প্রযুক্তি যখন মানুষের অন্তর্জগতে উঁকি দেওয়ার চেষ্টা করে তখন তা শুধু বিস্ময়করই নয়, ভয়ংকরও হতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এমন এক ক্ষমতা অর্জন করেছে, যা আগে কেবল বিজ্ঞান কল্পকাহিনির জগতে কল্পনা করা যেত। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক একটি গবেষণা এমনই এক দ্বিধাবিভক্তিকর এবং বিতর্কিত সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছে—AI কি শুধুমাত্র মানুষের মুখাবয়ব বিশ্লেষণ করে তার যৌন প্রবণতা অনুমান করতে পারে? এই প্রশ্নের উত্তর গবেষকরা যে রকম নিখুঁতভাবে দিয়েছেন, তাতে একদিকে যেমন প্রযুক্তির ক্ষমতা চমকে দেয়, অন্যদিকে নৈতিকতা ও গোপনীয়তার প্রশ্নে তা শঙ্কাও জাগায়।
এই গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, একটি কম্পিউটার অ্যালগরিদম বা বিশেষ সফটওয়্যার পুরুষদের যৌন প্রবণতা ৮১ শতাংশ এবং নারীদের যৌন প্রবণতা ৭৪ শতাংশ নির্ভুলতায় শনাক্ত করতে পারে। শুধু তা-ই নয়, যখন AI একাধিক (৫টি) ছবি বিশ্লেষণ করে তখন এটি পুরুষদের ক্ষেত্রে ৯১% এবং নারীদের ক্ষেত্রে ৮৩% নির্ভুল অনুমান দিতে পারে। এই তুলনায়, মানুষ AI-এর চেয়ে অনেক পিছিয়ে মাত্র ৬১% (পুরুষ) এবং ৫৪% (নারী) ক্ষেত্রে যৌন প্রবণতা বোঝার চেষ্টা করেছে।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন স্ট্যানফোর্ডের দুই গবেষক—মিশাল কোসিনস্কি এবং ইয়িলুন ওয়াং। তাঁরা ৩৫,০০০-এর বেশি পুরুষ ও নারীর মুখের ছবি বিশ্লেষণ করেছেন, যেগুলো একটি জনপ্রিয় মার্কিন ডেটিং ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ছিল। এই ছবিগুলো বিশ্লেষণে তাঁরা ব্যবহার করেছেন ডিপ নিউরাল নেটওয়ার্কস নামক একটি অত্যাধুনিক AI পদ্ধতি, যা বড় পরিসরের ডেটা থেকে শেখে এবং নিখুঁতভাবে ছবি বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। এই পদ্ধতিটি শুধু বাহ্যিক মুখাবয়ব নয়, বরং সামান্য অঙ্গভঙ্গি, মুখের গঠন এবং সাজসজ্জা পর্যবেক্ষণ করে নির্দিষ্ট প্যাটার্ন খুঁজে বের করে।
গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে সমকামী পুরুষদের মধ্যে সাধারণত একটু সরু চোয়াল, লম্বা নাক এবং বড় কপাল দেখা যায়, যেখানে সমকামী নারীদের তুলনামূলকভাবে বড় চোয়াল এবং ছোট কপাল থাকে। এই পার্থক্যগুলো অত্যন্ত সূক্ষ্ম, যা সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না, কিন্তু AI অনায়াসে তা ধরতে পারে।
এই ফলাফলগুলোর ভিত্তিতে গবেষকরা একটি বিতর্কিত কিন্তু সাহসী দাবি করেছেন—মানুষের যৌন প্রবণতা আংশিকভাবে হলেও জৈবিক বা জন্মগত হতে পারে। অর্থাৎ, মুখাবয়বের গঠনে যে ভিন্নতা দেখা যায় তা হয়তো হরমোন বা জেনেটিক প্রভাবের ফল এবং সে কারণেই AI এই তথ্যগুলো শনাক্ত করতে পারছে। তবে নারীদের যৌন প্রবণতা সম্পর্কে গবেষণাটি বলে যে এটি তুলনামূলকভাবে বেশি পরিবর্তনশীল হতে পারে।
তবে এই গবেষণার প্রয়োগ এবং ব্যবহারিক দিক নিয়ে উদ্বেগের সীমা নেই। কারণ মুখাবয়বের মাধ্যমে কারও যৌন প্রবণতা শনাক্ত করা মানে শুধুমাত্র একধরনের প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়, বরং এটি ব্যক্তিগত গোপনীয়তার জগতে এক বিপজ্জনক হস্তক্ষেপ। গবেষণায় ট্রান্সজেন্ডার বা উভকামী ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি, এবং বর্ণগত বৈচিত্র্যও ছিল সীমিত। এই সীমাবদ্ধতাগুলো সত্ত্বেও প্রযুক্তিটির নির্ভুলতা একে আরও বিতর্কিত করে তোলে।
এই প্রযুক্তির অপব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়েও গবেষকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা সতর্ক করে বলেন, যদি এই প্রযুক্তি কোনো রাষ্ট্র, সংস্থা, বা ব্যক্তি ভুল উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে, তবে সমকামী ব্যক্তিরা ব্যাপকভাবে হয়রানির শিকার হতে পারেন। এমন দেশে, যেখানে সমকামিতা আজও আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ, সেখানে এই ধরনের প্রযুক্তি সরকার ব্যবহার করে ব্যক্তিদের চিহ্নিত ও টার্গেট করতে পারে। এটি একটি ভয়াবহ বাস্তবতার জন্ম দিতে পারে, যেখানে AI-এর একটি অনুমানই কারও জীবনে বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
এই সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো বোঝাতেই গবেষক কোসিনস্কি বলেন, এই প্রযুক্তি আগে থেকেই বিদ্যমান, আমরা শুধু তার ক্ষমতা সামনে নিয়ে এসেছি। এখন সময় এসেছে এর বিপদ ও সম্ভাব্য অপব্যবহার নিয়ে সচেতন হওয়ার। কোসিনস্কি পূর্বে ফেসবুক ডেটা ব্যবহার করে সাইকোমেট্রিক প্রোফাইলিং নিয়ে গবেষণা করেছেন, যা রাজনৈতিক প্রচারণায় ভোটারদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে ব্যবহৃত হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি আশঙ্কা করছেন যে এই ধরনের AI ব্যবহার করে ব্যক্তিগত তথ্য শোষণ করা নতুন এক ঝুঁকির দিক উন্মোচন করতে পারে।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী নিক রুল বলেন, যদি চেহারা দেখে যৌন প্রবণতা বুঝে ফেলা সম্ভব হয়, তবে তা গভীর উদ্বেগের বিষয়। এমন প্রযুক্তি যদি ভুল হাতে পড়ে, তবে তা বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। আমাদের এই সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে সিরিয়াসভাবে ভাবতে হবে।
নিক রুল মনে করেন, এই ধরনের গবেষণা একদিকে যেমন বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে তা সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকারের প্রশ্নেও আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে। যদি AI চেহারার ভিত্তিতে মানুষের ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি বা যৌন প্রবণতা নির্ধারণ করতে পারে, তবে ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি অপরাধ পূর্বাভাস দেওয়ার মতো কাজেও ব্যবহৃত হতে পারে, যেমনটি Minority Report সিনেমায় দেখানো হয়েছে। যদিও সেটা এখনো কাল্পনিক, তবে স্ট্যানফোর্ড গবেষণার বাস্তবতা আমাদের সেই আশঙ্কাকেই কিছুটা সত্য করে তোলে।
ব্রায়ান ব্রাকিন, AI কোম্পানি কাইরোস-এর সিইও, গবেষণাটিকে ভীতিকরভাবে সঠিক বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, AI যথেষ্ট ডেটা পেলে যেকোনো বিষয়ে অনুমান করতে সক্ষম। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—আমরা কি সত্যিই এই তথ্য জানতে চাই? প্রযুক্তির উন্নয়নকে থামানো সম্ভব নয়, কিন্তু এর নৈতিক নিয়ন্ত্রণ আমাদেরই হাতে। তাই প্রয়োজন গোপনীয়তার জন্য কড়া আইন, নীতিমালা এবং মানুষের সচেতনতা।
স্ট্যানফোর্ডের এই গবেষণা আমাদেরকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এক জটিল ও নৈতিক দ্বিধা তৈরি করা সক্ষমতাকে সামনে নিয়ে আসে। একদিকে বিজ্ঞান বলছে, মানুষকে বোঝার ক্ষমতা AI-এর হাত ধরে নতুন উচ্চতায় পৌঁছতে পারে। কিন্তু অন্যদিকে, এই বোঝার ক্ষমতা যদি আমাদের গোপনীয়তা ভেঙে দেয়, আমাদের পরিচয়, আমাদের সত্তা, এমনকি আমাদের জীবনের নিরাপত্তা হুমকির মুখে ফেলে, তাহলে আমরা কোন দিক বেছে নেব?
সমস্যার সমাধান একমাত্র সচেতনতা ও নীতিনির্ধারণের মধ্যেই নিহিত। প্রযুক্তির ব্যবহার যেন মানবকল্যাণে হয়, অপব্যবহার যেন ঠেকানো যায়, আর মানবাধিকারের মূল্য যেন সব সময় শীর্ষে থাকে—এটাই হওয়া উচিত ভবিষ্যতের পথে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্ষমতা অনেক দূর যাবে, কিন্তু তা যেন মানবিকতা হারিয়ে না ফেলে—এই প্রার্থনাতেই শেষ হোক আমাদের এই বিশ্লেষণ।
লেখক : ইমাম হোসাইন আনজির
তথ্যসূত্র : The Guardian
