফ চেষ্টা করছিলেন এমন একটি সমীকরণ বের করতে, যার মাধ্যমে মাধ্যাকর্ষণকে বোঝা ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়। কারণ সেটা পারলে Plan A সফল হবে—যেখানে পৃথিবীর মানুষকে বিশাল মহাকাশ স্টেশন বা কোলোনি রকেটের সাহায্যে মহাকাশে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
কিন্তু এই সমীকরণ সমাধান করতে হলে দরকার ছিল ব্ল্যাক হোলের সিঙ্গুলারিটি, যেটি পৃথিবী থেকে পাওয়া সম্ভব নয়। সিনেমার একদম শেষদিকে, কুপার যখন গার্গানচুয়া ব্ল্যাক হোলে পড়ে যায়, তখন সে পঞ্চমাত্রিক (5th dimension) প্রাণীদের সাহায্যে ওই তথ্য মার্ফের কাছে পৌঁছে দেয়। এই তথ্য হাতে পেয়েই মার্ফ সেই বহু বছর ধরে অসমাপ্ত ‘গ্র্যাভিটি ইকুয়েশন’ সমাধান করে ফেলে এবং মানবজাতিকে বাঁচানোর পথ খুলে যায়।
মুভির সেই ব্ল্যাকবোর্ড ভর্তি সমীকরণগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল Einstein Field Equation এর একটি বর্ধিত সংস্করণ, যা মাধ্যাকর্ষণ কেবল বুঝিয়ে দেয় না, বরং ব্যবহারযোগ্য শক্তিতে রূপান্তর করবার চেষ্টাও করে।
টাইম ডাইলেশন আর সেই বিশাল ঢেউয়ের গ্রহ
মুভির সবচেয়ে আলোচিত দৃশ্যগুলোর একটি হলো, যেখানে মিলারের গ্রহে মাত্র ৩.৫ ঘণ্টা কাটালেও বাইরে থাকা মহাকাশযানে ২৩ বছর ৪ মাস ৮ দিন কেটে যায়। এটা বোঝার জন্য আমাদের ‘টাইম ডাইলেশন’ বা সময় আপেক্ষিকতা সম্পর্কে কিছুটা বুঝতে হবে।
আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী, যেখানে মাধ্যাকর্ষণ যত বেশি, সেখানে সময় তত ধীরে চলে। আর মাধ্যাকর্ষণ কম হলে, সময় তুলনামূলক দ্রুত চলে। মিলারের গ্রহটি ছিল গার্গানচুয়া নামের সুপারম্যাসিভ ব্ল্যাক হোলের খুব কাছাকাছি কক্ষপথে, তাই সেখানে টাইম ডাইলেশন এত চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
ড. ব্র্যান্ড ও কুপার যখন সেই গ্রহে ৩.৫ ঘণ্টা কাটাচ্ছিলেন, তখন মহাকাশযানে থাকা রোমিলির জন্য ২৩ বছর পেরিয়ে যাচ্ছিল—এটি সময়ের আপেক্ষিক প্রবাহের এক বাস্তবসম্মত চিত্রায়ন।
তবে কিছু বাস্তব প্রশ্নও উঠে আসে: যদি কোনও গ্রহ এতটাই ব্ল্যাক হোলের কাছাকাছি থাকে, তাহলে সেই গ্রহের অস্তিত্ব টিকে থাকা কঠিন হতে পারে। মাধ্যাকর্ষণ এত প্রবল হলে গ্রহের গঠন, বায়ুমণ্ডল, এমনকি কক্ষপথও অস্থিতিশীল হয়ে পড়তে পারে।

লাইভ ভিডিও ও স্লো মোশন বিভ্রান্তি
অনেকেই টাইম ডাইলেশন শুনলেই ভাবেন, হয়তো সময় ধীরে চললে সেই জায়গার ভিডিও দেখলেও সব কিছু স্লো মোশনে দেখা যাবে। কিন্তু বিষয়টা আসলে একটু ভিন্ন।
ধরুন, Interstellar সিনেমার কুপার তার হেলমেটে GoPro ক্যামেরা লাগিয়ে মিলারের গ্রহে কাটানো ৩.৫ ঘণ্টার ভিডিও রেকর্ড করল এবং সেই ভিডিও পরে পৃথিবীতে পাঠাল। এখন, পৃথিবীর কেউ যদি সেই ভিডিও দেখেন, তাহলে সেটা ঠিক ৩.৫ ঘণ্টা চলবে—না বেশি, না কম। কারণ ক্যামেরার জন্য সময় যত ধীরে চলে, সব কিছুই তত ধীরে চলে। তার সার্কিট, মেমোরি, সেন্সর—সব ধীরে হলেও নিজস্ব টাইমফ্রেম অনুযায়ী সেগুলো একে অপরের সাথে সমন্বিতভাবে চলছে। ফলে, ভিডিওতে কুপারকে আপনি স্বাভাবিক গতিতেই হাঁটতে, কথা বলতে, কাজ করতে দেখবেন—স্লো মোশন নয়।
তাহলে স্লো মোশনের মতো লাগবে কখন?
এখন ভাবুন, কুপার যদি GoPro-তে ভিডিও রেকর্ড না করে লাইভ স্ট্রিম করত—মানে ভিডিও সরাসরি পৃথিবীতে পাঠাত, তাহলে চিত্রটা আলাদা হতো। এখানে দুটো বড় বাধা কাজ করে:
- টাইম ডাইলেশন (Time Dilation): মিলারের গ্রহ গার্গানচুয়া ব্ল্যাক হোলের খুব কাছাকাছি থাকায় সেখানে সময় ধীরে চলে। ফলে কুপারের জন্য ১ মিনিট সময় কাটলেও, পৃথিবীতে অনেক বেশি সময় পার হয়ে যায় (উদাহরণ: ১ ঘণ্টা ≈ ৭ বছর)।
- তথ্য পাঠানোর বিলম্ব: আলোর গতিতে তথ্য পাঠালেও, দূরত্বের কারণে সেই তথ্য পৃথিবীতে পৌঁছাতে বেশ সময় লেগে যাবে। মহাকাশে তথ্য ট্রান্সমিশন ‘তাৎক্ষণিক’ হয় না।
এখন, কুপার লাইভ স্ট্রিম করলে পৃথিবীতে সেই ভিডিও বিরতিতে বিরতিতে পৌঁছাত—অনেকটা এমনভাবে যে মাঝে মাঝে কয়েক ফ্রেম এসে থেমে যায়, আবার অনেকক্ষণ পরে আরেকটা ফ্রেম আসে। এতে পৃথিবীর দর্শকের কাছে মনে হবে, কুপার খুব ধীরে ধীরে নড়ছে, একেকটা মুহূর্ত যেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় নিচ্ছে—ঠিক যেন স্লো মোশন ভিডিও।
কিন্তু আসলে কুপারের টাইমলাইনে কিছুই ধীরে হচ্ছে না—সে তার স্বাভাবিক গতিতেই কাজ করছে। আমাদের কাছে স্লো মনে হচ্ছে কারণ, তার চারপাশের সময় আমাদের তুলনায় ধীর গতিতে এগোচ্ছে।
ভিডিওর গতি নির্ভর করে রেফারেন্স ফ্রেমের উপর
এটা বোঝার জন্য একটা কথা মনে রাখতে হবে—সময় আপেক্ষিক। কুপারের জন্য ৩.৫ ঘণ্টা মানেই ৩.৫ ঘণ্টা, তার ঘড়ি সেই অনুযায়ীই চলছে। আর পৃথিবীর জন্য ২৩ বছর কেটে যাচ্ছে তার এক ঘণ্টায়। তাই এই টাইম ডিফারেন্সের কারণে, যদি লাইভ তথ্য পাঠানো হয়, তবে তা অন্য রেফারেন্স ফ্রেমে ধীর গতিতে এসে পৌঁছাবে—এটাই টাইম ডাইলেশনের বাস্তব প্রকাশ।
বিজ্ঞান, কল্পনা আর কিপ থোর্নের বই
ইন্টারস্টেলার সিনেমাটির সবচেয়ে বড় বৈজ্ঞানিক শক্তি হলো—এর পেছনে ছিলেন নোবেল বিজয়ী পদার্থবিদ কিপ থোর্ন। তিনি সিনেমার বিজ্ঞানের পরামর্শদাতা ছিলেন এবং পরে লিখেছেন একটি চমৎকার বই—“The Science of Interstellar”, যেখানে তিনি সিনেমার প্রতিটি বৈজ্ঞানিক কনসেপ্ট বিশ্লেষণ করেছেন। সিনেমার অনেক থিওরি এখনো কল্পনা হলেও, তার ব্যাখ্যাগুলো বাস্তববিজ্ঞানের সম্ভাব্য সীমানা পর্যন্ত গিয়েই দাঁড়িয়েছে।
ওয়ার্মহোল, টাইম ডাইলেশন, ব্ল্যাক হোল বা TARS-এর মতো রোবট—Interstellar একসাথে বিজ্ঞানের কঠিন তত্ত্ব আর মানুষের আবেগ, কল্পনা ও সংকটকে একসূত্রে বেঁধে ফেলেছে। যদিও এতে কিছু মেটাফিজিকাল বা অতিভৌতিক ব্যাপারও আছে… তবে সেগুলো আরেকদিন আলোচনা করা যাবে।
লেখক: ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র: Science ABC

