১ম পর্ব
আলার্মের শব্দে ঘুম ভাঙল। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি চারটা বেজে বাইশ মিনিট প্রায়। একটু আলসে লাগছে, তারপরও উঠে পড়লাম।
“এই যে সাহেব, সাহেব, এই যে,” মেঘের মাথায় হাত রেখেই বললাম, “আকাশি ডিম লাইটের আলোতে খুব সুন্দর লাগছে।”
“আসেন, ফ্রেশ হয়ে আসেন,” আদেশের সুরে বললাম তাকে। আমার দিকে মুচকি হেসেই ফ্রেশ হতে পা বাড়াল।
ফজরের নামাজের আজান হয়ে গেছে। পাঁচটা দশ মিনিটে নামাজ। সে আজকে মসজিদে গেল না, আমরা ঘরেই নামাজ পড়ব। অবশ্য কালকে খুব দেরি করে বাসায় ফিরেছে। প্রোজেক্টের কাজ নাকি আজকে সাবমিট করতে হবে, তাই রাতে প্রোজেক্ট শেষ করে বাসায় আসল। তাই আর মসজিদে যাবে না।
আমরা বাইরে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিলাম, এটা আমাদের এখন নিত্যদিনের রুটিন। আর কিছুদিন হলে অভ্যাসে পরিণত হবে। সকালবেলা হাঁটতে বের না হলে দিনটাই খালি খালি লাগে। শুনেছিলাম, উনিশ দিন নাকি একুশ দিন একটা কাজ যদি মানুষ নিয়মিত করে, তাহলে সেটা তার অভ্যাসের খাতায় নাম লেখায়। আমাদের ক্ষেত্রেও বোধ হয় তাই হয়েছে।
ও আচ্ছা, মাসুদ ও মামুনকে ডাকা হয়নি। ওরা দুই ভাই, কিছুদিন আগেই আমাদের বাসায় এসেছে। মেঘের খুব ইচ্ছা কিছু এতিম ছেলের লালন পালন করবে। আর ওরাই সেই ভাগ্যবান দুইজন। আমার তেমন কোনো আপত্তি নেই। উলটো ও বাসায় না থাকলে সময়টা কেটে যাবে। একা বাসায় আমার তো দুটো সঙ্গী হলো।
আমাদের বিয়ের তখন এক বছর। আমরা হাঁটতে বের হলাম। পাশে একটা বিশাল মাঠ আছে। মাঠের চারপাশে গাছের সাম্রাজ্য। হাওয়ায় এক অন্যরকম ভাব আছে। নানু সবসময় বলে, সকালের বাতাস নাকি গা পাতল করে দেয়। কথাটা পুরোপুরি মিথ্যা নয়, আবার পুরোপুরি সত্য কিনা ঠিক জানি না। আমরা আমবাগানে যাব। সেখানে যথেষ্ট জায়গা আছে। আমবাগানের একটা চমৎকার গল্প আছে, সে গল্পটাই লিখব বলে ভাবছি। আমার বহুদিন ডায়েরি লেখা হয় না। বিয়ের পর এই প্রথম ডায়েরি লিখছি, তাও আজকে শুরু করলাম। অবশ্য বহু অভিজ্ঞতা ছিল, লেখার ইচ্ছা হচ্ছিল, কেন জানি লেখা হয়নি।
“আচ্ছা, তোমরা সেটা কোথায় পেয়েছিলে?”
“কোনটা?”
“ওই যে।”
“ও আচ্ছা, তোমার ঠিক সামনের চার নম্বর গাছ।”
“এটাই তাহলে তাদের পয়েন্ট?”
“ঠিক জানি না, হতেও পারে।” সেদিন আমি সেই জায়গাটা প্রথম নিজ চোখে দেখলাম। আমি ‘হাইড্রাস পয়েন্ট’ বলে চিনি।
আমাদের দিন-তারিখের সময়, মেঘ পরিবার আমাদের বাসায় আসবে। বাসায় সারাদিন নানা আয়োজন চলছে। সকাল হতেই পরিবারের গুরুজনেরা আসতে শুরু করল। বিয়ের ব্যাপারে চূড়ান্ত কথাবার্তা হবে আজ। আমাকে নাকি আংটি পরাবে।
আমাদের পরিচয়টা হয়েছিল আরও এক বছর আগে। মেঘের অফিসে বাবার প্রোজেক্ট নিয়ে গেলাম। সেখানেই তার সাথে প্রথম সাক্ষাৎ। আমাদের মধ্যে কখনো সম্পর্ক ছিল না, পরবর্তীতে আব্বু ও মেঘের শিক্ষক ও বাবার পছন্দেই বিয়েটা হয়েছে।
ওরা আসবে সন্ধ্যার সময়। আমাদের বাসায় তখন ত্রিশজনের মতো মেহমান। কেউ সকালে, কেউ দুপুরে, কেউ আবার সন্ধ্যায় এসে পৌঁছাল।
সেদিন আসরের কিছুক্ষণ পর আমার ফোনে মেঘ মেসেজ দিল। মেসেজটা স্বাভাবিক ছিল না, আমার কাছে অদ্ভুত ঠেকল। ইনফরমাল লেটারের মতো লেখা কয়েকটা বাক্য:
“মুকাররমা, তোমার কাছে একটা রিকোয়েস্ট আছে। তোমাদের ঘরের কোনো রুম বা বারান্দা আমাদেরকে দশ মিনিটের জন্য ম্যানেজ করে দিতে পারবা? আমাদেরকে বললাম কারণ আমি আর আমার দুই বন্ধু। কারণটা পরে বলব, তবে কাউকে কিছু না বলেই তোমার মতো করে ম্যানেজ করো।”
আমি পুরোটাই পড়লাম। সাধারণত ইংরেজিতে টেক্সট করে, কিন্তু আজকে বাংলায়, একেবারে খাঁটি বাংলায়। দুই একটা ইংরেজি শব্দও ঠাঁই পেয়েছে।
সাধারণত মেয়ে দেখতে এসে মেয়ের সাথে আলাদা কিছুক্ষণ কথা বলাটা স্বাভাবিক। কিন্তু সে একটা কথা বলবে না, বরং বন্ধুদের নিয়ে দশ মিনিটের জন্য কোনো একটা খালি কামরা লাগবে। এমন আবদার কেউ কখনো এইরকম অবস্থায় করেছে কিনা আমার জানা নেই।
আমি বিষয়টা খালাকে জানালাম। খালা আর আমি ফ্রেন্ডের মতোই। খালা সবকিছু শুনে বলল, “আচ্ছা, চাইছে আর কি। কোনো কারণে হয়তোবা ওদের কোনো প্রয়োজন আছে। তুই চিন্তা করিস না, আমি ম্যানেজ করে দিব। আর তোর রুমের বারান্দাতো আছেই।”
ঘরভর্তি মানুষ, তাছাড়া ওদের সেই দশ মিনিট আমার বারান্দায় থাকবে। ধুর ছাই!
সন্ধ্যা সাতটা ত্রিশ-পঁয়তাল্লিশ হবে, একটা কালো রঙের গাড়িতে মেঘ পরিবারের আগমন। আব্বু, চাচাতো ভাই, নানা, দাদা সবাই গোল মিটিংয়ে অংশ নিয়েছেন। তাদের বিষয়বস্তু এই বিয়ে। স্বর্ণ কত দেবে, মোহরানা কত দেবে, বরযাত্রী কতজন, হাবিজাবি বকর চক্কর। আমার এতসব ঝামেলা ভালো লাগে না। মেয়ে হিসেবে স্বর্ণের প্রতি একটু ইন্টারেস্ট আছে। আমার আট ভরি দিলেই হলো, মোহরানা এক লাখ না দশ লাখ সেটা দেখার বিষয় না।
দীর্ঘ দুই ঘণ্টা আলোচনার পর বিয়ে পাকাপোক্ত হলো, অর্থাৎ পারিবারিকভাবে আমরা এখন হবু স্বামী-স্ত্রী। উভয় পক্ষই তাদের ন্যায্য দাবি আদায় করে নিল।
আলোচনার পর মেঘের আংটি পরানোর পালা। মেঘ ও ওর দুই বন্ধু আমার রুমে এলো। খালা ওদের ডেকে নিয়ে আসল। আমি খাটের ওপর বসে আছি। মেঘ আসার পর তাকে একটা চেয়ার দিল। বেচারার মুখখানা ছিল লাজুক প্রকৃতির। আমার মুখখানা কেমন ছিল সেটা আমি বলতে পারব না। আংটি পরানোর আগে মিষ্টি বিনিময় পর্ব। ইলহাম ভাই মেঘকে আংটি পরানোর জন্য আংটি দিল। আংটি বদলের আনুষ্ঠানিকতা। যথারীতি আমি হাত দিলাম, সে আংটি পরিয়ে দিল। সবাই আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে। খুব নার্ভাস লাগছিল, বোধ হয় সেটা প্রতিটা মেয়েরই লাগে।
আমি ভেবেছিলাম আংটি বদলের পর সে বারান্দায় যেতে চাইবে। কিন্তু না, আমাকে বলল, সে মেসেজে জানাবে।
আংটি বদলের আধা ঘণ্টা পর মেঘের মেসেজের শব্দ আমার কানে আসল, “মোকাররমা, সময় হয়েছে।”
ওরা তিন বন্ধু আমার রুমের বারান্দায়। ইলহাম ভাই, মেঘ আর উনাইস ভাই। আমাকে বলল টিস্যু অথবা টাওয়েল দিতে। হঠাৎ করে লক্ষ্য করলাম, কপাল থেকে বিন্দু বিন্দু পানি ঝরছে। বুঝলাম ওদের শরীর থেকে ঘাম ঝরছে। ফ্যান চলছে, গরমের তেমন মাতামাতিও নেই, কিন্তু তিনজন একই সময়ে ঘামতে শুরু করেছে। আমি বড় বড় করে তাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম।
বারান্দায় আমরা চারজন। দিন তারিখ ঠিক করতে আমাদের বাসায় এলো। আসার আগে আমাকে মেসেজ দিল, কারণ কাউকে বলতে নিষেধ করল। এখন একসাথে ঘামতে শুরু করল। সবকিছু কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হচ্ছে। অবাক করা বিষয় হলো, তাদের ঘাম ঝরা শুরু হলো একসাথে, এবং শেষও হলো একসাথে। এটা কোনো রোগ হতে পারে? আমি তখন জিজ্ঞেস করলাম। বন্ধুত্রয় বলে উঠল, “না, এটা কোনো রোগ না।”
“আপাতত ঘামের বিষয়ে কাউকে কিছু বলার দরকার নেই, তবে এটা কোনো রোগ নয় সেটা আমরা নিশ্চিত।”
আমি চুপ থাকলাম, খালাকেও কিছু বললাম না। মুখে কিছু না বললেও মনের ভেতরে এক অদ্ভুত প্রশ্ন উঁকি দিতে লাগল—এরা আসলে কারা? আর আমার বাসার বারান্দাতেই কেন ঘটে চলেছে অজানা কিছু? [চলবে…]
প্রথম পর্ব সমাপ্ত।
লেখকঃ ফাতিহ্ মুহাম্মদ কায়কোবাদ
