১২০৬ সালে উত্তর মঙ্গোলিয়ার ভয়ংকর এক গোত্রপতি চেঙ্গিস খান সারা দুনিয়া দখলের মিশনে নামে। তার নিষ্ঠুর কৌশল আর অনুগত সৈন্যদলের হাত ধরে একের পর এক এলাকা মঙ্গোল সাম্রাজ্যের পতাকাতলে চলে আসে। একসময় এই সাম্রাজ্য পূর্ব চীনের উপকূল থেকে শুরু করে পশ্চিমে হাঙ্গেরি আর পোল্যান্ড পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। অবস্থা এমন হয়েছিল যে ইউরোপও মঙ্গোলদের হাতে পতনের মুখে পড়ে গিয়েছিল। কিন্তু ঠিক এই ইউরোপীয় বিজয়যাত্রা আচমকা থেমে যায়। অস্ট্রিয়ার দিকে আক্রমণ করার আগেই মঙ্গোল বাহিনী হঠাৎ করে এশিয়ায় ফিরে যায়।

মঙ্গোল সেনাপতিদের নিজস্ব লিখিত দলিল খুবই কম থাকায় ইতিহাসবিদদের কাছে কেবল অনুমানযোগ্য ছিল যে এমনটা ঘটেছিল কেনো। কিন্তু সম্প্রতি Scientific Reports জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় এই রহস্যের নতুন জবাব মিলেছে—গাছের গুঁড়ির বৃত্তাকার রিং বা ‘ট্রি রিং’-এর বিশ্লেষণের মাধ্যমে।

এই গাছের গুঁড়ি বিশ্লেষণের মাধ্যমে জানা গেছে, সেই সময় ইউরোপে কয়েক বছর ধরে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা আর বৃষ্টিপাত বিরাজ করছিল। গবেষকরা বলেন, এই আবহাওয়াই চারণভূমি নষ্ট করে ঘোড়সওয়ার বাহিনীর চলাচল দুর্বিষহ করে তোলে এবং ফলে মঙ্গোল সেনাদের যুদ্ধ দক্ষতাও কমে যায়। চেঙ্গিস খানের মৃত্যুর পর ১২২৭ সালে তার ছেলে ওগোদেই খান সাম্রাজ্যের দায়িত্ব নেন। এই সাম্রাজ্য তখন উত্তর-পূর্ব চীন থেকে ক্যাস্পিয়ান সাগর পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল, প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ বর্গমাইল এলাকা জুড়ে। ওগোদেই তার বাবার পথ ধরে উত্তর-পশ্চিম চীন জয় করেন, রাশিয়াতেও প্রবেশ করেন। সে সময় আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় হাজার হাজার ঘোড়া নিয়ে গোবি মরুভূমি পেরোনো সম্ভব হয়।

ছবিঃ চেঙ্গিস খান

১২৪০ সালের মধ্যে কিয়েভ (বর্তমান ইউক্রেনের রাজধানী) ধ্বংস হয় এবং মঙ্গোল বাহিনী ইউরোপের দিকে দ্রুত অগ্রসর হতে থাকে। যুদ্ধের সময় বিস্ফোরক অস্ত্র বা আগুন ছোড়ার জন্য ব্যবহৃত চীনা গানপাউডার সাথে নিয়ে তারা হাঙ্গেরিতে প্রবেশ করে ১২৪১ সালের মার্চে কারণ ইউরোপের লোকদের কাছে তখন এ গানপাউডার ছিল একেবারেই নতুন আর আতঙ্কজনক।

রাজা বেলা চতুর্থ পালিয়ে যান এবং মঙ্গোলরা এক মিলিয়নের মতো হাঙ্গেরিয়ান হত্যা করে যার মধ্যে ছিল সৈন্য, ধর্মযাজক, অভিজাত, নাইট থেকে শুরু করে সাধারণ কৃষক পর্যন্ত যা মধ্যযুগের অন্যতম রক্তক্ষয়ী হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত এটি।

১২৪১ সালের ডিসেম্বরে ওগোদেই হঠাৎ মারা যান। কেউ কেউ বলেন, পশ্চিমাঞ্চলীয় অভিযানের নেতৃত্বদানকারী তার ভাতিজা বাতু খান নতুন খান নির্বাচনের জন্য রাজধানী কারাকোরামে ফিরছিলেন। কিন্তু বাতু আর কখনও মঙ্গোলিয়ায় ফেরেননি। বরং তিনি দক্ষিণ রাশিয়ায় ‘গোল্ডেন হোর্ড’ সাম্রাজ্যের শাসক হন। আর ওগোদেই-এর স্ত্রী তোরেগেন তখন সাম্রাজ্যের রানি হিসেবে ক্ষমতা নেন।

পরের বছর মঙ্গোল আক্রমণ হঠাৎ দিক পাল্টে দক্ষিণ দিকে সরে যায়, আধুনিক সার্বিয়া হয়ে রাশিয়ার দিকে ফিরে যায়। এরপর খানরা মাঝে মাঝে ইউরোপীয় শহরে হামলা করলেও, বড়সড় আক্রমণ আর কখনো হয়নি।

গবেষণায় বিজ্ঞানীরা ইউরেশিয়ার পাঁচটি অঞ্চল থেকে কাঠ সংগ্রহ করে আবহাওয়ার প্রভাব খতিয়ে দেখেন। গাছের রিং বছরে বছরে আবহাওয়ার তারতম্য জানান দেয়— বৃষ্টি হওয়া বছরে রিং মোটা হয়, শুকনো বছরে রিং পাতলা।

তারা দেখেছেন, ১২৩৮ থেকে ১২৪১ সাল পর্যন্ত হাঙ্গেরি ও আশপাশের এলাকাগুলোতে আবহাওয়া অস্বাভাবিকভাবে ঠাণ্ডা আর বৃষ্টিমুখর ছিল। অতিরিক্ত বরফ গলে হাঙ্গেরির সমতলভূমি জলজমিতে পরিণত হয়, ঘোড়সওয়ার বাহিনীর চলাফেরার জন্য যা একেবারেই অনুপযোগী।

১২৪২ সাল, অর্থাৎ ইউরোপ অভিযানের শেষ বছরটি ছিল সবচেয়ে বেশি ভেজা। ফলে ফসল নষ্ট হয়, খাদ্যের সংকট তৈরি হয় এবং পরে দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়, যাতে হাজার হাজার মানুষ মারা যায়।

গবেষকরা মনে করেন, আবহাওয়ার এই দুরবস্থা দেখে মঙ্গোল সেনাপতিরা অপেক্ষাকৃত শুষ্ক দক্ষিণ পথ বেছে নিয়ে ইউরোপ ছেড়ে চলে যান। প্রকৃতির এই রূপই থামিয়ে দিয়েছিল ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর সামরিক বাহিনীর অগ্রযাত্রা।

চেঙ্গিস খানের ছেলে ওগোদেই খানের মৃত্যু ছিল মঙ্গোল সাম্রাজ্যের জন্য এক বিশাল মোড় বদলের ঘটনা। তার মৃত্যুর পর চেঙ্গিস খানের ছেলেরা আর নাতিরা একে অপরের সঙ্গে ক্ষমতার লড়াইতে জড়িয়ে পড়েন। এই অন্তর্কলহে বিশাল মঙ্গোল সাম্রাজ্য ছোট ছোট অংশে ভাগ হয়ে যায় এবং আর কখনোই একত্রিত হতে পারেনি।

তবে এই ভেঙে পড়া সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকারীরা একেবারে হারিয়ে যায়নি। মঙ্গোল বংশের লোকেরা পরবর্তীতে ভারতে, চীনে, পারস্যে (আজকের ইরান), এবং সাইবেরিয়ায় বিভিন্ন রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করে। আজকের মঙ্গোল জাতি এখনও টিকে আছে। তারা চীনের ইননার মঙ্গোলিয়া স্বশাসিত অঞ্চলে এবং স্বাধীন মঙ্গোলিয়ার ভূখণ্ডে বসবাস করে।

আজও মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটোরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নাম চেঙ্গিস খানের নামে রাখা হয়েছে। তার ছবি দেখা যায় মঙ্গোলিয়ার কাগজের টাকায়, এমনকি ভদকা আর সিগারেটের প্যাকেটেও তার ছবি ব্যবহার করা হয়। এসবই প্রমাণ করে যে, শত শত বছর পেরিয়ে গেলেও চেঙ্গিস খান মঙ্গোল জাতির গর্ব হয়ে রয়ে গেছেন।

এদিকে, বিজ্ঞানীরা যখন জলবায়ু নিয়ে আরও সূক্ষ্ম গবেষণা করতে পারছেন, তখন তারা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারছেন যে প্রকৃতির আবহাওয়া কীভাবে ইতিহাসকে পাল্টে দিয়েছে। যেমন, অস্বাভাবিক আবহাওয়া হয়তো দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরে পলিনেশীয়দের ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি করেছিল। আবার, মেক্সিকোর এক প্রাচীন নগরী আবহাওয়া বদলের কারণে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। এমনকি, চেঙ্গিস খানের জন্মের ৮০০ বছর আগে আতিলা দ্য হানের রোমান সাম্রাজ্যের ওপর আক্রমণ চালানোও ছিল এক ধরনের জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব।

এই নতুন গবেষণার লেখকরা বলেন, মঙ্গোলদের হাঙ্গেরি থেকে হঠাৎ পিছু হটার ঘটনাটি প্রমাণ করে যে ইতিহাসের মোড় ঘোরাতে কখনো কখনো খুব সামান্য আবহাওয়ার পরিবর্তনই যথেষ্ট। মাত্র কয়েক ডিগ্রি কম-বেশি হলেই মানব ইতিহাসের গতি সম্পূর্ণভাবে বদলে যেতে পারে—এটিই হতে পারে ভবিষ্যতের জলবায়ু পরিবর্তন থেকে শেখার সবচেয়ে বড় শিক্ষা।

তথ্যসুত্রঃ Science Alert, Business Insider

বিজ্ঞানের সব খবর সবার আগে পেতে আমাদের ফেসবুক পেজটি ফলো করে রাখুন।
Leave A Reply