মানুষের ইতিহাসে জ্ঞান অর্জনের পথে সবচেয়ে বড় বাঁধা ছিল চোখের দুর্বলতা। আমরা সকলেই জানি একটা জীবের জন্য চোখ জিনিসটা কতটা মূল্যবান। কিন্তু তৎকালীন সময়ে অর্থাৎ চশমা আবিষ্কারের আগে যাদের দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ ছিল, তারা শুধু জীবনযাপনে পিছিয়ে থাকেননি, বরং জ্ঞানের আলো ছড়াতেও হোঁচট খেয়েছেন। রোমান মহাবাগ্মী সিসেরো (Cicero) একসময় আক্ষেপ করেছিলেন, দুর্বল চোখের কারণে তাকে দাসদের দিয়ে বই পড়ে শোনাতে হতো। আবার সম্রাট নিরো (Nero) সবুজ পাথরের টুকরো চোখে ধরে গ্ল্যাডিয়েটরদের লড়াই দেখতেন, ভেবে যে আলো তার চোখকে তরতাজা করবে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে মানুষ এভাবে দৃষ্টির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করেছে।
কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, সেই সীমাবদ্ধতা ভাঙতে শুরু হয় এক হাজার বছরেরও বেশি আগে! যখন আরব বিজ্ঞানী ইবনে আল-হাইতাম (Ibn al-Haytham) আলো ও প্রতিসরণের রহস্য উন্মোচন করেন। সেখান থেকেই জন্ম নেয় মানুষের দৃষ্টিশক্তিকে নতুনভাবে ফিরিয়ে আনার প্রচেষ্টা।
তাহলে কীভাবে এই যুগান্তকারী বস্তুর উৎপত্তি হলো? চলুন জানা যাক।
বিশ্বের প্রথম দৃষ্টি সহায়ক যন্ত্র
চোখের সমস্যার সমাধান খুঁজতে মানুষের চেষ্টা বহু পুরনো। সেই সময়ে পড়তে বা দেখতে অসুবিধা হলে কোনো উপায় ছিল না, শুধু মেনে নিতে হত। এমনকি গ্রিক চিকিৎসক গ্যালেন (Galen) কিংবা রোমান লেখক সেনেকা (Seneca) আলো প্রতিসরণ নিয়ে ভাবলেও, কোনো কার্যকর দৃষ্টিসাহায্য আবিষ্কার করতে পারেননি।

কিন্তু সেই শূন্যস্থান পূরণ করলেন আরব বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ ইবনে আল-হাইতাম। তাঁর লেখা বিখ্যাত গ্রন্থ আল-মানাজির (Book of Optics) ছিল অপটিক্স বিজ্ঞানের এক বিশাল মোড় ঘোরানো কাজ। সেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, মানুষ জিনিস দেখে তখনই, যখন আলোকরশ্মি চোখে প্রবেশ করে। আলো সোজা পথে চলে, কিন্তু কাচ বা পানির মতো স্বচ্ছ কোনো বস্তুর মধ্যে গেলে তা প্রতিসরিত হয়।
তার এই আবিষ্কৃত ধারণা সে সময় এতটাই যুগান্তকারী ছিল যে, বইটি পরে লাতিন ভাষায় অনূদিত হয়ে ইউরোপের বিভিন্ন মঠ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপীয় জ্ঞানচর্চার ভাণ্ডারে অপটিক্সের এই নতুন জ্ঞান রেনেসাঁর পথ প্রশস্ত করেছিল।


সেখান থেকেই ১৩শ শতকে ইতালিয়ান সন্ন্যাসীরা ইবনে আল-হাইতামের ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেন। তাঁরা পাথরের কাচ বা কোয়ার্টজ থেকে অর্ধগোলক আকৃতির লেন্স বানালেন, যাকে বলা হয় রিডিং স্টোন। লেখার ওপর রাখলে এই লেন্স অক্ষরগুলো বড় হয়ে যেত, ফলে বয়সজনিত চোখের সমস্যা থাকা সন্ন্যাসীরা সহজে বই পড়তে পারত।
সেই সময়ই জার্মান ভাষায় Brille শব্দের প্রচলন শুরু হয়। যা এসেছে beryll থেকে, অর্থাৎ কাচের সেই খনিজ পাথরের নাম।
চশমার জন্মস্থান
রিডিং স্টোন আসল চশমা ছিল না, কারণ এগুলো হাতে ধরে ব্যবহার করতে হত। চশমার জন্ম হয় ইতালির ভেনিস শহরের কাছের মুরানো (Murano) দ্বীপে। এই দ্বীপ তখন বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত কাচ তৈরির কেন্দ্র। মুরানোর কারিগররা বিশেষ ধরনের সাদা কাচ বানাতো, যা দুনিয়ার অন্য কোথাও পাওয়া যেত না। তাদের গোপন ফর্মুলা এতটাই মূল্যবান ছিল যে, কোনো কারিগর দ্বীপ ছেড়ে পালালে মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হতো।

১৩শ শতকের শেষের দিকে মুরানোর কারিগররা এক অসাধারণ সাফল্য পেলেন। প্রথমবারের মতো তাঁরা দুটি উত্তল লেন্স কাঠের ফ্রেমে বসিয়ে একটি রিভেট দিয়ে যুক্ত করলেন। এভাবেই তৈরি হলো প্রথম “রিভেট গ্লাসেস” (Rivet Glasses)। যদিও এগুলো কানে বা নাকে আটকে থাকত না, ব্যবহারকারীকে কেবল হাতে ধরে চোখের সামনে রাখতে হত, তবুও এটি ছিল একটি বিপ্লব। ১৩৫২ সালে ইতালির ত্রেভিসো (Treviso) শহরে আঁকা এক ফ্রেস্কোচিত্রে এই ধরনের চশমা দেখা যায়। এরপর ধীরে ধীরে ইউরোপের অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়ে।

সকল আকার এবং আকৃতির চশমা
চশমার নকশা সময়ের সাথে পাল্টাতে থাকে। প্রথমদিকে কাঠের বদলে ধাতু, চামড়া, হাতির দাঁত, কচ্ছপের খোল, এমনকি রূপা ও ব্রোঞ্জও ব্যবহার করা হয়। এসব ফ্রেম এত ব্যয়বহুল ছিল যে কেবল ধনী মানুষরাই কিনতে পারত।
১৭শ শতক থেকে চশমার বিভিন্ন ধরণ দেখা দিতে শুরু করে। যেমন মনোকল, যা এক চোখে ব্যবহৃত হত এবং ধনী সমাজে তা ছিল মর্যাদার প্রতীক। আবার লর্গনেট নামে এমন এক ধরনের চশমা বানানো হয় যেটি লম্বা হাতল ধরে চোখের সামনে রাখতে হতো। নোজ-ক্রাশার নামে বিখ্যাত নুরেমবার্গ চশমাও তখন জনপ্রিয় হয়, যা একটানা লম্বা তার দিয়ে বাঁধা থাকত। পরে ধনীদের মধ্যে পিন্স-নে (Pince-nez) চশমা জনপ্রিয় হয়, যা নাকের ওপর আটকে থাকত।
সেই সময়ে চশমার ব্যবহার শুধু চোখের চিকিৎসা নয়, সামাজিক অবস্থানও প্রকাশ করত যা বর্তমান যুগেও চলমান। কোনো কোনো সমাজে চশমা জ্ঞান আর মর্যাদার প্রতীক ছিল। আবার অনেকে এটিকে শুধু ফ্যাশনের অংশ হিসেবেও ব্যবহার করত।
বর্তমান যুগের চশমা
১৮শ শতক থেকে চশমা আরও আধুনিক রূপ নিতে শুরু করে। ইংল্যান্ডে ১৭২৮ সালে স্কারলেট (Scarlett) নামের এক অপটিশিয়ান টেম্পল গ্লাসেস তৈরি করেন, যেখানে নাকের ব্রিজ ও কানের হুক ছিল। এতে আর চশমা হাত দিয়ে ধরে রাখতে হত না। এরপর ১৭৮৪ সালে বেঞ্জামিন ফ্রাঙ্কলিন (Benjamin Franklin) তৈরি করেন বিফোকাল লেন্স, যেখানে একসঙ্গে দূরের ও কাছের জিনিস দেখা যেতো। আজও এগুলোকে “ফ্রাঙ্কলিন গ্লাসেস” বলা হয়।
১৯শ শতকে শিল্প বিপ্লবের ফলে চশমার দাম কমে যায় এবং সাধারণ মানুষের নাগালে আসে। একই সময়ে সূর্যের আলো থেকে রক্ষা পেতে তৈরি হয় আধুনিক সানগ্লাস। ২০শ শতকে এসে চশমা শুধু চিকিৎসা নয়, বরং ফ্যাশন হিসেবেও জায়গা করে নেয়। অড্রে হেপবার্ন থেকে শুরু করে জন লেনন, সবাই চশমাকে ব্যক্তিত্বের অংশ করে তুললেন।
আজকের দিনে চশমা প্রযুক্তির বিস্ময়। অ্যান্টি-রিফ্লেকটিভ লেন্স, প্রগ্রেসিভ লেন্স, ব্লু লাইট ফিল্টার সবই চোখের সুরক্ষায় ব্যবহৃত হচ্ছে। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি গ্লাসেস বা স্মার্ট গ্লাসও নতুন যুগের দরজা খুলে দিয়েছে। আবার মজার বিষয় হলো, এখন অনেকেই কোনো পাওয়ার ছাড়াই শুধু ফ্যাশনের জন্য চশমা ব্যবহার করেন, যাকে বলে জিরো গ্লাসেস।
সর্বশেষ
পরিশেষে, চশমার ইতিহাস শুধু চোখ ভালো দেখার গল্প নয়, বরং মানুষের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সমাজেরও অংশ। প্রাচীন রিডিং স্টোন থেকে শুরু করে আজকের স্মার্ট গ্লাস পর্যন্ত পথচলা এক বিশাল অগ্রগতি। একসময় যা ছিল কেবল ধনীদের হাতের নাগালে, আজ তা সবার দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। চশমা শুধু দৃষ্টি ফিরিয়ে দেয়নি, বরং মানুষকে দিয়েছে নতুন দিগন্তে পৌঁছানোর শক্তি।
:
তথ্যসূত্র :

