প্রতিটি মানুষের জীবনে মা একজন বিশেষ স্থান দখল করে। একজন মায়ের মমতা, যত্ন, ভালোবাসা সবই শিশুর মানসিক ও শারীরিক বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু শুধু ভালোবাসলেই হবে না, তার সাথে মায়ের স্পর্শ, বিশেষ করে শারীরিকভাবে শিশুকে আদর করা যা শিশুর বিকাশে এক ধরনের অদৃশ্য শক্তি প্রদান করে। বিজ্ঞানীদের গবেষণা বলছে, মায়ের স্পর্শ শুধু প্রশান্তি এনে দেয় না বরং তার সাথে শিশুর মস্তিষ্ক, শরীর এবং মনকে দৃঢ় ও সুস্থ রাখে।
শিশুর জন্মের পর পরই তার মস্তিষ্কের বিকাশ ঘটানোর কার্যক্রম শুরু হয়। এই সময়ে একটি শিশুর জন্যে তার মায়ের স্পর্শ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন যে, “ক্যাঙ্গারু কেয়ার” বা শরীরের সংস্পর্শে রাখা শিশুর মস্তিষ্কের নিউরন কানেকশন দ্রুত বৃদ্ধি পায়। মায়ের প্রতিটি আদর, কোমল স্পর্শ শিশুর মস্তিষ্কের আবেগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রকে এক্টিভ করে তোলে।এছাড়াও মায়ের স্পর্শ শিশুর শরীরে অক্সিটোসিন হরমোনের নিঃসরণ বাড়ায় যা বন্ধুত্ব, ভালোবাসা ও নিরাপত্তাজনিত অনুভূতি প্রদান করে। একই সঙ্গে কর্টিসল বা চাপ হরমোনের মাত্রা কমায় যার ফলে শিশুর মানসিক চাপও কমে।
গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, প্রিম্যাচার বা আগে জন্ম নেওয়া শিশু যারা নিয়মিত মায়ের স্পর্শ পায়, তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা উন্নত হয় এবং অসুস্থও কম হয়। উদাহরণস্বরূপ, পেডিয়াট্রিকস জার্নালে প্রকাশিত এক মেটা-অ্যানালাইসিসে দেখা গেছে, ক্যাঙ্গারু কেয়ার প্রিম্যাচার শিশুর মৃত্যুহার ৩৬% কমিয়ে দেয়। এর অর্থ হলো মায়ের স্পর্শ শুধু মানসিক নয়, শারীরিকভাবে শিশুর জীবনকেও সুরক্ষা দেয়।
শিশুর আবেগগত বিকাশে মায়ের স্পর্শ অপরিসীম গুরুত্ব রাখে। শিশুরা স্পর্শের মাধ্যমে নিরাপত্তা, মমতা এবং ভালোবাসা অনুভব করে। এটি শিশুকে আত্মবিশ্বাসী ও সামাজিকভাবে সচেতন হতে সাহায্য করে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত মায়ের স্পর্শ পাওয়া শিশুদের মধ্যে বিরক্তিভাব কম থাকে যার ফলে তারা অন্যদের সাথে সহজে মিশে যেতে পারে এবং তারা শান্ত থাকে সবসময়।
শুধু শিশুরাই নয় বরং মায়ের মনোভাব ও মানসিক স্বাস্থ্যেও মায়ের স্পর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মায়ের সাথে শিশুর সংস্পর্শ মায়ের পোস্টপার্টাম ডিপ্রেশন কমাতে সাহায্য করে। যখন মা এবং শিশু একে অপরকে স্পর্শের মাধ্যমে আদর করে, তখন দুজনেরই মানসিক চাপ কমে এবং ভালোবাসার অনুভূতি বৃদ্ধি পায়। গবেষকরা বলছেন, এই প্রাথমিক ইমোশনাল কানেকশন শিশু ও মায়ের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপন করে।
মায়ের স্পর্শ শুধু মস্তিষ্ক ও আবেগের জন্য নয়, শিশুর শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্যও অপরিহার্য। শিশুর হার্ট রেট, শ্বাসপ্রশ্বাস এবং ডাইজেশন বা হজম প্রক্রিয়া নিয়ন্ত্রণেও স্পর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রিম্যাচার শিশুদের ক্ষেত্রে, নিয়মিত স্পর্শ তাদের হেলদি থাকা, নিয়মিত ঘুম এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে।
শিশু যখন মায়ের স্পর্শ পায়, তখন তার শরীরের হরমোনগুলো সঠিকভাবে কাজ করতে থাকে। যেমন অক্সিটোসিনের মাত্রা বৃদ্ধি পাওয়া, যা হৃদস্পন্দন নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং রক্তচাপ কমায়। একই সঙ্গে কর্টিসল হরমোন কমে যাওয়ায় শিশু চাপমুক্ত থাকে। ফলে মায়ের স্পর্শ শিশুর শারীরিক স্বাস্থ্যকে স্থিতিশীল রাখে।
শিশুর সামাজিক বিকাশেও মায়ের স্পর্শ গুরুত্বপূর্ণ। যে শিশুরা নিয়মিত ভালোবাসার স্পর্শ পায়, তারা অন্যদের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং সহযোগিতামূলক হয়। অনেক গবেষণায় এটিও দেখা গেছে, এই শিশুরা প্রায়শই তাদের বন্ধুবান্ধব এর সাথে মিসআন্ডার্সটেন্ডিং কম ঘটায় এবং দ্রুত সমস্যার সমাধান করতে পারে।
শিশুরা স্পর্শের মাধ্যমে শিখে মানুষকে বিশ্বাস করা, স্নেহ করা এবং সম্পর্ক তৈরি করা। এটি শিশুর প্রাপ্তবয়েস্কের জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে। যারা শৈশবে ভালোবাসার স্পর্শ পায়নি, তারা প্রাপ্তবয়স্ক জীবনে সামাজিক সম্পর্ক বা সোশ্যালিসম নিয়েও সমস্যায় পড়তে পারে। তাই মায়ের স্পর্শ শুধু শিশুকালেই নয়, পুরো জীবনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
বিভিন্ন গবেষণায় মায়ের স্পর্শের প্রভাব স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। যেমন পেডিয়াট্রিকস জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, ক্যাঙ্গারু কেয়ার প্রিম্যাচার শিশুর মৃত্যুহার ৩৬% কমায়। জার্নাল অফ ডেভেলপমেন্টাল সাইকোবায়োলজি ২০২০ সালে প্রকাশিত গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিদিন ১৫ মিনিট মায়ের স্পর্শ পাওয়া শিশুদের মানসিক শান্তি বৃদ্ধি পায়। আর প্রিম্যাচার শিশুদের ক্ষেত্রে দৈনিক স্পর্শ ও আলিঙ্গনের মাধ্যমে ওজন বৃদ্ধি ১৫–২০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
আবার ম্যাটারনাল টাচ বা মাতৃস্পর্শ নিয়ে গবেষকরা সিঙ্গাপুর আর জার্মানিতে একটি রিসার্চ কন্ডাক্ট করে।সেখানে কতগুলো বাচ্চাকে আর মাকে ২ টি গ্রুপে ভাগ করা হয়। একটি গ্রুপকে বলা হয় বাচ্চাদেরকে একটু পরপর টাচ করে আদর করে করে খেলতে। আর আরেকটি গ্রুপে বলা হয় বাচ্চাদের সাথে খেলার সময় তাদের টাচ না করতে। এর পর ঠিক ২ সপ্তাহ পর বাচ্চাগুলোরর ব্রেইন এ একটি FMRI টেস্ট করা হয়। তখন দেখা যায় যে,যেসব বাচ্চাদের সাথে তাদের মায়েরা টাচ করে করে খেলেছিল, তাদের ব্রেইন ডেভেলপমেন্ট তুলনামূলক বেশি হয় সেসব বাচ্চাদের থেকে, যাদের সাথে তাদের মায়েরা টাচ না করে খেলেছে।
এই গবেষণাগুলো বোঝা যায়, মায়ের স্পর্শ শুধুমাত্র অনুভূতি নয়, বরং জীবনের বিভিন্ন স্তরে গুরুত্বপূর্ণ। এটি শিশুর মস্তিষ্ক বিকাশ, মানসিক শান্তি, শারীরিক স্বাস্থ্য এবং সোশ্যালিসম বাড়াতে একটি ম্যাজিকাল কনসেপ্টের মতো কাজ করে। প্রতিটি শিশুর জীবনে মায়ের স্পর্শ অপরিহার্য।এছাড়াও শুধুমাত্র শিশুকালেই নয়, পুরো জীবনেও এই স্পর্শের প্রভাব স্থায়ী থাকে।
সুতরাং, প্রতিটি মা ও পরিবারের সদস্যের উচিত শিশুর সঙ্গে নিয়মিত স্পর্শের মাধ্যমে ভালোবাসা প্রকাশ করা। এটি শুধু শিশুর জন্য নয়, মায়ের মানসিক ও শারীরিক স্বাস্থ্যের জন্যও উপকারী। মায়ের স্পর্শ একটি প্রাচীন কিন্তু বিজ্ঞানসম্মত উপায়, যা মানব জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে দৃঢ় ও সুস্থ রাখে।
